আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাস হয়ে এসে ভারতে সাম্রাজ্য শাসন করেছিল হাবসিরা

8709

রাজিয়া সুলতানা ছিলেন ভারতের অন্যতম বীরাঙ্গনা | তাঁর সঙ্গে জামালউদ্দিন ইয়াকুতের সম্পর্ক নিয়ে বহু কথা শোনা যেত অভিজাত মহলে | কে ছিলেন ইয়াকুত ? মধ্যযুগীয় দিল্লিতে তিনি ছিলেন এক চর্চিত নাম | সে সময় দিল্লি শাসন করত তুরস্কের অভিজাত রক্তরা | ইয়াকুত কিন্তু জন্মগত দিক দিয়ে অভিজাত বা তুর্কী‚ কোনওটাই ছিলেন না | তিনি ছিলেন আফ্রিকান ক্রীতদাস | সেই অবস্থা থেকে উন্নীত হয়ে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন আভিজাত্যের শিখরে | ফলে পেয়েছিলেন আমির-উল-উমারা উপাধি | তিনিই প্রথম আফ্রিকান যিনি ভারতীয় সমাজে এতটা গুরুত্ব লাভ করেছিলেন |

তারপরে অবশ্য আরও অনেক আফ্রিকান উজ্জ্বল হয়েছেন ভারতের ইতিহাসে | ইয়াকুৎ প্রথম আলোকবর্তিকা‚ তাতে সন্দেহ নেই | নানা রূপে আফ্রিকানরা ভারতে এসেছিলেন | ক্রীতদাস‚ ব্যবসায়ী‚ সৈন্য এবং জলদস্যু | অনেকেই নতুন রূপে ও পরিচয়ে মিশে গিয়েছিলেন ভারতীয় জনমানসে | সেনাপতি‚ অভিজাত ওমরাহ‚ রাজনীতিক-সহ নানা পরিচয় | এমনকী‚ নিজেদের রাজত্বও স্থাপন করে ফেলেছিলেন | যেমন মুঘলদের ত্রাস ছিলেন মালিক অম্বর | মহারাষ্ট্রের উপকূলীয় অংশে জঞ্জীরা দুর্গ ছিল আফ্রিকান শাসকের ঘাঁটি | 

ক্ষমতাবান আফ্রিকান শাসকরা দক্ষিণ ভারতে ছিল সিদ্দি ও উত্তর ভারতে হাবসি | আরবসাগরের ঢেউ বেয়ে বহু যুগ ধরেই আফ্রিকার সঙ্গে ব্যবসায়িক আদানপ্রদান ছিল ভারতের | কবে প্রথম ভারতে আফ্রিকানদের পা পড়েছিল‚ তা সঠিক জানা যায় না | প্রথম প্রমাণ আছে সপ্তম শতাব্দীর | যখন তারা ভারতে এসেছিল ক্রীতদাস হয়ে | আরব বণিকরাই বিক্রি করত তাদের | ইউরোপীয়ানরা আসার পরে দাস ব্যবসার হাল চলে গিয়েছিল তাদের হাতে | সবথেকে বড় মাইগ্রেশন হয় উনবিংশ শতাব্দীতে | যখন হায়্দ্রাবাদের নিজাম আফ্রিকান হাবসিদের নিয়োগ করেছিলেন ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর পদে |

বিশ্বের অন্যান্য দেশে আফ্রিকান ক্রীতদাসদের দিয়ে নিকৃষ্টতম কাজ করিয়ে নেওয়া হয়েছে | কিন্তু ভারতবর্ষে গুরুত্ব ও মূল্য দেওয়া হয়েছে তাদের সাহস ও দৈহিক শক্তির উপরে | সুলতান‚ মুঘল এবং হায়দ্রাবাদি নিজাম‚ সবার সেনাবাহিনীতে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে | বিংশ শতাব্দী অবধি এই নিয়োগ জারি ছিল | তবে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দী ছিল ভারতে আফ্রিকানদের সোনালি সময় | বাংলা‚ গুজরাত ও দাক্ষিণাত্য রীতিমতো শাসন করেছে তারা |

বঙ্গদেশে চতুর্দশ শতাব্দী থেকেই বহাল ছিল সুলতানি শাসন | সেনাবাহিনীতে বহুলাংশে নিযুক্ত হয়েছিল আফ্রিকান যোদ্ধারা | সেখান থেকে তারা ধীরে ধেরে দেখা দিল প্রশাসনিক রূপে | তবে সবাইকে টেক্কা দিয়ে গেলেন একজন আবসিনিয়ান‚ বরবক শাহজাদা | তৎকালীন বাংলার শাসক জালালউদ্দিন ফতে শাহ-র সময়ে প্রাসাদের মূল রক্ষী ছিলেন তিনি | পরে সেনাবিদ্রোহ করে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন ক্ষমতা | বরবক হলেন বাংলার প্রথম আফ্রিকান শাসক | তিনি শুরু করেছিলেন হাবসি শাসক বংশ |

তবে এই শাসন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি | ১৪৯৩ তেই শেষ হয়ে যায় হাবসি বংশ | তবে এই বংশের শাসকরা ছিলেন উদার | অন্য ধর্মের বহু নিদর্শন বানিয়েছিলেন তাঁরা | মালদাতে গৌড়ে আছে ফিরোজ মিনারের মতো বহু নিদর্শন‚ যা নির্মিত হয়েছিল হাবসি রাজাদের আমলে | গুজরাতের সেনাবাহিনীতেও মূল স্তম্ভ ছিল আফ্রিকান হাবসিরা | 

তর্কসাপেক্ষে ভারতের উজ্জ্বলতম আফ্রিকান বা হাবসি মালিক অম্বর | ষোড়শ শতাব্দীর মাঝে তাঁর জন্ম ইথিওপিয়ায় | ক্রীতদাস হয়ে হাতবদল হতে হতে মধ্যপ্রাচ্য‚ বাগদাদ হয়ে এসে পৌঁছেছিলেন ভারতে | সেখানেও বেশ কয়েবার ঠিকানা বদলে অবশেষে থিতু হন দাক্ষিণাত্যে | আহমদনগর সুলতানি বংশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি | গেরিলা যুদ্ধে পটু মালিক অম্বরের জন্য দাক্ষিণাত্য অধরা রয়ে গিয়েছিল মুঘলদের কাছে | মালিক অম্বরের মেয়েদের বিবাহ হয়েছিল সুলতানি বংশে |

আফ্রিকান শক্তির আর এক নিদর্শন হল মরাঠা উপকূলের জঞ্জিরা দুর্গ | জঞ্জিরা দ্বীপ অধিকার এই দুর্গ বানিয়েছিলেন মালিক অম্বর | মরাঠা বা মুঘল কেউ দখল করতে পারেনি | ব্যর্থ হয়েছিল ব্রিটিশরাও | ভারতের স্বাধীনতা লাভ অবধি এই দুর্গ থেকে সিদ্দিরা ছোট্ট এলাকা শাসন করে গিয়েছিল | গুজরাত‚ কর্নাটক‚ মহারাষ্ট্র‚ গোয়া‚ হায়দ্রাবাদে খুব সামান্য হলেও এখনও সিদ্দিরা আছেন |

তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আফ্রিকানরা ভারতীয়দের বিয়ে করে মিশে গেছেন জনজীবনের মূলস্রোতে | বর্তমানে ভারতে প্রায় ৫০ হাজার আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আছেন | তবে তাঁরা এখন পোশাক-আচার-আচরণে এতটাই ভারতীয়‚ যে চেহারায় কিছু বৈশিষ্ট্য ছাড়া বোঝার উপায় নেই যে এঁদের পূর্বপুরুষরা কয়েকশো বছর আগে আফ্রিকা থেকে ভারতে এসেছিলেন | 

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.