শব-সাধনা‚ নরমাংস ভক্ষণ থেকে মৃতদেহের সঙ্গে যৌন সঙ্গম – রহস্যে ঘেরা বিভীষিকার নাম ‘অঘোরী সাধু’

8520

ক্যানিবলিজম বা মানুষের মাংস খাওয়া । লিবিয়া এবং কঙ্গোর বেশকিছু যুদ্ধে এই ক্যানিবলিজম-এর চর্চা হয়েছে। করোওয়াই হল এমন একটি প্রজাতি যাঁরা আজও বিশ্বাস করেন যে নরমাংস খাওয়া সংস্কৃতিরই একটি অংশ। মানুষের আচার-আচরণের গ্রহণযোগ্যতার সীমানা নির্ধারণে নৃতত্ত্ববিদ্‌দের বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন করে এই ক্যানিবলিজম।

নরমাংস ভক্ষণের কারণ খুঁজতে গিয়ে বেশ কয়েকটি বিষয় উঠে এসেছে। প্রাথমিকভাবে নরমাংস খাওয়ার সামাজিক আচরণে দুই ধরণের নৈতিক পার্থক্য রয়েছে- একটি হল, একজনকে হত্যা করা তার মাংস খাওয়ার জন্য ও আরেকটি হচ্ছে স্বাভাবিকভাবে মৃত মানুষের মাংস খাওয়া। ইতিহাস বলে, সপ্তম শতকে মুসলিম ও কুরাইশদের যুদ্ধের সময়ে ক্যানিবলিজম-এর ঘটনা ঘটে।  মূর্তিপুজক থেকে খ্রীষ্টধর্ম অবলম্বন করার আগে পর্যন্ত অর্থাৎ দশম শতাব্দীতেও হাঙ্গেরীর অধিবাসীরা মানুষের মাংস খেত।

অঘোরী বলতে মূলত বীভৎস আচারে অভ্যস্ত শৈব সম্প্রদায়কে বোঝায় যাঁরা মহাকালের তপস্যায় গভীরভাবে বুঁদ হয়ে আছেন। ভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য তপস্বীস্বামী নিগমানন্দ বলেছিলেন কোন সাধনাই খারাপ নয়। শুধু উপাসনার ক্ষেত্রে পার্থক্য থেকে যায়। যদিও শ্বেত সাধকরা মনে করেন অঘোরী সাধনা একটি নিচু স্তরের সাধনা। কিন্তু এদের ক্ষমতা প্রবল। প্রচলিত বিশ্বাস একটা গোটা এলাকায় বৃষ্টি বা ক্ষরা এনে দিতে পারে অঘোরীরা। এদের উপাসনা পদ্ধতিও খুব অদ্ভুত। মল, মূত্র, পশুর মাংস, মানুষের মাংস, মদ সবই কাজে লাগে এই ধরনের তপস্যায়। তবে এই তপস্যার কোন উল্লেখ যজুর্বেদ-এ নেই। তবে আজও উত্তর ভারতে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে অঘোরীদের দেখা মেলে।

অঘোরী সাধকদের মন-প্রাণ জুড়ে শুধু শিব তথা মহাকালের অবস্থান। অঘোরীদের আরাধনার পদ্ধতি বাকিদের থেকে আলাদা। এঁরা একেবারে অন্য পদ্ধতিতে মহাদেবের পুজো করে থাকেন। বেশ কিছু পুঁথিতে লেখা রয়েছে অঘোরী সাধুদের কাছে সবাই মৃতদেহ। সেই কারণেই কোনও কিছু নিয়েই এঁদের কোনও মোহ-মায়া নেই।

এঁরা সমস্ত জাগতিক লোভকে ভুলে ভগবান শিবকে পেতে চান। বিশ্বাস করেন প্রাণের উৎ‍স শিবের থেকে, আর শেষও হয় শিবের শরীরের গিয়েই। আর তাই এদের কাছে পরিষ্কার আর নোংরা বলে কিছু হয় না, তাঁদের কাছে সবই ঈশ্বরের দান। ভগবান শিবকে পেতে এঁরা এমন সাধনা করেন যে নানা ধরণের অলৌকিক শক্তির অধিকারী হয়ে ওঠেন। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ অনুসারে অঘোরী সাধুবাবারা যে কোনও রোগ, এমনকী ক্যান্সার রোগীকে পর্যন্ত সারিয়ে তুলতে পারেন। যদিও এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে একথাও ঠিক যে, পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যা ঠিক-ভুল বা সত্য-মিথ্যার অনেক ঊর্ধ্বে।

তবে অঘোরী সাধু হওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। টানা ১২ বছর কঠোর সাধনার পর অঘোরী গুরুর আশীর্বাদে নিজের ধর্মীয় যাত্রা শুরু করেন অঘোরী সাধুরা। আর তখনই জন্ম হয় এক চরম সাধকের। যাঁদের বস্ত্র হয় মৃত ব্যক্তির জামা-কাপড়ের ছেঁড়া অংশ। শরীরে থাকে মৃত দেহের ছাই। এখানেই শেষ নয়, এমন সাধকদের সারা জীবন বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, যেমন- প্রত্যেক অঘোরী সাধু কে একজন গুরুর অধীনে থাকতে হয়। গুরু যা বলেন, সেইভাবে জীবনযাপন করতে হয়। সংগ্রহ করতে হয় মৃতদেহের খুলি, যা তাঁদের সাধনার প্রধান উপকরণ।

এবার জেনে নেওয়া যাক অঘোরীদের সংস্কৃতি কেমন। মূলত নদীর ধারের কোনও নির্জন শশ্মানে অথবা গভীর জঙ্গলের মধ্যে এঁদের বাস। মৃত ব্যক্তির মাংস খান এঁরা। এঁদের বিশ্বাস, এমনটা করার মধ্যে দিয়ে তাঁরা ভক্তির প্রদর্শন করছেন। কারণ মৃত্যুর পর আত্মা শরীর ছেড়ে অন্য জগতে চলে যায়। তাই যে কোনও মৃত পশুর মাংস খাওয়া আর মানুষের মাংস খাওয়ার মধ্যে কোনও পার্থক্য় খুঁজে পান না অঘোরীরা। শুধু তাই নয়, মৃতদেহ যে কাঠে পোড়ানো সেই একই কাঠে তাঁরা রান্না করে খান। এমনও বিশ্বাস আছে যে অঘোরী সাধুরা মৃতদেহের উপর বসে খুলিকে সামনে রেখে সাধনা করেন। কিন্তু বাস্তবে এমন দৃশ্য কেউ দেখেছেন কিনা তা জানা নেই।

এঁদের সম্পর্কে যা কিছু জানা গিয়েছে, তার বেশিরভাগই প্রাচীন পুঁথিপত্রে লেখা রয়েছে। সভ্য সমাজের থেকে হাজার মাইল দূরে জীবনযাপন করা এমন সাধকদের খোঁজ পাওয়ার সত্যিই খুব কঠিন।তবে এঁদের একেবারেই যে দেখা পাওয়া যায় না, তেমনি নয়। অনেকে বিশ্বাস করেন যে, এখনও আমাদের দেশের দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলে বহু অঘোরী সাধু বসবাস করেন। আর শিবরাত্রির সময় তাঁদের মধ্যে অনেকে পশুপতিনাথ মন্দিরে পুজো দিতে আসেন। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন।

হিমালয়ের ঠান্ডা আবহাওয়া হোক বা গরম- তারা প্রতিটি ঋতুতে জামাকাপড় ছাড়া থাকেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর জন্য ছোটো জিনিসগুলি নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়, যেমন পরিচ্ছন্ন থাকা এবং পোশাক পরিধান করা। অঘোরীরা বিশ্বাস করেন যে তাঁদের কাছে মানুষের সব রোগ নিরাময়ের ওষুধ আছে। তারা মৃতদেহ থেকে অসাধারণ তেল বের করে ঔষধ তৈরি করেন, যা খুব কার্যকর বলে মনে করা হয়। অঘোরী সাধুরা ঘৃণা থেকে দূরে থাকেন। কর্মের উপর ভিত্তি করে ভগবান শিবের প্রদত্ত সবকিছুই তাঁরা গ্রহণ করেন। তাঁদের মতে,পরিত্রাণের জন্য এটা প্রয়োজনীয়।

তাঁরা নিজের কাপড় ত্যাগ করলেও মৃতদেহগুলি জ্বলন্ত চিতার ছাই দিয়ে নিজের শরীর ঢেকে রাখেন। মানুষের হাড়কে গহনার মতো পরিধান করেন। বলা হয় যে অধিকাংশ অঘোরীদের তান্ত্রিক ক্ষমতা আছে। তাঁরা কালো জাদুও জানেন এবং তাঁরা যখন মন্ত্রকে উচ্চারণ করতে শুরু করেন তখন তাঁদের মধ্যে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা আসে বলে মনে করা হয়। অঘোরীরা নারীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেন। কিন্তু তাদের ইচ্ছা না থাকলে স্পর্শ করেন না। তাঁরা শশ্মানের মৃতদেহের সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক করেন বলেও শোনা যায়।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.