কুমোরটুলির কড়চা

-“সন্দীপ, আরেকটু জুম ইন কর – আরেকটু বাঁদিকে। আলোটা একটু কম। রোহিতাশ্ব, তুই লাইটমিটারটা দেখিস, না ফ্ল্যাশ নয় – ন্যাচারাল লাইট চাই। মধুশ্রী, আঁচলটা মাটিতে লুটোবে – লুকটা আরেকটু ভ্যাকান্ট চাইছি, মাতৃমূর্তির অসহায়তা – কাম অন, থিমটা ভুললে চলবে না। দেবীর মুখটা একটু ডিফোকাসড। হ্যাঁ, ঠিক আছে – চলো, টেক শট!” ক্লিক! ক্লিক-ক্লিক!

–“আরেকটা, রেডি – টেক শট!” ক্লিক! ক্লিক-ক্লিক! ক্যামেরা, এ্যাকশন – সিনঃ২৩/৪/১ কুমোরটুলির কড়চা …

বৃদ্ধ গোবিন্দ পাল তার বেতের মোড়াটায় বসে চেয়ে থাকেন। বাবুরা সব ফটোগ্রাফার, কুমোরদের ছবি তুলতে এয়েচেন। সন্ধে হলে নাহয়, আবার কাজ শুরু করা যাবে। তিনি জোগাড়ে সুবিমলকে এখনকার মতো রং-তুলি তুলে রাখতে বলেন … কাজ এখন থাক, কারণ – ছবি উঠবে এখন।

সুতানুটি, গোবিন্দপুর, কলিকাতা – কমবেশী প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের খবর …

লালচুলো, লালমুখো সাহেবেরা তাদের বসতি গড়ে তুলতে বেছে নিয়েছিলেন হুগলী নদীর তীরবর্তী এই সামান্য অঞ্চলটিকেই। সাবর্ণ্য রায়চৌধুরীদের জমিদারি থেকেই তিনখানি গ্রাম পাওয়া গেলো। পত্তন হলো শহর কলকাতার। তিনশো বছর আগেকার চেহারাটা ঠিক কেমনটাই বা ছিলো তখন? মনে মনে ক্যামেরার রিল ঘোরে, আর একেকটা করে ছবি তৈরী হয়।

শহর যখন বেড়ে উঠলো, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হুকুমে হলওয়েল সাহেবের উপর ভার বর্তালো পেশা অনুযায়ী মানুষদের থাকবার জায়গাকে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার। পাথুরিয়াঘাটা, জোড়াসাঁকো, শোভাবাজারে গড়ে উঠলো বড়মানুষদের বাসস্থান। পেশার ভিত্তিতে তৈলব্যবসায়ীদের জন্য গড়ে উঠলো কলুটোলা, কাঠের মিস্ত্রীদের জায়গা হলো ছুতোরপাড়ায়, মদের কারবারীরা ঠাঁই নিলেন শুঁড়িপাড়াতে, গোয়ালারা বাসা নিলেন আহিরীটোলায়। আর মৃৎশিল্পীদের জন্য তৈরী হলো কুমোরটুলি পাড়া। সেই থেকেই নয় নয় করেও, কেটে গেলো তিনশোটা বছর। তিলোত্তমা হয়ে উঠলো কলকাতা।

মারোয়াড়ী ব্যবসাদারদের আগমন, এবং পরবর্তীতে বড়বাজারের পত্তন – খানিকটা হলেও চাপ সৃষ্টি করেছিলো এলাকার স্থানীয় ছোট শিল্পীদের উপর। একে একে অনেক-কটি পেশার মানুষেরাই পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেবল কুমোরটুলির তেমনটা বদল হলো না। শিব-দুর্গা-পার্বতীর পাশাপাশি গণেশকেও তারা বরণ করে নিলে। মনসার পাশেই জায়গা করে নিতে পারলেন লক্ষ্মী-সরস্বতীরাও।

আজকের দিনে যদি কুমোরটুলি যেতে হয়, শোভাবাজার মেট্রোতে নেমে – লাল মন্দিরের দিকটায় তাকালে, বামহাতে নরেন্দ্রকৃষ্ণ দেবের নামাঙ্কিত পার্কের পাশটুকু দিয়ে চলে আসবেন – চিৎপুর রোডের মোড়। এখানে আপনার সামনেই পাবেন স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া। এই মোড় থেকে ডানদিকে ঘুরে অল্প কিছুটা হাঁটলেই বনমালী সরকার স্ট্রীট। কুমোরটুলির প্রবেশদ্বার। পাশাপাশি অজস্র ঘর, অনেক-কটাই আবার দোতলা। বাঁশের কঞ্চির সিঁড়ি বেয়ে উপরে যাওয়ার পথ। ওপরে-নীচে বিশালাকৃতি সমস্ত মূর্তি গড়া হচ্ছে, কোনওটা বা একমাটির অবস্থা, কোনওটায় বা আবার সাদা রঙের পোঁচ পড়ে গিয়েছে।

যতবার গিয়েছি জানেন, অবাক হতে হয়েছে – এমন নড়বড়ে সমস্ত বাড়ির অবস্থা – এত অজস্র, অমন সুন্দর এবং বিশালাকৃতি প্রতিমার ছড়াছড়ি – বের করবার সময়ে কি অসম্ভব পরিশ্রমটাই না করতে হয়। শেষ পর্যন্ত কোনও একটিবারের সফরে, তা দেখবারও সৌভাগ্য হয়েছে। আর এটুকুও বলা চলে যে, সে জিনিস স্বচক্ষে না দেখলে পরে – তা বিশ্বাস হবার নয়।

মধ্যে মধ্যেই আবার শোলার মুকুট, গয়না আর দেবীর গায়ের জরির কাপড়ের দোকান। বনমালী সরকার স্ট্রীট ধরে আরও খানিকটা এগোলেই, রাস্তার একেবারে বাঁ দিকটাতেই পড়বে রুদ্রপালেদের স্টুডিও। মোহনবাঁশি রুদ্রপাল। দেবীমূর্তিদের আকারেই যেন থমকিয়ে যেতে হয়। এইখান থেকেই পরপর ডানহাতে তিনখানি সরু গলি পাবেন। প্রতিটারই দুপাশে শিল্পীদের ঘর। তফাত কেবল, এই গলিগুলির প্রতিটিই, বনমালী সরকার স্ট্রীটেরও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিসরের। দুইপাশে ঠাসাঠাসি করে লক্ষ্মী-গণেশ-অসুর-সিংহের সহাবস্থান। তার মধ্যেই আবার একখানি খোলা শৌচাগার, বৃষ্টিতে সমস্ত দিক সুরভিত করে তোলে। কোথাও বা উচ্ছিষ্ট খাবার পড়ে আছে।

একবার দারুণ বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিলাম। তিনটি গলির মধ্যে শেষ যে গলিটি – তাতে যতদূর মনে পড়ে রাখাল পাল বা গোরাচাঁদ পালের স্টুডিওতে আশ্রয় নিলাম। গলিটা নদী হবে হবে করছে, জল বাড়ছে। বৃষ্টির ছাঁটে স্টুডিওর ভিতরটায় ঢুকে আসি। কাদা-মাটির সোঁদা গন্ধ আর চকচকে রঙের গন্ধে বেশ লাগছিলো তখন। আর দেখছিলাম বিশাল বিশাল পলিথিনে সেই সমস্ত ঘেঁষাঘেঁষি করে রাখা বিশালাকৃতি প্রতিমাগুলিকে জল থেকে বাঁচাবার প্রয়াস। দাঁতে দাঁত চিপে বলতেই হবে, “সাবাস!” – বছরের পর বছর, বৃষ্টি আর দুর্যোগ সামলিয়ে কেমন করে যে ওখানকার শিল্পীরা প্রতিমা বানিয়ে চলেন, তা না দেখলে পরে – কেবল কাগজের লেখায় তা বিশ্বাস হবে না আপনাদের। সবটুকুর বর্ণনা দেওয়াটাও কঠিন।

মহালয়াতে ওরা চোখ আঁকেন। সেদিন সন্দীপ, রোহিতাশ্ব বা মধুশ্রীদের মতো মানুষদের আনাগোনা বাড়ে। দ্বিতীয়ার দিন থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা যাবার পালা শুরু হয়ে যায়। কাঁচা মাটির প্রথম কাঠামোতে, সাদা কাগজের স্লিপে বায়না ঝুলিয়ে যাওয়া বাবুরা তখন মাকে নিয়ে যেতে আসেন। রঙের গন্ধে, মাকে মাখানো ঘাম-তেলের চকচকে রূপের লাবণ্যে, শোলা কিংবা জরির গহনায় সেজে ওঠা সেই আশ্চর্য সৃষ্টিকে বিদায় দিতে হয়। মণ্ডপে মণ্ডপে তখন উদ্বোধনপর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। মা এসে গিয়েছেন। আলোয় সেজেছে দেশ।

এক পিতার ঘরে তখন, শূন্যতা কেবল। জানিনে, কুমোরটুলির শিল্পীরা কাব্যি করতে ভালোবাসেন কি না। তবু বলতে পারি, সেই বৈশাখের কাঠফাটা রোদে বাঁশের চালি কেটে তাতে খড় চাপানো হয়। ঘামের গন্ধ আর খড়ের গন্ধে গঙ্গাপাড় ম-ম করে, ক্যাঁচকোঁচ শব্দ – বাঁশকাটার আওয়াজ, খড় বাঁধার খসখস। ক্রমে তাতে মাটি পড়ে।

ভেজা মাটির গন্ধ আর একমেটে প্রতিমার সোঁদা গন্ধে শ্রাবণ আসে বোধহয়। সাদা রং পড়ে। নরম তুলতুলে কাদামাটির ছোঁয়ায় – দেবীর একেকটি আঙ্গুল তৈরী হয়। ছাঁচে ফেলে ভেসে ওঠে মুখ। শিল্পী তো নন, কুমোরেরা তখন পিতা হয়ে ওঠেন, মাতা হয়ে ওঠেন। হাতের আশ্চর্য ছোঁয়ায় তাঁদের মেয়েকে রূপ দেন তাঁরা। দেবী নন, ঘরের মেয়ে দুগ্গার রূপে তাঁদের ঘর আলো হয়ে ওঠে। তাঁরা পিতার চোখ দিয়ে তাঁকে দেখেন, আরও সাজিয়ে দেন।

মধুশ্রীদের মণ্ডপে যখন বোধন শুরু হয়, একেকজনের মন ভালো নেই তখন। দুগ্গা যে বাপের কোল খালি করেই বাপের বাড়ি গেছেন। গঙ্গার জলের শব্দে, কুমোরটুলির শিল্পীদের কি মন খারাপ হয়? কখনও জিজ্ঞেস করে উঠতে পারিনি …

কাশী মিত্তিরের ঘাট। ডিরেক্টর শুভময় বোস গলা-খাঁকারি দেয়। -“দীপ্তেশ, এইবারে বিকেলের সূর্যটাকে নাও। ফোকাস অন দ্য ওয়াটার। ঢেউগুলোকে জুম করো, সাউন্ড …” কুমোরটুলির কড়চা তো শেষ হবার নয় … কুমোরটুলির গল্প কেবল আরও এগিয়ে যায় …

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

2 COMMENTS

  1. দুর্গাপূজার প্রাক্কালে এমন সুন্দর একটি লেখা পাঠকদের উপহার দেবার জন্য bangla live.com ও লেখক অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায় কে আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here