দিলওয়ারা দেখতে মাউন্ট আবু

886
পাহাড় ঘেরা জমজমাট ‘নাকি’ লেক

রাজস্থান বেড়ানোর সমস্যা একটাই – বড্ড বেশি কেল্লা দেখতে হয়।আমরা তাই সেবার পশ্চিম রাজস্থান ঘুরে কিছুটা দক্ষিনে পাড়ি দিয়েছিলাম। প্রথমে মাউন্টআবুর উদ্দেশ্যে। ছোটোখাটো টিলা গোছের পাহাড় চতুর্দিকে ছড়ানো থাকলেও রাজস্থানের হিল স্টেশন বলতে একটাই – আরাবল্লি রেঞ্জের ওপর এই ‘আবু’, যার উচ্চতা মেরেকেটে চার হাজার ফিট।যোধপুর স্টেশন থেকে সকালবেলা ‘আবু রোড’ যাবার ট্রেনে চেপেছিলাম – রিজার্ভেশন ছিল না। বাধ্য হয়ে জেনারেল কামরা – তবে ভিড়ভাট্টা তেমন নেই। বউ আর ছেলে উঠেই বসার জায়গা পেয়ে গেল। আমি কয়েকটা স্টেশন বাদে, এবং জানলার ধারে। যাচ্ছি তো যাচ্ছি, কোথাও পাহাড়ের চিহ্ন মাত্র নেই। সামনের পাগড়ি মাথায় লোকটা জানাল – ‘অভি আবু রোড আয়েগা’।

জানলা দিয়ে কোমর অবধি বার করে দিয়েও পাহাড় দেখা গেল না ……. কিন্তু ট্রেনটা আস্তে হতেই যেন একেবারে ভোজবাজির মতো মাটি ফুঁড়ে গজিয়ে উঠল একটা গোটা রেঞ্জ।

আবু রোড অবধি ট্রেন আসে। এরপর গাড়ি ভাড়া করে পাহাড়ে ওঠা – এক ঘন্টাও লাগে না – আমরা দুপুর দেড়টার মধ্যে মাউন্ট আবু পৌঁছে গেলাম।

বাস স্ট্যান্ডের আশপাশটা বেশ ঘিঞ্জি – হোটেল, দোকানপাট, হইহট্টগোল। গাড়িতে আমাদের সঙ্গে একটা বড় বাঙালির দল ছিল। আমরা হোটেল বুক করে আসিনি শুনে একটু ভড়কাবার চেষ্টা করল।

‘সিজন টাইম…..ভালো হোটেলে জায়গা পাওয়া ….. দেখুন’, ইত্যাদি।

ওরা কলকাতা থেকে ব্যবস্থা করে এসেছে। বেশ কায়দা মেরে গাড়ি থেকে মালপত্তর নামিয়ে হোটেল খুঁজতে গিয়ে দ্যাখে সেটা একটা বাজারের মধ্যে নোংরা গলিতে ঢুকে ….. ঠিকমতো খোঁজ খবর না নিয়ে এলে, ট্যুরিস্টকে এরকম দুরবস্থায় হামেশাই পড়তে হয়।

জানতাম এখানকার ‘নাকি’ লেক-এর দিকটা সব থেকে সুন্দর। থাকলে ওখানেই কোথাও থাকব – জিগ্যেসপত্র করে সামান্য হাঁটতেই পৌঁছে গেলাম ….পাহাড় ঘেরা বিশাল লেক …. চারপাশটা বেশ মনোরম। লেকের ধার দিয়ে রাস্তা গেছে এবং পর পর ছিমছাম সব হোটেল। ঘরও পেয়ে গেলাম ‘লেক ভিউ’-এর দোতলায়।

উল্টোদিকের পাহাড় থেকে আঁকা লেক ভিউ হোটেল

হোটেলের নামটাও সার্থক – ঘরে বসেই দিব্যি লেক দেখা যায়। ভাড়াটাও তেমন আহামরি কিছু নয়। অনেকে বলে মাউন্ট আবু আসলে গুজরাটের হিল স্টেশন। হবেই তো, আহমেদাবাদ তো এখান থেকে মাত্র কয়েক ঘন্টার রাস্তা। একটু ঘুরলেই দেখা যাবে আদ্ধেক লোক গুজ্জু ভাষায় কথা বলছে। বহু দোকানের সাইন বোর্ড গুজ্জু ভাষায় লেখা।

সামনেই দেওয়ালি। তাই দলে দলে লোক বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে আনন্দ করতে এসেছে। খাবারের দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড় – সবই প্রায় নিরামিষ খানা। আমরাও বসে গেলাম ছোলে ভাটুরে আর পাওভাজি নিয়ে, অম্বিকা রেস্তোরাঁয়। ম্যানেজার নন্দুরাম বেশ আলাপি। ওকে বলেই ফেললাম, ‘এই সব পাহাড় দেখে কি আর আমাদের মন ভরে …. পারলে একবার এসে হিমালয় দর্শন করে যান।

অম্বিকা রেস্তোরাঁ

এখানকার বেশিরভাগ জায়গাই ন্যাড়া আর রুক্ষ। তবে এতেই ওরা যথেষ্ট খুশি। ‘নাকি’ লেক-এ জলবিহারের ব্যবস্থা আছে। আমরা প্যাডেল বোট চালিয়ে কিছুক্ষন ঘুরলাম। হইহট্টগোল পছন্দ না হলে লেকের ধার ধরে বরাবর রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে বেড়ানো যায়।

একরকম ঠেলাগাড়ি দেখলাম – এখানকার একমাত্র যানবাহন। নাম দিয়েছে, ‘বাবা গাড়ি’। তাতে দু-একজন ‘মা’কে দেখলাম বাচ্চাসমেত চড়ে চলেছে – বেশ ঠাসাঠাসি করে যদিও।

‘বাবা’ গাড়ি ও তার চালক

খাড়াই চড়তে অসুবিধে না থাকলে যে কোনও পাহাড়ের রাস্তা ধরে একেবারে টঙে উঠে চারধারের দৃশ্য দেখতে দারুন লাগে। এ সব জায়গায় রাজা-মহারাজারা বেশ কিছু হাভেলি বানিয়ে রেখেছে – তবে ঢোকা বারণ। আমাদের হোটেলের গা ঘেঁষে যে পাহাড়, তার মাথায় জ্বল জ্বল করছে জয়পুর কোঠি – প্রায় রাজপ্রাসাদ বলা যায়। কিন্তু উপরে উঠেও ভেতরটা দেখা গেল না।নামার সময় একটা শস্তা দরের হোটেলের ছাদে দেখলাম রঙিন চাঁদোয়া টাঙিয়ে লুচি ভাজা হচ্ছে। বিশাল একদল বাঙালি ট্যুরিস্ট এসেছে – ব্রেকফাস্ট হবে। বেলা তখন বারোটা – তবু দেখি, কেউ কোথাও নেই। শুনলাম, সারারাত বাস জার্নি করে এসে সবাই পাবলিক টয়লেটে ঢুকেছে, চান ইত্যাদি সারতে। ওবেলা দিলওয়ারা মন্দিরটা দেখে নিয়েই রওনা দেবে অন্য কোথাও। এইভাবে ঘুরতে পারলে খরচটা কম হয়, এইটুকুই যা।

পাহাড়ের মাথায় জয়পুর কোঠি

রান্নার লোকটা বাঙালি, ওদের সঙ্গেই ঘুরছে। আমার ছেলেকে দেখে বলল, ‘তুমি একটু হালুয়া খাবে? টাটকা বানানো হয়েছে। বুঝলাম, ব্যবস্থা মন্দ নয়।

মাউন্ট আবুতে একটা গোটা দিন হাল্কা চালে এদিক ওদিক করে কাটল ….. বেশ কয়েকটা স্কেচও হল।

কলকাতা ছাড়ার পর থেকে কেবল ছুটোছুটি হয়েছে …. একটু বিশ্রামেরও দরকার ছিল। অক্টোবরের মাঝামাঝি, তাও এখনও তেমন ঠাণ্ডা পড়েনি, তবে যথেষ্ট আরামদায়ক। আমাদের হোটেলের ঘর এমনিতে ভালো। কিন্তু খাটের মাথার কাছে দেওয়ালে টাঙানো বিশাল রাধাকৃষ্ণ মার্কা পেন্টিংটাকে কিছুতেই সহ্য করা যাচ্ছিল না।

এখানকার প্রধান আকর্ষণ হল, জৈনদের তৈরি দিলওয়ারা মন্দিরগুলো। মাউন্ট আবু থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে …… অটো ভাড়া করে আমরা দেখতে গেলাম। একটা পাহাড়ের ধারে কালো হয়ে আসা বড় বড় পাথরের খাঁজে প্রায় লুকিয়ে রয়েছে খান পাঁচেক মন্দির। খুব কাছে না গেলে চোখেই পড়বে না। হানাদারদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই বুদ্ধি করে এই ব্যবস্থা করেছিলেন সেকালের ঘর পোড়া মানুষেরা। আজ থেকে চোদ্দ বছর আগে গিয়ে দেখেছি মন্দির চত্বরে ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা বারণ – আরও অনেক আগে অবশ্য এই নিয়ম ছিল না।

আগাগোড়া মার্বেল পাথরের অপুর্ব সুন্দর কারুকাজওলা মন্দিরের সমস্ত দরজা-থাম আর ছাদগুলো রীতিমতো চমক লাগিয়ে দেয়। ঘন্টার পর ঘণ্টা দেখেও আশ মিটতে চায় না। এই সব ornamented আর জেল্লাদার পাথর খোদাই পৃথিবী বিখ্যাত। এত নিষ্ঠা ও দক্ষতা নিয়ে যাবতীয় স্থাপত্য তৈরী হয়েছে, অথচ কারিগরদের নাম কেউ জানতেই পারল না ! আমার বহু জায়গা ঘুরে মনে হয়েছে – এ ভারি অন্যায়। ঠিক যেমন অন্যায় ছবি তুলতে না দেওয়াটা। হাত নিশ-পিশ করলেও আমরা নিরুপায়। আরও রাগ ধরল, যখন বেরিয়ে এসে দেখলাম এখানকার স্থানীয় ফোটোগ্রাফারদের তোলা ছবির সব অ্যালবাম বিক্রী হচ্ছে। ঝাপসা ম্যাড়মেড়ে সব ছবি, এদিকে আকাশছোঁয়া দাম। অন্যদের তুলতে দিবি না, বেশ কথা। তাহলে নিজেদের তো ভালো করে তুলে রাখতে হয়। আজকাল অবশ্য ইন্টারনেট খুললে সব কিছু পাওয়া যায়। তবু নিজের মতো করে ছবি তোলার মজাটাই তো আলাদা। এতো কিছুর পরেও মনে হলো, মাউন্ট আবু আসাটা সত্যিই সার্থক।

এবার উদয়পুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা …. যার কথা পরের বার।   

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.