জোবের সঙ্গে বাক্যালাপ

397

মাঝরাতে কড়া নাড়ার শব্দ | বুঝি এ হল জোবের আগমনবার্তা | কতকাল কেটে গেল সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলকাতায় তবু ইংল্যান্ডের ঘড়ির নিয়মে সন্ধ্যাকালে প্রাতঃভ্রমণ আর উষাকালে শয্যাগমন | সে কথা দরজা খুলে বলি জোবকে | ও দরজার কোণে ওয়াকিং-স্টিকটি হেলান দিয়ে আরাম-কেদারায় বসে | তারপর পাইপ আর তামাক স্টুলের ওপর রেখে বলে, সবাই ঘুমুলে প্যাঁচা-যুগলের প্রেমালাপ শুনবে কে? ওই যে রায়চৌধুরী মশায়ের ছেলে শ্রীমান সুকুমার লিখেছিল না — প্যাঁচা কয় প্যাঁচানি, খাসা তোর চেঁচানি |

জোবের কথা শুনে চা বানানোর ফাঁকে বলি, সে কথা শুনতেই বুঝি মাস খানেক তুমি নিরুদ্দেশ!

পাইপে তামাক ভরতে ভরতে জোব বলে, কথা শোনা তো হলই তবে কলকাতা ছেড়েছিলুম তোমার পেঁয়াজ-পটল-কপি-ঢেঁড়সের দরে | অগ্নিমূল্য কি জিনিস সত্য্ই বুঝলুম, হাতটি দিলেই পুড়ে ফসকা |

কিন্তু জোব আনাজপাতির দামে দেশান্তরী হয়েছিল নাকি! তাই ওকে বলি, যাবে কোথায়! যা কলকাতা তাই তোমার দিল্লি, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর |

জোব চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, বিশ্বায়নের চেয়েও বিপদজনক এই নগরায়ন | কলকাতার বিকল্পে হিল্লিদিল্লি ভাবি অথচ কাকদ্বীপ, শেওড়াফুলি, নবদ্বীপ ভাবতে পারি না | কিন্তু লোকাল ট্রেনে শিয়ালদহ…

দেখি ধোঁয়ার সঙ্গে জোবের মন ঊর্ধমুখী | তারপর কিছুটা স্মৃতি-রোমন্থনের স্বরে জোব বলে, মনে আছে মুখুজ্যে, শিয়ালদহে শয়ে শয়ে শেয়াল কেমন ডাক পাড়ত শীতের রাতে | কুলগাছও ছিল তেমনি | টোপাকুলের পাহাড় নিচে | এখন শুনি কিলো হাঁকে একশ টাকা | জাত গেলে লোকের হাজার কথা কিন্তু কুল গেলে কোনও ব্যথা নেই |

সত্য্ই কষ্ট হয় মানুষের অবিবেচনা দেখে | বাড়ি উঠল পটলডাঙায় আর কলকাতার লোককে পটল কিনতে হয় চল্লিশ টাকা কিলো | বলি সে কথা জোবকে | বিলাপ করি পলতা পাতার বড়াও উঠে গেল |

উত্তেজিত জোব বলে, বেলতলাতে একটাও বেল মেলে না | ড্রাইভিং লাইসেন্স নাকি দেয় | আমরা বুনো হাতি-ঘোড়া চালালুম আর এরা মরা কাছিম চালায় ট্রেনিং নিয়ে | দুঃখেই নবদ্বীপ চলে গেলুম হে |

আতঙ্কে বলি, তুমি দ্বীপান্তরী হতে গেসলে নাকি!

জোব চা শেষে পাইপে আগুন দিয়ে বলে, সে গুড়েও বালি | দ্বীপ জুড়ে গেল মূল ভূখণ্ডে | তবে জেনেশুনেই গেসলুম অন্য এক সংবাদে | নবদ্বীপের বৈষ্নবেরা আজও পরম যত্নে সন্তান স্নেহে নাকি তুলসী গাছ লালন করে |

বিস্ময়ে বলি, কি রকম?

তাকিয়ে দেখি জোব যেন ভাব সমাধিতে | প্রা অস্ফূট স্বরে বলে, শ্বেতশুভ্র বেশ পরিহিত এক প্রৌঢ় বৈষ্নব পরম যত্নে মাথায় বহন করে একটি তুলসী গাছ | গাছের টবটি বসানো একটি চক্রাকার কাপড়ের বিঁড়িতে |

জোবের ভাবাবেগ দেখে বলি, তুমি ধর্ম-আফিং খাচ্ছো নাকি হে জোব!

আবার রঙ্গ অগ্রাহ্য করে জোব ফেরে তার দেখা অভাবিত দৃশ্যে মূর্তি নেই রাধা-কৃষ্ন কিংবা চৈতন্যের | ওই তুলসী গাছটি নিয়ে ভক্তদের কি অপরূপ নৃত্য ও নগর-পরিক্রমা | আমার জাতভাইগুলো আকাশছোঁয়া গাছ কেটে রণতরী বানালো আর এরা তুলসীগাছ ঘিরে নাচে |

জোবকে আনাজপাতির দরে ফেরাতে বলি, কিন্তু ওই যে বাজারদর…

জোব হাত তুলে বলে, দর কমবে তবে মন্ত্রী-সান্ত্রীদের হাট-বাজার ঘুরে নয় | ঠিক যেভাবে নবদ্বীপ…

ওকে থামিয়ে বলি, মন্ত্রী-সান্ত্রীরা তুলসীগাছ মাথায় নৃত্য করবে?

জোব বলে, আহা, সবাই তুলসীগাছ নেবে কেন | শৈবদের দেখবে বেলাগাছে ভক্তি, বৌদ্ধদের অশ্বত্থে | আমার কথা তাও নয়, আমার প্রস্তাব হল সব মানুষই মাথার ওপর বহন করুক বেগুন, লঙ্কা, তমেটো এমন কোনও একটি গাছ |

আমি বুঝে ফেলি জোবের দাম কমানোর তত্ত্বটি | সাঁওতাল মেয়েরা মাথাও ওপর অক্লেশে বয়ে নিয়ে যায় হাঁড়ি, কলসি, জামবাটি | ইস্কুল-কলেজ-ক্লাবের অনুষ্ঠানে পট ব্যালেন্স প্রতিযোগিতা হয় | সেকথা বলি জোবকে |

জোব বলে, ঠিক, ওটিকেই জাতীয় ক্রীড়া করা দরকার | ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিং, ফুটবলে বিদেশের মাঠে গণ্ডা গণ্ডা গোল খাওয়া থেকে মুক্তি |

জোবের বিকল্প দরনিয়ন্ত্রণ এতই অভিনব যে মোটরগাড়ির ছাদের কথাও বলি | এই গরম দেশে মানুষজন ন-মাসই এ. সি. চালায় | অথচ বিকল্প ব্যবস্থা হতেই পারত | আগে যেমন গাড়ির মাথায় মাল বাঁধার ব্যবস্থা হত তেমন একটি চলমান ক্ষেত করলে কেমন হয়!

কথাটা শুনেই জোব মহানন্দে হাত দুটি তুলে দিল ওপরে | বলল, গিমে শাক, পুনকো শাক, ধনে গাছ বড়ো ভালো হবে হে ছাদে | গাড়িটি দেখতেও তখন অপূর্ব |

বলি, গাড়ির নিচের মানুষজনও নিয়ন্ত্রিত শীততাপে মহানন্দে | তখন নিধুবনতলে রাধার নিত্য হোলি খেলা শ্যাম সঙ্গে |

বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার কথা ভেবে আমি আর দু-কাপ চা বানাতে যাই | জোব অচিরেই গভীর চিন্তামগ্ন |

চা করে ফিরে এসে দেখি জোব শূন্যে আঁক কাটে | স্টুলে চায়ের কাপ রাখার শব্দে চমকে ওঠে | তারপর চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বলে, আম, জাম, কাঁটাল গাছগুলো কেমন একা একা দাঁড়িয়ে থাকে দেখেছো!

হ্যাঁ দেখেছি কিন্তু সে একাকে দোকা করবে কেমন করে!

জোব হেসে বলে, ওহে সে চেষ্টাই তো করছিলুম এতক্ষণ ধরে | ঝিঙে, পরল, সিম এমনকি কুঁদরির আগুন দামটি ভাবো একবার | তরকারি মুখে তোলার সময় ভয় হয় এই বুঝি পবনপুত্রের মত পুড়ে গেল মুখ-জিব | তাই ভাবছিলুম আম-জাম গাছের ডালে ঝিঙে, সিম, কুঁদরি লতাগুলো তুলে দিলে কেমন হয় |

বুঝি যেটা আকাশে আঁক কাটা ভেবেছিলুম তা আসলে কঞ্চি লাগিয়ে জোবের সিম-ঝিঙের ডগা তোলা আম-জামের গাছে | ভাবি পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বৃক্ষে বৃক্ষে ঝিঙে, পটল, উচ্ছে, সিম ঝুললে এক টাকায় এক কিলো দিলেও কেনার খদ্দের মিলবে না | ওদিকে হেমন্তে পাতা খসার পর গাছগুলি লতাময় | আহা, যেন মুণ্ডমালা পরিহিতা শ্মশানকালী |

জোব বলে, মুখুজ্যে, কলকাতায় পাঁচ টাকা জোড়া পাতিলেবু, কোনওদিন শুনেছো এমন বে-আক্কেলে কথা! আগেও লেবু বিক্রি হত তবে সে কাশ্মীর-নাগপুরের কমলা |

জোবের কথায় কথা জুড়ে বলি, পাতি জিনিস তখন কে বেচবে কেইবা কিনবে বল!

জোব আবার আপন ভাবনায় | এক-দেড়শ বছর আগের স্মৃতি হাতড়ে বলে, ঠাকুরপুকুরের হরনাথ দত্তকে দেখি মালকোঁচা মেরে ধম্মতলা চলেছে সক্কালবেলা | জিজ্ঞেস করি গোরু খুঁজতে নাকি পাটের দর জানতে | উত্তরে শুনি পিসিবাড়ির পাতিলেবুগুলার রস ও গন্ধ এত ভালো যে পাড়তে যাচ্ছে |

বলি, সে তো একবেলার রাস্তা, জোব!

জোব বলে, তা তো বটেই | সে জন্যেই পৌঁছনোর পরেই মুড়ি-গুড় লঙ্কা-পেঁয়াজ আর দুপুরে পঞ্চব্যঞ্জনে ভাত | বিকেলবেলা দেখি কোঁচায় গণ্ডা চারেক লেবু বেঁধে কিষ্টনগরের মহারাজের চালে ঘরে ফিরছে |

মনে মনে ভাবি একটা পাতিলেবু গাছ থাকলে কিসের ব্যক্তি একাকীত্ব, কিসের সমাজ সংকট | জাতীয় সংহতিও…

জোব বলে, একদিন গোপাল ভাঁড়…

জিজ্ঞেস করি, বেঁচে আছে?

খানিক বিষণ্ণ জোব বলে, নবদ্বীপ যাবার পথে কিষ্টনগরে দেখলুম গোপালের মাথাটি সিমেন্ট বালিতে বাঁধানো | অন্যরা করেছে নাকি গোপাল এটি কাউকে দিয়ে বানিয়ে নিজে রঙ্গ করে বেড়াচ্ছে কে জানে | দেখলে তো বীরসিংহের ঈশ্বরবাবুকে দিয়ে নিজের নামটি কেমন ঢুকিয়ে দিলে বর্ণ পরিচয়ে | যত গুণ গোপালের আর বেচারা রাখালের দোষ আজও খণ্ডন হল না |

জিজ্ঞেস করি, হ্যাঁ একদিন গোপাল…

জোব ফেরে মূলে, সক্কালবেলা মুর্শিদাবাদের কান্দীতে কাশীর পেয়ারা চারা খুঁজতে যাচ্ছে গোপাল | দেখা ফেরিঘাটে | পাঁচকথার পর জিজ্ঞেস করি মধ্যাহ্নভোজনটি কার ঘরে | গোপাল বার করল একটি পাতিলেবু | শুনি পথে গৃহস্থ বাড়িতে গিয়ে গোপাল ‘লেবুটেবু সবই আছে’ বলে একটি রান্নার হাঁড়ি চায় | তারপর ওই একই লেবুটেবুর কথা বলে একে একে চাল, ডাল, আলু, পটল সব জোগাড় | শেষে ওই লেবুর রস দিয়ে পরমান্ন ভোজন | সে ব্যবস্থা নাকি ওদিনও |

বিস্ময়ে বলি, একটি পাতিলেবুতেই তো হাট-বাজারের গপ্পো শেষ!

জোব মাথা নেড়ে বলে, শেষ নয় হে, শুরু | নিত্যদিনের সমস্যা মিটল কিন্তু কি হবে বিয়ে, পৈতের মতো বিশেষ বিশেষ দিনে | তখন তো আবার অনাজপাতি মাছ-মাংসের দাম আকাশছোঁয়া |

ওকে প্রবোধ দিয়ে বলি, ও দু-চারদিনের ব্যাপার সামলে নেওয়া যাবে |

অসম্মতির মাথা নাড়ে জোব, পরিকল্পনা হবে নিখুঁত | শোনো খাওয়াদাওয়া কমাতে হবে, বন্ধ করতে হবে বিশ-পঞ্চাশ পদের ভোজবাজি | মেঘালয়ের খাসিদের মতো নিমন্ত্রিতকে মান দাও পান-সুপুরিতে | ওটি ভগবানের বিধান লোক খাইয়ে মানুষজনের ফতুর হওয়া দেখে |

আমার পেট কিন্তু পান-সুপুরির মানে ভরে না | তাই বলি, পেট না ভরলে আমার মনটাও কেমন ফাঁকা লাগে হে জোব |

জোব হেসে বলে, মুখুজ্যে, তুমি দেখছি ব্রাহ্মণ ভোজনটি রাখবেই |

বাধা দিয়ে বলি, শুধু ব্রাহ্মণ নয় হে, সর্বজনীন ভোজন |

জোব বলে, তাহলে এখনকার ‘মেনু’ ছেড়ে আদি ত্রিপদী ফলারে চলো | অধমটি হল ‘গুমা চিড়া, শুখা দই/ চিটা গুড় ধেনো খই |’ পছন্দ হল না তো! তা হলে মধ্যম — সরু চিড়া, কাতারি কাটা দই / মর্তমান কলা / আর ফাকা খই |

আমি থামিয়ে বলি, না হে জোব, উত্তমটিই হোক | ফতুয়া-ধুতি পরে কম্বল আসনে বসে কলাপাতায় ভোজন —

ঘিয়ে ভাজা তপ্ত লুচি
দু-চারি আদার কুচি
কচুরি তাহাতে খান দুই,
ছক্কা আর শাক ভাজা
মোতিচুর বঁদে খাজা
ফলারের যোগাড় বড়োই |

জোব ওঠে | হাই উঠেছে ঘুমোতে যাবে | দরজাটি পেরিয়ে জোব পেছন ফিরে বলে, ভাবলে সবেরই সমাধান আছে | আনাজপাতির দর তো তুচ্ছ ব্যাপার |

সমর্থনে বলি, সে তো বটেই |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.