আহ ! আর একবার যদি আমার প্রেয়সীর মুখখানি দেখতে পেতাম‚ তবে আমি ঈশ্বরের কাছে ঋণী থাকতাম আমার পুনর্জন্ম অবধি‘… লেখা আছে লাহোরের এক সমাধির গায়ে | মুঘল আমলের এই সমাধিতে কে শায়িত‚ তা নিয়ে কোনও প্রামাণ্য দাখিল নেই | বহু গবেষক-ঐতিহাসিক মনে করেন এটাই নাকি আনারকলির সমাধি | যাঁকে জীবন্ত সমাধি দিয়েছিলেন সম্রাট আকবর |

Holi Hai

যুবরাজ সেলিমের প্রেয়সী হিসেবে এই নারীর অস্তিত্ব নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ঐতিহাসিকরা | অবিশ্বাসীদের কাছে পরে যাব | আগে দেখে নিই বিশ্বাসীরা কী বলছেন |

আনারকলির উল্লেখ কিন্তু ঐতিহাসিক দলিল আকবরনামা বা তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরিতে নেই | এই দুটি বই মুঘল আমলের অমূল্য এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি | ইতিহাসে আনারকলির কথা প্রথম পাই ব্রিটিশ ব্যবসায়ী উইলিয়াম ফিঞ্চের লেখায় |

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে নীল বেচতে ফিঞ্চ লাহোরে এসেছিলেন ১৬১১-এ | তিনি ভ্রমণের বিবরণ লেখেন সপ্তদশ শতকের গোড়ায় | সেখানে তিনি বলেছেন ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে আনারকলিকে জীবন্ত সমাধি দেওয়া হয় আকবরের নির্দেশে | এবং সেলিম তাঁর স্মৃতিতে লাহোরে ওই সমধি নির্মাণ করান |

ফিঞ্চের কদিন পরে লাহোরে আসেন আর এক ব্রিটিশ পর্যটক এডওয়ার্ড টেরি | তিনিও বলেন‚ আনারকলির অস্তিত্ব সত্যি ছিল |

তবে এঁরা কেউ আনারকলিকে স্রেফ সেলিমের প্রেমিকা বলতে নারাজ | ফিঞ্চ বলেছেন‚ আনারকলি ছিলেন সম্রাট আকবরের ছেলে দানিয়েলের জন্মদাত্রী | টেরিও তাঁকে সমর্থন করেছেন |

এঁদের মত যদি মানতে হয় তাহলে বলতে হয় সুদূর পারস্য থেকে লাহোর হয়ে দিল্লিতে মুঘল দরবারে এসে পড়েছিলেন ক্রীতদাসী শরফউন্নিসা | মালিকের ক্যারাভান থেকে হাতবদল হয়ে চলে আসেন মুঘল হারেমে |

রূপসী এই তরুণী ছিলেন দক্ষ নর্তকী | একদিন দরবারে তাঁর নাচ দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন সম্রাট আকবর | দুধে-আলতা বর্ণের এই নর্তকীর তিনি নাম দেন আনারকলি | অর্থাৎ আনার বা বেদানার ফুল |

রূপ গুণ এবং নাচের জন্য আনারকলি আকবরের নেক নজরে পড়ে যান | তিনি নাকি আকবরের পুত্র দানিয়েলের জন্ম দেন | যাই হোক‚ আনারকলির এই উত্থান মেনে নিতে পারেনি হারেমের অন্য নারীরা |

ফিঞ্চ-টেরির মতে‚ একদিকে আকবরের ছেলের জন্ম দিলেন আনারকলি | অন্যদিকে তাঁর প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগলেন আকবরের আর এক পুত্র সেলিম | ৪৪ বছর বয়সী বিমাতার সঙ্গে গোপনে শুরু হল ৩০ বছর বয়সী সেলিমের গোপন অভিসার | দানিয়েলের বয়স তখন ২৭ |

সেলিমের এই আচরণ মেনে নিতে পারেননি সম্রাট আকবর | সেলিমও নাকি মুঘল সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন | কিন্তু আকবরের বিশাল সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে পেরে ওঠেননি |

সামান্য রক্ষিতা-নর্তকীর সঙ্গে প্রণয়ের জেরে সেলিমকে প্রাণদণ্ড দেন আকবর | প্রেমিককে বাঁচাতে সেই দণ্ড মাথা পেতে নেন আনারকলি নিজে | লাহোরে নাকি সেলিমের সামনেই দুটি পাঁচিলের মাঝে তাঁকে রেখে পাথর দিয়ে পাঁচিলের মুখদুটি গেঁথে দেওয়ান আকবর | জীবন্ত সমাধি দেওয়া হয় আনারকলিকে |

কালজয়ী সিনেমা মুঘলে-আজম-এ অবশ্য দেখানো হয়েছে আকবর শেষ মুহূর্তে ক্ষমা করছেন আনারকলিকে | গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে মা জিল্লো বাই-য়ের সঙ্গে দিল্লি ছেড়ে চলে যান আনারকলি | কথা দিয়ে যান আর কোনওদিন ফিরবেন না মুঘল সাম্রাজ্যে | এবং শেষদিন অবধি ছিলেন লাহোরে |

এই তত্ত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেন না ঐতিহাসিকরা | তাঁদের মতে‚ এই এন্ডিং শুধুই ভারতীয় দর্শকদের কথা ভেবে | তাঁরা মনে করেন‚ আকবরের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কোনওভাবেই এই ক্ষমা প্রদর্শন মেলে না |

ফিরে আসি লাহোরের ওই সমাধিতে | তার গায়ে যে সাল লেখা আছে‚ তার আগেই ১৫৯৬-তে মৃত্যু হয় দানিয়েলের মা‚ আকবরের স্ত্রীর | আবার‚ যদি ধরে নেওয়া হয়‚ সিংহাসনে বসে সম্রাট জাহাঙ্গীর হয়ে শাহজাহান-পিতা সেলিম স্বয়ং এই সমাধি বানান‚ তাহলেও কি সব সমাধান হয় ?

সমাধিগাত্রে খোদাইয়ে অত্যন্ত লঘুভাবে সম্বোধন করা হয়েছে প্রেয়সীকে | এখন প্রশ্ন‚ মুঘল সালতনাতের কোনও সম্রাট এইভাবে প্রকাশ্যে কোনও নারীকে সম্বোধন করে খোদাই করে যাবেন না |

পরবর্তীকালে লাহোরের ওই উদ্যানের তত্ত্বাবধানে ছিলেন জাহাঙ্গীরের নাতি দারা শিকো | তিনি সমাধির উল্লেখ করেছেন নিজের লেখায় | কিন্তু বলে যাননি কার সমাধি |

রহস্যময় সমাধির মালকিন যে-ই হোন না কেন‚ আনারকলির অস্তিত্ব যতই সত্য-মিথ্যার দাঁড়িপাল্লায় উঠুক না কেন‚ সেলিম-আনারকলি থেকে যাবেন শাশ্বত প্রেমের কিংবদন্তি হয়ে |

ঋণস্বীকার :  The Last Spring: The Lives and Times of the Great Mughals by Abraham Eraly

আরও পড়ুন:  ২০০১ সাল অবধি জীবিত নেতাজি বাস করতেন ভারতেই ? নতুন রহস্য বিদারের রহস্যময় বৃদ্ধকে ঘিরে

আরও পড়ুন :

কন্যা জাহানারার সঙ্গে নিয়মিত যৌন সম্পর্কের জেরেই ঈর্ষাকাতর শাহজাহান জীবন্ত দগ্ধ করেছিলেন তাঁর প্রেমিককে ?  http://banglalive.com/shah-jahan-had-incestuous-relationship-with-daughter-jahanara-killed-her-lovers/

মেয়েকে ভোগ করতে নৃশংস হত্যা তাঁর দুই প্রেমিককে…তবু কামুক পিতা শাহজাহানকে ক্ষমা করেছিলেন শাহজাদী জাহানারা http://banglalive.com/incestuous-relationship-brutally-killing-her-lovers-how-could-jahanara-forgive-her-father-shahjahan/

১৯ বছরের দাম্পত্যে সন্তান ১৪ জন‚ শেষ সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু নূরজাহানের ভাইঝি শাহজাহানের প্রিয়তমা পত্নী মুমতাজ মহলের http://banglalive.com/intimate-erotic-relationship-shahjahan-mumtaz-had-14-children-in-their-19-years-of-marriage/

সৎ মামাতো বোন থেকে আদরের স্ত্রী হওয়া মুমতাজের জন্য ২২ বছর ধরে তিল তিল করে তাজমহল বানান শাহজাহান http://banglalive.com/over-1000-elephants-carried-priceless-stones-from-all-over-asia-to-decorate-the-tajmahal/

সৎ শাশুড়ির পরিচারিকা থেকে নিজেই সম্রাজ্ঞী ! অসামান্য সুন্দরী‚ স্বামীহীনা নূরজাহানকে ২০ তম পত্নী হিসেবে গ্রহণ করেন জাহাঙ্গীর http://banglalive.com/became-empress-from-aide-nur-jahan-got-her-step-daughter-married-to-her-step-son/

হারেম-রাজনীতি ভুলে, সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের শেষ জীবন কেটেছিল কবিতা লিখে‚ গোলাপ থেকে সুগন্ধি বানিয়ে  http://banglalive.com/noor-jehan-wrote-poems-in-persian-made-perfumes-from-rose-in-last-days-of-her-colourful-life/

2 COMMENTS

  1. lekhata bhaalo hoeche…kintu selim pore shahjahan honni…hoechilen Jahangir.

    porerbar theke ei detailing er upor ektu nojor deben please