বাইশ গজে রাসেলাসুর-তাণ্ডবের অনুঘটক নাকি তাঁর রোম্যান্টিক দাম্পত্য !

1060

আন্দ্রে রাসেল । সির্ফ নাম হি কাফি হ্যায় ।

বিখ্যাত বিজ্ঞাপনের ক্যাচলাইন অনায়াসে বসিয়ে দেওয়া যায় তাঁর নামের পাশে । ছক্কার পর ছক্কা মেরে হারা ম্যাচ জিতিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি এখন ‘রাসেলাসুর’। কলকাতা নাইট রাইডার্সের ৬ ফুট ১ ইঞ্চির এক দৈত্য। তিনি যতক্ষণ পিচে, ততক্ষণ কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। আস্কিং রেট আকাশ ছুঁয়ে ফেলুক। তবু… রাসেল থাকলেই গ্যালারিতে সমর্থকদের বুকে আশা।

এ বারের আইপিএলে এ পর্যন্ত দশটা ম্যাচ খেলে তিনি প্রায় চারশো রান করে ফেলেছেন । দুশোরও বেশি স্ট্রাইক রেট । ছক্কা মেরেছেন একচল্লিশটা ! এমন মারকাটারি পারফরম্যান্সের কারণে বিশ্বকাপের ক্যারিবিয়ান স্কোয়াডে জায়গা মিলেছে । এই মুহূর্তে জীবনের অন্যতম সেরা সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছেন রাসেল। তবু… এই উত্থানটা খুব সহজ ছিল না।

আসলে জীবন কখনও একই রকম যায় না । নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে তিনি । ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। শিক্ষিকা মা সংসার চালাতে হিমশিম। ছেলেকে সটান বলে দিয়েছিলেন, অন‌েক হয়েছে। আর নয়। এবার ওসব ক্রিকেট-টিকেট ছাড়ো। রাসেল দু’বছর সময় চেয়েছিলেন। তার মধ্যেই অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। ঘরোয়া ক্রিকেট। সেখান থেকে ক্রমে জাতীয় দল। রানের পাশে গানেও আছেন তিনি।

২০১৪ সালে রেকর্ডিং আর্টিস্ট ‘ড্রে রাস’-এর দু’টি সিঙ্গল রেকর্ড প্রকাশিত হয় । তবে সেটা একান্তই তাঁর দ্বিতীয় কেরিয়ার । সব কিছুই যে মসৃণ থেকেছে তা নয়। বিতর্ক তিনি এড়িয়ে চলতে পারেননি । মাঝে এক বছরের জন্য তাঁর উপরে জারি হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা। ‘জামাইকা অ্যান্টি ডোপিং কমিশন’-এর ডাকে ডোপ টেস্টে বসতে রাজি হননি তিনি। বারো মাসে টানা তিনটি পরীক্ষায় না বসায় চলে যেতে হয় মাঠের বাইরে। কেঁদে ফেলেছিলেন। কিন্তু হার মানেননি। আবার ফিরেছেন মাঠে। ঝোড়ো পারফরম্যান্সে মাতিয়েছেন বাইশ গজ।

আসলে এমনই তিনি । অকুতোভয় । ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের জলহাওয়া যে তেমনই । সেই কবে লিয়ারি কনস্ট্যানটাইনের হাত ধরে গোটা বিশ্ব চিন‌েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। তারপর সোবার্স, রিচার্ডস, লারাদের দেশে বারবার দেখা মিলেছে মহান ক্রিকেটারের। দুরন্ত ফাস্ট বোলার কিংবা তুমুল আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান। রাসেল সেই ঘরানারই উত্তরসূরি। জোরে বল করা বা ব্যাটে ঝড় তোলা— আসলে এইভাবে জীবনকে চুটিয়ে উপভোগ করাই তাঁর জীবনদর্শন।

রাসেল যে ক্রিস গেইলের পরামর্শে ভারী ব্যাট ব্যবহার শুরু করার পর থেকেই এমন অতিমানব হয়ে উঠেছেন, সেকথা এখন সকলেই জানেন। কিন্তু এরই পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কথাও শোনা গিয়েছে যে, রাসেলের আসল শক্তি নাকি তাঁর স্ত্রী জাসিম লোরা। দীর্ঘদিনে প্রেমিকাকে বিয়ে করার পরেও নিজের ‘লাভ লাইফ’ কখনও গোপন করেননি তিনি। এই তো ক’দিন আগে বউয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত শেয়ার করলেন। জাসিম ও তাঁকে চুমু খেতে দেখা গিয়েছে সেই ভিডিওয়। ভাইরাল সেই ভিডিও দেখে নেটিজেনদের একাংশের মত, এমন রোম্যান্টিক দাম্পত্যের কারণেই নাকি মাঠে ওই মেজাজে থাকতে পারেন রাসেল! না হলে চোট থাকা সত্ত্বেও ওই খেলা খেলছেন কী করে!

সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ষোলো আস্কিং রেটকে নস্যি করে দিয়ে উনিশ বলে উনপঞ্চাশ কিংবা রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের বিরুদ্ধে শেষ চার ওভারে ছেষট্টি বাকি থাকা অবস্থায় তেরো বলে আটচল্লিশ— রাসেল একের পর এক মাইলফলক তৈরি করেছেন। অবশ্য কোহলিদের সঙ্গে ফিরতি ম্যাচে শেষ ওভারে চব্বিশ রান
তুলেও জেতাতে পারেননি । তবুও শেষ ওভার পর্যন্ত আশায় আশায় থেকেছিলেন সমর্থকরা ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের বিরুদ্ধেই প্রথম জাদু দেখান রাসেল । ২০১১ সালের সেই ম্যাচে একশো ওঠার আগেই সাত উইকেট পড়ে গিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের। রাসেল সেই অবস্থায় ৬৪ বলে ৯২ রান করে যান। পরের ম্যাচে পান চার উইকেট ! কিন্তু এবারের আইপিএলে তিনি যেন আগের সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছেন। আইপিএল শেষ হলে বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ডের মাটিতে রাসেল ঝড় ওঠার অপেক্ষা। ভারতীয় সমর্থকরা অবশ্যই চাইবেন না কোহলিদের বিরুদ্ধে পরাক্রম দেখান রাসেলাসুর। আপাতত আইপিএলে কলকাতার মানুষের কাছে তিনিই শেষ আশা। হারার মুখে অনড় এক যোদ্ধা। খোলা মনে যিনি এগিয়ে নিয়ে যান দলকে।

মেজাজটাই যে আসল রাজা । সেই দর্শন মেনেই রাসেল এখন ‘কিং রাসেল’ ।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.