অমিতাভ বচ্চন একজন অ্যামেজিং হিউম্যান বিয়িং : অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী

Aniruddha Roychowdhury interview

অন্তহীন‚ অনুরণন‚ অপরাজিতা তুমি‚ বুনো হাঁস-এর মতো নাগরিক কথকথায় তিনি সাবলীল‚ স্বচ্ছন্দ | বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর অডিও-ভিসুয়াল দুনিয়ায় প্রবেশ | খুব শিগগিরিই পা রাখতে চলেছেন হিন্দি ছবির দুনিয়ায় | আর তাঁর ছবির মুখ্য চরিত্রে থাকছেন স্বয়ং অমিতাভ বচ্চন | তাঁর সঙ্গে কথা বললেন তন্ময় দত্ত গুপ্ত |

আপনি প্রচুর অ্যাড ফিল্ম করেছেন।এরপর যখন প্রথম ফিচার ফিল্ম করতে এলেন,তখন এই জার্নিটা ঠিক কেমন মনে হয়েছিল?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : আমার প্রথম থেকে ফিচার ফিল্ম করার ইচ্ছে ছিল।অ্যাড ফিল্মটা ছিল স্টেপিং স্টোনের মতো।বিজ্ঞাপনের ছবি করে একটা ক্রাফ্ট শেখা যায়।শট ডিজাইনিং শেখা যায়।এই ধরনের ছবিতে অল্প সময় গল্পটা বলতে হয়।বিজ্ঞাপনের ছবিতে গল্পটা দশ সেকেণ্ড তিরিশ সেকেণ্ড কী ষাট সেকেণ্ডের মধ্যে জমিয়ে বলতে হয়।এটা একটা চ্যালেঞ্জ বলতে পারেন।এই ট্রেনিংটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।এই ছবি করতে করতে যখন ফিচার ফিল্মে গেলাম তখন ফিচার ফিল্মকে একটা অন্যরকম মাধ্যম মনে হলো।

সেটা ঠিক কী রকম?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : একটা বড় গল্প আর ছোট গল্পের মধ্যে যে ফারাক,ফিচার ফিল্ম আর অ্যাড ফিল্মের মধ্যে ফারকটা ঠিক সেরকম।অ্যাড ফিল্মে কাজ করার ফলে আমার মধ্যে একটা ডিসিপ্লিন তৈরি হয়ে গিয়েছিল।ফিচার ফিল্ম করতে গিয়ে সেই ডিসিপ্লিন কাজে এসেছিল।

আপনার প্রথম ছবির নাম অনুরণন,দ্বিতীয় ছবির নাম অন্থহীন,তৃতীয় ছবির নাম অপরাজিতা তুমি।প্রত্যেকটা ছবির প্রথম অক্ষর দিয়ে শুরু।এর পেছনে কি কোনও সচেতন ক্যালকুলেশন আছে?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : না না।এটা একটা কাকতালীয় ব্যাপার।ছবির প্রয়োজনে ওই নামগুলো ব্যবহার করা হয়েছে|

আপনার এখনকার প্রজেক্ট সম্পর্কে কিছু বলুন।

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : এখন আমি বম্বেতে একটা হিন্দি ছবি করছি।এর প্রোডিউসার সুজিত সরকার এবং রণি লাহিড়ি।ছবির নাম পিঙ্ক।এই ছবিতে অমিতাভ বচ্চন অভিনয় করছেন।এর বেশি এই ছবি নিয়ে এখনই কিছু বলতে পারব না।এটা আমার প্রথম হিন্দি ছবি।

অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজের এক্সপিরিয়েন্সের কথা কিছু বলুন।

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : উনি একজন ইনস্টিটিউশন।আমি একটা ইনস্টিটিউশনের মধ্যে থেকে কাজ করেছি।এটা একটা অসাধারণ অনুভূতি।আমি অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ করছি—এই বাস্তব সত্যটা অনুভব করতে সময় লেগেছিল।প্রথম যখন ওনাকে স্ক্রিপ্ট শোনাই তখন ওনার স্ক্রিপ্ট খুব ভালো লাগে।তারপর আস্তে আস্তে আমাদের প্রজেক্ট ডেভলপ করে।মানুষ হিসেবে অমিতাভ বচ্চন একজন অ্যামেজিং হিউম্যান বিয়িং।

প্রসেনজিত, দেব, অমিতাভ বচ্চন — বিভিন্ন স্টারদের নিয়ে আপনি কাজ করেছেন।স্টার ইমেজের দিকে লক্ষ্য রেখেই কি আপনি চরিত্র নির্বাচন করেন?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : চিত্রনাট্য যখন লেখা হয় তখন কতগুলো মুখ ভেসে ওঠে।আপনি দেখবেন আমার ছবিতে যে সমস্ত স্টার কাজ করেছেন তারা অন্যভাবে কাজ করেছেন।সেখানে তার অভিনয় সত্তাটাই বেরিয়ে এসেছে।কিন্তু এরপরেও বলব স্টার ভ্যালুকে অস্বীকার করা যায়না।ফিল্ম যেহেতু একটা ব্যয়বহুল মাধ্যম তাই স্টার ভ্যালুর প্রয়োজন আছে।কিন্তু আমাদের প্রধান দরকার একজন শক্তিশালী অভিনেতাকে।আমি যাদের সঙ্গে কাজ করেছি তারা খুব ভালো অভিনেতা।

আপনি নিজে একজন প্রোডিসার।নিজে প্রোডিসার হয়ে নিজের সেই ছবিতে পরিচালনা করার মধ্যে স্বাধীনতা কি বেশি পাওয়া যায়?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : আমি প্রডাকশানের কাজ করেই জীবন শুরু করেছিলাম।আমি এক্সিকিউটিভ প্রোডিওসারের কাজ করেছি।প্রডাকশান নিজে করলে সব কিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।আবার যদি ভালো প্রোডিউসার পাওয়া যায় তাহলে পরিচালনার কাজ করতে কোনও অসুবিধাই হয়না।

আপনার ছবিতে গানের একটা বিশেষ ভূমিকা দেখতে পাওয়া যায়।আপনার ছবিতে গানের ব্যবহার কি দর্শকদের রিলিফ দেওয়ার জন্য?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীঃভারতীয়রা গান বাজনা রিদম পছন্দ করেন।আমাদের শরীর ও মনের মধ্যে গান আছে।রিদম আছে।আমার অন্তহীন ছবিতে একটা গান বাদে কোনও গানকে আমি কারোর লিপে ব্যবহার করিনি।এরপর থেকে আমি ছবিতে গানকে পাংচুয়েশন হিসেবে ব্যবহার করেছি।আর আমি নিজে গানের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম বলে একটা বিষয় বুঝতে পারি।সেটা হলো গান মানুষের মনকে দ্রুত ছুঁয়ে যায়।তাই আমার ছবিতে গান একটা গুরুত্বপূ্র্ণ ফ্যাক্টর।

আপনার ছবি ন্যাশানাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে, এর ফলে আপনার মনগতি কি পরিবর্তিত হয়েছে ?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : আমি ন্যাশানাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার জন্য ছবি করিনা।কিন্তু ন্যাশানাল অ্যাওয়ার্ড এমনই একটা স্বীকৃতি যেটা সর্বভারতীয় স্তরে নিয়ে যায়।তাই ওই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।প্রেসিডেণ্ট দাঁড়িয়ে থেকে এই অ্যাওয়ার্ড দেন।সেই দিক থেকে এই অ্যাওয়ার্ড পেলে ভালো-তো লাগেই।

আপনার ছবির বিষয়বস্তু কি সমকালীন অবস্থা থেকে উঠে আসে?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : আমাদের কাজের মধ্যেই সমকলের বিভিন্ন মুহূ্র্ত প্রতিফলিত হয়।চারপাশের সামাজিক পরিবেশ কোনও না কোনওভাবে আমাদের কাজে উঠে আসে।

আপনার ছবি বুনো হাঁস-এ দেখা গেছে নিষ্পাপ অমল ধ্বংসের আগুনে পুড়ছে।বর্তমান অমলদেরও কি এই নিয়তি বলে মনে হয়?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : বুনো হাঁস-এ যেটা দেখানো হয়েছে সেটা শুধু বর্তমানের কথা নয়।অতীত এবং ভবিষ্যতেরও কথা।আমরা না চাইলেও এমন অনেক পিচ্ছিল জায়গায় পিছলে যাই যে সেখান থেকে ফিরে আসা যায় না।সমরেশ মজুমদারের লেখা বুনো হাঁসকে আমি আমার মতো করে ইন্টারপ্রেট করেছি।বুনো হাঁস-এ অমল এমন একটা জায়গায় চলে যায় যেখানে থেকে ফেরার আর কোনও পথ থাকে না।

নিজের কোনও ছবিকে যদি পুনর্নির্মাণ করতে বলা হয় তাহলে কোন ছবি নিয়ে ভাববেন?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : হয়ে যাওয়া ছবির মধ্যে কোনও ছবিকে নিয়ে পুননির্মাণ করার কথা ভাবব না।আমার করা বাংলা ছবি হিন্দিতে করার অফার আমি পেয়েছিলাম,কিন্তু আমি করিনি।আমি ঠিক পুনর্নির্মাণে বিশ্বাসী নই।আমি সব সময় নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে চাই।

আপনি দুবছর অন্তর একটা করে ছবি করেছেন।এই দুবছরের গ্যাপটা কি প্রস্তুতিপর্ব ছিল?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : আমার অনেক কাজ করার খুব ইচ্ছা নেই।মনের ভেতর থেকে যখন তাগিদ আসে তখনই আমি কাজ করি।আমি চটজলদি কাজ করতে পারিনা।আমার প্রস্তুত হতে সময় লাগে।আর একটা ছবি মনের মধ্যে জমাট বাঁধতে সময় লাগে।সেটা যতক্ষণ না পর্যন্ত জমাট বাঁধছে ততক্ষণ কাজটা করা সম্ভব নয়।

আপনি কলকাতা এবং মুম্বাইয়ে কাজ করেছেন।এই দুই জায়গায় কাজের পরিবেশের মধ্যে কোনও ফারাক লক্ষ্য করেছেন?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : বম্বেতে একটা অদ্ভুত প্রফেশনালিজম রয়েছে।ওখানকার অল্পবয়সী ছেলে মেয়েরা খুব মনযোগের সঙ্গে কাজ করে।আমাদের এখানেও ভালো কলাকুশলী আছে।আমার এই ছবিতে অভীক ক্যামেরার কাজ করছে।বম্বেতে সারভাইভ করা মুশকিল বলে প্রত্যেকেই নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে।এটাই কলকাতার সঙ্গে বম্বের ফারাক।

প্রসেনজিত চ্যাটার্জী একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন —এখন কলকাতায় বসে হিন্দি ছবি করার সময় চলে এসেছে।এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : কলকাতার কলাকুশলীদের নিয়ে সর্বভারতীয় স্তরে হিন্দি ছবি করা অবশ্যই সম্ভব।কিন্তু সর্বভারতীয় স্তরে কাজ করতে গেলে কিছু সর্বভারতীয় স্তরের অভিনেতা অভিনেত্রী নেওয়া প্রয়োজন।আসলে এই ধরনের প্রোজেক্ট করতে গেলে কলকাতা বম্বের অভিনেতা অভিনেত্রীদের নিয়ে মিলিয়ে মিশিয়ে কাজ করতে হবে।এটা করলে সর্বভারতীয় স্তরে কাজটা অ্যাকসেপটেন্স পাবে।

কলকাতা এবং মুম্বাইয়ে কাজ করতে গিয়ে কোনও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে পড়তে হয়েছে?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : খুব কঠিন প্রশ্ন করেছেন।কলকাতায় অতি সহজে আমি অ্যাকসেপটেন্স পেয়ে যাই।কিন্তু বম্বেতে চ্যালেঞ্জটা অনেক বেশি।তাই ওখানে লড়াইটা অনেক কঠিন।

আপনার পিঙ্ক ছবির লোকেশন কোথায়?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : মূলত লোকেশন হলো দিল্লি|

আপনার এটাই প্রথম হিন্দি ছবি।এর পরেও কি হিন্দি ছবি করার ইচ্ছে আছে?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : হ্যাঁ, করব।

আপনি সাহিত্য নিয়ে ছবি করেছেন।সাহিত্য নিয়ে ছবি করলে কি দর্শকদের কাছে অ্যাকসেপটেন্স বেশি পাওয়া যায়?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : অ্যাকসেপটেন্স বেশি পায় কিনা জানি না।তবে সাহিত্য নিয়ে কাজ করতে আমার খুব ভালো লাগে।আমাদের বাংলায় সাহিত্যের সম্ভার অনেক।সাহিত্য নির্ভর ছবি বাংলায় হওয়া উচিত।আর আমি করতেও চাই।

আপনার সিনেমার বিষয়বস্তু কি ব্যক্তিগত জীবন থেকে অনুপ্রাণিত?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : আমি এই পর্যন্ত যতগুলো সিনেমা করেছি,সবকটাই আমার ব্যক্তিগত জীবন থেকে অনুপ্রাণিত।আমার নিজস্ব জীবনের অনুভূতির স্পর্শই আমার সিনেমায় আছে।ব্যক্তিগত জীবনের অনুভূতি ছাড়া আমি ছবি করতে পারিনা।

আপনি সিনেমার মধ্যে যখন থাকেন না তখন কী ধরনের চিন্তা আপনার মধ্যে আসে?

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী : আমি সিনেমার মধ্যে যখন থাকিনা তখনও আমি রেগুলার সিনেমা দেখি।এ ছাড়া আমি অবসরে বই পড়ার চেষ্টা করি।ভীষণ ভাবে ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল গান শুনি।এবং বহু মানুষের সঙ্গে মিশি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here