এই সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় মিউজিক ডিরেক্টরের নাম সম্ভবতঃ অনুপম রায় | পরের পর ছবির গানে তিনি সুপারহিট | তাঁর গান ও গানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বললেন তন্ময় দত্ত গুপ্তর সঙ্গে |

Banglalive

 

 

এখন আপনার হাতে তো প্রচুর কাজ? 

অনুপম রায়: হ্যাঁ।এই মুহূর্তে মৈনাকের ছবি জাস্ট শেষ হলো। এবং ‘পরীর’ কাজ শেষ হলো। মৈনাকের ছবি রিলিজ করেনি। কিন্তু ‘পরীর’ গানগুলো রিলিজ করে গেছে।কৌশিকদার ‘দৃষ্টিকোণ’ ছবির কাজ শেষ হচ্ছে।এটা এপ্রিলের শেষ দিকে রিলিজ করবে।এছাড়া সুজিতদার ‘অক্টোবর’ ছবির কাজ চলছে। 

তা একই সাথে এত কাজ করতে অসুবিধা হয় না? 

অনুপম রায়: প্রত্যেক ছবির ধরণ আলাদা। সুজিতদার ছবির জন্য গজলের মতো গান তৈরি হয়েছে।এদিকে মৈনাকের ছবির জন‍্য পপুলার অফবিট গান তৈরি করেছি। এদিকে কৌশিকদার ছবিটা সিরিয়াস,সেখানে বুম্বাদার মতো সিনিয়র অভিনয় করছেন। ওই গানের ক্যারেক্টর আরেক টু সিরিয়াস।তাই সেভাবে গানটা তৈরি করেছি। সুজিতদার ছবিতে যে গান তৈরি করেছি,সেটা সারপ্রাইজ।সৃজিতদার আরেকটা ছবি উমা,সেটা বেরোবে জুন মাসে। ওটার গান আবার অন্যরকম। কারণ ওই গানের মধ্যে একটা ফ্রেশনেস  দরকার। কারণ ছবিটা একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে।গানে একটা ইনোসেন্সের মুড আছে। 

একই সঙ্গে এতোগুলো কাজ করছেন। বিভিন্ন মেজাজের মিউজিক।এই বিভিন্ন মানসিক অবস্থানকে কীভাবে ডিভাইড করছেন? 

অনুপম : এটা খুব কঠিন কাজ।ছোট থেকে বাঙালি বাড়িতে বড় হওয়ার কিছু সুবিধা তো থাকে। খেলাধূলা করা।গান করা। পড়তে বসা-এইগুলো মাল্টিটাস্ক।এগুলো তো ছোট থেকে অভ্যাস করে এসেছি।এখন শুধু গানই বানাই।এক সময় দীর্ঘকাল চাকরী করেছি। চাকরীর পাশাপাশি গানও বানাতাম।সেই সময় যদি সারভাইভ করতে পারি,তাহলে এখন সারভাইভ করাটা অনেক সোজা। 

অটোগ্রাফ থেকে আপনার জানপ্রিয়তা। এতো জনপ্রিয়তার পরেও ব্যাণ্ড করার প্রয়জনীয়তা কেন হলো? 

আনুপম রায় : ঠিক ব্যাণ্ড করা নয়।  আমি স্টেজে গান করতে বিশেষ করে মিউজিক করতে পছন্দ করি। সেই জায়গা থেকেই ব্যান্ড করার প্রয়োজন ফিল করি।একটা ফরম্যাটে আমরা অনুষ্ঠান করি। 

পেশাগত জায়গা থেকে আপনার কাছে এত কাজ। তবুও লাইভ অনুষ্ঠান করছেন। সেটা কী কারণে? 

অনুপম : আমি গান লিখে গান গাই। মানে নিজের গান গাই।সেগুলোর জন্য মঞ্চটা খুব ইম্পরটেন্ট। ডিরেক্টলি আমার কথাগুলো গেয়ে শোনানোটা খুব দরকার। স্টুডিওতে কাজ করতে করতে এক সময়ে একঘেয়ে ক্লান্ত লাগে। সে সময় লাইভ অনুষ্ঠানগুলো আমার কাছে প্রাণ বলতে পারেন। 

ইতিহাসের দিকে দেখলে আমরা দেখতে পাব রবীন্দ্রনাথকে। নব্বইয়ের দশকে আমরা কবীর সুমনকে পেয়েছি।কবীর সুমনের পরবর্তী সময়টা কি আপনার সময়?নাকি রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী সময় আপনার সময়? 

অনুপম রায় : এটা বলা খুব কঠিন। যুগে যুগে গানের ধরণ পাল্টায়।আমি এই মুহূর্তে আমাদের সময়ের কথা বলছি।আবার কিছুদিন পর অন্য কেউ আসবে সে নিজের ভাষায় কথা বলবে।এটাই সময়ের নিয়ম। দেখুন অনেকেই গান লেখে। কিন্তু সকলের গান সমাজে এ‍্যাকসেপ্টেড হয় না।আমি ভাগ্যবান।মানুষ আমার সুর, গান সবই ভালোবেসেছেন। এবং সেই সম্মানটা মানুষ আমাকে দিয়েছেন। এই ভাগ্যটা সবার হয় না। 

‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’।এখানে অনুপম রায়ের নিজস্ব আইডেন্টিটি কতটা? 

অনুপম রায় : এটা মূলত প্রেমের গান। সেখানে ওই শব্দমালাগুলো ওই মেন্টাল স্টেটকে অ্যাডজাস্ট করছে।সেটা বহু মানুষের মুখের কথা হয়ে দাঁড়াল। ওটা অটোবায়োগ্রাফিকাল লাইন। 

এই গানের একটা পোয়েটিক এক্সপ্রেশন আছে। লজিক্যাল এক্সপ্রেশনও আছে। কিন্তু আমার বা আপনার থাকা,না থাকাটা একটা চেইন সিস্টেমে চলে।মানে আমি বা আপনার থাকাটা নির্ভর করে আশেপাশের মানুষগুলোর ওপর। সেইদিকে থেকে এই গানটা কি সেই চেইন সিস্টেমের বাইরে বেরিয়ে কিছু বলছে? 

আরও পড়ুন:  বাবার বায়োপিক কি পছন্দ হয়নি 'সঞ্জু'র মেয়ে ত্রিশলার?

অনুপম রায় : অনেক সময় এরকম হয় যে আপনার দিনটা ভালো যায়নি।আপনার বসের সঙ্গে আপনার ঝামেলা হয়েছে।বা আপনার প্রেমিকার সাথে আপনার ঝামেলা হয়েছে।আপনি অশান্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চান।এখন আবেগের কাছে লজিক কাজ করে না। সেই জায়গা থেকে একজন মানুষ এই কথাটা বলতে পারেন— ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’। 

নিজের লেখা আর ফরমায়েসি লেখা,এই দুটিরমধ্যে বিভাজন করেন কী করে? 

অনুপম রায়: দেখুন আমি নিজের জন্য লিখতে সব থেকে বেশি পছন্দ করি। ফরমায়েসি কাজের প্রেশার থাকে।এখন এটাকে আমার এ্যাকসেপ্ট করতে হবে। কারণ এটা আমার প্রফেশন।উদাহরণ স্বরূপ আমি বলতে পারি,শিবুদার ‘প্রাক্তন’ ছবিতে আমি দুটো গান তৈরি করেছি।’তুমি যাকে ভালোবাসো’ এবং ‘কলকাতা’।‘তুমি যাকে ভালোবাসো’ গানটা দু’হাজার এগারো সালে তৈরি।এই গানটা ‘প্রাক্তনের’ দশ্যায়ণের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।সেটা বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। কারণ ‘কলকাতা’ বলে গানটা ফরমায়েসি গান।ওই গানটা সিনেমার জন্য লেখা।সেটাও মানুষের ভালো লেগেছে। কিন্তু তুমি ‘যাকে ভালোবাস’র মতো মানুষ ভালোবাসেনি। নিজের তগিদ থেকে করা কাজ অনেক বেশি ভালো হয়। আমার চ্যালেঞ্জ এখানেই যে, ফরমায়েসি গানগুলোকে আমি ওইখানে নিয়ে যেতে পারি কিনা। 

আপনি একটু আগে বুম্বাদার কথা বললেন। ওখানে দেখা যাচ্ছে,প্রসেনজিতের এক চোখ দৃষ্টিহীন।এই অর্ধ অন্ধের জীবন দেখা—এটাকে কীভাবে আপনি গানের মধ্যে আনলেন? 

অনুপম রায় : ওনার যে দৃষ্টিশক্তিহীনতা সেটা আমার গানের মধ্যে আসেনি। গানগুলো সম্পর্ক ভিত্তিক। কৌশিকদা আমাকে তেমনই বলেছেন। 

একটা ইন্টারভিউতে আপনি বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের গানের একটা বিধিবদ্ধ স্বরলিপি থাকে। কিন্তু মান্না দে বা সলিল চৌধুরীর গান শ্রুতি নির্ভর।সেই দিক থেকে  কি মনে হয় রবীন্দ্রনাথের গান অনেক বেশি ডিসিপ্লিন্ড? 

অনুপম রায়: রবীন্দ্রনাথের গান অনেক বেশি স্ট্রাকচারে পড়েছে।বিশ্বাভারতীর একটা টিম ছিল।যারা এই স্বারলিপি লিপিবদ্ধ করেছেন।রবীন্দ্রনাথ খুব সুন্দর ভাবে এই কাজ করেছেন।সলিল চৌধুরী,মান্না দে নিশ্চয়ই স্বারলিপি করেছেন। কিন্তু সেই স্বরলিপি কোথাও লিপিব্ধ নেই।এখন অনেক মিডিয়াম এসে গেছে।যার ফলে স্বরলিপি শুধুমাত্র নির্ভরশীলতার জায়গা নয়। হয়ত আধুনিক গানের স্বরলিপি কেউ করবেন ভবিষ্যতে। 

গান শুনে গাওয়া আর স্বরলিপি থেকে গানকে আবিষ্কারের মধ্যে তো একটা ফারাক থেকেই যায়। কারণ আপনার গান শুনে ইমিটেট করা আর একচুয়াল গানের কাঠামো অনুযায়ী গাওয়া গানে এসেন্স কি অনেক বেশি করে পাওয়া যায়? 

অনুপম রায় : এখনও অরিজিনাল গানের রেকর্ড শোনা যায়।সেটা রবীন্দ্রনাথের সময় ছিল না। তাই আমি বিশ্বাস করি এখনও সেই ইম্পরটেন্স আছে।যখন মাল্টিপল রেকর্ডিং হবে তখন ব্যাপারটা গোলাতে শুরু করবে। কোন গান কার ভার্সান সেটা শনাক্ত করা কঠিন হবে। তখন ডকুমেন্টশন করার প্রয়োজন পড়বে।আমার ডকুমেন্টেশনের সময় নেই। আমার একটা টিম থাকলে বিষয়টা এনকারেজ করতাম।আর আমাদের ট্র‍্যাডিশন কিন্তু অনেকটাই শ্রুতি নির্ভর।সুতরাং শুনে গাওয়ার একটা মূল্য আছে। 

আপনি ‘চতুষ্কোণের’ জন্য একটা গান লিখেছিলেন। সেটা হলো ‘বসন্ত এসে গেছে’। এই গানটার স্ট্রাকচার কিন্তু পুরানো গানের স্ট্রাকচারের মতো।এই গানটার ভাবনা কীভাবে এলো?

অনুপম রায় : সৃজিত ওল্ড স্কুল লিরিক চেয়েছিল।আমি ওকে বললাম, রবীন্দ্রনাথ যেরকম লিখতেন সেরকম কিছু করব?ও বলল,হ্যাঁ, করে দেখ।আমি তখন রবীন্দ্রনাথের কিছু শব্দ ধার করে গানটা বানিয়েছিলাম।সৃজিতের সেটা পছন্দ হয়,এবং সেভাবেই ‘বসন্ত এসে গেছে’র ফিমেল ভার্সন হয়।

ওই গানের পিকচারাইজেশনের ব‍্যাপারে সৃজিত ঠিক কোন সময়ের কথা বলেছিলেন?

অনুপম রায় : ওটা নিশ্চয়ই সিক্সটিস বা সেভেন্টিসের সময়।সেই সময় এ ধরণের গান লেখা হত।কারণ সেই সময় রবীন্দ্রনাথের ইনফ্লুয়েন্স ছিল।

আরও পড়ুন:  মিশা সফির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা আলি জাফরের

আপনি বলেছেন,রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহারে আপনি পক্ষপাতী নন। রবীন্দ্রগানের পিকচারাইজেশন আর আপনার গানের পিকচারাইজেশনের ইম্প্যাক্ট একই হয় বলে মনে হয়? 

অনুপম রায় : ছবিতে রবীন্দ্রগান না মৌলিক গান থাকবে,সেটা নির্ভর করে ছবির পরিচালকের ওপর।মিউজিক ডিরেক্টর সেটা ডিসাইড করে না।আমি যদি কোনও দিন ছবি করি,তখন আপনি এই প্রশ্ন আমাকে করতে পারেন।আমি সামান্য মিউজিক ডিরেক্টর।আমাকে যা বলা হবে ,আমি তাই করব।এবার একজন ডিরেক্টর যদি আমায় নির্বাচন করেন এবং বলেন,অনুপম এসো আমার ছবিতে আমি পাঁচটা রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করছি।তোমাকে মিউজিক করতে  হবে।সেই প্রজেক্টে আমি ইন্টারেস্টেড হব না।এখানে আমার কিছু করার নেই।কারণ আমি সুরকার গীতিকার।আমি সুর আর গান না লিখতে পারলে  ছবিতে মিউজিক ডিরেকশন দিয়ে লাভ কি!এখন রবীন্দ্রগান ব্যবহার করতে হলে কোনও এ্যারেঞ্জার করুক।

আপনি নিজেকে একজন সামান্য মিউজিক ডিরেক্টর বলছেন।কিন্তু সামান্য মিউজিক ডিরেক্টরের হাতে তো অনেক কাজ।আপনার গানগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে।এটা কি উদারতা?

অনুপম :  আমি বেশি দিন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছি না।আমার এখনও অনেক পথ চলা বাকি। 

আপনি কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘ধূমকেতু’ বলে একটা ছবিতে কাজ করেছিলেন।

অনুপম : ও বাবা সে ছবি তো রিলিজ করেনি।

ওই ছবির কাজের পেমেন্ট আপনি পাননি।বলেছিলেন,কাজ আমি করে যাব,টাকা যেরকম আসার সে রকম আসবে।তাই কি? 

অনুপম রায় : সে কথা এখনও ভ্যালিড আছে।

আমি এখনই বলব না, আমার পেমেন্ট চাই।আমার পেমেন্টের থেকে ছবি রিলিজ করা বেশি ক্রুসিয়াল।ছবি রিলিজের ঠিক আগে পেমেন্ট পেলেই হলো। 

আপনি বলিউডে কাজ করেছেন।ওখানে কাজ করে কেমন লেগেছে? 

অনুপম রায় : আমি  সেরকম  কোনও ভাগ করি না। আমার কাছে কাজ ইজ কাজ।সেটা যেকোনও ভাষাতেই হতে পারে।হিন্দীতে কাজ করলে পারিশ্রমিক সামান্য হলেও বেশি পাওয়া যায়।সুজিতদার কাছে আমি কাজ করেছি।খুবই ভালো এক্সপিরিয়েন্স।ওরা কাজ করার স্বাধীনতা দেয়।কোঅপারেট করে।এই এক্সপিরিয়েন্সগুলো ভালোই হয়েছে।আমি কোনও ইন্ডাস্ট্রিকে বড় ছোট এইভাবে দেখতে চাই না।সেটা বুঝতে পেরেছি।

কিন্তু হিন্দী ছবি মানে ন্যাশনাল মার্কেট। সেটা কখনও মনে হয় যে হিন্দী গান সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়বে?

অনুপম : না, তেমন মনে হয় না।আমি আমার কাজটা অনেস্টলি করতে চাই।অতো কিছু মাথায় রাখলে মূল বিষয় গুলিয়ে যেতে পারে।

মুম্বইয়ের একজন সিঙ্গার বলেছেন,এখন পিচ কারেকশন করে সবাই গায়ক হয়ে যাচ্ছেন। অতি খারাপ কণ্ঠের মানুষও  গান গাইছেন?

অনুপম : একচুয়ালি সবাই গায়ক হয়ে যাচ্ছেন না।একজন আর্টিস্টের মূল জায়গা মঞ্চ। একজন মানুষ খুব খারাপ গান গায়।তাকে স্টুডিওয় ঝাঁ চকচকে করে দেওয়া হলো। কিন্তু রেকর্ড বাজিয়ে সারাজীবন চালালে হবে না।মঞ্চে পারফর্ম করতে হবে।মঞ্চে গাইতে না পারলে সে এগজিস্ট করবে না।একজন শিল্পীর কাছে মঞ্চই সবকিছু।

আপনি বলেছিলেন ছোটবেলায় আপনার বাড়িতে যখন গান করতে বলা হতো,আপনি ‘জীবন মরণে সীমানা ছাড়ায়ে’ গানটা করতেন।সেই সময় আপনার এই গানকে প্রেমের গান বলে মনে হতো।আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আপনার এই গানকে কী মনে হয়?

অনুপম : এখন আমি দু’নৌকায় পা দিয়ে আছি।কখনও মনে হয় আমার ঈশ্বর চেতনা হচ্ছে।কখনও মনে হয় আমি এখনও প্রেমেই আবদ্ধ আছি।গানটার মধ্যে এতটা পাওয়ার আছে, ডেপ‍্থ আছে যে এই বিমূর্ত চিন্তা আমায় ভাবায়।

এখন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির খুব খারাপ অবস্থা। এখন মিউজিক সিডি বা ডিভিডি বিক্রি হয় না। কেন  এমন অবস্থা বলে আপনার মনে হয়?

অনুপম : এখন সিডি প্লেয়ার এগজিস্ট করে না।আপনি যদি নতুন গাড়ি কেনেন,দেখবেন সেখানে কোনও সিডি প্লেয়ার নেই।নতুন ল্যাপটপ নিলে দেখবেন,সেখানে সিডি ড্রাইভ ব্যাপারটা উঠে গেছে।সুতরাং সিডি আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হচ্ছে। এখন সকলের মোবাইল ফোনে ভর্তি গান। কোনওটা লিগ্যালি,কোনওটা ইললিগ্যালি। রাস্তাঘাটে খুব কম মানুষকে দেখা যায় যে কানে হেডফোন ছাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে।তার মানে গান মানুষ শুনছেন।

আরও পড়ুন:  নেশাভাঙ নাকি সব ছেড়েছেন কপিল‚ দেখে কি মনে হচ্ছে?

অনুপম রায় যখন জনপ্রিয় হননি, তখন তার দিকে কেউ ফিরেও দেখত না। কিন্তু জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরেই শুরু হলো তাকে নিয়ে মাতামাতি।এটা চিরকালীন সত্য।এই সত্যকে আপনি কীভাবে দেখেন?

অনুপম রায় : দেখুন সমাজে প্রচুর শিল্পী থাকে।আর কিছু মানুষ থাকে যারা জুহুরি।যারা শিল্পী খুঁজে বার করেন। বারো জন গান শোনালেন। আপনাকে বুঝে নিতে হবে এই বারো জনের মধ্যে কে গান গাইলে মানুষ পছন্দ করবে।প্বথিবীতে জহুরির সুংখ‍্যা খুব কম।  প্রোডিউসারদের জুহুরি চিনতে হবে।কিন্তু মুশকিল হলো আমাদের দেশের অর্ধক প্রোডিউসার ফিন্যান্সার ছাড়া কিছুই নয়। ভালো মন্দ তারা সঠিক ভাবে বুঝতে পারছে না।মিউজিক কোম্পানীকে নতুন ট্যালেন্ট খুঁজতেই হবে।

তারা কি খুঁজছে?

অনুপম রায় : বড় পাবলিশার,মিউজিক  ইন্ডাস্ট্রি কি ফুটবল খেলার কোচ সবাই বিখ্যাত শিল্পী নিয়ে কাজ করছন।কিন্তু যে ভালো জুহুরি সে চোদ্দ বছরের  নতুন একটা ছেলের মধ্যে থেকে ট্যালেন্ট খুঁজে নেবে।বিদেশে এটা প্রচণ্ড ভাবে আছে।

এখন যা কিছু পপুলার তাকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়া আনা হচ্ছে।তৈরি জমিতে সবাই খেলেতে চায়।জমি তৈরি করে কাউকে খেলতে চায় না।কেন বলে মনে হয়?

অনুপম রায় : এটা ক্যপিটালিজমের রূপ।কারণ মাস গেলে কত রোজগার হয়,এই দিকে যদি একমাত্র নজর হয়,তাহলে সমস্যা হবে।আজকে আপনি ইউটিউবে যদি একটা কুরুচিকর ভিডিও আপলোড করেন,আর পাশাপাশি ‘পথের পাঁচালী’ আপলোড করেন, তাহলে ওই কুরুচিকর ভিডিও জনপ্রিয় হবে।এখন এখান থেকে মানুষ যদি ধরে নেন,যে ভালো কিছু করার কোনও মানে নেই তাহলে কোয়ালিটি খারাপ হবেই।এবং সেটাই হচ্ছে।কারণ সমাজটা এখন ক্যাপিটালিজমকে সমর্থন করছে।আদর্শ, নীতির মূল্য এখন কমছে। এর জন্যই সব সমস্যা।

খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন।তাহলে কি এভাবেই চলবে?

অনুপম রায় : একজন ধনী বা টাকাওয়ালা মানুষকে সরাতে হলে তার থেকে বড় টাকাওয়ালা মানুষ আনতে হবে।কিন্তু যে কাজে তেমন টাকা নেই,সেই কাজের কোয়ালিটি দেখতে হবে। বাঁচতে হলে সম্মানও দরকার।শুধু টাকা নয়।

আপনি যে কথা বলছেন,সেটা ‘পথের পাঁচালী’র সময়ও প্রাসঙ্গিক।এখনও প্রাসঙ্গিক। ‘পথের পাঁচালী’র রিলিজের পর তেমন দর্শক পায়নি।কিন্তু বিদেশ থেকে সম্মান পাওয়ার পর জনপ্রিয়তা বেড়েছে।তার মানে কি বিদেশ ছুঁলেই সোনা?

অনুপম রায় : এটা থার্ড ওয়ার্ল্ডের ক্রাইসিস।তৃতীয় বিশ্বের মানুষ সারাক্ষণ কমপ্লেক্সে ভুগছে।পশ্চিম ভালো বললে,এদের মনে হয় এটা বেশ ভালো। 

১৯৪৭ সালে দেখা যাচ্ছে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছে।আজ আমরা ২০১৮-য় দাঁড়িয়ে আছি।আজও ধর্মের ভিত্তিতে অশান্তি, রাজনীতি।যে দেশে সলিল চৌধুরী,বিজন ভট্টাচার্য,উৎপল দত্তের মতো মানুষ কালচারাল মুভমেন্ট করেছেন।সেই দেশে কি আজও কোনও কালচারাল  গ্রোথ হয়নি?

অনুপম রায় : এটা খুবই দুশ্চিন্তার ব্যাপার।আপনার কথাকে আমি সমর্থন করি।সত্যি এর কোনও সদুত্তর আমার কাছে নেই।সত্যি এটা আমাকেও ভাবায়।

একজন নিউকামার,সে মিউজিক নিয়ে কিছু করতে চায় বা কেউ ছবি পরিচালনা করতে চায় বা অন্য কিছু করতে চায়।সে কি ক্যপিটালিজমের গড্ডলিকায় গা ভাসাবে নাকি নিজের আদর্শকে ধরে রাখবে?

অনুপম রায়:এটারও কোনও উত্তর নেই দাদা।এটা খুব ডিফিকাল্ট একটা লাইফস্টাইল।এটার সত্যি কোনও সলিউশন হয় কি?জানি না।

NO COMMENTS