দেবাশীষ দেব
স্বনামধন্য এই অঙ্কনশিল্পী নিজেই এক সম্পূর্ন প্রতিষ্ঠান | তাঁর হাত ধরে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে বাংলার কার্টুন শিল্প | সিগনেচার বেড়াল আর স্ব-নেচারটি কোমল, আত্মবিশ্বাসী, রসিক | বেড়ানো তাঁর নেশা | তাই ঝুলিতে রয়েছে বহু গল্প, সঙ্গে অসাধারণ সব স্কেচ | সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নিরলস সাধনার অমর ফসল ‘রঙ তুলির সত্যজিৎ’ |
valley resort araku
চোম্পি থেকে ফেরার পথে দূর থেকে এঁকে নেওয়া ভ্যালি রিসর্ট

আরাকু ভ্যালি বেড়াতে আসার সেরা সময় বর্ষাকাল, এটা জানতাম আর কপালজোরে আগের দিন ঋষীকোণ্ডা থেকেই আমরা বৃষ্টি পেয়ে গেলাম। ভাইজ্যাগ স্টেশন থেকে কিরান্ডেলু এক্সপ্রেস ছাড়ল সকাল সাড়ে সাতটায়, আরাকু হয়ে এটা যায় ছত্তিসগড় অবধি। আমরা দুজনেই জানলার ধারে বসেছি তার ওপর বাইরে জোর বৃষ্টি আর কি চাই। ধীরে ধীরে ট্রেন উপরে উঠছে আর চারদিকে দেখছি শুধু গাঢ় সবুজে ঢাকা উঁচু নিচু পাহাড়ের পর পাহাড়। বৃষ্টিতে ভিজে গোটা উপত্যকাটা যে কি অদ্ভুত তরতাজা হয়ে উঠেছে তা না দেখলে বোঝানো যাবেনা। ও পাশের জানলা দিয়ে শুধু খাড়া পাহাড় ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না ফলে অনেকেই এসে আমাদের চারপাশে ভিড় করতে শুরু করল। আমার মত ক্যামেরা বার করে ছবি তুলতে লাগল অনেকেই। ট্রেনে স্থানীয় মানুষও প্রচুর, সবাই দৈনন্দিন কাজে যাতায়াত করে, তাই এরা দেখলাম বেশ নির্বিকার।

যে কোনও পাহাড়ি রেলপথের মতো এই ট্রেনও একের পর এক টানেলের মধ্যে দিয়ে যায়, বাঁক নিয়ে ধীরে ধীরে টানেলে ঢুকতে থাকা ট্রেনের দৃশ্যটাকে ভিডিও রেকর্ড করার জন্য ক্যামেরা সমেত হাতটা জানলার বাইরে বের করে রাখা ছাড়া উপায় ছিল না এর জন্য গিন্নির কাছে বকুনিও খেলাম। মাঝে মাঝে পাহাড়ের কোলে ছোট ছোট স্টেশনে ট্রেন থামছে, একটার নাম দেখলাম ‘বোররা গুহালূ’। বিখ্যাত বোররা গুহা দেখার জন্য অনেকেই এখানে নেমে গেল, বিকেলের ট্রেনে আবার ভাইজ্যাগ ফিরবে।

Banglalive
ভ্যালি রিসর্টের ছোট ছোট কটেজ

আরাকুতে ট্রেন ঢুকল দুপুর বারোটা নাগাদ, ওখানেও অন্ধ্র ট্যুরিজমের হরিথা ভ্যালি রিসর্টে বুকিং ছিল, স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার, অটো চেপে বোঁ করে পৌঁছে গেলাম। অন্ধ্রর এই অঞ্চলটা প্রধানত আদিবাসী এলাকা যা ছড়িয়ে গেছে ছত্তিসগড় অবধি এবং এর মধ্যে আরাকু বেশ ব্যস্ত শহর। তবে হাইওয়ের ওপর ঘিঞ্জি বাজার এলাকাটা ছাড়িয়ে কিছুটা গেলেই শুধু দিগন্ত ছোঁয়া সবুজ ধানক্ষেত, জঙ্গল আর চারপাশে ঘিরে থাকা পাহাড়ের সারি। এরই মাঝখানে বিশাল বাগান ঘেরা পাঁচতলা ঢাউস বাড়ি হল ভ্যালি রিসর্ট।

Banglalive
রিসর্টের সামনে চোখ জুড়নো সবুজের ঘনঘটা

আমাদের একতলার ঘরটা বেশ নিরিবিলি দিকটায়, খোলা বারান্দা টপকালেই বাগান আর সামনে চোখ জুড়নো সবুজের ঘনঘটা। আশপাশের সরু রাস্তাগুলো ধরে বেশ মনের আনন্দে যতদূর খুশি হেঁটে ঘোরা যায়, বিকেলে বৃষ্টি থেমে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হতেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আরাকুতে দুটো জবরদস্ত দেখার জিনিস আছে, ট্রাইবাল মিউজিয়াম আর কফি মিউজিয়াম, এবং দুটোই রিসর্টের একেবারে সামনে। পরদিন ব্রেকফাস্টের পর আমরা গেলাম কফি মিউজিয়াম দেখতে। এখানে খাবার ঘরটা দেখলাম বিরাট বড় কারণ ভাইজ্যাগ বা অন্যান্য জায়গা থেকে বাসে চেপে দিনে দিনে ঘুরতে আসা যত রাজ্যের টুরিস্ট দল বেঁধে লাঞ্চ সেরে যায়। এদের খাবার বলতে ভাত, জলবৎ রসম, বড়া আর আলুর ঘ্যাঁট, বুফে সিস্টেম, সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে তাই নেয় আর টেবিলে এনে হাপুস হুপুস করে খায়। আমাদের অবশ্য সৌজন্যমূলক ব্রেকফাস্ট মন্দ ছিল না, উপমা আর মশলা বড়াটা তো দিব্যি চেয়ে খাবার মতো।

Banglalive
কফির পেয়ালা হাতে সেই ছাগল। পোস্টারে বানানের ভুলটাও অবিকল রাখা হয়েছে

কফি মিউজিয়াম খোলে সকাল দশটায় আর টিকিটও মাথাপিছু দশ টাকা। দক্ষিণ ভারতের লোক কফি খেতে বেশি পছন্দ করে এটা সবাই জানে কিন্তু এ অঞ্চলে কফি চাষ শুরু হওয়া থেকে নিয়ে কফি দানা আবিষ্কারের গোটা ইতিহাসটাই আমরা জেনে ফেললাম এখানকার মিউজিয়ামটা ঘুরে। মজার কথা হল একেবারে গোঁড়ায় ইথিওপিয়ার একদল ছাগল নাকি এই কফির ফল খেয়ে উত্তেজিত হয়ে নাচানাচি করে ব্যাপারটা প্রথম সবার নজরে আনে। ভারতবর্ষে লুকিয়ে এই কফির বীজ এনে চাষ শুরু করেন এক সুফি সাধক ফলে ভেতরে সারাক্ষণ বেজে চলেছে সুফিদের বিভিন্ন ধরনের গান। মিউজিয়ামটা সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে মাটির মূর্তি, আঁকা ছবি, পোস্টার, নকশা, ম্যাপ ইত্যাদি নানা জিনিস দিয়ে তবে ছবি তোলা বারণ। কফির প্রথম আবিষ্কারক সেই ছাগলের কফির পেয়ালা হাতে এমনই মজার কার্টুন ছিল যেটা সঙ্গের স্কেচ খাতায় কপি না করে পারলাম না। মিউজিয়ামের অন্য দিকে রয়েছে কফির দোকান সঙ্গে বসে কফি খাওয়ার জায়গা। কত রকমের কফি পাওয়া যাচ্ছে বোর্ডে তার একটা লম্বা তালিকা দেখে আমাদের তো চক্ষু চড়কগাছ, কফির সঙ্গে আনারস, লিচু, কমলালেবু, নারকোল কোনওটারই ককটেল বানাতে এরা বাদ রাখেনি। শেষে কাউন্টারের ছেলেগুলোর কথা মতো ‘এথনিক’ আর ‘অথেনটিক’ এই দু ধরনের কফি নিয়ে বসলাম। ধোঁয়া ওঠা পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে চারদিকের এই কফিময় পরিবেশটাকে জমিয়ে উপভোগ করা গেল। বেরোবার আগে দু চার প্যাকেট কফি কেনা হল, কেক, চকোলেট, পেস্ট্রি আর স্থানীয় হস্তশিল্পের জিনিসও বিক্রি হচ্ছিল তবে দাম বেশ চড়া। কাউন্টারের পাশে দেখলাম একটা বোর্ডে লেখা রয়েছে… ‘আমরা দরাদরি করি যখন একশো বছরের কোনও বুড়ো আসেন তাঁর বাবা মার সঙ্গে’। জব্বর রসিকতা বটে।

Banglalive
Chompi village Araku
চোম্পি গ্রাম

আমাদের রিসর্টের সামনে দিয়ে একটা লাল মাটির রাস্তা এঁকে বেঁকে দূরে পাহাড়ের কোলে গিয়ে মিশেছে। একটা অটোওলা কে বললাম নিয়ে চলোতো ওইদিকে। জানা গেল রাস্তাটা গেছে আদিবাসীদের গ্রাম ‘চোম্পি’ অবধি, তিন কিলোমিটার পথ। চারপাশের শোভা দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম টুক করে। পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা আর চালাঘর। শান্ত, নিরিবিলি জায়গা, লোকজন খুব অল্পই চোখে পড়ল। শুরুতেই রয়েছে একটা স্কুল, মনে হল খৃস্টানরা চালায়। বাচ্চাগুলো সামনের খোলা জায়গাটায় স্লিপ চড়ছিল, ছোটাছুটি করছিল। আমরা হাত নাড়লাম, ওরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, এখানে টুরিস্ট বড় একটা আসেনা বোধহয়। ওরই মধ্যে অবশ্য চোম্পির একটা স্কেচ করে নিয়ে আমরা আবার ফেরার পথ ধরলাম। এরপর আরাকুতে আমাদের বাকি দিনগুলো ঘুরে বেড়িয়ে ভালই কেটেছিল তবে সে বৃত্তান্ত থাকবে পরের বার।

আরও পড়ুন:  তালপিয়টের সমাধিক্ষেত্রেই সমাহিত হন স্ত্রী পুত্র-সহ যিশু খ্রিস্ট ?

NO COMMENTS