রহস্যময় উপকরণে তৈরি এই জাদু-দর্পণের দাম পৌঁছয় এক লাখ টাকাতেও

রূপকথার হিংসুটে রানির সেই আয়না সত্যি কোথাও আছে নাকি ? যে দর্পণ সামনে দাঁড়ালেই বলে দেয় সবথেকে সুন্দরীর নাম ?

সম্পূর্ণ সেরকম না হলেও এক আশ্চর্য আয়না আছে বটে | একমাত্র তাতেই নাকি ধরা পড়ে উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা জনের সঠিক প্রতিবিম্ব | সে আয়না তৈরি হয় কেরলের আরানমুলায় | মালয়লম ভাষায় তার নাম আরানমুলা কন্নড়ি | অর্থাৎ আরানমুলা দর্পণ | 

ঈশ্বরের নিজের দেশের ছোট্ট শহর আরানমুলায় তৈরি এই আয়না অন্য আয়নার থেকে আলাদা | এর নির্মাণশৈলী কয়েক হাজার বছর ধরে গোপনীয় | সাধারণ আয়না হল ‘Silvered Glass Mirror’ | কিন্তু আরানমুলার দর্পণ তৈরি হয় ধাতু সংকর দিয়ে | ফলে এড়ানো যায় ‘Secondary Reflections’ | 

কিন্তু কোন কোন ধাতুর মিশ্রণ ? সেটা প্রকাশ নিষিদ্ধ | বলা হয়‚ যে শিল্পীরা এই দর্পণ বানান তাঁরা স্বয়ং বিশ্বকর্মা দেবের বংশধর | ধাতু বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন কপার আর টিন-এর সংকরে তৈরি হয় জাদু দর্পণ | ধাতু সংকর বহু ঘষে মেজে তবেই প্রস্তুত হয় আয়নার সঠিক রিফ্লেকটিভ সারফেস | যাতে প্রতিবিম্ব হয় বিকৃতি-মুক্ত |

আরানমুলার একটিমাত্র পরিবার জানে নির্মাণ-রহস্য | তারা একটি বৃহৎ পরিবারের বিস্তৃত শাখা | তাদের হাতের কাজ সংরক্ষিত আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও | বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী একটি আরানমুলা দর্পণের দাম পড়ে ৮০০ থেকে ১ লাখ টাকা অবধি |

২০০৪ সালে GI বা Geograaphical Indication পেয়েছে এই দর্পণ | তবে এই আয়নার উল্লেখ আছে বৈদিক যুগেও | পুরাণে কল্প-দর্পণকে বর্ণনা করা হয়েছে দেবী পার্বতীর দর্পণ বলে | তবে প্রামাণ্য ঐতিহাসিক তথ্য বলছে‚ প্রায় পাঁচ প্রজন্ম আগে আরানমুলায় এসেছিলেন একদল শিল্পী | তিরুনেলভেলি থেকে এসে বসত গড়েছিলেন তাঁরা | তাঁদের ডেকেছিলেন পাণ্ড্যলম-এর রাজা | আরানমুলায় পার্থসারথি মন্দির নির্মাণের উদ্দেশে |

অপূর্ব দক্ষতায় মন্দির তৈরি করলেন তাঁরা | সঙ্গে বানালেন বিগ্রহের অলঙ্কার এবং বাসনপত্র | বিগ্রহের বাসন ও মন্দিরের ঘণ্টা তৈরি সময় কাজ করছিলেন তামার ধাতু সংকর দিয়ে | হঠাৎ আবিষ্কার করলেন কপার ও টিনের নির্দিষ্ট একটি ধাতু সংকরের Reflective Property অভূতপূর্ব | সেটাই হয়ে দাঁড়াল দর্পণের উপকরণ | বিশ্ববিখ্যাত হল আরানমুলা আয়না |

এই আয়না নির্মাণের নেপথ্যে প্রচলিত আর একটি কিংবদন্তি | কিছু শতাব্দী আগে আরানমুলার পার্থসারথি মন্দিরের পুরোহিত খেয়াল করেন বিগ্রহের মুকুটে চির ধরেছে | তিনি ডেকে পাঠান স্থানীয় ব্রোঞ্জ-কারিগরকে | বললেন মুকুট ফের বানাতে | এদিকে কারিগরের কাছে যথেষ্ট ব্রোঞ্জ ছিল না | তিনি চিন্তায় পড়লেন | কথিত‚ সে রাতে তাঁকে স্বপ্নে দেখ দেন স্বয়ং দেবী পার্বতী | তিনি বলে দেন কোন ধাতু কী পরিমাণে নিয়ে তৈরি করতে হবে নির্দিষ্ট ধাতু সংকর | 

সেই নির্দিষ্ট ধাতু সংকর দিয়ে বছরের পর বছর ধরে বানানো হচ্ছে বিশেষ দর্পণ | তবে এখন স্থানীয় বাজার অপেক্ষা এর চাহিদা অনেক বেশি বিদেশে সমঝদারদের কাছে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here