সম্পূর্ণ মাটির তৈরি পরিবেশবান্ধব দোতলা বাড়ি তৈরি করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন মহিলা স্থপতি

719
Two Storied Mud House

হরিয়ানার ফরিদাবাদ জেলার সূর্যকুণ্ডের কাছাকাছি অনঙ্গপুর গ্রাম। পৃথ্বীরাজ চৌহানের মাতামহ অনঙ্গপাল টোমারের জন্মস্থান ছিল এটি। সেই থেকেই নাম হয় অনঙ্গপুর। নামের দিক থেকে রাজকীয় সম্বন্ধ থাকলেও এই অঞ্চল মূলত পাথুরে খনি এলাকা। গাছগাছালি খুব কম, সবুজের নিতান্ত অভাব। আদি গুল্ম জাতীয় জঙ্গলও সাফ হয়ে গিয়েছে, মানুষ জ্বালানির জন্য কাঠকুটো সংগ্রহ করে করে শেষ করে এনেছে এই বনাঞ্চল। এই ছোট্ট অখ্যাত গ্রামটিকে আবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এলেন এক মহিলা স্থপতি। এই গ্রামে তিনি যখন তাঁর বাড়ি বানালেন তখনই তা অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। কেন? ঠিক কী কারণে কেউ বাড়ি বানিয়ে বিখ্যাত করে তুলতে পারে একটি অঞ্চলকে?

এই বাড়ির কাঠামো একটু স্বতন্ত্র। দোতলা বাড়িটি তৈরি হয়েছে সূর্যের তাপে পোড়া মাটি দিয়ে। ভারতে প্রথম বানানো হয়েছে এ’রকম পোড়ামাটির বাড়ি। নব্বই দশকের শুরুর দিকে বিখ্যাত স্থপতি রেবতী কামাথ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাটির তৈরি নানা ধরণের স্থাপত্য নিয়ে কাজ করছিলেন। মাটির বাড়ি খুব একটা পোক্ত হয় না, বেশিদিন টেঁকে না, এসব বিবিধ প্রচলিত ধারণাকে নস্যাৎ করে তিনি বিগত ২৭ বছর ধরে নিজে বসবাস করছেন এই বাড়িতেই। খোলা ছাদ, বারান্দা, উঠোন, আকাশের নীচে আচ্ছাদনহীন সিঁড়ি, সবই মাটি দিয়ে তৈরি। পোড়ামাটির অপূর্ব রং অসাধারণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মাটির পৃথিবী থেকে সহজে সংগ্রহযোগ্য কাঁচামালও হতে পারে আধুনিক গৃহ নির্মাণের টেঁকসই ও নির্ভরযোগ্য উপাদান, এটি প্রমাণ করে দিয়েছেন রেবতী।

রেবতী, জানান আদি যুগ থেকেই মানব সভ্যতার অপরিহার্য অঙ্গ ছিল মাটির বাড়ি। ‘ভারতে ধীরে ধীরে এর চল উঠে গেল, কেননা কম খরচে পাকা বাড়ি চায় মানুষ। কিন্তু গাছপালা ধ্বংস করে, গাছের কাঠ জ্বালানি করে ইট পুড়িয়ে বাড়ি বানালে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। বিশেষত অনঙ্গপুরের মত গ্রামে, যেখানে সবুজ ফুরিয়ে আসছে। একটি সাধারণ বাড়ির ইটের যা শক্তি, মাটির বাড়িরও একই রকম শক্তি রয়েছে। ‘সাধারণ পাকা দালান কোঠা বানাতে বিশেষ দক্ষতা বা শিল্পবোধের প্রয়োজন পড়ে না কিন্তু মাটির বাড়ি তৈরি করতে দু’টিরই দরকার পড়ে। মাটির বাড়ির বিশেষ সাফল্য দুইটি। এক হল এতে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে, দ্বিতীয় অনেক মহিলা শ্রমিক কাজ করার সুযোগ পান। রেবতী বলেন, ‘বাড়ি বানানোর সময় আমি খেয়াল রেখেছি যাতে এই অঞ্চলের পাথর, খনিজ ব্যবহার করা যেতে পারে, এই অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বাড়ির নকশা তৈরি করা হয়েছে’। সাধারণ ইট মাটির বাড়িতে ব্যবহার করা যায় না তাই দেয়াল গাঁথতে ব্যবহার করা হয়েছে সূর্যের তাপে পোড়া মাটির ইট, দুটি তলা ধরে রাখার জন্য একেবারেই টেঁকসই। দেওয়ালের শেষ পর্যায়টি মহিলারা সম্পন্ন করেছেন। মাটি আর গোবর দিয়ে খুব সুন্দর করে দেওয়ালগুলি লেপে দিয়েছেন তারা। গ্রামীণ মহিলাদের সৃজনশীলতা ফুটে উঠেছে বাড়িটির আনাচে কানাচে। কামাথ জানিয়েছেন, শুধুমাত্র সিমেন্ট ব্যবহার করা এড়ানো হয়েছে এমন নয়, বাড়িটি তৈরির প্রতিটি উপাদানই রিসাইকেলযোগ্য। গোটা বাড়ির স্থাপত্যের মাত্র 0.3 শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে সিমেন্ট| মাটি একটি চমৎকার উপাদান। যিনিই রেবতীর এই মাটির বাড়ি তৈরিতে অংশ নিয়েছিলেন, প্রত্যেকেই কাজ করে দারুণ আনন্দ পেয়েছেন। মহিলা শ্রমিক থেকে রাজমিস্ত্রি সকলেরই খুব ভালো অভিজ্ঞতা ছিল এই অন্য ধারার বাড়িটি তৈরি করতে। পরিবেশের বিন্দুমাত্র ক্ষতি না করে মাটির পৃথিবীর উপাদান দিয়ে মাটির বাড়ি তৈরি করলেন রেবতী। সারা দেশের মানুষ বিস্ময়ে চেয়ে দেখলেন তাঁর সাধের ঘর। এমনও সম্ভব ! গৌরবান্বিত হল অনঙ্গপুর গ্রাম।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.