অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
অম্লানকুসুমের জন্ম‚কর্ম‚ধর্ম সবই এই শহরে|বাংলা ছোটগল্পের পোকা|একেবারেই উচ্চাকাঙ্খী নয়‚অল্প লইয়া সুখী|

দিন কয়েক আগে অফিস থেকে ফেরার পথে আমাদের স্কুলের এক শিক্ষকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমাদের স্কুলে শিক্ষকদের স্যার নয়, দাদা বলার নিয়মপ্রায় বছর চোদ্দ পরে দেখা। ভৌতবিজ্ঞানের ক্লাস নেওয়া সেই দাপুটে দাদার শরীর ভেঙেছে অনেকটাই। কপালে, গলায় বলিরেখা। প্রণাম করলাম। একথা সেকথার পরে জিজ্ঞেস করলেন, বিয়ে করেছিস?’ একটু রাঙা হয়ে বললাম, হ্যাঁ দাদা। এর পরেই অবধারিত সেই প্রশ্নটা, ইংরিজিতে কিউ অক্ষরের পরে যেমনভাবে ইউ আসে। ছানাপোনা?’ বললাম, এখনও হয়নি দাদা। উনি কয়েক সেকেন্ড ভাবলেন কী যেন। তারপরে বললেন, দেখিসজুনিয়রকে আবার সরকারি বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দিস না যেন। ওই সর্বনাশটা করিস না। জিজ্ঞেস করলাম, এ কথা বলছেন কেন?’ একটা দীর্ঘশ্বাস। তারপরেই কল্যাণ হোক বলে উনি হেঁটে চলে গেলেন সামনে।  আমার আরও কিছু বলার ছিল। বলতে পারিনি। গুমোট লাগছিল

Banglalive

২০১৫-১৬ আর ২০১৬-১৭ সালের রাজ্য সর্বশিক্ষা মিশনের রিপোর্টে যা উঠে এসেছে তাতে আর যাই হোক, স্বস্তি হয় না। রিপোর্ট বলছে, রাজ্যে হু হু করে বেড়ে চলেছে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা। বলাই বাহুল্য, এর সিংহভাগই ইংলিশ মিডিয়াম। ২০১৫-১৬তে রাজ্যে যেখানে ৯৫৯৬টা বেসরকারি প্রাথমিক স্তরের স্কুল ছিল, সেখানে ২০১৬-১৭তে তা বেড়ে হয়েছে ৯৮৮০মাধ্যমিক স্তরে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৩৮৯ এবং ৪৫৩। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ২০১৫-১৬তে বেসরকারি স্কুল ছিল ২১৫২২০১৬-১৭তে তা হয়েছে ২২৩১। বৃদ্ধির হার যদি দেখা যায়, তা হলে বেসরকারি স্কুলের বাড়বাড়ন্তে সবার আগে জায়গা করে নেবে মাধ্যমিক স্তর। সাড়ে ১৬ শতাংশ।

আমরা যারা বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়ে এসেছি আজীবন, তাদের এই সমস্ত সংখ্যা দেখে কেমন যেন ভয় হয়। মনে হয়, সাধের ভিটেমাটিটায় ভাঙন ধরছে ক্রমশসত্যরে লও সহজে বললেও যেখানে রাজ্যে কচিকাঁচাদের সংখ্যার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী, সেখানে সরকারি স্কুলগুলোতে পড়ুয়ার অভাবের ব্যাপারটা ঠিক মেনে নিতে পারা যায় না। বাস্তবে কিন্তু তা হচ্ছে। এ বছরের গোড়ার দিকে স্কুলশিক্ষা দফতর জানিয়েছিল, কলকাতার ৭৫টা স্কুল বন্ধ হয়ে যেতে চলেছে স্রেফ পড়ুয়ার অভাবে। সম্প্রতি আবার তারা বলেছে, এখন যা অবস্থা, গ্রামাঞ্চলের এক হাজার স্কুলে এখনি তালা চাবি লাগিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

অনেক স্কুল আছে, যেখানে ছাত্রের থেকে শিক্ষকের সংখ্যা বেশি! আসি যাই মাইনে পাইয়ের একঘেয়ে নিয়মে ওখানকার শিক্ষকদেরও দমবন্ধকরা অবস্থা। ওঁদের অন্য কোনও চলতি স্কুলে বদলি করে ইতিমধ্যেই ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গিয়েছে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরবাকিগুলো নিষ্কৃতি মৃত্যুর প্রহর গুণছে। আর বেসরকারি স্কুলগুলো তাদের বিলবইয়ের বরাত বাড়াচ্ছে ফি বছর। ব্যাঙ্কে স্কুলের টিউশন ফি জমা দেওয়ার জন্য চালু হয়ে যাচ্ছে ডেডিকেটেড কাউন্টার। ব্যবস্থা ভালই!

আমার বাবার যে বন্ধু-বান্ধবেরা আছেন, তাঁদের ছেলে মেয়েদের মধ্যে সরকারি বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়েছি একমাত্র আমি। বছরে দুতিন বার বাবা আর ওই কাকুদের জমায়েত হত, সপরিবার। এক এক বার এক এক জনের বাড়িতে। তখনও ফেসবুক, হোয়্যাট্সঅ্যাপ, লাইভ স্ট্রিমিং আসেনি। ওদের হার্ডি বয়েজ, ন্যান্সি ড্রিউয়ের মাঝে যখন কথা খুঁজে পেতাম না মুখচোরা আমি, তখন, কেন জানিনা, ঠাকুরের কাছে বলতাম, আমার মন ভাল করে দাও প্লিজ। সুযোগ খুঁজতাম। আমাদের বাড়িতে যেদিন জমায়েত হল, আমার বইয়ের তাকটা খুলে যখন সারা শরীরে অস্বস্তি মেখে দাঁড়িয়েছিল কৌশিককাকু-তাপসকাকুর ছেলেমেয়েরা, তখন একটা অদ্ভুত আনন্দ হয়েছিল। বাচিক শিল্পী হলে বলতে পারতাম, আনন্দে যোগ হয়েছিল অন্য মাত্রা! ওরা আমার বইয়ের তাকের থেকে এক এক করে বের করছিল চাঁদের পাহাড়, ছিন্নমস্তার অভিশাপ, কাকাবাবু সমগ্রর প্রথম খন্ড। জিজ্ঞেস করেছিল, এগুলোর ইংলিশ ভার্সন নেই?’ হয়ত ছিল বাজারে, জানতাম না। আসলে জানার প্রয়োজন বোধ করিনি কখনওজোরে না বলার সময় বুকটা ফুলে গিয়েছিল। ওদের মতো শ্রাগ করতে পারিনি হয়তো, কিন্তু ছাতির উপরে যেন ঝলমলিয়ে উঠেছিল একটা সোনার ঢাল। বলেছিলাম, সেকিরে! ফেলুদা-কাকাবাবু কেউ ইংরিজিতে পড়ে?’ কলেজজীবনে কোনও এক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়া আমার এক বান্ধবী বাদশাহী আংটি পড়তে নিয়ে দেড় মাস পরে আমায় বইটা ফেরত দেয়। বলেছিল, রোজ পড়েছি, জানিসওর উপরে আমার যে ক্রাশটা ছিল, উড়ে গিয়েছিল সেই দিনই। এক নিঃশ্বাসে পড়ার যে বই, তার জন্য দেড় মাস! যা পাখি উড়তে দিলাম তোকে, খুঁজে নে অন্য কোনও বাসাআর সত্যি বলছি, এ নিয়ে আমার আজ পর্যন্ত আফশোস হয়নি। লাল সেলাম, ফেলুদা!

বাংলাটা আমার না ঠিক ঠাক আসে নাজীবনে এ কথা না বলতে পেরে ঠকেছি কি? ফটফট করে হয়তো ইংরিজি বলতে পারি না এখনও, হঠাৎ একটু ব্যথা পেলে আউচ না বলে উফ্ বলি। ওহ শিট্-এর বদলে ধ্যাত্তেরি। তার জন্য দুঃখ হয়নি তো কখনও। বিরক্তি, রাগের প্রকাশেও তো কম যাই না বলেই মনে হয়! স্কুলে জগিং ট্র্যাক পাইনি, মাল্টিজিম পাইনি, পাইনি স্মার্ট ক্লাসরুম, লন টেনিস, টেবিল টেনিস কোর্ট। ছিল না পন্ডিতমশাইয়ের মাথায় চারটে টিকির মতো দেখতে ওয়াই-ফাই ক্যাম্পাস। শৈশব-কৈশোরের পড়াশোনার বৃত্তে ব্র্যান্ডেড থ্রিসিক্সটি ডিগ্রি অ্যাপ্রোচহল কই? লুকোচুরি খেলার জন্য তো কোর্ট লাগেনি কোনওদিন। পিছন থেকে এসে দুম করে দেওয়া ধাপ্পা-কে ইংরিজিতে কী বলে? স্কুলের নিচে মহাদেবদার দোকানে পাঁচ টাকায় লুচি-আলুর দম হাতে স্যানিটাইজার না দিয়েও শালপাতায় দিব্যি খেয়েছি তো। হাইজিন ওয়ার্কশপ কো-পাওয়ার্ড বাই অমুক ব্র্যান্ড, হয়নি কখনও স্কুলে। কিন্তু ইংরিজি মিডিয়ামের বন্ধুদের থেকে পেট খারাপ কম হত!

বাঙালির ঘরে জন্মেও বাংলা কারও থার্ড ল্যাঙ্গোয়েজ জানতে পারলে লালমোহনবাবু হয়তো বলতেন, আপনাকে তো তা হলে কালটিভেট করতে হচ্ছে মশাই। ব্রজদা দুয়ো দিত। টেনিদা মাথায় গাঁট্টা মারত একটা। কালের খেয়ালে, স্রোতের টানে বদলেছে অনেক কিছুই। বদলাবেও। তবু প্রথম ভাষা হিসেবে নিজের মাতৃভাষাকে বেছে নেওয়ার এখনও সুযোগ আছে যেখানে, বিনা খরচায়, সেগুলোর দরজায় যেন পর্দা না টানা হয়, তা দেখা দরকার। সর্বশিক্ষা মিশনের রিপোর্টই বলছে, বহু স্কুলে প্রধান শিক্ষকের বসারই কোনও আলাদা জায়গা নেই। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি এবং সরকার পোষিত স্কুলের সংখ্যা ৮৩,৩২২। প্রধান শিক্ষকের জন্য ঘর বরাদ্দ রয়েছে এর মধ্যে মাত্র ১৯,০৯২ স্কুলে। পশ্চিম মেদিনীপুরে প্রাথমিক স্কুলগুলোর মধ্যে মাত্র ৫.৬৬ শতাংশ স্কুলে প্রধান শিক্ষকের ঘর রয়েছে। বেসরকারি স্কুলগুলো যখন সগর্বে ত্রৈমাসিক পিটিএম (পেরেন্টস-টিচার্স মিট)-এর ইমেল করে, তখন সরকারি স্কুলের কোনও প্রধান শিক্ষক ছাত্রের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য জায়গা হাতড়ান। নিজের বসার ব্যবস্থা থাকলে তবে তো অন্য কাউকে বসাবেন।

সর্বশিক্ষা মিশনের বিভিন্ন রিপোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে সরকারি আর সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলোর দুরবস্থার কথা বলে আসছে বারবার। শুধু মিড-ডে মিলে ডিম দিয়ে যে ছাত্র বাড়ছে না, তা তো আজ স্পষ্ট। বহু সরকারি স্কুলে বাড়ির অবস্থা বেহাল। পানীয় জল, শৌচাগারের মতো ন্যূনতম পরিকাঠামোরও অভাব। কিন্তু কারও কোনও হেলদোল নেই। কেন্দ্র রাজ্যকে দোষ দেয়, রাজ্য কেন্দ্রকে। অথচ আমাদের এই উৎসবমুখর রাজ্যের যে মোড়ক, তার দিকে তাকিয়ে আপাতভাবে কোনও আর্থিক দুরবস্থার আঁচ পাওয়া যায় না। ক্লাবগুলোর বরাদ্দের কোনও ঘাটতি নেই। বারো মাসে এখন পঁয়ষট্টি পার্বন। অথচ শিক্ষক নিয়োগের ঠিকানা এখনও দিকশূন্যপুর। মন্ত্রীদের হাসিমুখের ছবি ব্যানারে হোর্ডিংয়ে ছাপতে যত কোটি টাকা খরচ হয়, তার থেকে কয়েক চামচ নিলেও সরকারি স্কুলগুলোকে সাজানো যেত কিছুটা। দেওয়াল রং করা সাজ নয়, অন্দরের, অন্তরের সাজ। বেসরকারি স্কুলের জরির ঝালর নাই বা হল, কিন্তু আব্রুটা যেন বাঁচানো যায়, সসম্মানে। না হলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কোনওদিন জানতেও পারবে না স্নোয়ির থেকে বহু গুণ মিষ্টি একটা নাম ছিল টিনটিনের কুকুরটার। কুট্টুস।

আজকের যুগে বাংলা আমার দৃপ্ত শ্লোগান, তৃপ্ত শেষ চুমুক হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু ইংরিজির মোহমেঘেও বাংলাকে যেন দেখা যায়। চাকা যেভাবে গড়াচ্ছে, তার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

আরও পড়ুন:  ভেটকি পার্সলে ফ্রাই

7 COMMENTS

  1. মহাদেবদা কই অম্লান? সুরেশদা তো! আর প্রথমের দাদা কে?

    দিব্য লিখেছেন!

  2. Besh bhabnar bishoy, kintu e toh howar e chilo, jodi na rajnitik ra engreji bhasa r upor nana badha stop na korten, tobe hoito erom hoto na.

  3. Ajker yug er sikhya jagot er halhokikot sob e ei lekha er madhyome prakash pelo.erokom ekta mormosporshi kintu bastabbadi lekha jaroori chhilo.kurnish janai lekhok k.