ম্যানিফেস্টো : এক গুল্পকথা

নাচন-কোঁদন থামিয়ে মাথা হেঁট করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইতেন ভূতের রাজা। তাঁর হল্লাগোল্লাকে ‘অ্যাই রোখকে’ বলার জন্য একটা ম্যানিফেস্টোই যথেষ্ট ছিল। যে কোনও একটা। তিনটে জবর জবর বরে গুপী-বাঘার জীবন পাল্টে দিয়েছিলেন তিনি। ম্যানিফেস্টোর পাতা উল্টে অবাক হয়ে তিনি হয়তো ভাবতেন, আমার তিন বরের জায়গায় এখানে যে তিনশ বর…।

তাও কারও জীবন পাল্টায় না।

রাজনীতির পুকুরে ছিপ ফেলেছে যারা, ভোটপর্ব আসতেই তারা একটা ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে। মানে নির্বাচনী ইস্তেহার আর কি। ইভিএম-এ পিইইপ দিয়ে জনগণ যদি তাদের সিংহাসনে বসিয়ে দেয়, তা হলে কি ভাবে কোন কোন জাদুকাঠি ছুঁইয়ে এ দেশটাকে স্বর্গরাজ্য বানিয়ে দেওয়া হবে, তা বিশদে লেখা থাকে ম্যানিফেস্টোতে। ব্রজদার কথা ধার করে বলা যায়, এক একটা ম্যানিফেস্টো আসলে আর কিছুই না, গুল্পসমগ্রের এক এক খণ্ড। এ বলে আমায় দেখ, ও বলে ‘আমি’? দেশ বলে, আমায় দেখ, হাসে অন্তর্যামী!

ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে রাহুল গাঁধীর দল বলেছে, তাঁর পাখির চোখ হবে ন্যায়। না, এটা অন্যায়ের উল্টো নয়। ন্যুনতম আয় যোজনা। প্রতিটা শব্দের ইংরিজি প্রথম অক্ষর নিলে শব্দটা দাঁড়ায় ন্যায়। এর ফলে কি হবে? দেশের সবচেয়ে গরীব যে কুড়ি শতাংশ লোকজন আছে, বছর গেলে তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকে যেবে কড়কড়ে বাহাত্তর হাজার টাকা। টাকাটা যাবে পরিবারের যে মহিলা আছেন, তাঁর অ্যাকাউন্টে, পুরুষেরা যেন উল্টোপাল্টা খরচা না করে ফেলতে পারেন তার জন্য। বছর পাঁচেক আগে অন্য এক প্রধান মন্ত্রী পদপ্রার্থী বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে বিদেশ থেকে এমন পরিমাণে কালো টাকা আনবেন যে প্রত্যেকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পনেরো লক্ষ টাকা করে পুরে দেওয়া যাবে। বহু খেটে খাওয়া, দিন আনা দিন খাওয়া, বসের গালি খাওয়া, অ্যাপ্রাইজালে শূন্য রেটিং পাওয়া মানুষের মতো আমিও ভেবেছিলাম, এ বার একটা হিল্লে হল বটে। আর কারও গোলামি করতে হবে না। কালো টাকাওয়ালা, দ্যাখ কেমন লাগে! ভেবেছিলাম, এখন সুখই সুখ। ভেবেছিলাম, এ সব বলার জন্য ছাপ্পান্ন ইঞ্চি বুকের পাটা লাগে। শখানেক দেশ ঘুরে ছাপ্পান্ন হয়তো একষট্টি হয়েছে এত দিনে, আমার অ্যাকাউন্টে একটি পয়সাও আসেনি।

ভোটের দামামা বাজলেই রাজনীতির নেতাদের মনে পড়ে, চাকরির কথা বলতে হবে। এটা অনেকটা বড়শিতে গেঁথে দেওয়া কেঁচোর মতো। বুভুক্ষু বেকারের দেশে এই টোপ লাগিয়ে দিয়ে বসে থাকলে ভোট-ফাতনা নড়বেই। আশীর্বাদের হাত দেখিয়ে কংগ্রেস বলেছে, ক্ষমতায় এলে চাকরির জায়গা তৈরি করা তাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হবে। সরকারি, বেসরকারি দুজায়গাতেই। সামনের বছরের মার্চ মাসের মধ্যেই নাকি কেন্দ্রীয় সরকারের চার লক্ষ শূন্যপদ ভর্তি হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, দিল্লিতে বসে তারা দেখবে যেন বিভিন্ন রাজ্য সরকারের কুড়ি লক্ষ শূন্যপদও ভর্তি হয়। মানে বছরে চব্বিশ লক্ষ শুধু সরকারি চাকরি। গরম গরম। দেশের কথা বলতে পারব না, তবে এই তথ্য জানতে পেরে সবচেয়ে খুশি হবেন আমাদের রাজ্যের এক ব্যবসায়ী বাহাদুর প্রফেসর, মাসের দুই রবিবারে মোটিভেশনাল স্পিচ সহ যাঁর কোচিং সেন্টারের পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন বের হয়। গ্রুপ ডি হলেও শুধুমাত্র সরকারি চাকরি না করলে ভবিষ্যৎ যে নিকষ কালো, তা তিনি উপপাদ্যের মতো মাসে দুবার করে প্রমাণ করতে সফল হয়েছেন। চব্বিশ লাখের গন্ধ পেলে এবারে না বাড়ি থেকে, রাস্তা থেকে ধরপাকড় শুরু হয়। গ্র্যাজুয়েটরা সাবধান।

শিক্ষা হোক বা স্বাস্থ্য, তুবড়ির মতো উপচে পড়ছে আশার ফুলঝুরি। সনিয়া গাঁধীর দল বলছে, ক্ষমতায় এলে রাইট টু হেলথকেয়ার অ্যাক্ট বলে একটা আইন বলবৎ করবেন তাঁরা। এর ফলে দেশের প্রতিটি মানুষ সরকারি হাসপাতালে বিনা পয়সায় চিকিৎসা পাবেন, ওষুধ পাবেন। কিছু বেসরকারি হাসপাতালকেও নাকি এর আওতায় নিয়ে আসা হবে। ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে জিডিপির তিন শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ করা হবে। এখন এর পরিমাণ মাত্র দেড় শতাংশ। এই কথাগুলো শুনতে ভাল, পড়তে ভাল। কবীর সুমনের সেই দু’দশক আগের গানে ছিল, ‘ভরসা থাকুক হাসপাতালে সহজ পথের অ্যাডমিশনে / ভরসা থাকুক ওষুধে আর ডাক্তারদের চোখের কোণে।’ ইস্তেহারগুলো বুলেট পয়েন্টে স্বপ্নের কথা বলে। আর বাস্তবে, আগুনে পুড়ে যাওয়া পাঁচ বছরের মেয়েকে সাতবার রেফার করা হয়। মেয়েটা, মেয়েগুলো বাঁচে না।

নোট বাতিলের উপকারিতা নিয়ে এত দিনে কয়েক হাজার পাতা ফিরিস্তি দিয়েছে কেন্দ্রের শাসক দল। অন্য দিকে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে জানিয়ে দিয়েছে, তারা ক্ষমতায় এলেই নোট বাতিল কাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত দাবি করবে। অর্থাৎ কত নোটে কত বাতিল হয়েছে, আদালতের মাধ্যমে তার হিসেব দেখিয়ে দেওয়া হবে আম-আদমিকে। যে জিএসটি নিয়ে পদ্মফুলের গর্ব-পাপড়ি প্রসারিত হয়েছে আরও, জোড়াফুল বলেছে, বিশেষজ্ঞ কমিটি বসিয়ে তারও পত্রপাঠ রিভিউ করা হবে। নেত্রী আরও বলেছেন, তিনি নিজে কাশ্মীরে যাবেন, থাকবেন কিছুদিন, স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলবেন আর এর ফলেই কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মূর্খেরা কেন যে এত বছর একটা রাজ্য নিয়ে জট পাকিয়েছিল কে জানে! জানি না, ছররা লাগা চোখ দিয়ে কাশ্মীরের মানুষদের এখনও এই ইস্তেহার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে কি না।

কাস্তে হাতুড়িকে একটু কষ্ট করে দিল্লির তখতে বসতে দিন। ন্যুনতম মাইনে আঠারো হাজার টাকা হল বলে। ইন্টারনেট, মোবাইল ফোনের ব্যবসায় কোনও কোম্পানি একনায়কের মতো ছড়ি ঘোরাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে? তারা কি মুম্বইয়ের উঁচু বাড়িতে থাকে? কোটি কোটি টাকা খরচা করে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেয়? সিপিএমের ম্যানিফেস্টো বলছে, এসব মনোপলি আর চলবে না, চলবে না। অন্যদিকে বিজেপি বলছে, আর এক বার, মোদী সরকার হলে চাষীদের জন্য হবে স্বর্ণযুগ। দাম না পেয়ে রাজপথে পেঁয়াজ, আলু, টমেটো ছড়িয়ে রেখে কৃষকরা আত্মহত্যা করলে কি হবে, মোদী সরকার বুক বাজিয়ে বলে দিয়েছেন, ২০২২ সালের মধ্যে চাষীদের রোজগার তাঁরা দ্বিগুণ করে দেবেন। কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে নাকি ২৫ লক্ষ কোটি টাকা ঢালা হবে। শুধু তাই নয়, ছোট এবং প্রান্তিক চাষীরা ষাটের কোঠায় পা দিলেই পেনশন পাবেন। আর কিছু হোক না হোক, ম্যানিফেস্টোতে বিজেপির দাবি, রামমন্দির হবেই। আজও কাঁচা বাড়িতে যাঁরা থাকছেন, ২০২২ সালের মধ্যে নাকি সবার পাকাবাড়ি হবেই।

নির্বাচনী ইস্তেহারগুলোর পাতা উল্টোতে উল্টোতে বেশ বুঝেছি, বাজারচলতি জোকস-এর বই না কিনে এসব পড়লেই আনন্দ হয় বেশি। দুমলাটের মধ্যে অজস্র স্বপ্নসন্ধান, যার সত্যি হবে না কোনওটাই। আমরা বুঝি সবই। ইভিএম-এর বোতাম টেপা মানে অনেকগুলো আপাত-স্বপ্ন-আসলে-মিথ্যের মধ্যে একটাকে বেছে নেওয়া। ভাবতে অবাক লাগে, কয়েকশ দলের কয়েক হাজার পাতার ম্যানিফেস্টোর মধ্যে কোথাও একটা শব্দও খরচ করা হয় না পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে। খাবারে ভেজাল দেওয়া বন্ধ হবে কি ভাবে, বাতাসে ক্রমাগত বিষ মেশার সুরাহা হবে কোন পথে, প্লাস্টিকের ব্যবহার রোধে কি ভাবে একটা পরিকাঠামো গড়ে তোলা যায়, ধুঁকতে থাকা সরকারি স্কুলগুলোতে বেঁচে থাকার স্টেরয়েড ঢোকানো হবে কোন সিরিঞ্জে—এ সব নিয়ে একটা কথাও নেই। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে দুনিয়ার ১১৯টা দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৩। প্রতিবেশী নেপাল ৭২ নম্বরে, শ্রীলঙ্কা ৬৭। নিজের দেশ আরও একটু বেশি খেতে পাবে কি করে, এই নিয়ে কোনও ইস্তেহারেরই বিশেষ মাথাব্যথা নেই। যে কোনও কর্পোরেট কোম্পানির রিভিউ মিটিংয়ে যান। শুধু ভাল কথা বললেই হয় না। একটা জরুরি জিনিস নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়। এর বাহারি নাম বিল্ডিং ব্লক। মানে ভাল কাজটা তুমি করতে চাইছ তা ভাল কথা। কিন্তু ধাপে ধাপে দেখাও কি ভাবে সেটা বাস্তবায়িত হবে। তা না দেখাতে পারলে বড় বড় কথাগুলো শুধুমাত্র স্তোক বাক্য হিসেবেই থেকে যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইস্তেহার লেখেন যাঁরা, তাঁদের কোরাসে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, কি ভাবে? কেমন করে দেশের কুড়ি শতাংশ গরিবের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বছরে বাহাত্তর হাজার টাকা আসে? কেমন করে চার বছরের মধ্যে কাঁচা বাড়িগুলো বদলে গিয়ে পাকা বাড়ি হয়? কোন জাদুকাঠিতে ন্যুনতম বেতন গিয়ে দাঁড়ায় মাসে আঠারো হাজার টাকা? এর ফলে খরচের যে বহর বাড়বে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা, তা রাজকোষে আসবে কোথা থেকে? শুধুমাত্র ট্যাক্স চাপানো ছাড়া এই বাড়তি অর্থের যোগানের জন্য সরকারের সম্ভাব্য রাস্তা কি কি? এ সব প্রশ্নের কিন্তু কোনও উত্তর নেই।

শাসক দলের শীর্ষ মন্ত্রী অথবা বিরোধী দলের তাবড় কোনও নেতা, গ্রামে গিয়ে মাটিতে বসে ‘আমি তোমাদেরই লোক’ বলে, শালপাতায় ডাল-ভাত খেলে তা খবর হয়। আর রসনা শেষে তৃপ্তির মেকি ঢেকুর তুলে নেতা যখন চপারে চাপেন, চাপার আগে বলে যান, ‘ভোট দিলেই স্টিলের থালা’। এটাই গুল্পের লার্ভা।

আর এমন কয়েক হাজার কিলবিল করা লার্ভা নিয়েই ম্যানিফেস্টো। ইভিএম-এর বোতাম টেপার পরে যা আর খুলে দেখা বারণ।

গুল্পের জয় হউক।

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
অম্লানকুসুমের জন্ম‚কর্ম‚ধর্ম সবই এই শহরে|বাংলা ছোটগল্পের পোকা|একেবারেই উচ্চাকাঙ্খী নয়‚অল্প লইয়া সুখী|

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here