হিংস্রতা ও অসহায়তা

দুপুর গড়িয়ে গেল। বিকেল ছুঁই ছুঁই সময়। সুরঙ্গনা দেবী অসহায়ের মত বসে আছেন। এখনো দুপুরের খাবার দিয়ে যায়নি কেউ। অন্যদিন অফিসে বেরিয়ে যাবার আগে ছেলে ছেলের বউ একথালা ভাত রেখে চলে যায়। ভাতের সাথে তরকারি যেটুকু থাকে তা চিনতে পারেন না। অধিকাংশ সময় ঝোল আর আলু!

প্রথম প্রথম থালা সরিয়ে রেখে শুয়ে পড়তেন অভিমানে। চোখের কোল ভিজে বালিশ ভিজে যেত! সময় তো যেন কিছু নয়। এই তো সেদিন!

চাকরি পেয়েও অঙ্ক বিশারদ সুরঙ্গনা চাকরি করেননি। একমাত্র সন্তানকে নিজের হাতে করে মানুষ করবেন, তাই। স্বামী উদ্দালক বারবার বলেছিলেন, এত মেধা নষ্ট করো না সুর। তুমি একশো ছাত্র তৈরি করতে পারো কিন্তু।

পুত্র আহিরের দিকে চেয়ে বলতেন তিনি, নাহ! আগে ঘরেরটাকে ঠিকঠাক মানুষ করি। ওকে কোয়ালিটি টাইম দিতে চাই। যাতে বড় হয়ে ও কখনো না বলতে পারে, তোমরা আমাকে সময় দাওনি।

উদ্দালক বুঝিয়ে ব্যর্থ হয়ে বলেছেন, পরে রিপেন্ট করো না।

স্মৃতি কাতর সুরঙ্গনা। পরিষ্কার দেখতে পান দুরন্ত দিনগুলো। উদ্দালক মারা গেলেন! ছেলে এম. টেক. করে একটি কলেজে অধ্যাপনা করছে। পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেছে। পুত্রের আব্দারে পুরনো বাড়ি বিক্রি করে সব অর্থ তার হাতে তুলে দিয়েছেন। সম্ভ্রান্ত এলাকায় ফ্ল্যাট কিনেছে পুত্র।     

প্রথম সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়ে যাবার আগে পর্যন্ত স্বামীর পেনশনের টাকার নিজেই চালিয়ে নিতেন। অ্যাটাকের পর পূর্বের মত হাঁটাচলা করতে পারেন না। পেনশনের টাকা পুত্রের হাতে!

সেই এক মন খারাপ করা রোদ্দুরে দুপুর! এমন দুপুরে ছেলেকে নিয়ে ছাদে যেতেন ছেলের মন ভালো করতে। আজ এমন এক দুপুরে ছেলে এসে বলল, “ছাদে যাবে? রোদ্দুরটা সুন্দর। আমি ধরে ধরে নিয়ে যাব। ভয় নেই”।

অভুক্ত পেটেও আনন্দের বন্যা সুরঙ্গনার। বললেন, “আমার ভার তুই বইতে পারবি? থাক বাবা”।

  • ভার তো বইছিই। চলো।

ছাদে এলেন সুরঙ্গনা কতটা বছর পরে! পাঁচিল ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সদ্য আনন্দ অনুভব করছেন যখন তখনই তার এক মুহূর্তের জন্য মনে হল তার শরীরটা হাল্কা হয়ে নেমে যাচ্ছে কোনো এক শূন্যতায়!

নিশ্চিন্ত আহির। অথর্ব মায়ের ভার আর বহন করা সম্ভব হচ্ছিলো না। অবশেষে স্বস্তি। কবে মরতো তার কোনো ঠিক নেই! স্ত্রী দিতিও খুশি।

গ্রেপ্তার হল আহির আর দিতি। সিসিটিভির ছবি দেখে পুলিশ গ্রেপ্তার করল একমাস বাদে।

***************

একমাত্র কন্যা চিত্রানী! স্কুলশিক্ষক পিতামাতা আদর আহ্লাদের সবটুকু দিয়ে বড় করে তুললেন। ছাত্র-রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া কন্যা কলেজের পরীক্ষার ফলাফল তেমন ভালো হলো না। ফরাসী শিখে উত্তম ফলাফল করে ফ্রান্স পাড়ি দিল ফরাসী সরকারের আমন্ত্রণে।

ভালো কবিতার হাত তার। গদ্যের হাতও মন্দ নয়। অনুবাদের কাজ পেয়ে গেল সে। এক ফরাসী বৃদ্ধ কবিকে বিয়ে করে নিল অতি সত্ত্বর। ফরাসী নাগরিকত্ব পাবার জন্য এরচেয়ে উৎকৃষ্ট পদ্ধতি আর কী আছে?

বাবা মারা গেলেন। একদিনের জন্য চিত্রানী এসে বাবার মরদেহের সামনে দাঁড়াল এবং মৃতদেহ সৎকার হয়ে যাবার পরই ফিরে গেল ফ্রান্সের প্যারি নগরীতে!

মা মায়া অনুরোধ করলেন, ‘দু’টো দিন থেকে যা না চিত্রা? বড্ড একা লাগছে রে!

  • সম্ভব না। একা লাগলে ওল্ডেজ হোমে চলে গেলে কিন্তু আর অতটা একা লাগবে না। বাড়িও বেঁচে দাও। এতবড় বাড়িতে সত্যিই তো তুমি কীই বা করবে?

হতবাক মায়াদেবী। কানের মধ্যে দহন, বৃদ্ধাশ্রম!!

চিত্রানী ফিরে গেল। ফিরেও এল এক বছরের মধ্যে। ততদিনে বৃদ্ধ কবির সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। অনুবাদ সাহিত্যে বেশ পরিচিতি হয়েছে।

ফিরে এসে প্রথমেই মায়াদেবীকে তার বাপের বাড়ীর আত্মীয়-স্বজন থেকে দূরে সরিয়ে দিল। মোবাইল ফোনটি হস্তগত করে গৃহবন্দী করে ফেলল মাকে। এরপর বাড়ি বিক্রি হয়ে গেল সহজভাবে। মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আশ্রম কতৃপক্ষকে বলল, আমি বিদেশে। মা প্রাচীনপন্থী। বিদেশের পরিবেশ মানিয়ে নিতে পারবেন না। বাড়িতেও একা নিঃসঙ্গ। এখানে আপনাদের কাছে ভালো থাকবে, তাই রেখে গেলাম। আপনারা প্লিজ দেখবেন। মান্থলি টাকা পাঠিয়ে দেব আমি।

মায়াদেবী ঘটনার আকস্মিকতায় সেই যে কথা বলতে ভুলে গেলেন আর কোনোদিন একটিও শব্দ উচ্চারণ করলেন না! যথারীতি মাসোহারা আসাও বন্ধ হয়ে গেল প্রথম কয়েক মাস পরেই।

***************

বৃদ্ধা মা আর পোষ্য অ্যালশেসিয়ানকে বাড়িতে ভেতরের দিকে ঘরে জানালা দরজা বন্ধ করে মূল বাড়িটি তালা দিয়ে এক মাসের ছুটিতে বেড়াতে বেরিয়ে পড়লেন ব্যাঙ্ক অফিসার দম্পতি তাদের শিশু কন্যাকে নিয়ে। ঘরে মজুত করে দিয়ে গেলেন এক টিন মুড়ি আর বিস্কুট এবং পানীয় জল!

এক মাস বাদে মৃত বৃদ্ধা ও মৃতপ্রায় কুকুরটিকে উদ্ধার করা হল। পরিচারিকাই প্রতিবেশীদের গোপনে খবর দিয়ে দিয়েছিল।

কুকুরটিকে উদ্ধার করে নিয়ে গেল এক পশুপ্রেমী দম্পতি। পুলিশ অবহেলার অভিযোগে অভিযুক্ত করলেও জামিনে মুক্ত দম্পতি। শোনা গেল, শিশুকন্যাটি নাকি অনেক কান্নাকাটি করে বাবা-মাকে তার ঠাকুরমার মৃত্যু ও কুকুরটির অবস্থার জন্য দায়ী করেছিল।

***************

অষ্টম শ্রেণীর ক্লাস। অফ পিরিয়ড! ছাত্ররা গোপনে আনা মোবাইল ফোন বের করে গেম খেলছে। একটি ছেলের মোবাইল নেই! তাকে তার বাড়ি থেকে মোবাইল কিনে দেয়নি। পাশে বসা বন্ধুটির কাছে বারবার তার মোবাইলটি একটু হাতে দেবার জন্য অনুরোধ করছিল সে। বন্ধুটি তাকে ব্যঙ্গ করে বলেছিল, নিজের মোবাইল না থাকলে অন্যের মোবাইলে অত লোভ কীসের জন্য? বাবাকে বল মোবাইল কিনে দিতে।

মুহূর্তে ক্রোধে উন্মত্ত কিশোরের হাতের ঘুষি নেমে এল অন্য কিশোরের কপালে। মোবাইল হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেলে কিশোরটি পা দিয়ে কয়েকবার মাড়িয়ে ভেঙ্গে ফেলল। প্রথমে তারপর রক্তাক্ত আক্রান্ত সহপাঠীকে বলল, ‘দেখ, কেমন লাগে!’

নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তখন কিশোরটির। এবং চেতনা হারিয়েছে তৎক্ষণাৎ। হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময়ে মৃত্যু হয় তার।

নাবালক কিশোরের মধ্যে কোনো অনুতাপ মন খারাপ লক্ষ্য করলেন না মনোবিদ। হোমে স্থানান্তরিত করা হল তাকে। সেখানেও যে স্বাভাবিক আচরণ করছে। পুলিশ থেকে মনোবিদ সকলেই স্তম্ভিত তার আচার আচরণ পর্যবেক্ষণ করে।

***************

বাড়ির পোষা কুকুরটিকে ছাদে নিয়ে গেল ডাক্তারির এক ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। সঙ্গী দুই বন্ধু। প্রথমে কুকুরটিকে আদর করল যুবকটি। কুকুরটি খুব খুশি। তারপরই আচমকা চড়, কিল, ঘুষি, লাথি শুরু হল কুকুরটির ওপর! কুকুরটি আত্মরক্ষার চেষ্টা করলো না। আক্রমণ করলো না। শুধু হতবাক হয়ে মার খেল। এবং ছাদ থেকে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল যুবকটি প্রচণ্ড উল্লাসে। বন্ধুরা সম্পূর্ণ ঘটনাটা ভিডিও করে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে প্রচার করে দিল!

কুকুরটি বেঁচে গিয়েছিল ভাগ্যক্রমে। কারণ ছাদের পাশেই নীচে যে জমিটি ছিল তাতে ছিল অনেক ছোট ছোট লতাগুল্ম! কুকুরটিকে উদ্ধার করার পর ডাক্তার উদ্ধারকারী দল জানিয়েছিল, তার মধ্যে থেকে বিশ্বাস করার সহজাত আবেগ এবং প্রবণতা, তা দুটোই সাময়িক হারিয়েছে সে।

***************

উদাহরণ আর উদাহরণ! মাত্র সামান্য কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হল এখানে। প্রকৃতপক্ষে এই উদাহরণ সংকলন করলে গবেষণাপত্র তৈরি হয়ে যাবে। এইবারে প্রশ্ন, কেন এই অমানবিকতা? কেন এই অমানবিকতার অবনমন বারেবারে দেখছি আমরা। সারা পৃথিবী জুড়ে কেন এই হিংসা?

হিংসা লাঞ্ছনার প্রকারভেদ আছে। ধর্ষণ, খুন, লাঞ্ছনার মত হিংসাও একটি ক্যাটেগরির অন্তর্গত। অপরদিকে পারিবারিক হিংসা!

তবে কি আত্মকেন্দ্রিকতা, আত্মসর্বস্ব হবার সঙ্কীর্ণ একটি বাতাবরণ আমাদের সত্ত্বা ক্রমশ গ্রাস করছে অজগরের মত? ‘লেটস এনজয় দ্য লাইফ’, কি মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছে সমাজে বৃহৎ এক শ্রেণীর মধ্যে? তাই মা-বাবা-পোষ্য সকলেই বোঝা?

অসহিষ্ণুতা থেকে আক্রমণ করল কিশোর তার সহপাঠীকে! কেন এত অসহিষ্ণুতা? অতিরিক্ত আদর প্রশ্রয় অথবা অতিরিক্ত অবহেলা, দুই এর জন্য দায়ী।

কুকুরটিকে মেরে ছুঁড়ে ফেলে দেবার সময়ে পৌরুষ অনুভব করেছিল যুবকটি। ক্ষমতার প্রদর্শন! পৌরুষ মানে যে দুর্বলকে রক্ষা করা সেই শিক্ষা কি পরিবার তাকে দেয়নি?

গুলিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ সব কিছু। নতুন করে ভাবার সময় হয়ে এসেছে আমাদের।    

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.