মনে আছে স্কুল বা কলেজ লাইফের সদ্য সদ্য প্রেম, প্রিয় মানুষটির সাথে মনে হত সর্বক্ষণ কাটাই। একে অপরকে দুচোখে হারাতেন তখন। আর পাশ থেকে বন্ধুরা টিটকিরি মারতো, কখনও অভিযোগ করতো, কী রে, এখন তো আর আমাদের জন্য সময় নেই তোর। আপনি হয়তো হেসে উড়িয়ে দিতেন সেই সব অভিযোগ, কিন্তু মনের মানুষের সাথে মন কষাকষি হলে সেই বন্ধুরাই আপনার আশ্রয় হতো, তাদেরকে দুখের কথা বলে আপনি হাল্কা হতেন। আর ভাবতেন, ভাগ্যিস এরা ছিল! 

Banglalive

কি, চেনা ঠেকছে তো? আসলে মানুষ সামাজিক জীব। বন্ধু বান্ধব, সংসার এই সব নিয়েই থাকতে চায়। সামাজিকতা পালন করার মধ্যে দিয়ে পূরণ বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখা, নতুন বন্ধুত্ব করা, আত্মীয় স্বজনের সাথে সময় কাটানো, একসাথে আনন্দ হইচই করা, এই নিয়েই জীবন। ইন্টারনেট আসার সুবাদে এই সামাজিকতাই এখন আমাদের আঙ্গুলের ডগায়। এসেছে নানা ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া সাইট। ফেসবুক, টুইটার,হোয়াটসআপ যার মধ্যে অন্যতম। আমাদের সময়ে ছিল একমাত্র অর্কুট। যদিও তার সীমাবদ্ধতার জন্যই সেটি বন্ধ হয়ে যায় এবং রাজত্ব শুরু হয় ফেসবুকের।

ফেসবুকে আমরা ঠিক কী করি? কর্মব্যস্ত জীবনে সারা সপ্তাহ অফিস আর বাড়ি, সংসার এইসবের মধ্যে সবার সাথে দেখা করে ওঠা হয় না। কিন্তু তাদের জীবনে কি ঘটছে, তা জানতে ইচ্ছে হয়। তাদের ছেলে মেয়েরা কত বড় হল, তাদের জীবন কেমন কাটছে, সেই সবের খোঁজ এর মধ্যে দিয়েই পুরনো সম্পর্ক ঝালাই করা। আবার, অনেক সমমনষ্ক মানুষ, যাদের চিনিনা, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসে, তাদের লেখা, ছবি, গান,বা পাণ্ডিত্য দেখে আমরা নতুন ভাবে ভাবার রসদ পাই, তাদের সৃষ্টি দেখে আনন্দ পাই,প্রেরণা পাই। তাদের সাথে বন্ধুত্ব করার সহজ উপায় ফেসবুক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া। কখনো কখনো সেই শৈশবের হারানো বন্ধু বা বান্ধবী, যাদের সাথে নিত্যদিনের খেলা বা খুনসুটি না হলে গোটা দিনটাই ফাঁকা ফাঁকা লাগতো, তাদেরকে হঠাত ফেসবুক-এ পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠা, সেরকম মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। 

এই অবধি ঠিকই আছে।  কার না ভাল লাগে পুরনো সম্পর্ক ঝালাই করতে, নতুন বন্ধুত্ব করতে, বা বিশ্বের দরবারে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে? নতুন নতুন অজানা জায়গার খোঁজ, প্রিয়জনদের আনন্দের ছবি, প্রেমিকটি বা প্রেমিকাটির সেজেগুজে তার প্রিয় মানুষটির জন্য ছবি দেওয়া, একটা সুস্থ সমাজের এবং সুস্থ জীবনের জন্য খুবই দরকারি। রোজকার অফিস রান্না সংসার সন্তান এই আবর্তের মধ্যে থেকে একটা একঘেয়েমির মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া এক ঝলক টাটকা বাতাসের মতন। কিন্তু মানুষ যত পায়, তত চায়। যা শুরু হয়েছিল শুধু মাত্র টাইম পাস বা সময় কাটানোর জন্য, তা কোন এক সময়ে যেন দিনের পুরো সময়টাই খেয়ে নিতে শুরু করলো। একটা উদাহরণ দিই।

দামি ঝাঁ চকচকে রেস্তরাঁ। স্বামী স্ত্রী বা প্রেমিক প্রেমিকা একটি টেবিলে মুখোমুখি বসে। স্বাভাবিক ভাবেই নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা মেনুতে খাবার পছন্দ করা, এটাই হওয়া উচিত। কিন্তু এখন দেখা যায়, দুজনের হাতে দুটি মোবাইল এবং তারা সেই মোবাইলের মধ্যে ডুবে আছেন, সোশ্যাল মিডিয়াতে কোন বন্ধু বিদেশে ছুটি কাটানোর ছবি দিয়েছে, কে দামি মদ কিনে পার্টি করছে, কার ছেলে কোন ক্লাস-এ ফার্স্ট হয়েছে, কোন ছেলে বা মেয়ে তার ডি পি বা লেখা স্ট্যাটাসে লাইক বা লাভ দিয়েছে, কোন এডমায়ারার তাকে নতুন করে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে, সেইসব দেখতে ব্যস্ত থাকেন। ওপর দিকে যে আরেকজন মানুষ আছেন, এবং আদপে যে সময়টা তার সাথে কাটাতে এসেছেন, সে দিকে কিন্তু কারোর ভ্রুক্ষেপ নেই। টেকনোলজি মানুষের সুবিধা করতেই তৈরী করা, সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের সাথে যোগাযোগ করার একটি রাস্তা, কিন্তু কীভাবে যেন সেই দূরের মানুষদের কাছে টানতে গিয়ে আমরা আমাদের কাছের বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলিকে আস্তে আস্তে দূরে সরিয়ে দিই। খানিকটা তাদেরকে টেকেন ফর গ্রান্টেড করে নিই। কিছু সম্পর্ক, যেমন বাবা মায়ের সাথে ছেলে মেয়ের সম্পর্ক, এসবে অতটা টাল খায় না। কিন্তু টাল খায় সেই সব সম্পর্ক যেগুলো মানুষে নিজের থেকে তৈরী করে, যেমন বন্ধুত্বের সম্পর্ক বা প্রেমের সম্পর্ক। 

আজও, মেয়েরা চাকরি করতে গেলে সমাজে সে তার স্বামী বা সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিচ্ছে না বলে কথা শুনতে হয়। যদিও আর্থিক স্বাধীনতা সবার জন্যই প্রয়োজনীয়। এবারে ভাবুন, সেই মহিলা যদি সারাদিন বাড়িতেই বসে থাকেন এবং সকাল থেকে রাত সোশ্যাল মিডিয়াতে কে কী খাচ্ছে, কে কী পরে ঘুমতে যাচ্ছে, কে কোথায় বেড়াতে যাচ্ছে, এই সব দেখে খুশি দুঃখিত এবং ঈর্ষান্বিত হয় তাহলে কি তিনিও নিজের পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন? এবারে ধরুন বাড়ির পুরুষটির কথা। তিনিও চাকরি বাকরি করে অনেক রাত করে ফিরে কোনোদিকে না তাকিয়েই তাঁর মোবাইলের ভেতরে ঢুকে গেলেন, কোন নতুন মেয়ে তাকে রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে, বা চ্যাট এ তার সাথে বেশ মাখো মাখো কথা হচ্ছে, বা কোন বিখ্যাত লোক কী বলেছেন এবং সেই নিয়ে সবাই চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে অতএব তাকেও তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় রাখতে হলে কিছু একটা ভেবে চিনতে লিখতেই হবে, এই সবে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। খেতে খেতেও মুখে মোবাইলটি ধরে থাকেন, কোন ক্রমে খাওয়া শেষ হলেই আবার বিছানাতে চলতে থাকে, যতক্ষণ না ঘুম পাচ্ছে। এর মধ্যে তাঁর এতটুকু সময় নেই যে যাকে স্বেচ্ছায় জীবনসঙ্গিনী করে এনেছিলেন তার জীবনে কী ঘটলো, কেমন কাটল, বা ছেলে মেয়ের কী খবর, সেসব জানার। এরা টেকেন ফর গ্রান্টেড। খবর নিলেও তারা থাকবে, না নিলেও থাকবে। নিজের বিয়ে করা স্বামী বা স্ত্রী কে ইপ্রেস করার মতন নতুন কিছুই নেই। কিন্তু ফেসবুকের ওপারে কম বয়সী মেয়েটি বা মুগ্ধ ছেলেটিকে ইমপ্রেস করে নিজের বাজার দর যাচাই করার মধ্যে একটা উন্মাদনা আছে, নিজের ইগো বুস্ট আছে।মানুষের এট্যেনশান সিকিং সিন্ড্রোম সবসময়েই আছে, তবে সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে সেটি একটি ব্যাধির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মানুষ এখন শুধু মাত্র অন্যের ছবি তোলাতে সন্তুষ্ট নয়, দামী মোবাইলের ততোধিক উন্নত ক্যামেরাতে নিজের নিজস্বী বা সেলফি তুলে দেখাচ্ছেন, কখনো বা নতুন জামা,কখনো মেক আপ, কখনো বা শুধুই নিজের বোরডাম বা একাকীত্ব কাটাতে। নতুন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে সেলফি তোলাটা একটি মানসিক ব্যাধি হিসেবে দেখা হচ্ছে।কিন্তু তাতে কোন ভাবেই এর সংখ্যা কমছে না, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এত সবের মাঝে আপনার নিজের অজান্তেই আপনার কাছে মানুষরা আপনার থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে, আর আপনি মেতে আছেন বিশ্বের খবরে। মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কবিতাটি :

বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

আমরা নিজের কাছের মানুষজনদের বাদ দিয়ে সেই শিশিরবিন্দু উপেক্ষা করে বহু ব্যয় করে দূরের পর্বতমালা বা সিন্ধুতে মজে আছি।শেষ মেষ এই কাল্পনিক জগতের বাসিন্দা হয়ে সান্নিধ্য পাওয়ার চেয়ে আমরা হয়ে পড়ছি আরো একা, একলা।কিন্তু এই ভার্চুয়াল জীবনের আকর্ষণ চুম্বকের মতন টানে, আসল জীবনের সব দায়িত্বও, কর্তব্য, প্রেম ভালবাসা ভুলিয়ে দেয়।মাঝে মাঝে ভাবি,কবির বলে যাওয়া এই কথাগুলি কি অমোঘ সত্য, এবং আজো সমান ভাবে প্রযোজ্য!পালটে গেছে অনেক কিছুই, কিন্তু কোথাও যেন কিছু জিনিস আজো ঠিক এক রকমের রয়ে গেছে। একটুও পাল্টায়নি।  

আরও পড়ুন:  রান্না করতে গিয়ে বাসন পুড়ে গিয়েছে? ভাবছেন দাগ তুলবেন কীভাবে? জেনে নিন

NO COMMENTS