নীল তিমি, কিছু ‘অ’প্রাসঙ্গিক কথা

নীল তিমি, কিছু ‘অ’প্রাসঙ্গিক কথা

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

হাল ফ্যাশনের টিভি আর ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের বিজ্ঞাপনে একটা কথা প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল। কিংবা চাইল্ড লক্। মধ্য চল্লিশ অথবা পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই যে বাবা মায়েরা জিনিসগুলি কিনছেন, তারা কিন্তু এই লকের ব্যাপারটা শিখছেন তাঁদের পঞ্চদশ অথবা সপ্তদশী জাতক জাতিকার কাছ থেকে। কি আশ্চর্যের ব্যাপার দেখুন। যাঁদের থেকে কোনও চ্যানেল কিংবা ওয়েবসাইট আটকানোর জন্য এই লক-কন্ট্রোলের কারিগরি, তারাই এর খুঁটিনাটি শিখিয়ে দিচ্ছে তাদের বাবা মা-কে। আর গর্বিত পিতা মাতা তাঁদের ছেলেমেয়ের টেকনিক্যাল স্কিল দেখে, যাকে বলে, একেবারে আহ্লাদে আটখানা হচ্ছেন।

একটি ডাটা কার্ডের বিজ্ঞাপনে দেখায় কোনও এক শিশু পৃথিবীর আলো দেখার পরেই সবার প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের আবির্ভাবের কথা পোস্ট করে। নিজে নিজেই। নতুন বিশ্বের দ্বারে ব্যক্ত করে অধিকার জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে। সেই চিৎকারটাও যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাইভ’ করা যায়, তাহলে জমে ভাল। বিজ্ঞাপনগুলো অন্তত আমাদের এমনটাই শেখায়। আজকের দিনে বেঁচে থাকাটা তো নিজের জন্য নয়, ফ্রেন্ডসদের জন্য।

প্রযুক্তির উপরে কখন কতটা ভর করা দরকার, সেটা বেমালুম ভুলে গিয়ে যখন প্রযুক্তির কিছু আগাছাকেই আমরা আমাদের মননে শিকড় গজাতে দিই, গন্ডগোলটা তখনই পাকাই। শুধু মননে বলছি কেন, ব্লু হোয়েলের দৌলতে তার আঁচড় তো লাগছে আমাদের গায়েও। হাতে, কবজিতে। গেমটির জনক আপাতত শ্রীঘরে। কিন্তু রক্তবীজের মতো দুনিয়াজোড়া সে ছড়িয়ে গিয়েছে কিছু অ্যাডমিন, যারা ‘দায়িত্ব’ নিয়ে কাজ করে চলেছে। যারা অবসাদে ভুগছে, তাদের চিকিৎসা নয়, জঞ্জালের মতো তাদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়াটাই এই গেমের উদ্দেশ্য। তিমির ফাঁদ পাতা ভুবনে, কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে। মোবাইলের পাঁচ ইঞ্চি সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিনের মধ্যে থেকে বুঁদ হয়ে, গায়ে আর মনে ক্ষত নিয়ে বহু কিশোর কিশোরী এই গেম খেলে চলেছে। পঞ্চাশতম রাউন্ডে গিয়ে নিজেদের শেষ করে দিচ্ছে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কেউ জানতে পারছে না যে তারা নীল তিমির শিকার।

আজকের দিনে আমাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত মানসিকতা চোখে পড়ে। কোনও শিশুর বয়স দুবছর না পেরোতে পেরোতেই তার প্রিয় সঙ্গী হয়ে ওঠে বাবা কিংবা মায়ের মোবাইল। এবং কি আশ্চর্য! এই নিয়ে বাবা মায়ের অভিযোগ কিংবা শাসন দূরে থাক, উল্টে তাঁরা আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন। ‘আমার দু বছরের সোনাই জানিস্, কাল নিজে নিজেই প্লেস্টোর থেকে গেম ডাউনলোড করেছে’, এর উত্তরে শোনা যায়, ‘আরে এ আর এমন কি? আমার মনাই পেটিএম-এ টাকা ভরে দিচ্ছে আমার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে।’ এভাবে কথা এগোতে থাকে আর সোনাই মনাইয়ের বাবা মায়েরা নিজেদের চারপাশে দ্যুতি কাটতে থাকেন। গর্বের দ্যুতি। নিজেরা যা পারেননি, পরবর্তী প্রজন্ম তা পারছে তো! শুধু পারছে কোথায়, চোখে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো পারছে। আর এই পারাটাকেই তাঁরা ইনটেলিজেন্সের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। পাঁচ বছরের যে ছেলে মোবাইলে লাভমিটার ডাউনলোড করে নিজের লাভ কোশেন্ট কত বুঝতে পারে, সে আর বছর দশ পরে প্রশান্তচন্দ্র মহালানবীশ না হয়ে যায় না! তাঁরা এই রসেই মজে থাকেন। অপত্যস্নেহে মোবাইলের ডেটা প্যাক বাড়িয়ে নেন। সদ্য বাবা হওয়া আমার এক পরিচিত মানুষ মেয়ের প্রথম জন্মদিনে একটা গোটা ট্যাবই উপহার দিয়ে ফেলেছেন, আনলিমিটেড ডেটা প্যাক সহ। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ও তো ট্যাবটা ঠিকঠাক ধরতেই পারবে না এখন। আর এই বয়সে এর বুঝবেই বা কি?’ উনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ভাঙলে ভাঙবে। কত জিনিসই তো নষ্ট হয়। ছোট বেলা থেকেই টেক স্যাভি হওয়াটা দরকার। আর রাত্রে ইউটিউবে রাইম শুনে ঘুমিয়ে পড়তে পারবে।’

মোবাইলের ছোট্ট পর্দাটার মধ্যে অমৃত-গরল হাত ধরাধরি করে থাকে। যারা ছোট, তারা এর তফাৎটা বুঝে উঠতে পারে না। কোনও রকম লাগাম যদি না টানা যায়, তা হলে ‘জ্যাক অ্যান্ড জিল, ওয়েন্ট আপ দ্য হিল’টা বদলে ‘বেডরুম হার্ড রোম্যান্স’ হতে বেশি সময় লাগবে না। লাগছেও না। গাড়ির রেসিং খেলা দিয়ে যে শুরুটা হয়, তা যে কি ভাবে নিজের প্রাণ নিয়ে জুয়া খেলায় পৌঁছে যায় তা তো আমরা দেখতে পাচ্ছি ইদানীং। বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হলে তো কথাই নেই। যে কোনও দিন, শহর-মফস্বলের যে কোনও স্কুলের গেটে ছুটির সময়টা হাজির হোন। শুন্ডীর রাজা যেভাবে ‘ছুটি ছুটি’ বলতে বলতে বেরিয়ে এসেছিলেন, ঠিক তেমনভাবে মোবাইলগুলো ছাত্রছাত্রীদের পকেট কিংবা ব্যাগ থেকে বেরিয়ে আসে। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরে। হাজার হাজার ব্যাকুল আঙুল স্ক্রিনের পর্দায় বিলি কাটে। ‘ওএমজি! তিনশোটা আনরেড হোয়াটসঅ্যাপ’ অথবা ‘লিঙ্কটা দেখেছিস, ড্যাম সেক্সি রে’—এমন শুনতে পাবেন হরদম।  মোবাইলগুলো লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন, বেশিরভাগ সেটের দামই দশ হাজারের উপরে। তাতে থাকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর। বায়োমেট্রিক মেশিনের মতো আঙুলের ছাপ পরখ করিয়ে মোবাইলের দরজা খুলতে হয়। তার মধ্যে যে আদতে কি রাজসূয় যজ্ঞ চলে, সেটা বাইরের লোক জানতে পারে না। জানা সম্ভব নয়। বাবা মা জানতেও চান না। যখন চান, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।

শুনতে হয়ত খারাপ লাগবে, মনে হবে কোনও এক ব্যাকডেটেড-এর প্রলাপ, তা সত্ত্বেও বলছি, স্কুলজীবনে ইয়াব্বড় স্মার্টফোন ব্যবহার করার যুক্তি আমি আজও খুঁজে পাইনা। বাজারে হাজার দেড়েক টাকার মধ্যে বেশ ভালো বেসিক ফোন পাওয়া যায়। কথা বলা আর এসএমএস পড়াটাই যদি ফোন ব্যবহারের আসল উদ্দেশ্য হয় (স্কুলজীবনে অন্তত এমনটাই হওয়া উচিত বলে জানি), তা হলে চওড়া স্ক্রিনের ভারি মোবাইল ওরা বয়ে বেড়াবে কেন? বহু স্কুল আছে, যারা বই-খাতা-জামা-জুতোর পাশাপাশি বইয়ের মলাটটিও স্কুলের নিজস্ব দোকান থেকে কিনতে ফরমান জারি করে। অথচ, স্মার্টফোনের বদলে বেসিক ফোন ব্যবহার করতে বলে না। ওটা যে আবার স্ট্যাটাসের সঙ্গে যায় না।

জামার হাতা তুলে তুলে নীল তিমির আঁচড় খোঁজার চেষ্টা করাটা কোনও সমাধান নয়। আমাদের থেকে এই খেলার অ্যাডমিনরা অনেক বেশি বুদ্ধি ধরেন। আজ যেটা কবজিতে ‘আই অ্যাম হোয়েল’, কাল সেটা পেট-বুক-উরু হতেই পারে। তা হলে তো ‘আমি মারণখেলার শিকার নই’ প্রমাণ করার জন্য উলঙ্গ হয়ে যেতে হয়। যে বয়সটাতে দুনিয়াজুড়ে মানুষেরা সব চেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন, সেই কৈশোরকালে ওদের সঙ্গী হওয়াটা বেশি দরকার। আজকালকার নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির যুগে ঘুমপাড়ানি মাসি পিসিরা আর নেই। কিন্তু যারা আছেন, রক্ত মাংসের যারা আছেন, তাদের সঙ্গটা জরুরি। অবসাদমাখা দিনগুলোতে আরও বেশি করে। এই সঙ্গের বিকল্প কিন্তু ডেটা প্যাক-ট্যাবলেট-ওয়াই ফাই নয়।

প্যারেন্টাল অথবা চাইল্ড লককে বুড়ো আঙুল দেখাতে জানে এই প্রজন্ম। সুতরাং, নিজেদের স্বার্থেই প্রতিদিনের যাপনে কিছুটা বদল আনতে পারলে ভাল হয়।

 

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

3 Responses

  1. দারুণ লেখা। পরিবর্তন আসুক সেই সব গ্যাজেটময় জীবনের।

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।