দেবাশীষ দেব
স্বনামধন্য এই অঙ্কনশিল্পী নিজেই এক সম্পূর্ন প্রতিষ্ঠান | তাঁর হাত ধরে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে বাংলার কার্টুন শিল্প | সিগনেচার বেড়াল আর স্ব-নেচারটি কোমল, আত্মবিশ্বাসী, রসিক | বেড়ানো তাঁর নেশা | তাই ঝুলিতে রয়েছে বহু গল্প, সঙ্গে অসাধারণ সব স্কেচ | সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নিরলস সাধনার অমর ফসল ‘রঙ তুলির সত্যজিৎ’ |
লামপোখরি

পাহাড়ের ওপর একটা বড় লেক থাকলে জায়গাটা আরও আকর্ষনীয় হয়ে ওঠে | এই কারণে ‘আরিটার’ যাবার ইচ্ছেটা ছিল | পূর্ব সিকিমের ছোট্ট এই গ্রামে টুরিস্ট ভিড় করতে শুরু করেছে সবেমাত্র কয়েক বছর হলো, বলতে গেলে কৃত্রিমভাবে বানানো ওই লেকটার টানেই | ইদানিং আবার সিল্ক রুট যাবার হিড়িক বেড়েছে ফলে সারা বছরই এদিকটা সরগরম থাকে | জয়দীপ স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এক্সকারশন করতে এই সব পাহাড়ে প্রায়ই আসে, ওই আশিষ গুরুং-এর নম্বর দিয়ে বলেছিল আরিটারে গিয়ে ওর হোটেলেই থাকতে, দারুণ পর্ক খাওয়ায় | অতএব আশিষকে ফোন লাগলাম, নভেম্বর মাসে যাচ্ছি | ঘর নিয়ে কোনও সমস্যা নেই চাইলে শিলিগুড়ি থেকে একদম আরিটার অবধি গাড়ির ব্যবস্থাও হয়ে যাবে | আশিষকে জানালাম আমরা শুধু কর্তা-গিন্নি, খামোখা চার ডবল খরচা করব কেন? তার চেয়ে এন জে পি স্টেশন থেকে গ্যাংটকের শেয়ার জিপে করে রংপো অব্দি চলে যাচ্ছি, তুমি ওখান থেকে আমাদের তুলে নাও | রংপো থেকে আরিটার মাত্র এক ঘন্টার রাস্তা এবং পুরোটাই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে খাড়াই উঠেছে |

Banglalive
লামপোখরির সাদা কালো স্কেচ

গোলগাল, মিষ্টি ছেলে আশিষ, ওর হোটেল রেসিডেন্সি-র তিনতলার ঘরটাও বেশ পছন্দসই, সামনেটা পুরো খোলা, জানলা দিয়ে দূরের পাহাড়টার গায়ে পেডং শহরটা আবছা দেখা যায়, ওটা আমাদের পশ্চিমবাংলা | আরিটারের মূল বাজার অঞ্চলটা আরো ওপরে যেখান থেকে দুটো রাস্তার একটা গেছে স্থানীয় একটা গুম্ফার দিকে অন্যটা শেষ হয়েছে লেক অবধি গিয়ে, যার নাম লামপোখরি | তিন দিকে পাহাড় আর ঘন সবুজে ঘেরা জায়গাটা অতি মনোরম |

আরিটার গুম্ফা

লেকটাকে ঘিরে হাঁটার রাস্তা, মাঝে একটা ছোট্ট গুম্ফা আর একধারে পাহাড়ের ঢালুর ওপর সাজানো বেশ কিছু কটেজ, এটা ‘আরিটার লেক রিসর্ট’| শুধু লেকটা উপভোগ করতে চাইলে এখানে থাকাই ভালো |বাইরে থেকে এসেও দিব্যি সারাদিন কাটানো যায়, অনেকেই দল বেঁধে গাড়ি নিয়ে এখান ওখান থেকে চলে আসে |

আরও পড়ুন:  সেলেরিগাঁও...এবার গিন্নি সমেত

এটা সিজন নয়, তাই ভিড় কম | এক মহিলা মিনারেল ওয়াটার, চিপস, মুড়ি আর খেলনার ডালা সাজিয়ে বসেছেন | খদ্দের নেই, এই মওকায় ওঁর একটা স্কেচ করে নিলাম, স্থানীয় অনেকেই ঘিরে দাঁড়িয়ে দেখছিল |

ডালা সাজিয়ে বসে আছে পবিত্রা রাই

তারা জানাল সামনের ওই পাহাড়টার মাথায় উঠলে ওপর থেকে লেকটা নাকি দারুণ দ্যাখায় | পরের দিন যাওয়া যাবে ঠিক করে নিয়ে এবার হাঁটা দিলাম অন্য রাস্তা ধরে গুম্ফার উদ্দেশ্যে | আরিটার গুম্ফা নামে পরিচিত এই মঠ সংলগ্ন জায়গাটি একেবারে হালে গজিয়েছে | দেখলাম গুম্ফা আপাতত বন্ধ, চারদিকে একটা ঢিলেঢালা ভাব, কেবল একধারে একটা তিব্বতি স্কুলে জোরকদমে ক্লাস চলছে আর থেকে থেকে হুঙ্কার ছাড়ছেন এক মাস্টার | আমাদের ঘোরাঘুরি করতে দেখে এমনিতেই “ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি” ছাত্ররা উসখুস শুরু করেছিল এবার আমি খাতা আর রং-টং বের করে ছবি আঁকতে বসায় পড়াশুনো একেবারে লাটে উঠল, এমনকি সেই দুঁদে মাস্টার অবধি আমার প্রায় ঘাড়ের ওপর চড়ে দেখতে লাগল আমি কী করছি |

বয়স্ক ফুর্বা লামা

বয়স্ক একজন লামাকে বসিয়ে আঁকলাম, আমার গিন্নি আবার সেই স্কেচটা ওঁর হাতে ধরিয়ে চটপট ক্যামেরাবন্দি করে ফেলল | পুরো ব্যাপারটায় বাকিদের সঙ্গে এই লামাসাহেবও দেখলাম বেশ মজা পেলেন, ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত স্বর্গীয় একটা হাসি ফুটে রইল সারাক্ষণ |

আরিটারে এসে সব থেকে বিড়ম্বনা হয়েছিল আশিষ-এর হোটেলে তিনবেলা এলাহি খাওয়ার ব্যবস্থা | ওর কুক ‘ওয়াংচুক’ ফাটিয়ে রান্না করে, ঘুরে বেড়াব কি যত খাচ্ছি মনে হচ্ছে একটু শুয়ে বসে নিই | রাতে নুডলস-এর সঙ্গে গলা অবধি চিলি পর্ক খেয়ে পরদিন সকালে পাহাড়ে উঠতে প্রচুর দেরি হয়ে গেল, ভোর থাকতে গেলে বলেছিল সানরাইজ দেখা যাবে, সেটা আর হলো না |

লেকের একটা কোণা দিয়ে পাহাড়ে চড়ার রাস্তা, যেতে যেতে চারপাশটা দারুণ দেখতে লাগে | পাহাড়টার নাম ‘মাঞ্চকিম’, ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক ঘরবাড়ি রয়েছে সেই সঙ্গে নানারকমের ফুলের বাগান | প্রায় চল্লিশ মিনিট লাগল টং-এ পৌঁছতে |

আরও পড়ুন:  সেলেরিগাঁও...এবার গিন্নি সমেত
পাহাড়ের মাথায় বসে আঁকা লামপোখরি

সামনেই শিবমন্দির, চত্বরটা বেশ পরিষ্কার, পিছনেই গ্রিলে ঘেরা একটা জায়গা যেখান থেকে নিচে লেকটাকে এতটুকু দেখায় | অতএব কর্তা-গিন্নির একজন বসে গেলেন ছবি আঁকতে অন্যজন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ক্যামেরা নিয়ে | লেক থেকে ফেরার পথে একটা সুন্দর বসার ছাউনি দেখে গিন্নি কিছুক্ষণ ওখানে কাটাতে চাইল, জায়গাটা অসম্ভব নিরিবিলি, চারধারে খালি উঁচু উঁচু গাছ আর পাখির আওয়াজ | ওকে ওখানে বসিয়ে আমি পাহাড়ের অন্য দিকে হাঁটা লাগলাম, আজই তো আরিটারে আমাদের শেষ দিন |

NO COMMENTS