শ্রীকৃষ্ণের অভিশাপে মৃত্যুহীন‚ অমর হয়ে আছেন এই পৌরাণিক চরিত্র‚ বিচরণ করেন নাকি নর্মদাতীরে

3480

মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ তখন সমাপ্ত | কিন্তু শাপ ও অভিশাপ বর্ষণ সমাপ্ত হয়নি | মহাকাব্যের প্রায় অন্তিম লগ্নে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অভিশাপ বর্ষণ করেছিলেন অশ্বত্থামার উপরে | কী ছিল জানেন তাঁর শাপে ? অমরত্ব | আসলে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন নশ্বর জীবনে অমরত্ব আশীর্বাদ নয়‚ অভিশাপ |

মহাভারতের ঘটনাক্রমের কাল ধরে নেওয়া হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার বছর | যুদ্ধের পরিসমাপ্তির পরে পাণ্ডবরা হস্তিনাপুর শাসন করেছিলেন আরও ৩৬ বছর ৮ মাস | কলিযুগের সূচনা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দে |

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে ভীমের হাতে হত হলেন দুর্যোধন | তখন কুরু ও পাণ্ডব‚ দুই বংশেই জীবিত কতিপয় প্রাণ | কৌরবরা ভাঙবেন কিন্তু মচকাবেন না | শেষ মরণকামড় দিতে চাইলেন তাঁরা | যুদ্ধের নিয়মবিরুদ্ধ ভাবে ঠিক করলেন রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত পাণ্ডবদের বধ করা হবে | মূল ষড়যন্ত্রী ছিলেন অশ্বত্থামা | অস্ত্রাচার্য দ্রোণের পুত্র |

কোনও এক গভীর রাতে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে কুরুক্ষেত্রের শিবির ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন পঞ্চ পাণ্ডব | শিবিরে তখন নিদ্রামগ্ন তাঁদের পাঁচ পুত্র | তাঁদের পঞ্চপাণ্ডব রূপে ভ্রম বোধ করলেন অশ্বত্থামা | তিনি অগ্নি সংযোগ করলেন শিবিরে | ভস্মীভূত হয়ে মৃত্যু হল তাঁদের | 

অশ্বত্থামা প্রথমে ভাবলেন পাণ্ডব ভ্রাতাদের মৃত্যু হয়েছে | পরে ভ্রম উপলব্ধি করে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন | বদ্ধ পরিকর হলেন পাণ্ডব বংশ নির্মূল করবেন | ব্রহ্মাস্ত্র ক্ষেপণ করলেন নিহত অভিমন্যুর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা উত্তরার গর্ভ লক্ষ্য করে | মারা গেল গর্ভস্থ শিশু | অনতিবিলম্বে তাঁকে বাঁচিয়ে তোলেন শ্রীকৃষ্ণ | সেই শিশুই পরীক্ষিৎ | যাঁর হাতে রাজ্যপাট দিয়ে মহাপ্রস্থানের পথে এগিয়ে গিয়েছিলেন পাণ্ডবরা | 

অশ্বত্থামার এই হীন ও নীচ আচরণে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে ভয়ঙ্কর অভিশাপ দিয়েছিলেন | বলেছিলেন‚ সমগ্র মানবজাতির ভার বহন করতে হবে দ্রোণপুত্রকে | তাঁর কোনও মুক্তি নেই | মৃত্যু হবে না | তথাপি ভূতের মতো বিচরণ করবেন তিনি | সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও একাকী | মানবসভ্যতার কোনও প্রেম বা স্নেহ স্পর্শ করবে না তাঁকে | জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি পড়ে থাকবেন উন্মাদপ্রায় | দগদগে ঘা ও ক্ষতে ভরা দেহ নিয়ে দুর্বিষহতম জীবন যাপন করবেন তিনি |

জন্মাবধি অশ্বত্থামার কপালে ছিল একটি বহুমূল্য মণি | সেটি নিয়ে নেন শ্রীকৃষ্ণ | তাঁর কথায় মণি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন অশ্বত্থামা | কৃষ্ণ অশ্বত্থামাকে বলেন‚ মণি খুবলে নেওয়ায় ওই যে ক্ষত তৈরি হল‚ তা রয়ে যাবে | অনর্গল পুঁজ ও রক্ত বেরোতে থাকবে সেখান থেকে | তার পুতিগন্ধে ভরে থাকবে কলিযুগ | অশ্বত্থামার দেহ বয়ে বেড়াবে কুষ্ঠ | প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুকামনা করবেন তিনি | কিন্তু মৃত্যু আসবে না | যন্ত্রণাময় জীবন বয়ে চলতে হবে কলিযুগের শেষদিন অবধি | তখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে বিষ্ণুর শেষ অবতার কল্কিদেবের সঙ্গে |

প্রচলিত বিশ্বাস‚ অশ্বত্থামা এখনও আছেন এই ধরায় | নর্মদা নদীতীরে তিনি ঘুরে বেড়ান অশরীরীসম | প্রতি ভোরে একটি করে গোলাপ ফুল তিনি উৎসর্গ করেন মহাকাল মন্দিরে মহাদেবের পায়ে | কারণ একমাত্র তাঁর দয়া হলেই শ্রীকৃষ্ণের অভিশাপ পাশ থেকে মুক্ত হবেন দ্রোণাচার্য পুত্র অশ্বত্থামা | 

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.