এপ্রিল এবং অটিজম

দুই এপ্রিল তারিখটিকে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস এবং গোটা এপ্রিল মাসটিকেই অটিজম সচেতনতার প্রসারে ধার্য করা হয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জ কর্তৃক, সব সহযোগী রাষ্ট্রের সম্মতিতে। নীল রঙের পোশাক পরে বিষয়টিকে সমর্থন ও মান্যতা দেওয়া হয়। বিশ্ব জুড়ে বিশিষ্ট এবং ঐতিহ্যশালী ভবনগুলিকে সাজানো হয় নীল রঙের আলোয়। প্রভাতফেরি এবং সম্মেলন ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয় দুই এপ্রিল সকাল থেকে, যাতে সকলে জানতে পারে অটিজম ব্যাপারটাকে, আরও বেশি করে।

কিন্তু ‘অটিজম’ কী?!

সোজা কথায় অটিজম এক বিশেষ অসঙ্গতিপূর্ণ স্নায়বিক বিকাশ। সাধারণত শুরু হয় বাচ্চার তিন বছর বয়সের আশপাশে। এতে সামাজিক যোগাযোগ, তা কথা বলে হোক বা না বলে, ঠিকভাবে বিকশিত হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগ বলতে কেবল মানুষে মানুষে নয়, মানুষে এবং অন্য প্রাণী বা উদ্ভিদ, বা অন্যান্য পার্থিব বিষয়ের প্রতি উভয়ত যোগাযোগের যে প্রচলিত পদ্ধতি এবং কাঠামো, তা মেনে চলা সম্ভব হয় না একজন অটিস্টিক ফিচারড মানুষের পক্ষে। ফলে সেই বাচ্চা বা মানুষের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে সামাজিকভাবে মান্য এবং স্বীকৃত ব্যবহারসমূহও। অটিজমকে অসুখ বলে দেগে দেওয়া যায় না।

সমস্যা হল, শব্দটি এখনও তেমন বহুল পরিচিত নয়। অটিজম অবশ্য সেসব চেনা-অচেনার ধার ধারে না। সে নিজের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখন অনুপাতটা ১:৬৮। অর্থাৎ প্রতি আটষট্টিজন সদ্যোজাত শিশুদের একজন অটিস্টিক ফিচারড। এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাই অটিজম শব্দটি সব্বাইকে চেনানো খুব দরকার। এবং তা একটুও দেরি না করে। অটিজম ব্যাপারটির সঙ্গে না চেনা থাকলে এই সমাজ অটিস্টিক ফিচারড ব্যক্তিকে অন্য কিছুর মতো করে দেগে দেবে– পাগল, ন্যালাখ্যাপা, ছিটগ্রস্ত, অ্যাবনর্মাল এইরকম কোনো চেনা ডাকে।

চেনার রকমফের হয়। গোটা তিনেক উদাহরণে একটু সহজ করে দেখি, সে সময় আর আজকের সময়।

যেমন ধরুন তিরিশ বছর আগের সময়ে জল খাওয়া নিয়ে আমাদের কোনো ভাবনাচিন্তা ছিল না। রোজকার যাত্রাপথে জলের বোতল সঙ্গে নিয়ে ঘুরত না কেউ। ফিল্টার করে জল খাওয়া, মিনারেল ওয়াটারের বোতল ইত্যাদি কিছুই ছিল না। তৃষ্ণা নিবারণে ছিল রাস্তার ধারের টিউবওয়েলের জল, মিষ্টির দোকানের বড়োসড়ো জগের জল, ইশকুল বা অফিস-কাছারির ট্যাঙ্কের জল নলবাহিত হয়ে কলের মুখে, এমনকি পুকুরের জলও। এখন অবশ্য এ নিয়ে কাউকে শেখাতে হয় না। সঙ্গের ব্যাগে থাকে জল। না থাকলে দোকানে দোকানে সিল করা মিনারেল ওয়াটারের বোতল। জল খাওয়ার বাকি উপায়গুলো বাতিল হয়ে গেছে প্রায়। অর্থাৎ পানীয় জল নিয়ে সচেতনতা জাগ্রত।

আরেক জাগ্রত বিষয় হল জনবহুল স্থানে প্রকাশ্যে ধূমপান। এবারেও পিছিয়ে যাই চলুন তিরিশ বছর আগে। ট্রেনে বাসে ট্রামে, স্টেশনে বাসস্টপে, সিনেমা বা থিয়েটার হলে, সবরকম অফিসে, ইশকুলের স্টাফরুমে, রেশনের লাইনে, বাজারে— কারও হেলদোল নেই। এমনকি ডাক্তারেরা হাসপাতালে বা ব্যক্তিগত চেম্বারে, রোগী দেখতে দেখতেও, সুখটানে বিরাম ছিল না। ধূমপায়ীদের সংখ্যা ও তার শতাংশ হ্রাস-বৃদ্ধির হিসেব বলতে পারা না গেলেও, উপরোক্ত ছবিগুলির বড়ো অংশই যে এদানি দেখা যায় না তত, সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

এমনই আরেক ব্যাপার হল দুধ-চিনি-চা। গেরস্ত ঘরের রোজের রুটিনে বলুন অথবা অতিথি আপ্যায়নে, এর কোনো দ্বিতীয় বিকল্প ছিলই না। এখন দুধ এবং চায়ের মিলন অনেক পরিবারেই অপছন্দের। গুঁড়ো চা বই চায়ের অন্য রকমফের দুর্লভ ছিল তখন, মধ্যবিত্তের নাগালে। এখন পাতা চা সেই জায়গায় রমরমিয়ে। দুধবিহীন লাল চা-র জয়যাত্রা দিকে দিকে।

উদাহরণগুলিকে আরেকবার পড়ে দেখুন। যদি আপনি ত্রিশোর্দ্ধ হন, কল্পনায় ঘুরে আসুন পঁচিশ তিরিশ বছর আগে। তখন ভাবাই যায়নি যেখানে সেখানে মানুষ পানীয় জল খাবে না, যেখানে সেখানে বিড়ি সিগারেট ধরাবে না, দুধ-চা এড়াতে চেষ্টা করবে। এগুলি সম্ভব হয়েছে মানুষের প্রাথমিক সচেতনতায়।

অটিজম শব্দ এবং বিষয়টিও আগে পরিচিত হয়ে উঠুক। পরিচিত হলেই বাকি সচেতনতার পথ প্রশস্ত হতে বিশেষ সময় লাগবে না। আর পরিচিত করানোর প্রথম ধাপ অটিস্টিক ফিচারড বাচ্চাদের মা-বাবার মনোভাবে। বিষয়টাকে অযথা লুকিয়ে রেখে সন্তানের আগামী জীবনকে আরও জটিল করে তুলবেন, না সেই জটিলতা যতটা সম্ভব কম করার চেষ্টা করবেন, আগে তা স্থির করুন।

অটিজম-এর মতো আরও কয়েকটি শব্দঃ

যেমন ডিসলেক্সিয়া। যেমন ওসিডি। যেমন ট্যুরেট সিনড্রোম। যেমন হাইপার।

সেই কবে শ্রীরামকৃষ্ণ বলে গেছিলেন, নাটক ইত্যাদিতে লোকশিক্ষা হয়। হয় তো। ডিসলেক্সিয়া বিষয়টি সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া গেছে ‘তারে জমিন পর’ সিনেমায়। আমির খান ব্যক্তিজীবনের কথা লাইভ টক শো-তে বলতে গিয়ে বলেন ‘আমি কিং অফ ওসিডি’। ‘দঙ্গল’ সিনেমায় তাঁর সঙ্গে অভিনয় করতে আসা সদ্যতরুণী সানিয়া মালহোত্রা, সেই একই শো-তে নির্দ্বিধায় জানান তাঁর ওসিডি আছে। এরক্যুল পোয়ারোকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে বানানো সাম্প্রতিক সিনেমার আলোচনায় জনপ্রিয় দৈনিকে পোয়ারো-কে উল্লেখ করা হল ‘সেই অবসেসিভ কম্পালসিভ ব্যক্তি’ অভিধায়। ট্যুরেট সিনড্রোম নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারি ‘হিচকি’ সিনেমায়। আর বাচ্চার অতি দুরন্তপনার, অবাধ্যতা বা ছটফটে চঞ্চলতার বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনায় মা-বাবারা এখন কোনো সিনেমার উল্লেখ ব্যতিরেকেই ‘হাইপার’ শব্দটি যথাযথভাবেই প্রয়োগ করছেন। এমনকি বন্ধুদের আড্ডায় কেউ অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে রেগেমেগে গেলে তাকে শান্ত করতে বলা হয়, ‘এত্ত হাইপার হবার কী হল রে!’

দুঃখের বিষয়, ভারতীয় সিনেমায় এখনো তেমন বিশদে ও বিশ্বাসজনকভাবে অটিস্টিকদের নিয়ে কাজ হয়নি।

রাষ্ট্রপুঞ্জের অবস্থানঃ

ভারত এবং রাষ্ট্রপুঞ্জ সম্মিলিত সিদ্ধান্তে সতেরোটি বিষয় নিয়ে চিরস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যে রূপরেখা তৈরি করেছে। তার মধ্যে একটি— একজনও না পিছিয়ে থাকে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুটের্‌রেশ বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসের প্রাক্কালে একটি বিশেষ বার্তায় জানাচ্ছেন-

On World Autism Awareness Day, we speak out against discrimination, celebrate the diversity of our global community and strengthen our commitment to the full inclusion and participation of people with autism. Supporting them to achieve their full potential is a vital part of our efforts to uphold the core promise of the 2030 Agenda for Sustainable Development: to leave no one behind.

This year’s observance underscores the importance of affordable assistive technologies to support people with autism to live independent lives and, indeed, to exercise their basic human rights. Around the world, there are still major barriers to accessing such technologies, including high costs, unavailability and a lack of awareness of their potential.

Last year, I launched a Strategy on New Technologies to ensure that new and emerging technologies are aligned with the values enshrined in the UN Charter, international law and human rights conventions, including the Convention on the Rights of Persons with Disabilities. On World Autism Awareness Day, let us reaffirm our commitment to these values – which include equality, equity and inclusion – and to promoting the full participation of all people with autism, by ensuring that they have the necessary tools to exercise their rights and fundamental freedoms.

ভারতের নির্বাচন কমিশন দেশব্যাপী লোকসভা নির্বাচনের আবহে অটিস্টিক এবং এমন আরও অন্য অন্য বিভাগের বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কিছু কর্মসূচি নিয়েছে। সেসব খবর আমাদের কানে আসছে, চোখে পড়ছেও। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে সংশোধিত RPWD আইন প্রণীত হয়েছে, রাইটস অফ পার্সনস উইদ ডিজ-এবিলিটিজ। বলা যায়, চাকা গড়াতে শুরু হয়েছে। তার গতি অব্যাহত রাখার দায় একা সরকারের বা প্রশাসনের ওপর ছেড়ে দিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো কোনো কাজের কথা নয়। হাতে হাত ধরে কাঁধে কাঁধ মেলানোর সময় এখন।

আমাদের রাজ্য এবং অটিজমঃ

ভারতীয় অন্য কয়েকটি রাজ্য অটিজম নিয়ে যতটা এগিয়ছে, আমাদের রাজ্য ততটা নয় এখনো। ডিজএবিলিটি কার্ডে এখনো কেমন অক্ষমতা তার ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে MR অর্থাৎ মেন্টালি রিটার্ডেড-এর মতো বেঠিক শব্দবন্ধ। ব্যবহৃত হচ্ছে না ‘অটিজম’ শব্দটি। অন্যান্য পরিকাঠামোগত সুবিধাগুলিও সেভাবে আলোকবৃত্তের মধ্যে আসছে না। অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা থেরাপি তথা প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলি থাকছে না সরকারি নজরদারির আওতায়, ফলে অনেক অবাঞ্ছিত ঘটনার খবর প্রায়ই শোনা যাচ্ছে।

অটিস্টিক বাচ্চারা যখন বড়ো হচ্ছে, তাদের জন্য দরকার ইনক্লুসিভ সাপোর্ট লিভিং অথবা কমিউনিটি লিভিং-এর। সরকার তেমন অবাণিজ্যিক ছোটো ছোটো উদ্যোগগুলিকে সহায়তা প্রদান করুক। উন্নত গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় এসবই সম্ভব হয় সরকারি-বেসরকারি যৌথ-পদক্ষেপে।

সরকারের সক্রিয় মদতে অটিজম নিয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে যাক কালিম্পং থেকে কাকদ্বীপে, পুরুলিয়া থেকে মালদায়, প্রতিটি জেলায় জেলায়।

Advertisements

5 COMMENTS

  1. খুব প্রয়োজনীয় লেখা। অটিজম বিল পাস হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কেন তা এখনো পশ্চিম বঙ্গে এফেকটিভ হল না এটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার ও পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।

  2. এই শিশুরা খুব বুদ্ধিমান হয়। ভালো আচরণ করলে অনায়াসে বশ্যতা স্বীকার করে। আর গান ওদের খুব প্রিয়। আমার বোনের মেয়ে এই বিষয়ে চেন্নাইয়ে পড়াশোনা করছে। আমার ভালোবাসা সব সময়েই তাদের সঙ্গে ছিল আছে থাকবে।

  3. খুব ভাল, সময়োচিত ও তথ্য সমৃদ্ধ আলোচনা, বেশকিছু প্রশ্নের উত্তর পেলাম। সরকারকে এই বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দোয়া উচিত।
    ধন্যবাদ।

  4. অটিজম সচেতনতায় যেখানে বার বার বলা হচ্ছে অটিজম কোনো রোগ নয়, এটি একটি জন্মগত খামতি, সেখানে সম্প্রতি (এপ্রিল ৫) সংবাদ প্রতিদিনে একটি বাংলা সিনেমার রিভিউ লিখতে গিয়ে শ্রীরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘অটিজম জন্মরোগ’, ‘গভীর মানসিক রোগ’, ‘অসুখ’ ইত্যাদি। জন্মরোগ আর জন্মগত খামতি দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। যেমন, কেউ যদি জন্মান্ধ হয়, সেটা তার খামতি, রোগ নয়। অটিজমও রোগ নয়, তাই চিকিৎসা করে অটিজম সারানো যায় না। তবে প্রপার থেরাপি ট্রেনিং-এর মাধ্যমে এই খামতিগুলো অনেকাংশেই জয় করা যায়। জন্মরোগ আর খামতির তফাতটা বুঝতে না পারলে, মনগড়া ধারণার বশবর্তী হয়ে যা খুশি লিখলে জনমানসে চরম ভুল বার্তা যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.