আয়েষা বেগমরা

2148

নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে এসে তুমি খুব বিপন্ন মুখে বাসের নাম্বার পড়ছিলে। কে ভেবেছিল একটু আগেও তোমাকে শপিং-এ যাবার প্রস্তাব দিচ্ছে যে, সেই মেয়ে হঠাৎ ব্ল্যাক আউট করে পড়ে যাবে তোমারই কোলে। একটার পর একটা বাস বেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তোমার বাসের দেখা নেই। ইমনের গম্ভীর মুখটা মনে করে তোমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।

আকাশে ঘনঘোর মেঘ করে এসেছিল বলে তুমি আচমকা চেয়ার ঠেলে সংলগ্ন ছাদে এসে দাঁড়িয়েছিলে। এখান থেকে কী চমৎকার লাগে  নীচের কলকাতার ব্যস্ত চলমান রাস্তা দেখতে। দূরে আকাশের গায়ে সেকেন্ড হুগলি ব্রীজের অপূর্ব বিস্তার। ভিক্টোরিয়ার পরীর মাথার কাছে ঘন কালো মেঘ ঝুলে আছে। যেন টোকা দিলেই বৃষ্টি হয়ে ঝরে যাবে।

হঠাৎ পিছন থেকে হই হই করে এসে দাঁড়ায় মালবিকা। মালবিকা এরকম, সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখে। হয় কাউকে ধমকাচ্ছে, নয় হেসে গড়িয়ে পড়ছে। তাদের মার্চেন্ট ফার্মের একঘেয়ে কাজের মাঝে মালবিকা একমাত্র অক্সিজেন। বাকিটা খুব গতানুগতিক আর যান্ত্রিক! ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বললো, কী সোনা, রোমান্টিক মুডে কী ভাবছো! বস ধাতানি দিয়েছে, নাকি বর ? আমাদের তো এই দুই যাঁতা ……..  নে নে এক টান মার। মাথা হাল্কা হয়ে যাবে।

তুমি হাসো শুধু।

 – চল না শাওন আজ একবার নিউমার্কেট যাবি আমার সঙ্গে !

 – আজ হবে না রে। পাপাই আজকাল খুব বায়না করে, মনি সামলাতে পারবে না।

 – চল চল। এখন থেকে পুজোর বাজারটা করে রাখি। তুই কিছু কিনবি না।

 – তুই না! এই তো কদিন আগে ঈদ গেলো।

 – এমা সরি সরি, একদম মনে থাকে না। তোর তো আবার ঈদ। তবে বেশিক্ষণ লাগবে না কিন্তু। নাকি তোর বরকে বলা নেই বলে যাবি না।

অমনি তুমি কুঁকড়ে গেলে। তুমি চোখ ঘষলে অপ্রস্তুত ভাব লুকোতে।

 – কাল ভাল করে ঘুম হয় নি রে, টায়ার্ড লাগছে। কথাটা মিথ্যে নয়।

কাল রাতে অনেকক্ষণ ঘুম ভেঙে নিঃসাড়ে পড়ে ছিলে তুমি।

ইদানীং এটা প্রায় হচ্ছে। দেওয়ালে ঘড়ির টিক টিক শব্দে প্রহর গোনা শুধু। অন্ধকারেই রেডিয়াম জানান দেয়, রাত কত হলো। কী একটা দুঃস্বপ্ন দেখে পাশ ফিরতে গিয়ে তুমি জেগে উঠলে। বুকের মধ্যে অমনি ধড়ফড় করে উঠলো। মনে হল, কী যেন নেই, কী যেন ছিল – হারিয়ে গেছে।

তুমি স্বপ্ন দেখছিলে লাল টুকটুকে ফ্রক মাথায় দুই বেনুনি নিয়ে একটা মেয়ে ছুটছে নদীর পাশে বাঁধ ধরে।সেই নদীটা তোমার খুব চেনা, কোথায় যেন দেখেছ তুমি। ওহো, এটা তো তোমাদের মামার বাড়ির গ্রামের পাশে বয়ে যাওয়া বাবলা নদী! কিন্তু ওখানে তো বাঁধ নেই। বিপজ্জনক ভাবে মেয়েটি দৌড়চ্ছে। মেয়েটা খিল খিল করে হাসছে আর ছুটে পালাচ্ছে। বাঁধের পাশে তুমুল জলোচ্ছ্বাস, ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করছে তোমার, মেয়েটার সেদিকে ভ্রুক্ষেপই নেই। ভয়ে কাঁটা হয়ে যাচ্ছ তুমি। নদীর পাড় ভাঙার শব্দ হচ্ছে। বাচ্চা মেয়েটা সেসব তোয়াক্কা না করে ছুটছে, সে খুব মজা পাচ্ছে। পিছনে কেউ তাকে ‘শানু’ ‘শানু’ বলে ডাকছে।  আর তুমি শিউড়ে শিউড়ে উঠছো। অমনি তোমার ঘুমটা ভেঙে গেল।

কী যেন হারিয়ে গেল। কী যেন নেই হয়ে গেছে তোমার জীবন থেকে। কী ফাঁকা ফাঁকা বুকের ভেতর। বুকটা খালি খালি লাগে।

ইমন কি সুন্দর ঘুমাচ্ছে। ইমনের বুকে হাত রাখতে গিয়ে তুমি গুটিয়ে নিয়েছিলে হাত। আগে তুমি ইমনের বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে শুতে। ইমনেরও অভ্যাস হয়ে গেছিল।

ইমন প্রথম প্রথম বলতো, এই শানু মাথা সরাও কাতুকুতু লাগছে।

আচ্ছা সরে শোবে না, দাঁড়াও, বলে সে তোমাকে এক ঝটকায় বুকের উপর তুলে নিয়ে বসিয়ে দেয় আর তোমাকে তুমুল আদরে আদরে পাগল করে তোলে।

তারপর কখন তোমরা পরস্পরকে জড়িয়েই ঘুমিয়ে যাও আর তোমার মাথা থাকে ইমনের বুকের মধ্যে।

এখন সেখানে তোমার একদিকে পাপাই। আর অন্য দিকে ইমন। একহাত জায়গা পড়ে তোমাদের মাঝে। ইমনের বুকে মাথা গুঁজে শোবার অভ্যেসটা কবে হারিয়ে গেছে খেয়াল নেই তোমার।

কাল রাতে ইমন তোমাকে ফিরিয়ে দিল। অপমানিত লাগছে। স্বামীরাই কাছে টানবে তার প্রিয় নারীকে এটাই স্বতঃসিদ্ধ। নারীর সে অধিকার নেই। আসলে ‘কাগজ’-এর মতো একটা সাম্প্রয়ায়িক কাগজে ইমন কাজ করবে তোমার পছন্দ নয় শোওয়ার আগে সেটাই জানিয়েছিলে শুধু, ইমনকে। ইমন ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে ঝামেলা করে ‘দিনকাল এখন’ ছাড়ল যখন, তখনও তুমি কিছু বলোনি। তাও হয়ে গেল  পাঁচ বছর, তোমার এই অফিসে জয়েনের পরপরই। ইমন বলে, প্রাইভেট সেক্টরে মুসলমানদের চাকরি পাওয়া খুব টাফ হয়ে গেছে শানু। কত চাকরি এই হয়ে যাবে যাবে করে হচ্ছে না।’ ইমন এখনও স্বীকার করে না সেই চাকরিটা ছেড়ে দেওয়াটা তার হঠকারিতা ছিল। গত সপ্তাহে দিল্লি থেকে ফিরে বললো ‘কাগজ’-এ জয়েন করবে। তুমি খুব অবাক হয়েছিলে ইমনের এই সিদ্ধান্তে। কারণ বছর খানেক আগেও ইমন এই দৈনিক সংবাদপত্রের কাজকর্ম নিয়ে খুব সমালোচক ছিল।

আনমনা ছিলে, কিন্তু রিফ্লেক্সে ধরে ফেলেছিলে তখনই মালবিকাকে। কিন্তু মালবিকার ওই ভারী চেহারার ভার সামলাতে না পেরে ওকে নিয়েই সজোরে মাটিতে আছাড় খেলে। ব্যস, তারপর সময় টময় আর মাথায় নেই। ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স, নার্সিংহোমে মালবিকার জ্ঞান না ফেরা অব্দি অপেক্ষা।

আর এখন তুমি ভাবছো আজকে তোমার বাড়ি ননদ শাবানা আর হাফিজ ভাইদের দাওয়াত। ঠিক দাওয়াত নয়। শাবানাই ফোন করে আসতে চেয়েছে। রাতের খাওয়ার কিছু ব্যবস্থা নেই। সংসার খরচ তলানিতে। তবু বিরিয়ানি কিনে নিয়ে গিয়ে সামলাতে হবে।

তুমি ভাবলে সামনেই পুজো। এতদিন পর আবার মা বাবার সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগছে। এবার পুজোয় ওদের জন্য কিছু কিনলে কি ইমন কিছু মনে করবে! সেই যবে থেকে, তুমি শাওন চক্রবর্তী মুসলমান যুবকের হাত  ধরে ঘর ছেড়েছো, ততদিন যোগাযোগ নেই তোমার। অবশ্য শ্বশুর বাড়িতে তোমাকে  সকলে খুব সাদরে বুকে টেনে নিয়েছে।

দাদারা  তখন হন্যে হয়ে তোমায় খুঁজছে। রেজিস্ট্রি করে তুমি সোদপুরের বাড়ি ছেড়েছো। ইমন তখনও হোস্টেলে। কলকাতায়  একটা কাজ খুঁজছে পাগলের মত। তোমার থাকার জায়গা নেই। তোমাদের কলেজের বন্ধু কাজল জোর করে ধরে নিয়ে গেল তোমাকে। সঙ্গে ইমনকেও। একরকম লুকিয়ে রেখেছে তাদের হাবড়ার বাড়িতে মাস খানেকের উপর। একদিন ইমনের ছোটচাচু খুঁজে খুঁজে এসে হাজির।

– চল বাড়ি চল। বড় ভাই তোমাদের আসতে বলেছে।

ইমন কী ভীষণ ব্যাকুল ছিল আখিরায়, হুগলী জেলার প্রত্যন্ত  গ্রাম আখিরার বাড়িতে ফেরার জন্য। সে ছোট থেকে পরিবারকে জড়িয়ে-মড়িয়ে বড় হয়েছে। তোমার কান্না এসেছিল ইমনের খুশি দেখে। ইমন তোমার ধ্রুবতারা, তোমার ঈশ্বরই হয়তো বা। ইমন তোমায় জানায় তারা রাজি তোমাদের মেনে নিতে কিন্তু শর্ত একটাই। কলমা পড়ে নাম বদলে ধর্মান্তরিত হতে হবে। আশ্চর্য তুমি ইমনের উজ্জ্বল মুখ দেখে এক বাক্যে রাজি হলে। তোমার কাছে ইমনের খুশিটাই এক এবং একমাত্র। সে তোমার কাছে বেঁচে থাকার ইচ্ছে, তোমার জীবনমরণ। তোমার জন্মই হয়েছে শুধু ইমন এ পৃথিবীতে আছে বলে। তুমি খুশি। তুমি আনন্দে নেচে উঠলে, তুমি  সেই কবে থেকে  শুনে আসছো আলম, বুলবুল, জেসমিন, শিরিন, শাবানাদের কথা। আখিরার বাড়িটা তোমার খুব চেনা। সারাক্ষণ ইমনের কাছে আখিরার গল্প শুনে শুনে সেখানকার মাটি, বাতাস, আকাশ, আলো সবকিছু কী ভীষণ চেনা হয়ে গেছে তোমার।

তুমি বললে, কবে যাব আমরা !

তোমায় ইমন একটা লাল তাঁতের শাড়ি কিনে দিয়েছিল। সেই শাড়িটা পরে চোখে কাজল দিলে, কপালে লাল টিপ পরে তুমি সাজলে।

-টিপটা পোরোনা। আমি কপালে চুমু খাব কোথায় ?’ ইমন তোমায় পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল।

– চুমু খাওয়ার আর জায়গা নেই বুঝি।’ তুমি কপট চোখ রাঙালে।

– থাক না, পরে পোরো, এখানে ফিরে এসে।

– কেন, তোমার কী লজ্জা লাগছে! এমন কালো বউ, তায় লাল শাড়ি, কপালে লাল টিপ।  বাবা বলতো টিকেয় আগুন দিয়েছে যেন!

আর বাবা ‘বলতো’ বলছো দেখে নিজেই অবাক হয়ে যাও তুমি। বাবা-মা, তারা কি সত্যি যা বলতো সব অতীত হয়ে গেল। ভেবে তোমার বুক হু হু করে উঠলো।

  • টিপ পরা বেশরিয়তি। এখানে এসে পোরো। ওদের সামনে পোরো না। সকলে খুশি হবে।

তুমি লক্ষ্যই করো না বামপন্থী উদারমনস্ক যুবকের মুখ নিঃসৃত শব্দগুলো তোমার অজানা লাগছে।

– তাইই! তুমি কপাল থেকে টিপ খুলে আয়নায় লাগালে।

ইমনের মুখে এক আকাশ আলো। আহা কী সুখী তুমি। এত আনন্দময় জীবন তোমার! তুমি পরক্ষনেই বাবা-মা সকলকে ভুলে যাও। তুমি ভাবো ওখানে কার জন্য কী কী জিনিস কিনে নেওয়া যায়। ইমন তোমায় নিবৃত্ত করে। বলে, এসব পরে হবে।

আখিরার বাড়িতে ঢোকার আগে ইমন তোমায় ইশারা করে, কাপড়ের প্রান্ত দিয়ে তোমার শরীর মুড়ে যেন মাথা আচ্ছাদিত করো। তুমি তাইই করলে। আর তুমি জানতেও পারলে না সারা জীবন এই আঁচল তোমার গায়ে জড়িয়ে নেবার ভারে বন্দী হয়ে গেলে।

তোমার জন্য দু’হাত বাড়িয়ে যিনি অপেক্ষায় ছিলেন, তিনি ইমনের মা। কী পরম মমতায় তিনি তোমাকে বুকে টেনে নিলেন। তুমি প্রণাম করলে আর তিনি হাত বাড়িয়ে চিবুক ধরে চুমু খেলে তার মুখের পান জর্দা সুবাস তোমার নাকে এসে ঝাপটা দিল। এই গন্ধে তুমি এক আশ্রয় পেলে যা তোমাকে জীবনভোর সাহারা দেবে তুমি তখন জানতে পারোনি।

এক পক্ককেশ বৃদ্ধকে দেখিয়ে বলা হল এঁকে কদমবুসি করতে। তুমি আগোছালো ভাবে প্রণাম করলে, তোমাকে এতদিন ধরে পই পই করে শেখানো ইমনের কদমবুসি করার বিদ্যায় জল নাকি পানি ঢেলে দিয়ে।

 – আগামীকাল বাদ জুম্মা তোমার সঙ্গে ইমুর শাদি পড়ানো হবে। বললেন তিনি রাশভারি গলায়।

 – তোমার নাম হবে আয়েষা বেগম। এখন থেকে তোমার এটাই পরিচয়। ঘোষণা করার ঢঙে বলেন তিনি। আর তুমি হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক ভাবে ভাবলে কে যেন ধর্মান্তরিত হয়ে আয়েষা বেগম হয়েছিল। শর্মিলা ঠাকুর কি! না কি সঙ্গীতা বিজলানি! না কি যারাই ধর্মান্তরিত হয়, তারাই আয়েষা বেগম হয়!

প্রথম রাতে তোমায় শুতে হল শাশুড়ির পাশে। তার গায়ে সেই পানজর্দার গন্ধ তোমার মস্তিষ্কের দখল নিল। তোমার এই অচেনা বাড়ির অচেনা মানুষটাকে মনে হল বড়ই কাছের, আপন। তোমার কী মায়ের কথা মনে হয়েছিল! তোমায় ইমনের ছোটবেলার কত গল্প শোনালেন আম্মা। বললেন, সংসারে অনেক ঝড় ঝাপটা আসবে শানু, তুমি কিন্তু নিজের সম্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে থাকবে, কাউকে ভয় পেও না। কেন সেদিন একথা তিনি বলেছিলেন তুমি জানতে না।

পরের দিন তোমার সঙ্গে আবার বিয়ে হোল ইমনের।

একজন মৌলবী তোমায় কলমা পড়ালেন। ‘আলহামদো লিল্লাহে রাব্বিল আল আমিন ……..’

জিজ্ঞেস করলেন আপনি আয়েষা হক সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন করে আখিরা নিবাসী সৈয়দ সিরাজুল হকের পুত্র সৈয়দ ইমানুল হককে দশ হাজার দেনমোহরে বিয়ে কবুল করছেন। তোমায় বলতে হল কবুল।

ভারী একটা একটা সিল্কের শাড়ি আর প্রচুর গয়নায় মুড়িয়ে নীচের ঘরে বসিয়ে রাখা হল। আর সারা গাঁ ভেঙে লোক এলো এরকম আশ্চর্য একটা বউকে দেখতে। মুখ চোখ ভালো তবে রঙটা কালো, তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল। তার নাক, চুল, মুখের গড়ন নিয়ে প্রচুর গবেষণা করে শেষটায় রায় দিল , না ইমনভাই একটা সবাব (পূণ্য)এর কাজ করেছেন, বউ যাইই হোক।

ইমন আর অন্যান্যরা অবশ্য তোমাকে আয়েষা নামেই পরিচয় করাচ্ছিল।

আজকাল তোমার শাশুড়ি ফোন করে অনেক বিষয়ে পরামর্শ চান। গর্ব করে বলেন, এ যুগের শিক্ষিত মেয়ে, এদের মাথা অনেক পরিষ্কার। আর এ মেয়ের তো কোনও তুলনা নেই। আমার এমন বউ, রূপ একটু কম, তাতে কী, ও গুন দিয়েই ঢেকে দেবে। কী শরম লেহাজ, জানে কত সবুর, কী শরাফৎ! মুরুব্বিদের কত মানে! দু’দিনে নামাজ শিখে ফেলল! কী সুন্দর ছোলার ডালের হালুয়া বানায়, আমিও পারবো না অমন । বিরিয়ানি খেলে মুখে লেগে থাকে। আহা বেঁচে থাকো মা। বলে চিবুক ধরে চুমু খান। তুমি প্রায়ই ওখানকার অন্য বউদের সঙ্গে তুলিত হও। তুমি মাথায় ঘোমটা দিয়ে শ্বশুর বাড়িতে ঢোকো আর সে ঘোমটা খোলো ফেরার সময় ট্রেনে উঠে। তুমি খুব তাড়াতাড়ি জলকে পানি, মাংসকে গোস্ত, মাকে আম্মাজান বলতে শিখে গেছ। আর এসব দেখে ইমন কিছু বলে না। শুধু মিটিমিটি হাসে।

বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখলে ইমন কড়া চোখে একবার তোমাকে দেখেই হাফিজ ভাইএর কোনও কথার উত্তরে হাসতে লাগলো জোরে জোরে। পাপাই দৌড়ে এল। সে তার টুবলু দাদার সঙ্গে ক্যারাম খেলছিল।

 – মা আমি রেড ফেলেছি।

ফ্রেশ না হয়েই তুমি বসার ঘরে এলে। অমনি হাফিজ ভাই আর শাবানা হইচই করে উঠলো।

 – তোমায় বললে হবে না ইমনভাই! যাকে বললে হবে তিনি এসে গেছেন।

শাবানা এসে জড়িয়ে ধরলো, চলো না ভাবী এই রোববার আমার শ্বশুর বাড়ি পলাশডাঙা চলো না।

তুমি আড়চোখে ইমনকে দেখলে। গায়ের আঁচলটা টেনে বসেছো কোনের বেতের চেয়ারে।

 – আসলে এই রোববার মাকে নিয়ে একবার ডাক্তারের কাছে যাবো, অ্যাপয়ন্টমেন্ট করা আছে।

তুমি খুব কুন্ঠার সঙ্গে  উচ্চারণ করলে।

 – না না, সে ঠিক আছে। তাহলে পরের রোববার।

অমনি পাপাই স্ট্রাইকারে আঙুল রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে বললো, জানো ফুম্মা (পিসিমা), মা না মামুর বাড়ি গেলে পুজো করে, শাঁখ বাজায়। কী সুন্দর আওয়াজ বেরোয়। আমিও একদিন হাতে নিয়েছিলাম। মা বকেছিল, তাই রেখে দিয়েছি।

ঘরে বাজ পড়লেও কেউ এত চমকাতো না।

 – কী সব আজেবাজে বকছো পাপাই! কবে আবার আমাকে পুজো করতে দেখলে! ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বলে উঠলে তুমি।

 – পাপাই বেশ প্রত্যয়ের সুরে বলে, বা রে সেদিন দিদান বললো তো তোমায়!

কিছুটা ঠিকই বলছে পাপাই। মা বলেছিল সন্ধে দেখাতে। ছেলে যে সেসব লক্ষ্য করে রেখে এভাবে সবার মাঝে বলে ফেলবে কে জানতো? কী আতান্তরেই না ফেললো তোমায়। বুকের মধ্যে আনচান করে ওঠে। লজ্জায় অপরাধবোধে মাটিতে মিশে যেতে থাকো তুমি।

পাপাই ঘরের নীরবতায় উৎসাহ পেয়ে আরও বলে, জানো বাবা, মা না পশ্চিমদিকে পা করে শোয়। আমি দেখেছি। মা যখন অফিস থেকে ফিরে টিভি দ্যাখে, তারপর ঠোঁট কামড়ে বলে, মায়ের কিছু হবে না বলো বাবা, মা তো হিন্দু। বুকের মধ্যে নদীর পাড় ভাঙার আওয়াজ পেলে তুমি। তোমারই রক্ত মাংস দিয়ে গড়া সন্তান, মাত্র ছ’ বছরের পাপাইএর মনে কে এভাবে ঢোকালো হিন্দু-মুসলমান, জল-পানি, নামাজ- পুজোর বিভেদ রেখা! ঘরে পিন পড়ার শব্দও শোনা যাবে এখন। ইমন হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো, চুপ করবে? খুব পাকা পাকা কথা শিখেছো না!

রাতের খাওয়া সেরে ওরা অনেকক্ষণ চলে গেছে। তুমি ধীর পায়ে তোমাদের ফ্ল্যাট বাড়ির ছাদে উঠে এসেছো। দীর্ঘ আট বছরের বিবাহিত জীবন পেরিয়ে কোন পরিচয় নিয়ে তুমি দাঁড়িয়েছ একলা! তুমি কি শুধুই একজনের মা? একজনের ধর্মান্তরিত স্ত্রী ! কে তুমি ? তোমার নিজের পরিচয়টুকু কবেই মুছে গেছে। এতদিন কেন টের পাওনি ! নাকি পেয়েছিলে নিজের কাছেই স্বীকার করতে চাওনি তা ! পাপাই আজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আজ।

আকাশে মস্ত চাঁদ। আজ কি পূর্ণিমা? জ্যোৎস্নার মায়াবী স্পর্শে এতক্ষণের বিষণ্ণতা যেন কেটে যাচ্ছে। খুব ফুরফুরে লাগছে হঠাৎ। চাঁদের দিকে তাকিয়ে তুমি শাপমুক্ত নারীর মতো দাঁড়িয়ে রইলে স্থির অচঞ্চল।   

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.