বদ্রীনাথ ধাম ও দ্বিতীয় পাণ্ডবের কিসসা

1573
বদ্রীনাথ মন্দিরের চটজলদি স্কেচ

চোপতার পাট চুকিয়ে এবার বদ্রীনাথ যাত্রার পালা। আমরা সকাল ৯ টার মধ্যেই বেড়িয়ে পড়লাম, লম্বা রাস্তা থেমে থেমে যেতে হবে ফলে গোটা দিন লেগে যাবে। চামোলি হয়ে পিপলকোঠি পৌঁছতেই দুপুর গড়িয়ে গেল অতএব লাঞ্চ পর্বটা ওখানেই সেরে নিলাম। এরপর থেকে রাস্তা শুধুই চড়াই আর বিশেষ সুবিধের নয়। ব্যাপারটা মালুম হল যোশিমঠের পর থেকে। উমাপ্রসাদবাবুর লেখায় কোথায় যেন পড়েছিলাম এই জায়গার নামটা আদতে ছিল ‘জ্যোতির্মঠ’, সে যাই হোক এর স্থান মাহাত্ব্য কিন্তু মোটেই ফেলনা নয়। শীতকালের ছটা মাস বদ্রী ঠাকুরের সঙ্গে সঙ্গে ওই অঞ্চলের তামাম পাহাড়বাসি নেমে এসে এখানে ঘাঁটি গেড়ে নিজেদের রুজিরোজগার চালিয়ে যায়। তাছাড়া ‘আউলি’ আর ‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স’ এর মত দুটো অতি মনোরম ট্যুরিস্ট স্পট রয়েছে এরই খুব কাছে পিঠে। আমাদের গাড়ি যদিবা এতক্ষণ হেলেদুলে উঠছিল যোশিমঠ ছাড়তে না ছাড়তেই মুহুর্মুহু যান নিয়ন্ত্রণের ঠেলায় সবাই একেবারে কাহিল হয়ে পড়লাম। রাস্তার যা হাল তাতে বেশির ভাগ জায়গাতেই শুধু একদিক থেকে গাড়ি পাস করানো হচ্ছে। আমরা মাঝে মাঝেই আটকা পড়ে যাচ্ছি আর নিতান্ত বেজার হয়ে গাড়ি থেকে নেমে হাত পা ছড়াতে বাধ্য হচ্ছি। চারদিকের পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ করার মত মনের অবস্থা তখন কোথায়। বদ্রীনাথ পৌঁছলাম প্রায় সন্ধে ছটায়। নেহাত গরমকালে আলো থাকে অনেকক্ষণ তাই বাঁচোয়া।

মন্দিরের সামনে হট স্প্রিং-এ মানুষের ভীড়

হদিশ জেনে নিয়ে প্রথমেই ঢুঁ মারলাম ভারত সেবাশ্রমে, দেখি মাছির মত ভিড়। বুকিং নেই তাও ঘর চাইছি শুনে টেবিলের লোকটা যেভাবে তাকালো বুঝলাম আমাদের নির্ঘাত পাগল-ছাগল কিছু একটা ঠাউরেছে। এ তল্লাটে অবশ্য থাকার জায়গা প্রচুর, পেয়েও গেলাম মনের মত একখানা যেটা মূল জায়গা থেকে একটু দূরে, ফাঁকা ফাঁকায়।

মন্দির চত্বরের সাধুবাবা

বদ্রীনাথের ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে অলকানন্দা নদী, আমরা রয়েছি হোটেল, বাজার, রেস্তোরাঁ মেশানো দিকটায়, নদীর ওপারে শুধু মন্দির চত্বর আর সাধু সন্তদের আখড়া। এখানে কুল্লে একদিনের মেয়াদ আমাদের ফলে পরদিন খুব সকাল সকাল মন্দির দর্শনে যাওয়া হল নদীর ওপর ঝুলন্ত সেতু পেরিয়ে। এপার থেকে পাহাড়ের ব্যাকগ্রাউন্ডে গোটা মন্দিরের দৃশ্যটা ভোলবার নয়, চটজলদি একটা ছবি এঁকে ফেলার লোভ সামলানো গেল না। ধর্মস্থানটিকে ঘিরে অত সকাল থেকেই মেলা বসে গেছে, পূজো দেবার জন্য কাতারে কাতারে মানুষ আসা যাওয়া করছে, গিন্নি একটা ডালা কিনে ছেলে বগলে মন্দিরে ঢুকলেন।

আমি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম রেজগির স্তূপ সাজিয়ে বসা নাদুস নুদুস সব সাধুবাবা, হট স্প্রিং-এর জলে ভিড় করে চান আর কাপড় চোপড় কাচতে থাকা লোকজন কিংবা সাফারি স্যুট পরা ভক্তি-আপ্লুত মাঝবয়েসী বেওসাদার সঙ্গে তার ক্রমাগত খুনসুটি করতে থাকা সদ্য বিবাহিত ছেলে ও তার বউকে।

সাধুবাবার গায়ে বাহারি নীল আলখাল্লা

এখানে বাস স্ট্যান্ডের কাছে নন্দাদেবী রেস্তোরাঁটা খুব চালু, বাইরে বড় বড় করে লেখা চাইনিজ থেকে গাড়োয়ালি সব রকম খাবার মিলবে ফলে জায়গা পাবার জন্য রীতিমত বাইরে লাইন দিতে হয়। গোটা অঞ্চলটা এরা মাইকে মাইকে ছয়লাপ করে রেখেছে আর অষ্টপ্রহর কানের গোঁড়ায় “নারায়ণ-নারায়ণ” ধ্বনি শুনতে শুনতে মনে ভক্তিভাব জেগে উঠবেনা এমন পাপী তাপী আর কেই বা আছে। দুপুরের পর ঘুরে এলাম ৩ কিলোমিটার দূরে মানা গ্রামে, ভারতের শেষ জনবসতি হিসাবে যার নামডাক, মাত্র ২৪ কিলোমিটার গেলেই রয়েছে ইন্ডো-টিবেটান সীমান্ত। গ্রামের বাড়ি গুলোর আনাচে কানাচে ঢুঁ মারলাম, মনে হল থমথমে একটা চেহারা, রান্না বান্না, ঘরের কাজ সবই চলছে কিন্তু কেমন যেন প্রাণহীন ভাবে। বড় রাস্তার ধারে প্রচুর দোকানপাট, লোকে ভিড় করে নুডলস খাচ্ছে আর জিনিষপত্রের দরদস্তুর করছে। ওখানেই আলাপ হল নন্দন সিং-এর সঙ্গে, লোকাল গাইডের কাজ করে, ওই জানাল প্রায় যাযাবরের জীবন মানার লোকেদের, অক্টোবর থেকে মার্চ গোটা এলাকা বরফে ঢেকে যায়, ফলে এরা তখন যোশিমঠ বা গোপেশ্বর-এ গিয়ে ডেরা বাঁধে আর কার্পেট বানিয়ে বিক্রি করে সংসার চালায়, আবার গরম পড়লে নিজের গ্রামে ফিরে এসে প্রধানত ট্যুরিস্টদের ওপর নির্ভর করে দিন কাটায়।

মানা গ্রাম

বুঝলাম বছরের পর বছর ধরে এই টানাপড়েন মানুষগুলোর জীবন থেকে সমস্ত রসকষ তাই একেবারে নিংড়ে নিয়েছে। মানার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে সরস্বতী নদী আর কাছেই রয়েছে দু পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে তোড়ে নেমে আসা ঝরনা মাঝখানে বসানো প্রকাণ্ড পাথরের চাঁই যার নাম ভীমা পুল, অর্থাৎ মহাভারতের সেই ভীমের কীর্তি, পাহাড়ের গায়ে ওঁনার পায়ের ছাপও নাকি দেখা যায়।

মানা গ্রামে কার্পেট বিক্রি করছে এক বয়স্ক লোক

প্রায় লাগোয়া পরপর কয়েকটা গুহা রয়েছে যার একটা ব্যাসদেব-এর নামে এবং যার মধ্যে বসে নাকি মহাভারতের একটা অংশ লিখেছিলেন এই মুনিবর। ভেতরটায় ছোট্ট এক ফালি জায়গা, সেখানেই লোক ঢুকছে, বেরোচ্ছে, মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করছে অনেকেই আবার ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি টবি তুলে মহা আহ্লাদিত হয়ে উঠছে। আমরা দেখলাম, সমৃদ্ধ হলাম আর আসার পথে ট্রাক বোঝাই ভারতীয় সেনাদের খুব জোড়ে হাত নাড়তে নাড়তে ফিরলাম। যদিও মাথায় তখন ঘুরছে পরের দিনের অনেকখানি পথ ভেঙ্গে ঋষিকেশ অবধি নামার কথা।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.