সাত প্যাঁচে বাঁধা

3123

বেশি দিন নয়, ৩০/৩২ বছর আগেও মধ্যবিত্তর বিয়েবাড়ি ছিল অন্যরকম। এখন কার্ড মানেই গ্রন্থ। মলাটে প্লাইউডের পালকি, পলিথিনের কলাপাতা, ফাইবারের সিঁদুর কৌটো। পালকির ওপর জ্যালজেলে পর্দা। ভেতর থেকে বউ বলছে, টুকি! মলাট সরালে দুই খানদানের নাম, পজিশন, অ্যাচিভমেন্ট— এলাহি ব্যাপার। নিমন্ত্রণ লিপিকায় শ্রীজাত থেকে দেড় লাইন, জয় গোস্বামী থেকে আড়াই লাইন। তার সঙ্গে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে যা দাঁড়াল, বুঝতে হলে ছোটো বাংলা অধ্যাপকের কাছে। তখন কার্ডে কম্পিটিশন ছিল না। পছন্দসই একখান কার্ড প্রজাপতয়ে নমঃ দিয়ে শুরু অতিথি আপ্যায়ন আইনে শেষ। খামের ওপর হলুদ ফোঁটা মেরে ছেড়ে দাও। কার্ড এলেই হামলে পড়ে দেখে নিতাম আপনি না আপনারা। এখন ফেসবুকে যেমন বউ ছেলে মেয়ে সবাই বন্ধু, বিয়ের কার্ডে তেমনি সবাই বান্ধব। সবান্ধব দেখলেই পুরো পরিবার খলবলিয়ে রওনা দিল।

এখন বিয়েবাড়ি বাড়িতে হয় না। রাজযোটক, মধূর মিলন, মঙ্গলতীর্থ ইত্যাদি নামাঙ্কিত বাড়ি পাওয়া যায়। মার্বেলের ছাদনাতলা, ডাইনিং প্লেস, কিচেনে, পার্কিং জোন। খোপে খোপে অতিথি। বেরোচ্ছে। খাচ্ছে। হেঁ হেঁ করছে। খোপে ঢুকে পড়ছে। সেকালে বাবলাদার বাড়ি, টুকুনদের বারান্দা, বাঘু মামাদের মস্ত খোলা ছাদ ছিল ভরসা। সারা পাড়া অতিথিশালা। এখানে খাও ওখানে ভাসাও। তখন মেনুকার্ড ছিল না। দরকারও ছিল না। গোটা মেনুটাই তরকারি কুটতে কুটতে জেনে যেত পাড়ার মেয়ে বউরা।

খাবার টেবিল বলতে ছিল লম্বা কাঠের পাটা। অস্থায়ী পায়া। টলমলে স্বভাব। গেল গেল ভাব। উপর দিয়ে গড়িয়ে দেওয়া হত নিউজপ্রিন্টের রোল। এরপর কাঠিসেলাই শালপাতা। গোবদা গোবদা মাটির গ্লাস। এখন যেমন থার্মোকলের গ্লাস প্লেট, টেবিলে স্থাপন করতে না করতেই উড়ে পালানোর ফিকির, প্রথম পদ আসা অব্দি চেপে ধরে থাক, তখন সে ভয়টা ছিল না। তবে ভাঁড় উল্টে সখের সন্নকাতন কিংবা গিলে করা পাঞ্জাবি কি বরবাদ হত না? সে দুর্ঘটনা হামেশাই ঘটত। তুচ্ছ ঘটনা।

বাড়ির কনিষ্ঠটি নাচতে নাচতে পাতে নুন লেবু ছড়িয়ে দিয়ে যেত। তারপর আসত বোঁটাশুদ্ধ বেগুন ভাজা। বেগুনের হ্যান্ডেল। মেঠো ইঁদুরের গ্ল্যামার। খাবারগুলোর নাম সব বাংলায় ছিল। ডালনা, ধোকা, ঘন্টো, পাতুরি। এখন তো খাবারের নামেই দাঁতকপাটি লেগে যায়। বস্তুটিকে চর্মচক্ষে জানতে হলে পাতে পড়া অব্দি হেজিয়ে বসে থাকতে হয়। তখন এইসব জ্বালা ছিল না।

তখন অনেক কিছুই ছিল না। লেপের মত জমজমাট চাটনি ছিল না। এখনকার মত চটাং করে এক খাবলা চেটে নিয়ে কেউ মনে মনে বলত না- সবার উপরে আমসত্ব তাহার উপরে নাই। সেকালে চাটনি মানে টমেটো ভেলিগুড় শুকনো লঙ্কা। কেলে কড়াইতে চড়ে চাটনির রং খুলত ধীরে ধীরে। তখন মাপা বোতলে মিনারেল ওয়াটার ছিল না। জগ ভর্তি জেনারেল ওয়াটার নিয়ে ঘুর ঘুর করত জলজ্যান্ত কচিকাঁচার দল। আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিংকস ছিল না। বাহারি পাউচ মশলা, খাঁজকাটা টুথপিক ছিল না। বাংলা পান ছিল। পেটের ভিতর চুন সুপুরি চমন বাহার ছিল।
ব্রুফে তো হালে এল। প্লেট হাতে লাইনে দাঁড়াও। চিমটে করে তুলে নাও। “আদ্দুটো খান” বলার লোক নেই। কোথাও কোথাও দুটো সিস্টেমই চলে। সেখানে প্রাচীনপন্থীদের ধাক্কাধাক্কি। একদল খাচ্ছে, একদল মুখের ওপর হুমড়ি খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উঠে পড়লেই এঁটো আবর্জনার তোয়াক্কা না করে চেয়ারে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। যেন লক্ষীকান্তপুর লোকাল।

উপহারে শরৎচন্দ্র বঙ্কিমচন্দ্র ছিল বাঁধা। গৃহদাহ, দত্তা, কপালকুণ্ডলা। হাইফাইরা দিতেন ওয়াল ক্লক, চিনেমাটির শো-পিস, ধনেখালি, টাঙ্গাইল।

সেকালে একটা দৃশ্য দেখা যেতই যেত। কনে সাজুগুজু করে বসে আছে। উপহার নিচ্ছে। নমস্কার ঠুকছে। মুখে কথাটি নেই। পাড়ার পুঁটি মিনতিরা পালা করে তাকে তালপাতার বাতাস দিচ্ছে। সাজিয়েছে ওরাই। মেক আপ রক্ষা করার দায়িত্ব ওদের। এখন আছে বিউটি পার্লার। দুধে আলকাতরা রং ঘষে ঘষে তুলে ফেলছে। শ্বেত পাথরের মর্মরমূর্তি বানিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে দিচ্ছে।

এখন বিনা বাধায় কনে অব্দি পৌঁছে গেলে গৃহকর্তার প্রেস্টিজ পাংচার। জ্যাম সরিয়ে সরিয়ে যেতে হবে। কুসুমদুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকবে মাসতুতো পিসতুতো সুন্দরীরা। ওদের দেখামাত্রই দুহাত তুলে দিতে হবে মহাপ্রভুর মতো। ওরা বগলে সেন্ট ছড়িয়ে হাতে রুমাল ধরিয়ে দেবে। এরপর পদে পদে পদ। চা কফি ফুচকা বাঁটোরা চিকেন চাপ কাবাব। চাউমিন পিৎজা ফ্রুটজুস কাস্টার্ড। এটা সেটা চাখতে চাখতে পেট আইঢাই। এরপর কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বাড়ি যান।

বিয়ের আসরে ছড়াপত্র ছেপে বিলি করার রেওয়াজ যাই যাই করে তখনও যায় নি। মনে আছে আমার এক পিসতুতো দিদির বিয়েতে ঘরগুষ্ঠি কবি হয়ে গিয়েছিলাম। সেবার ছোট ভাই একটা ছড়া লিখে হিরো হয়ে গিয়েছিল- সন্ধ্যাদিদির বিয়ে হবে/ জামাইবাবু কানাইদা/ এদিক খোঁজে ওদিক খোঁজে / সত্যি তুমি কানা-ই দা।/ বরের বেশে অবশেষে / বসল এসে পিঁড়িতে/ জামাইবাবুর মন মজেছে/ সন্ধ্যাদিদির পিরিতে।

এখন কাগজ নেই। যত কাব্যি হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুকে।

সেকালে বিয়েবাড়িতে চোঙা বাজত। মালাবদল হবে এ রাতে, কুসুমদোলায় দোলে শ্যামরাই কিংবা চন্দনপালঙ্কে শুয়ে একা একা কি হবে জীবনে তোমায় যদি পেলাম না। সন্ধ্যে হলেই বিসমিল্লার দখলে চলে যেত গানযন্ত্র। সানাই আর রজনীগন্ধায় ঘোর লেগে যেত। বিসমিল্লা আজও আছেন, তবে সারাদিন পাগলু দিলবালেদের অত্যাচার সহ্য করার পর বেঁচে থাকলে আছেন।

ঘরে মামা দাদারাই আপন ক্যামেরায় চিরিক চিরিক ফটো তুলত। পেশাদার ক্যামেরাম্যান থাকত অবশ্য। স্থির স্মৃতিচিহ্ন। এখন ভিডিও ক্যামেরার ক্যারিসমায় স্মৃতি নড়ছে দুলছে ঢলছে। কার দিকে কার চোরা চাউনি সব ধরা পড়ছে খপাখপ। মাধ্যমিকের পল্টা সিগারেট ধরিয়েছিল। সেও জেনে গেছে ঘরগুষ্টি।
একটা কিপ্টেমি ৩২ বছর আগে ছিল। আজও আছে। লাখ লাখ টাকা খরচ হবে জেনেও বিয়ের বিজ্ঞাপনে দেড়শ টাকা বাঁচানোর জন্য লেখা হয় দঃ রাঃ সঃ চাঃ।

বিয়েতেও অসাম্য। নন্দিতাদি বিয়ে করল না। তার বোন বন্দিতা তিনবার বিয়ে করে ফেলল। দুজনেই দেদার সুখি। ইদানিং মানুষ লিবারেল হয়েছে। বিবেচনা পাল্টি খাচ্ছে। পাল্টিঘরের ফান্ডা উঠে যাচ্ছে। এটা ভাল লক্ষণ। আছেন সুলেখা বউদির মত মানুষ। শনিবার বিশুদ্ধ নিরামিষ খান। আবার বিয়েবাড়ির টানও উপেক্ষা করতে পারেন না। শনিবারে নেমন্তন্ন পেলে রাত ১২টার পরবে ব্যাচে বসেন। কেউ না থাকলে একাই বসেন। ওতে নাকি দোষ নেই।
যে দ্রুতগতিতে বিয়েবাড়ির ছবিটা পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে ৩২ বছর পরে সেটা কেমন হবে? আসুন একটু আন্দাজ করি। ধরে নিলাম বিবাহ প্রথাটি তখনও হাপিস হয়ে যায় নি। কেউ কেউ করছেন। লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতিকে বাঁচানোর তাগিদেই করছেন। খরচ নিয়ে বাপ মাকে ভাবতে হবে না। বিজ্ঞাপনদাতারা নাক গলাবে। ওরাই টাকা গলাবে। স্পন্সরশিপে কাজ হাসিল।

বিয়ের কার্ডের পেছনে থাকতেই পারে এমন বিজ্ঞাপন-
বনিবনা হচ্ছে না? স্বল্প খরচে ডিভোর্স চান? যোগাযোগ করুন : অমুক তলাপাত্র, বিশ্বস্ত অ্যাডভোকেট।
গেটে ইলেকট্রনিক বোর্ডে চমকাচ্ছে- প্রিয়গোপাল হিসাবী। প্রিয়গোপাল সরে গেলেই নতুন বিজ্ঞাপন- অ্যাসিডিটি? চিন্তা করবেন না। পিনো আছে তো।

কাঁচের প্লেটে গেঞ্জি মোজা জাঙ্গিয়া। আন্ডার কি বাত। টেবিলক্লথে স্যানিটারি ন্যাপকিন। ফুলদানিতে চিটফান্ড।
ঘরের ভিতরেই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার হাজারো বিনোদন। সোস্যাল নেটওয়ার্কের চিটচিটে আকর্ষণ। পাবলিক আসতে চাইবে না। টেনে হিঁচড়ে আনতে হবে। মুম্বাই থেকে সেলেব উড়িয়ে আনতে হবে। তিনি পাড়ার জগাদার মত হেঁ হেঁ করে গপ্প করবেন। চ্যানেলের পার্টনার থাকতে হবে। টেলিকাস্ট মাস্ট। কম্পিটিশন থাকতে হবে। যে এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি চিকেন চাপ সাঁটতে পারবে তাকে মাসিচন্দ্রর পক্ষ থেকে হীরের আংটি দিতে হবে।
গিফট কেউ বগলদাবা করে আনবে না। যা হবে ক্রেডিট কার্ডে। ক্লিপকার্ট, ঘ্যামাজনরাও পৌঁছে দিতে পারে।
ফুলশয্যা নিয়ে ইয়ার্কি জন্মের মত ঘুচে যাবে। ফুলেরা একা একাই শুকোবে। নব বরবধূ দেয়ালের দিকে মুখ গুঁজে সোস্যাল নেটওয়ার্কে ডুবে যাবে। অনলাইনে দুজনের জন্য অপেক্ষা করবে অন্য কেউ। উফ, এতক্ষণ কি করছিলে? বিয়েতে ফেঁসে গেছিলাম, স্যরি। তাদের বিছানাতেও হয়ত অকারণেই শুকোচ্ছে নিস্পাপ ফুলেরা।

Advertisements

4 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.