অযান্ত্রিক

2134

সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছিল কুশ | কাকচক্ষু টলটলে দিঘি | তাতে হেলান খেজুর গাছের ছায়া | পাখির কিচিরমিচির | কে যেন বাঁশি বাজাচ্ছে পাগল সুরে | বেশ লাগছিল‚ এমন সময় ঘুমটা ভেঙে গেল | জানালা দিয়ে রোদের হলকা এসে মুখ পুড়িয়ে দিচ্ছে|চারিদিকে গনগনে দিনের আলো | আশ্চর্য‚ বাঁশির সুরটা যেন এখনও কানে আসছে | পরক্ষণেই অবশ্য ভুল ভাঙল ওর | বাঁশি কই‚ সেলফোন বাজছে বালিশের নিচে | ভায়োলিনের সঙ্গে ফ্লুটের এই পিসটা গতকালই রিংটোন মোডে সেট করেছে গ্যালাটি | মেমরির সঙ্গে ওরিয়েন্টেশনটা এখনও হয়নি ঠিকঠাক |

তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে নিল কুশ | ঠক্করসাহেব কলিং | কুশের ইমিডিয়েট বস | এতক্ষণে টনক নড়ল ওর | সাংঘাতিক কেলো হয়ে গেছে | যাবজ্জীন অ্যাপার্টমেন্টে বি সি কুন্ডুর ডেরায় ঢু দেওয়ার ছিল সকাল আটটার মধ্যে | টেবিলে রাখা লাল এলসিডি ঘড়ি বলছে অলরেডি সাতটা চল্লিশ | অর্থাৎ হাতে আর বিশটি মিনিট | মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়েও শুয়েছিল | বাজল না কেন কে জানে | চাকরিটা আর রাখা গেল না | ভাগ্যিস ঠক্করকে অ্যাডভ্যান্স একটা হিন্টস দিয়ে রেখেছিল |

‘গুড মর্নিং স্যার |’ যতটা পারে ভোকালকর্ডে মধু ঢালল কুশ |

‘বিছানায় শুয়ে আয়েস করছ এখনও ?’ ঠক্করসাহেব খেঁকিয়ে উঠেছেন |

‘স্যরি স্যার আসলে রাতে ঘুম আসছিল না বলে সেডাটিভস নিয়েছিলাম তাই…’

‘জাহান্নমে যাও | বাই নাইন ও’ক্লক ইউথ্যানাশিয়ার একটা কেস দিচ্ছ বলেছিলে | কার ? নিজেরই নাকি ?’

‘এখুনি বেরচ্ছি স্যার |’

‘সে তো দেখতেই পাচ্ছি | শোনো ‚ যে কারণে ফোন করেছি ‚ কেস জেনুয়্যিন মনে করলে ময়াঙ্ককে সঙ্গে নেবে | তোমার একার মুরোদে কুলোবে না | মেসেজ দিয়ে রাখছি | রেডিও থাকবে ও |’

‘ইয়েস স্যার |’ বলল কুশ | ঠক্করসাহেব শুনলেন না | নির্দেশটা দিয়েই লাইন কেটে দিয়েছেন |

এক লাফে বিছানা ছাড়ল কুশ | এখান থেকে কুন্ডুর বাড়ি অন্তত পঞ্চাশ কিলোমিটার | ওর লজঝড়ে থার্ডহ্যান্ড গাড়িতে একশর বেশি স্পিড ওঠে না | ফুলস্পিডে গেলেও মিনিমাম আধঘন্টা | ময়াঙ্ককে অবশ্য থোড়াই সঙ্গে নেবে | এক তো ছেলেটাকে পছন্দ হয় না | তাছাড়া ঠক্করের মহা পেয়ারের লোক | ভাইসপ্রেসিডেন্ট যে ওকে একটু নেকনজরে দেখে তাতে দুজনেরই ভীষণ গাত্রদাহ | অতি কষ্টে এক ডাক্তার বন্ধুর থেকে এই স্কুপটা জোগাড় করেছে কুশ | কেসটা একাই হ্যান্ডেল করবে ও | দরকার হলে ট্র্যাভেলসেন্টার থেকে একটা ফ্লাইংকার নেবে | ঘন্টায় দু’শকিলোমিটার স্পিডে ছোটে এই উডুক্কু বাহনগুলো | অনেকগুলো টাকা অবশ্য খসবে | কিন্তু তাও সই | যেভাবেই হোক ডিলটা চাই ওর |

উপায়টা মাথায় আসতে একটু আরাম বোধ করল কুশ | আর একবার ঘড়ি দেখল | সাতটা বিয়াল্লিশ | বেশ বেলা হয়েছে | রোদে তেঁতে উঠেছে চারিপাশ | জানালার পর্দা টেনে রোদটা আটকাল আগে | ঠিক পাঁচমিনিট নেবে রেডি হতে | তলপেটে নিম্নচাপ নেই | তবু ক্লিয়ার থাকা ভাল | অলক্লিয়ার ডুশের হেল্প নেবে | এমনিতে এসব কৃত্রিম উপায় একেবারেই না পসন্দ ওর | পরে আর নর্ম্যালভাবে হতেই চায় না | তাছাড়া টক্সিক ইনগ্রিডিয়েন্টও থাকে আজকাল | ইনফ্লেমড হয়ে যায় | মেডিকেল কনসালটেন্সি নিতে গেলে অন্য বিপত্তি | গে ঠাউরে বসে | তাতে অবশ্য লজ্জার কিছু নেই | নির্বিচারে কন্যাভ্রুণ নিকেশের ফলে মেয়েমানুষ এতই বাড়ন্ত যে সমকামিতাকে কবেই অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে সরকার |

‘গুডমর্নিং স্যার | বেড-টি রেডি |’ গ্যালাটি এসে দাড়িয়েছে দরজায় | ভুল করেছে কুশ | গ্যালাটিকেই বলা উচিত ছিল ঘুম থেকে উঠিয়ে দেওয়ার |

‘ডোন্ট সার্ভ | এক্ষুনি বেরতে হবে |’ মাথা ঝঁকিয়ে বলল কুশ |

‘ও কে স্যার | তাহলে ব্রেকফাস্ট রেডি করছি |’ রিনটিন স্বরে বলল গ্যালাটি |

‘ডোন্ট | অ্যায়াম অলরেডি লেট | মোবাইলে অ্যালার্ম দেওয়া ছিল | তুমি অফ করেছ ?’ গ্যালাটি এমন করবে না |তবু হঠাৎ যেন কুশের মনে হল |

‘নো স্যার |’ মাথা নিচু করেস স্থির গলায় বলল গ্যালাটি |
একটু ভাবল কুশ | গ্যালাটির অনুভূতি থাকার কথা নয় | মিথ্যে বলবে না | মোবাইলটাই বিগড়েছে মনে হচ্ছে | একটা ভাল সেট নিতে হবে | নয়ত নিদেনপক্ষে একটা রিসিভার্স ইমেজ ব্লকার | শ্রীলঙ্কায় এই আইসি চিপসটা বেরিয়েছে নাকি | যে কোনও মোবাইলে ফিট করা যায় | কলারের ফোন যতই শক্তিশালী হোক, যাকে ফোন করছে তার বদন বা ব্যাকগ্রাউন্ড দেখতে পাওয়া যায় না | ওটা লাগান থাকলে ঠক্করকে যা খুশি একটা ঢপ দেওয়া যেত |

‘সুপারসনিক ট্রাভেলস-এ ফোন করো | এক্ষুনি | আই নিড আ ফ্লাইংকার | দশ মিনিটের মধ্যে আসা চাই |’ কম্যান্ডটা ছুঁড়ে দিয়ে বিছানা থেকে একলাফে নেমে পড়ল কুশ |

‘রাইট স্যার|’ মাথা নাড়ল গ্যালাটি | আপেল-আপেল মুখটা যেন একটু আড়ষ্ট | অপরাধী-অপরাধী | আলার্মটা সত্যি অফ করেনি তো? যযা | তা হলে হবে কি করে | চিন্তাটা উড়িয়ে দিল কুশ | কত কিছুই না কল্পনা করে ও |

||২ ||

সকাল আটটা পঞ্চাশ | যাবজ্জীবন আবাসনের ভিজিটরস রুমে বসে আছে কুশ | এখানে মহা কেলো | স্কুপটা ও একাই পায়নি | মেন কম্পিটিটর Exsight টিভির লোকেরাও হাজির | বলা বাহুল্য তাদেরই ডাক পড়েছে আগে |

কুশকে অবশ্য ফুটিয়ে দেওয়া হয়নি | বুড়োর ছেলেরা হাতে রেখেছে তাকে | Exsight-এর পর তার ডাক পড়বে | কিন্তু তাতে কাজ কতটুকু হবে সন্দেহ আছে | রিয়ালিটি শো বিজনেসে Exsight এক নম্বর চ্যানেল | একচেটিয়া কারবার | কুশদের জম্বি তো সবে ফিল্ডে নেমেছে | আগে আসতে পারলে তাও কিছু একটা করা যেত | কপাল খারাপ হলে কি আর করা যায় | পকেট ফুট করেও পাক্কা আঠাশ মিনিট লেগে গেল পৌঁছতে | দশ কিলোমিটারও ওড়েনি, আচমকা আকাশ কালো হয়ে ঝড়টড় উঠে যাচ্ছেতাই অবস্থা হলো | ঝাড়া উনিশ মিনিটের তান্ডব | তড়িঘড়ি গাড়ি ওড়াতে যাবে তখনো বিধি বাম | শুরু হলো ভয়ঙ্কর অ্যসিডবৃষ্টি | এবারের ধাক্কা আরো ন’মিনিট |

চুরমার টিভির থেকেও একটি ছেলে এসেছে | সে বেচারিও অম্লবৃষ্টির শিকার | কুশের পাশে বসে একটানা গালাগাল দিয়ে যাচ্ছে বাপ-ঠাকুদ্দাদের | আসলে ষাট-সত্তর বছর আগেও নাকি প্রকৃতির এমন অবস্থা ছিল না | এমন যখনতখন ঝড় | অ্যসিড রেন | হারিকেন সুনামি টাইফুন | সকাল সাতটায় সূর্যের এমন আগুনে রোদ | ওয়াটার টেবিলে নেমে গিয়ে পানীয় জলের এমন সংকট |

‘একটা জেনারেশন ছিল মাইরি | প্রজেনিদের জন্য একবিন্দুও চিন্তা করেনি | বন কেটে পাহাড় উপড়ে খালি নিজেদের বেনিফিট দেখে গেছে |’ কনস্ট্যান্ট বকে যাচ্ছিল ছোকরা |

শেষে রিসেপশনিস্ট কাম সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্টের নীরবতা রক্ষার সতর্কবানীতে বকুনি থামিয়েছে | এই রিসেপশনিস্ট লোকটি অবশ্য ঠিক মানুষ নয় | মানুষের মতো | হিউম্যানয়েড বা রোবোম্যান | ইদানিং এইরকম আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ছড়াছড়ি চারিদিকে | ঘরে বাইরে অফিসে ফ্যাক্টরিতে সব জায়গাতেই এদের উপস্থিতি | আসলে বছর পঞ্চাশেক আগে ইওরোপে কী একটা সায়েন্টেফিক এক্সপেরিমেন্টেশন করতে গিয়ে মহাপ্রলয়ের অবস্থা হয়েছিল প্রায় | প্রচুর ক্যাজুয়ালটি হয় | সেটা সামলে উঠতে না উঠতেই এশিয়া আমেরিকায় যুদ্ধ বেঁধে যায় আচমকা | মাত্র কয়েক ঘন্টার যুদ্ধ | কিন্তু তাতেই দেশগুলোর জনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল নাকি | এমনিতেই অনেকদিন ধরেই প্রাকৃতিক দুষণ আর অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্য নারীপুরুষদের সন্তান-উত্পাদনতা তলানিতে ঠেকেছিল | স্বাভাবিকভাবে ছানাপোনা করতেই পারছিল না মানুষ | রোবোটিক্স নিয়ে কাজ চলছিল বহুকাল ধরেই | পরপর দুটো ক্যাটাস্ট্রফ হয়ে যাওয়ার পর গবেষণা তুঙ্গে উঠলো | কৃত্রিম মানুষে ভরে উঠলো দেশ-বিদেশ | কুশের তো মাঝেমাঝে মনে হয় এরাই না একদিন নিজেদের মতো করে কম্যান্ড ঠুসে দেয় মানুষের মগজে |

চিন্তাটা হতেই রোবো-লোকটির দিকে চাইল কুশ | ল্যাপটপে খুলে ছবি আঁকছে একমনে | হয়তো তাতেই বিঘ্ন ঘটে ধমকানি দিয়েছে |

একটু মাথা উঁচিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চাইল কুশ | সাধারণ ছবি | সোলার কার | মনোরেল | কৃত্রিম ফুল | আসল মানুষ | নকল মানুষ | মানে যা নজরে পড়ে আর কি | কাঁচা কাজ | মানুষের মতো তো আর ইমাজিনেশন নেই | অবশ্য মানুষেরা এখন ওইসব বোকা বোকা ছবি থোড়াই আঁকে | সোসাইটির এত নিডস বেড়েছে যে পাল্লা দিতে অহর্নিশ নতুন-নতুন যন্ত্রের নক্সা আঁকে তারা | ইনফ্যাক্ট আঁকা টার্মটাও অবসোলিট | আঁকে না কেউ এখন | ডিজাইন করে | নেহাত বাড়িতে একটা অ্যান্টিক তুলি আছে কুশের | সেটা মাঝেমধ্যে বের করে রঙে চুবিয়ে সিন্থেটিক পেপারে যা পারে আঁকিবুকি কাটে | আঁকা শব্দটা মাথায় তাই এখনো সেট হয়ে আছে ওর |

সেদিন আবার গ্যালাটি পরামর্শ দিচ্ছিল, ‘একটা পেট রাখতে পারেন স্যার | একা থাকেন | কুকুর বিড়াল বা কোনো পাখি |’

‘একা থাকি কে বলল | তুমি তো রয়েছে আমাদের সঙ্গে |’ আলগা হেসে উত্তরটা দিয়েছিল কুশ | শুনে কি উত্ফুল্ল যন্ত্রমানুষী | সোনালী গালে রক্তিম আভা পড়েছিল | পড়ার কথা না | কুশের মনে হয়েছিল যেন |

‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার | আমি সাজেশন দিয়েছিলাম মাত্র |’ বলেছিল গ্যালাটি |

তা সাজেশনটা মন্দ না হলেও ক্যারি করার যোগ্য নয় মতেই | পেট কেউ রাখে নাকি এখন? সে সব উঠে গিয়েছে কোন কালে | তাছাড়া কুকুর বিরল দু-চারটে নজরে পড়লেও পাখিটাখি তো নজরে পড়েই না | হেরিটেজ মিউজিয়ামে গেলে অবশ্য পাখিটাখি দেখা যায় | ট্যাঁকের জোর থাকলে পেট-ক্লোনিং সেন্টার থেকে টাটকা একটা স্যাম্পেল তৈরি করেও নেওয়া যায় | কিন্তু ওসব অচল এখন | যেখানে মনিটরি রিটার্ন নেই সেখানে কেউ ইনভেস্ট করে না আজকাল | গ্যালাটি বলছে, কারণ অ্যাদ্দিন গ্র্যনির সঙ্গে থেকে ওর উপরে জ্ঞানীর মেন্টাল ওয়েভের একটা ইনডাকশন ডেভেলপ করেছে | গ্র্যনির এসব শখ-আহ্লাদ ছিল খুব | ইচ্ছে করলে রেপুটেড কোনো সেন্টার থেকে ইনডাকশনটা রিপেয়ার করিয়ে নিতে পারে কুশ | করে না | থাক | গ্র্যনি যে ওর কাছে সবকিছু ছিল |

নিজের বাপ-মাকে তো মনেই পড়ে না কুশের | খুব বড় বিজ্ঞানী ছিল নাকি তারা | দু’জনেই | নিউক্লিয়ার এনার্জি নিয়ে কাজ করছিল | ল্যাবেই কী একটা ত্রুটির ফলে ভয়ংকর বিষ্ফোরণ হয় | দু’জনেই মারা যায় একসঙ্গে | সত্যি বলতে সেই থেকে বিজ্ঞানের প্রতি অদ্ভূত একটা ভয় তৈরি হয়ে গিয়েছে কুশের মনে | বিজ্ঞানের ধারেকাছে যায়নি সে | ব্যবহারিক ইংরাজি নিয়ে পড়েছে | বাংলা নিয়েই পড়ত | উপায় হয়নি | বাংলাদেশ যেতে হত তাহলে | পশ্চিমবঙ্গে বাংলা এখন হেরিটেজ ল্যাঙ্গুয়েজ | টিচার-ই নেই, কে বাংলা পড়াবে |

টিং টং করে রিসেপশনিস্ট রোবোর ইন্টারকম বাজলো | Exsight এর অ্যাপো শেষ | এবার কুশের টার্ন |

|| ৩ ||

খবর ছিলই কুন্ডু পরিবারের জলে পড়ার অবস্থা | ড্রয়িংরুমে পা দিতে সেরকমই মনে হলো কুশের | ছেঁড়া কার্পেট | আদ্যিকালের এল সি ডি টিভি | তেলচিটে ফর্দাফাই সোফা | কাঠের একটা সেন্টার টেবিল | তাতে চিড়ধরা কাচের টপ | ভারী পর্দাগুলোতে শতাব্দীর ধুলোর আস্তরণ | সেগুলো টানটান করে জানলাগুলো ঢেকে রাখায় এত বড় ঘরে যথেষ্টই আলোর অভাব | টিমটিমিয়ে জ্বলা একটিমাত্র লো-পাওয়ারের এনার্জিসেভিং বাল্ব আর কতটা লাইট দেবে | এসি মেশিনও আছে, তবে শৈত্যের চেয়ে শব্দই বেশি ছড়াচ্ছে সেটা |

অথচ একটা সময় এরা নাকি এ তল্লাটের রইস আদমিদের দলেই ছিল | রমরমা বিজনেস ছিল উডেন ফার্নিচার আর নিউজপ্রিন্টের | কিন্তু গত কয়েক দশকের মধ্যে সব চৌপাটে উঠেছে | বনজঙ্গল যে হারে হাপিস হচ্ছিল গাছ কাটাই বেআইনি এখন | কাঁচামাল আমদানি বন্ধ দীর্ঘদিন | ভালো স্টক ছিল গোডাউনে | সব আনসোল্ড | ক্লেট্রনিক্সের যুগে যেমন খুশি শেপের কম্পিউটার ডিজাইনড ফার্নিচার এখন | মান্ধাতা আমলের কাঠের মাল কোন গেঁয়োভূতে কিনবে ! তেমনি নিউজপ্রিন্টের স্টকেও ছাতা পড়ছে | সেখানেও ন ডিমান্ড | খবরের কাগজ বা বই, দুটি অ্যান্টিক আইটেম | এখন খালি দেখা আর শোনার যুগ | সবকিছুই ডিজিটাল | স্কুল-কলেজের পরীক্ষাও হয় ইন্টারনেটে | বইপত্র খাতা পেন পেন্সিল সব ভ্যানিশ | সুতরাং যা হয়, কাল যে রাজা, আজ সে ফকির |

কুন্ডুর দুটি ছেলে | দুটিই মর্কট | বাপের মতোই যুগের সঙ্গে নিজেদের মোল্ড করেনি | পরিবারের যেটুকু সঞ্চয় ছিল ব্যাঙ্কে, তা ভাঙিয়ে বাংলা লিটারেচারের একটা ভার্চুয়াল পেড-লাইব্রেরি করেছিল | খবর আছে সেটাও বন্ধ হলো বলে | যে সফটওয়্যার কোম্পানি নো-হাউ দিয়েছিল, তারা তাদের পাওনা না পেয়ে এত টাকার মামলা করেছে যে কুন্দুদের ঘটিবাটি সব নিলাম হওয়ার মুখে |

এসব ঘটনা অবশ্য মোটেই রিসেন্ট নয় | দীর্ঘ সময় ধরে গড়িয়েছে | জীবনযুদ্ধের এই লড়াইয়ে ইতিমধ্যেই কুন্ডুর বাপ-ঠাকুরদা সকলেই দেহ রেখেছেন | কুন্ডুও লাইনে এখন | গত এক বছরে দু’বার তাঁর জীবনদায়ী অর্গান পাল্টানো হয়েছে | একবার লিভার | আর একবার হৃদয় | কিন্তু তবুও সুস্থ হতে পারেননি | দিন পনের আগে সেরিব্রাল হয়েছিল | তিনদিন হলো জ্ঞান ফিরেছে | অতি ক্ষীন চেতনা এসেছে | তবু তাতেই নাকি স্বেচ্ছা মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি |

‘দেখো ভাই Exsight আমাদের পঞ্চাশ লাখ দেবে বলেছে | তোমাদের রেট বেশি হলে তবেই কথা এগোবে | নয়তো আসতে পার |’ কুন্ডুর বড় ছেলে বলল সটান | ষাটের আশেপাশে বয়স | দু’পা উঠিয়ে বাবু হয়ে বসেছেন সোফায় | খালি গা | নিম্নাঙ্গে অতি প্রাচীন লুঙ্গি জাতীয় কিছু একটা জড়ানো |

কনিষ্ঠ পুত্রটি পাশেই দন্ডায়মান | দাদার মতোই গাট্টু গাট্টু দেখতে | বয়স কাছাকাছি হলেও ইনি আবার ফ্যাশানবাগিশ | বাপ যে মৃত্যুশয্যায় দেখে বোঝার উপায় নেই | হালফিলের পোশাক | হেয়ারলেস মাথার পিছনে এমবেডেড ডিজিটাল ক্যামেরা চিপস | পিছন দেখার জন্যে অনেকে লাগায় এখন | পা ট্যাপ করে এমন কায়দায় মাথা দোলাল বোঝা গেল দাদা যা বলে দিয়েছে ফাইনাল | একটি পয়সাও কমবে না ওর থেকে |

কয়েকটা হার্টবিট মিস করল কুশ | ঠক্করসাহেবের কড়া নির্দেশ‚বিশলাখের বেশি ওঠা যাবে না | খালি কুন্ডুদের দিলেই তো হবে না | ইনসিডেন্টাল খরচাও অনেক | লাইভ টেলিকাস্টের পারমিশন ফিজ লাগবে | মেডিকেল খরচ আছে | প্রতি ধাপে স্পিডমানির অঙ্কও কম নয় |

একটু চিন্তা করল কুশ | কিন্তু সত্যিই অত টাকার অফার দিয়ে গেছে Exsight? ইন্ধন আর দুর্দম এসেছিল | দু’জনকেই ভালোরকম চেনে কুশ | লোকের মগজধোলাইয়ে চোস্ত দু’জনেই | কদিন আগেই বিনা অ্যানেসথেসিয়ায় প্রস্টেট অপারেশনে রাজি করিয়ে ফেলেছিল এক বুড়োকে | লাইভ দেখিয়ে ভালো টাকা পিটেছে Exsight টিভি | লিফটে ওঠার সময় দেখা হয়েছিল মক্কেলদুটির সঙ্গে | চোখ টিপে কলা দেখিয়ে গেছে কুশকে | জিভ শুকিয়ে গেলেও মুখে হাসির স্ক্রিনসেভার ঝুলিয়ে রেখেছিল কুশ |

‘ওদের চ্যানেল দেখে লোকে বোর হয়ে গেছে | সবাই এখন জমবি দেখছে | বিরাট অডিয়েন্স পাবেন আপনারা |’ বলল কুশ |

‘ঠিক করে কথা বল ভাই‚ কী ভাবো তোমরা ? বাপের ছটফটিয়ে মরার সিন রাজ্যিসুদ্ধু লোককে দেখিয়ে খুব ফূর্তি হবে আমাদের ?’ জেষ্ঠ্যপুত্রের দু’পা নেমে এসেছে রোয়াওঠা কার্পেটে |

‘তা কেন ?’ ঢোক গিলল কুশ | ছড়িয়ে ফেলেছে | এটাই হয় ওর | ট্রেনিংয়ে শেখা বুলিগুলি উগড়াতে পারে না সঠিক সময়ে | দর বাড়ানর জন্যে এসব সেন্টিমেন্টের গান তো গাইবেই পার্টি| সে সময়ে কখনও পার্টির নি ধরিয়ে দিয়ে অফেনসিভ হয়ে যেতে হবে | নতুবা গলার স্বর খাদে নামিয়ে একদম ডিফেন্সিভ খেলতে হবে | স্পিরিচুয়াল হয়ে যেতে হবে পুরো | বোঝাতে হবে এ মহাবিশ্ব কে কার ? জন্ম-মৃত্যু ব্যথা-বেদনা সুখ-দুখ মায় বাপ-মা আত্নীয়স্বজন অবধি সব ফলস মায়া মাত্র | ইলিউশন |

‘তোমার এলেম বোঝা গ্যাছে ভাই | যেতে পারো নষ্ট করার মতো টাইম নেই আমাদের | চুরমারকেও একটা চান্স দিতে হবে |’ নাক খুঁটতে খুঁটতে বলল ছোটজন |

‘আমার পুরো কথাটা শুনুন আগে | Exsight এর ডাবল পেমেন্ট করতে পারি আমরা | বাট ‚ তার আগে আমাদেরও কিছু শর্ত আছে |’ মরিয়া হয়ে এক দমে কথাগুলো বলে ফেলল কুশ | ডিলটা ভোগেই গেছে | কেটে পড়ার আগে একটু ঘ্যাম দেখিয়ে যেতে দোষ নেই |

যা ভেবেছিল ‚ টাকার অঙ্ক শুনেই টেকোবাবুর চোখ কপালে | বড়টি দাড়িয়েই পড়ল সোফা ছেড়ে | তার চোখেও লোভী শিয়ালের দৃষ্টি |কুশের গোটা শরীরটা ঘিনঘিন করছে | বাপের মৃত্যুযন্ত্রণার দৃশ্যকে পণ্য করে ভাগ্য ফেরাতে চাইছে মুখে তাও বড় বড় বুকনি | অবশ্য বা দোষ দেবে | পেটের দায়ে সে নিজেও তো একই নৌকোর সওয়ারি | সেদিন কোথায় একটা রিপোর্ট দেখছিল ‚ এই শতাব্দীর শুরুতেই নাকি বিঞ্জানীরা প্রেডিক্ট করেছিল নেক্সট একশবছরের মধ্যে মানুষের মানবিকতা বোধ পুরোপুরি ভ্যানিশ হয়ে যাবে | কোনও সন্দেহ নেই | শেষের সে- দিন গিয়েছে |

‘তা তোমার শর্তটা কী ভাই ?’ ছোটজনই কথা বলল |

‘সিম্পল | মিস্টার কুন্ডু যে ইউথানাসিয়ার টেলিকাস্টে রাজি হয়েছেন ‚ সেটা ওঁর মুখ থেকে শুনতে চাই | স্টেটমেন্ট রেকর্ড করতে হবে | উইটনেস নিয়ে আসতে হবে | তাছাড়া সবছেয়ে বড়কথা প্রসেস অফ ডেথ আমরাই চুজ করব | উনি ফুল সেন্সে অ্যাক্সেপ্ট করলে তবেই টাকা পাবেন আপনারা |’ গড়গড়িয়ে বলে গেল কুশ |

পুত্রযুগল মুখ চাওয়াচাওয়ি করল নিজেদের মধ্যে | তারপর বড়টি বলল ‚ ‘ঠিক আছে | কিন্তু প্রসেস অফ ডেথ বললে সেটা কী হবে ?’
‘যা কিছু |স্লো-লেথাল ইঞ্জেকশন ইলেকট্রিক শক | অ্যাসফিক্সিয়েশন | আই মিন জাস্ট এনিথিং — ইভেন ইম পেলিং | মৃত্যুটা যাতে লিংগার হয় কিছুক্ষণ | যন্ত্রণার দৃশ্যগুলো দর্শক এনজয় করতে পারে খানিকটা সময় ধরে |’
এবার মানিকজোড় ঢোক গিলল | তবু অর্থের কী অক্ষয় মহিমা বড়টি বলল ‚ ‘আমরা রাজি | আপনি সাক্ষীসাবুদ যা লাগে নিয়ে চলে আসুন তাড়াতাড়ি | চুরমারের লোকটিকে আর ডাকছি না |’

‘কিন্তু এমনি কথায় হবে না |’ ফস করে বলল ছোটটি ‚ ‘অন্তত লাখদশেক নগন অ্যাডভ্যান্স দিয়ে যেতে হবে | আদারওয়াইজ আমরা Exsight-য়ের সঙ্গেই থাকছি |’

দশলাখ! একহাজার টাকাই নেই পকেটে | তবে এখন আর ব্যাকট্র্যাকিং চলবে না | পকেট থেকে মোবাইল বের করে জানালার দিকে এগিয়ে গেল কুশ ‚ নো প্রব্লেম | ম্যানেজমেন্টকে বলছি টাকা পাঠিয়ে দিতে | বলে ফোনটা কানে ধরল ও |

আসলে সত্যিই একটা কল এসেছে | -ময়াঙ্ক হতভাগা | ব্যাটা এখনও ওয়েট করছে নাকি | আনলে হত কী ওকে ? কথা বলতে পারে ভাল | অ্যামাউন্টটা হয়তো পচাত্তরেও নামাতে পারত | কিন্তু তাতে মুশকিল | ময়াঙ্ক ওর সিনিয়র | ডিলটা ওর নামেই রেজিস্টার করে দিত ঠক্কর | কুশ সেই কলা-ই চুষত | সাতটা দিন গ্রেস পেত অবশ্য | যদিও তাতে কিছুই হত না | ছ’মাসেও যখন সলিড কেস দিতে পারেনি ‚ সাত দিনে কি আর হত! আজ বাদে হাতে আর একটি দিন রইল | ঠক্কর তো নোটিস ধরিয়েই রেখেছে | কেস দাও নয়তো লাথ খাও |

‘স্যরি ইয়ার, হঠাৎ এমন ঝড় এসে গেল গাড়ি ঘোরাতে পারিনি |’ চাপা গলায় বলল কুশ |

‘ভুলে যা আগে বল ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিস কবে থেকে ?’

‘মানে ?’
সিম্পল | তোর ফ্ল্যাটে গেছিলাম ডাকতে | এমন সলিনয়েড মাল পটিয়েছিস বলিসনি তো!’

হতভাগা গ্যালাটির কথা বলছে | গ্যালাটি নিশ্চয় দরজা খুলে বলেছে যে ও ফ্ল্যাটে নেই | এমন তো করার কথা নয় | নাকি ডোরক্যামেরায় ময়াঙ্ককে দেখেই পটে গেল ছুঁড়ি | এনসিয়েন্ট গ্রিক যোদ্ধাদের মতো ফিগার ময়াঙ্কের | এই অভাবী বাজারেও নাকি রক্তমাংসের আসলি মেয়ের সঙ্গে সেক্স করেছে | তবু শালার ছুকছুকানির শেষ নেই | আসল-নকল কোনও কিছুরই পার্থক্য করে না | সেক্স-লাইব্রেরি থেকে থ্রি-এক্স মুভি আনবে আর গিলবে | তারপর ব্যাঙ্করাপ্ট হয়েছে এমনি মুখ করে বলবে ‚ আমাদের ফোরফার্দাসরা কিছু করেছিল ইয়ার | আমরা খালি ঘোল খেয়েই কাটাচ্ছি |
কথাটা একেবারে অসত্য নয় বটে | পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেরও থ্রি-এক্স মুভিগুলো দেখলে সত্যিই শিহরণ লাগে সর্বাঙ্গে | আসলি সব সেক্স-সাইরেনরা পারফর্ম করত ওগুলোতে | একালে আইনের কড়াকড়ি নই | কিন্তু কোটি টাকা খরচ করে একজনও রক্তমাংসের নারী পাওয়া যাবে না থ্রি-এক্স সিন করবে | মেয়েদের এখন বিশাল দেমাক | টাকার লোভে বিবস্ত্র হবে না | আডাল্ট প্লাজাগুলোতে থ্রি-এক্স যা দেখানো হয় সব নকলি মেয়ে দিয়ে তোলা |

‘বাজে কথা ছাড় | বিজি আছি |’ বলে লাইন কেটে দিল কুশ | বাড়ি ফিরে গ্যালাটিকে একটু বকতে হবে | যন্ত্র হলেও কুশ ওকে খারাপ চোখে দেখে না কখনও | কেউ দেখুক সেটাও পছন্দ করে না |

‘স্যার কথা হল ?’ টেকোবুড়ো কি নরম হঠাৎ | সম্বোধনেও পরিবর্তন | কুশ কথা বলার সময়ে একটু তফাতে সরে গিয়েছিল | সুপুত্রযুগল কাছে এগিয়ে আসেনি বটে | তবে দু’কান খুলে অপেক্ষা করছে |

‘হ্যাঁ | আধঘন্টার মধ্যেই ক্যাশ এসে যাবে |’ কেতা নিয়ে বলল কুশ |

‘কিছু খেলেন না |’ বড়ভাইয়ের গলায় গ্র্যানির কাছে শোনা প্রাচীন শান্তিপুরী বিনয় |

‘কাজের সময় খাই না আমি |’ বেরতে পারলে বাঁচে এখন | নিভৃতে ঠক্করসাহেবকে পটানর একটা অন্তিম চেষ্টা করতে হবে |

‘বাবার সঙ্গে কথা বলবেন ? ভিতরের ঘরে আছেন | একটু বেটার এখন |’ ঝাঁকড়াচুলোর বিনয় অক্ষুণ্ন | ‘প্রয়োজন নেই | আগে অ্যাডভান্স রিসিভ করুন | এগ্রিমেন্টে সই হোক | তারপর সব |’ বেরিয়ে পড়ল কুশ | মনে মনে বলল ‚ হারামজাদা!

|| ৪ ||

বিচ্ছিরি একটা স্বপ্ন দেখছিল কুশ!

অপারেশন টেবিলে তোলা হয়েছে ওকে | বস্ত্রহীন নগ্ন শরীরে অসংখ্য সূচের ফোড়াই | নলের সংযোগ | কাদের অস্ফুট ফিসফিসানি | ছুরি কাচির প্রাণহীন ধারাল শব্দ | কে যেন আচমকা চেঁচিয়ে বলল –লাইটস ক্যামেরা অ্যাকশন!
মুহূর্তে ঘর ভরে উঠল চোখ ধাঁধান আলোয় | সর্বাঙ্গ সবুজ অ্যাপ্রনে ঢাকা মুখোশপরা কে এগিয়ে এল ওর দিকে | মানুষ-ই | কারণ যন্ত্ররা মুখোশ পরে না | লোকটির হাতে চকচক করছে ইষ্পাতের ছুরি | শাণিত ফলাটা কেমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে দোলাচ্ছে ওর চোখের সামনে | প্রচন্ড আতঙ্কে চীৎকার করে উঠেছিল ও | যন্ত্রপাতি নলটল সরিয়ে উঠে বসতে গিয়েছিল আচমকা | পারেনি | কারা যেন ওকে চেপে ধরে রেখেছিল |

কে যেন গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘মুখটা চেপে না | মুখটা ছেড়ে দাও | ক্যামেরা চলছে | ন্যাচারাল এক্সপ্রেশনটা চাই আমার | পঞ্চাশলাখ নিয়েছে পুরো | মাথাটা বরং তুলে দাও | সার্জারিটা দেখুক নিজের চোখে | ফিলিংসটা আরও সলিড হবে |’

জান্তব হাতগুলো সরে গিয়েছিল মুখ থেকে | হাইড্রলিক অপারেশন টেবল রিক্লাইন হয়ে মাথা তুলে ধরেছিল ওর | ও এখন নিজেকে দেখতে পারছে | পুরোপুরি দু’পায়ের নখ অবধি | কয়েকমুহূর্তের পজ | আবার চিৎকার এল—-স্টার্ট ক্যামেরা | অ্যাকশন | মুখোশধারী ছুরি হাতে সরে গেল ওর ডান পায়ের কাছে | ধারাল ছুরির ফলা ওর শেভ করা নির্লোম
হাঁটুর থেকে এক সেন্টিমিটারেরও কম দূরত্বে | ওর বিচঞ্চল হদপিন্ডের শব্দ ছাড়া ঘরে এখন অসীম নিস্তদ্ধতা | আচমকা ছুরির ফলা স্পর্শ করল ওর পা | টাটকা লাল রক্ত ছুটল ফিনকি দিয়ে | কয়েকটি পল মাত্র | পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার মারণ অনুভূতি অসংখ্য স্নায়ূতন্তু দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল ওর দেহের প্রতিটি কোষে কোষে | অমানুষিক চিৎকার করে উঠেছিল ও | –আর ঠিক তক্ষুনি ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল |

বিছানায় উঠে বসল কুশ |

কী ভীষণ দুঃস্বপ্ন! জুলপির পাশ দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে | বুকের ভিতর এখনও ইলেকট্রিক ড্রামের কনসার্ট | পাশের টেবিল থেকে জলের বোতল নিয়ে ঢকঢক করে জল খেল কিছুটা | ডিজিটাল ঘড়ি বলছে চারটে তের | ভোর হতে বাকি নেই বেশি |

দোষটা ওরই | ডানপায়ের হাঁটুর একটু নিচে একটা টিউমার হয়ে রয়েছে বছরখানেক ধরে | টেস্ট করিয়েছে | বিনাইন | বৃদ্ধিও নেই তেমন | তবু মাঝে-মধ্যে ভয় হয় | ক্যানসারের ভয় নয় | সে রোগে মানুষ এখন প্রায় মরেই না | কিন্তু টিউমার থেকে অন্য মারণ রোগ হয় আজকাল | নতুন কতরকম ভাইরাস ইভলভ করেছে | পুরনো জীবাণুও প্রচুর মিউট্যান্ট হয়ে শক্তি বাড়িয়েছে | চাপা ভয়টা তাই থেকেই যায় |

তাছাড়া ক’দিন ধরে ভাবছিল কুশ ‚ ও নিজেই তো ওর রিয়েলিটি শো-এর নায়ক হতে পারে | নিজেই হতে পারে দুঃসাহসিক পারফর্মার | বিনা অ্যানেসথেসিয়ায় কাটাতে পারে ছোট্ট টিউমারটা | রক্ত ঝরবে |সুতীব্র তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় দম আটকে মরেও যেতে পারে ও | তাতে কী ? হাজার হাজার মানুষ উপভোগ করবে দৃশ্যগুলো | দেড়শ-দু’শ বছর আগেও তো সজ্ঞান সার্জারি হত মানুষের | সবাই কি আর মরত ? কুশও বেঁচে যাবে | আর বেঁচে গেলে ? ভাবতেই পারে না ও লক্ষ-লক্ষ টাকা | লাথি মারবে এই যন্ত্রণার দালালগিরিতে | সত্যি-সত্যি সব ছেড়েছুড়ে পালিয়ে যাবে ও | এই কলের শহর থেকে অনেক অনেক দূরে | যেখানে কোনও যন্ত্র নেই, যন্ত্রনাও নেই | আর পারছে না ও | কাল সারাটা দিন চরকির মতো ঘুরেছে | নিট ফল সেই শূন্য |

কুন্ডুর ওখান থেকে ফিরে সোজা অফিসে গিয়েছিল | ঠক্করসাহেব যাচ্ছেতাই ঝেড়েছেন | জমবির মুখ পুড়িয়েছে নাকি কুশ | আটানব্বুই বছরের ঘাটের মড়ার ডেথসিনের জন্যে এককোটির টাকার অফার! তাও ময়াঙ্ককে সঙ্গে অবধি নেয়নি | একলা গিয়েছিল ডিল করতে | তৎক্ষণাৎ মাস-মাইনে বন্ধের নোটিস পাঠিয়ে দিলেন অ্যাকাউন্টসে | তবে শাস্তি মকুবের উপায় একটা আছে এখনও | খোদ Exsight টিভির প্রোডাকশন ম্যানেজারের বউ নাকি প্রেগন্যান্ট | তাকে যদি লোকাল অ্যানাসথেসিয়া ছাড়া নর্মাল ডেলিভারিতে জমবির হয়ে এগ্রিমেন্টে সই করাতে পারে ‚ তবে চাকরি আবার বহাল তো হবেই প্রোমোশন ইনসেনটিভ সবই হবে ডবল ডবল | ঠিক চব্বিশ ঘন্টা সময় | শুনে গলে গিয়েছিল কুশ | খোদ যন্ত্রণা সওদাগরের কাছে তার নিজেরই সহধর্মিণীর যন্ত্রণাক্লিষ্ট অভিব্যক্তি ক্রয়ের কী সরল অমায়িক প্রস্তাব! তবু বেবুক নির্লজ্জের মতো চ্যালেঞ্জটা নিয়েছে কুশ | কী আর হবে ? বড়জোর একটা গলাধাক্কা | মারধর তো দেবে না |
‘স্যার আপনি জেগে আছেন ?’ গ্যালাটি কখন এসে ঢুকেছে ঘরে | না চমকালেও একটু অবাক হল কুশ | গ্যালাটি ইদানীং কী একটু বেশিরকম সংবেদনশীল ? কুশের মেন্টালওয়েভগুলো কি ওর নর্মাল প্রোগ্রামিংয়ে অ্যাফেক্ট করছে ? হতেও পারে | হাইলি সিমুলাইজড রোবট গ্যালাটি | কুশের সাফারিংয়ের কারণ ডেসিফার করে ফেলেছে |

‘ঘুমটা ভেঙে গেল |’ বলল কুশ |

‘আপনি ঠিক আছেন স্যার, শরীর খারাপ না তো ?’

‘না | আমি ঠিক আছি | তুমি যাও |’
ঘরের অতি মৃদু আলোয় কেমন মায়াবী লাগছে গ্যালাটিকে | শরীরী বক্ররেখাগুলো সুষ্পষ্ট | আনইজি ফিল করল কুশ কিন্তু গ্যালাটির শরীর সত্যি শরীর নয় | সেই অর্থে সেও অশরীরী |এমন নারীকে ও কামনা করে না | ওর বন্ধুরা করতে পারে | ময়াঙ্কের কথা মনে পড়ল হঠৎ |

‘ও কে স্যার |’ বলে গ্যালাটি পিছু ফিরেছিল | কুশ ডাকল |

‘ভিজিটর এসেছিল আজকে ?’

গ্যালাটি ঘুরল, ‘ইয়েজ স্যার |’

‘তুমি ডোরক্যামেরায় দেখনি ? দরজা খুলেছিলে কেন ?’

‘দরজা খুলিনি | নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করে রেকর্ড করে নিয়েছি কেবল | সে আমাকে দেখেছে নিচের রাস্তা থেকে |আমি ব্যালকনিতে ছিলাম |’

‘আই সি |’ নিশ্চিন্ত হল কুশ | রাস্তায় থেকে সাততলায় গ্রিলদেওয়া ব্যালকনিতে দাড়ান গ্যালাটিকে দেখলে সত্যি বলেই ভুল হবে |

‘ঠিক আছে | আর দাড়াবে না|’ গম্ভীর হয়ে বলল ও |

‘কেন স্যার ?’

‘মানে ?’ কথা আটকে গেছে কুশের | দশবছর ধরে দেখছে সিলিকনজেলে ঠাসা এই যন্ত্রমানবীটিকে | বাবার এক ছাত্র ছিল বাংলাদেশে | ভীষণ মেধাবী | সে-ই গ্যালাটির আসল নির্মানকর্তা | অ্যাসেম্বলিং থেকে সিমুলেশন ‚ সব তার ক্রেডিট | পিগম্যালিয়নের মতো সে নিজেও তার সৃষ্টির প্রেমে পড়েছিল কিনা জানা নেই | তবে রুপে তো মুগ্ধ হয়েই ছিল | গ্যালাটি নামটা তার-ই দেওয়া | কয়েকবছর আগে ফেরিওয়ালার চাকরি নিয়ে কুশ যখন প্রবাসী হল ‚ তখন মূলত নিসঙ্গতা কাটানোর জন্য গ্যালাটিকে গ্র্যানির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সেই ভদ্রলোক | সেই থেকে টানা কতবছর ধরে এই তিনখুপরির ফ্ল্যাটে রয়েছে গ্যালাটি | ডোমেস্টিক হেল্প কাম গ্র্যানির কম্প্যানিয়ন |কিন্তু যতই কম্প্যানিয়ন হোক ‚ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে গ্যালাটি কখনও কোনও প্রশ্ন করেছে ‚এমন দৃষ্টান্ত অন্তত কুশের স্মৃতিতে নেই |

‘স্যার একটা কথা বলব ?’ আবার প্রশ্ন | কুশ চুপ | গ্যালাটি কয়েক ধাপ এগিয়ে এল ওর দিকে |

‘এই ইনহিউম্যান জবটা আপনি ছেড়ে দিন স্যার |’ থেমে থেমে বলল গ্যালাটি |

এবার সত্যি হাসি পেলে কুশের | যন্ত্রের মুখে অমানবিকতার কথা শুনতে হচ্ছে!

‘থ্যাঙ্ক ইউ! আমি ভেবে দেখব |বাট ‚ অ্যাটা প্রেজেন্ট আই হ্যাভ নো অলটারনেটিভ | আই নিড মানি |’

গ্যালাটি তবুও দাঁড়িয়ে আছে অবিচল | অন্ধকারে কুশের মনে হল ওর পীনোন্নত নিটোল বুকদুটো যেন ওঠানামা করছে চাপা আবেগে | ধুস | নিজেকে সংশোধন করল তাড়াতাড়ি | বড্ড বেশি কল্পনা করে ও |

‘এনিথিং মোর ?’ কুশ জিজ্ঞেস করল |

‘আমি কি কিছু করতে পারি ?’

কী সব বলছে যন্ত্রমানবী! হাসি পেল কুশের, ‘যা খুশি | এনিথিং ইউ মে ফিল |’
‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার |’ মুখটা কেমন যেন কঠোর করে বলল মেয়েটা | জোরে শ্বাস ফেলার শ্বাস ফেলার শব্দও শুনল কুশ | পরক্ষণেই হেসে ফেলল | আবার সেই ভাবুকপনা |

|| ৫ ||

Exsight টিভির ভিজির্টসরুমে বসে আছে কুশা | অন্তত ঘন্টাদুয়েক তো হবেই | সামনে প্রমাণ সাইজের আলট্রা রেজলিউশন টিভি | Exsight এরই প্রাইজড শো-গুলো বিম হচ্ছে অনবরত | বডি পিয়ার্সিং থেকে শুরু করে কচিকাচাদের সজ্ঞান সারকামসিশিন অবধি | পরিশেষে রিলেটিভসদের ইন্টারভিউ | পারফর্মার টসকে না গেলে তারও বেদনাহত টাটকা অভিব্যক্তি | সঙ্গে বাছাই মিউজিক | ধারাল গ্রন্থনা | প্রোডাকশন হিসেবে সত্যিই দুর্দান্ত |

খুব পপুলার এপিসোডগুলোর শুরুতে আবার স্বয়ং মালিকের মহান ভাষণ —-বন্ধুগণ ‚ স্মরণ করুন সুপ্রাচীন রোমের বীর গ্ল্যাডিয়েটরদের ‚ অকুতোভয় স্পেনীয় মাটাডর এবং পিকাডরদের | সভ্যতার সেই আদিলগ্ল থেকে মহান এই মানুষরা কেবল আপনাদের স্বার্থেই নিজেদের জীবন বাজি রেখে চলেছেন | হাসিমুখে বরণ করেছেন যে কোনও প্রাণঘাতী যন্ত্রণা | সুখের কথা ‚ তাদের সেই মহান দৃষ্টান্ত এই ২০৮৭ সালেও আটুট | আজও কিছু অসমসাহসী মানুষ কেবল আপনাদের স্বার্থে যে কোনও যন্ত্রণা হাসিমুখে স্বীকার করে নিচ্ছেন | আসুন সকলে আমরা আমরা তাদের এই সুতীক্ষ্ণ অনুভূতির শরিক হই | যে কোনও পরিস্থিতির জন্যে গড়ে তুলি নিজেকে | আমাদের প্রতিটি স্নায়ূতন্ত্র হয়ে উঠুক ইষ্পাতের থেকেও কঠিন |
বিরক্তি লাগছিল কুশের | চোখ ফিরিয়ে রেখেছিল | স্ক্রিনে এখন অন্য সাবজেক্ট | হিস্টরিক ইনহিউম্যানিটি স্পেশালস | পচাত্তরবছর আগে কোন নরাধম বাপ মেয়ে হওয়ার অপরাধে নিজের তিনমাসের শিশুকন্যাটির সর্বাঙ্গে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে তিলে তিলে যন্ত্রণা দিয়ে মেরেছিল ‚ তার-ই গ্রাফিকস চলছে | মৃত শিশুটিকেও দেখান হল কয়েকবার | কী দৃশ্য! গোটা শরীরটা কেমন করছিল কুশের | গা ঘুলিয়ে উঠছিল বারে-বারে | অথচ অপেক্ষারত অন্যেরা কেমন অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে দৃশ্যগুলো দেখছিল | শিউরে উঠছে | কিন্তু নজর সরাচ্ছে না | মন্তব্যও করছে কতরকম |
উঠেই পড়ছিল কুশ | তখনি ডাক এল ওর | একটু চিন্তা করল যাবে কি ? প্রস্তাবটা শোনামাত্র ঘাড়ে কাটাবে না লেজে ছাঁটবে কে জানে! ঠক্করসাহেবের ছক না তো ? আরও অপদস্থ করতে চায় ওকে | অতবড় ডিলটা মিস হয়েছে বলে ঝড়টা তিনিও কম খাননি নিশ্চয় | ন-না | কেটে পড়াই ভাল | অবশ্য একটা কাজ করলে হয় | বুকের ভিতরটা নিমেষে ধক করে উঠল কুশের | শিরশিরিয়ে উঠল ডান-পায়ের হাঁটুর কাছটা | ঢোক গিলল ও |পা-দুটো টলে উঠল যেন | টলুক | সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে ও | কঠিন সিদ্ধান্ত | না| হারবে না ও | এইটপ্যাকের বডি না থাকুক | আটশটনের ইষ্পাতকঠিন মন আছে ওর | হঠাৎই গটগটিয়ে এগিয়ে চলল ও |

একটু বাধা | হিপপকেটে মৃদু কম্পন | মোবাইল বাজছে | হাতে নিতে হৃদপিন্ডটা একলাফে টাকরায় | খোদ জমবি নেটওয়ার্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট | এঁর বদান্যতাতেই জবটা হয়েছিল | তবে ইনিও এখন ঠক্করেরই দলে | ঠক্কর স্যালারি বন্ধ করেছে | ইনি হয়তো সেভিংসের সামান্য সঞ্চয়টুকুও ফ্রিজ করবেন | রোবোমানুষদের অঢেল উৎপাদনের জন্য কোম্পানিগুলো এখন যা খুশি পারে |

‘গুড আফটারনুন স্যার | কুশ হিয়ার |’ স্বভাবসিদ্ধ বুলি-ই আওড়াল ও |

‘সে তো দেখতেই পাচ্ছি |’ মহামান্য ভিপির গলার টোনটা একটু নরম যেন, দ্যাখো ইয়াংম্যান ‚ কাল কোম্পানির খাতিরেই ঠক্করসাহেব তোমার উপরে একটু রুড হয়েছিল | তুমি ইন্টেলিজেন্ট | ম্যাটারটা যে বুঝেছে তাতে খুশি আমি | নাউ মেক দিজ ডিল ফাইনাল | ইউ উইল গেট ডাবল আপলিফটমেন্ট |’

মনটা একটু দুর্বল হলেও সামলে নিল কুশ | আর বার খাচ্ছে না সে | ডিল আর একটি-ই করবে | টিকে থাকলে সোজা নিরুদ্দেশে |

‘হ্যালো শুনতে পাচ্ছো ?’

‘হ্যাঁ স্যার বলুন স্যার |’

‘লুক, যা ডিম্যান্ড করেছ তোমরা ‚ তাই পাবে | খালি একটা রিকোয়েস্ট রাখতে হবে — মাই ভেরি পার্সনাল রিকোয়েস্ট | অফ দ্য ক্যামেরা আমাকেও একটা চান্স দিয়ো |’

‘কিন্তু স্যার আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না…’ বাধা না দিয়ে পারল না কুশ | কীসব ভাট বকছে বুড়ো!
‘ন্যাকামি করছ কেন ?’ ভাইসপ্রেসিডেন্টের সাউন্ড খরখরে এবার, ‘তোমার রুম পার্টনার কোম্পানির রিপ্রেজেন্টিভ ডেকে এগ্রিমেন্ট করছে ‚ পেপার্সে দেখলাম তোমারই ব্যাঙ্ক-অ্যাকাউন্ট নাম্বার | তুমি কিছু বুঝতে পারছে না ? ডোন্ট ফরগেট এই কোম্পানিতে আমার রেকমেন্ডেশনেই ঢুকেছিলে তুমি | অ্যাট সেভেন্টিওয়ান কী করব তোমার গার্লফ্রেন্ডকে আমি ? জাস্ট একটু কিসিং হাগিং ‚লিটল বিট ওরাল স্টিমুলেশন অল দ্যাট | আর মুফতে তো বলছি না | ইন কোর্স অফ টাইমে বোর্ডে ঢুকিয়ে নেব তোমায় | তুমি খালি…’

স্যরি স্যার | আমি পরে কথা বলব |’ কেটে দিল কুশ | কান মাথা সব ঝাঁ ঝাঁ করছে | হচ্ছেটা কী কিচ্ছু বুঝতে পারছে না ও | লাইন কাটামাত্র সত্যি একটা এস-এম-এসও এসেছে মোবাইলে | প্যান-এশিয়ান গ্লোবাল ব্যাঙ্ক বলছে ওর অ্যাকাউন্টে আধাউন্টে আধঘন্টা আগে বিশ লাখ টাকা জমা পড়েছে | ডিপোজিটর জমবি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক |

মনোরেলে উঠে বাড়ির রাস্তা ধরল কুশ | বিষয়টা ক্রমশ ধরতে পারছে এখন | গেস করেইছিল | ময়াঙ্কের অপকম্ম সব | গ্যালাটিকে দেখার থেকেই হারামজাদার লোয়ার আউটলেট থেকে নাল ঝরা শুরু হয়েছিল | তক্কে তক্কে ছিল | কুশ বের হতেই ফ্ল্যাটে গিয়ে পটিয়েছে ওকে | কিংবা গ্যালাটি নিজেই পটেছে | কুশের নির্দেশও অমান্য করেছে | আসলে যন্ত্র হলে কি হবে |নারী-রুপী যন্ত্র যে | সুন্দর পুরুষ এবং সুন্দর বচনে না পটে যাবে কোথায় | কুশের অ্যাকাউন্ট নাম্বার দিয়ে থ্রি-এক্স ডিলে সাইন করেছে | ফোটোশ্যুট শুরু হলে বাকি টাকা আসবে | কিন্তু ‚ এত টাকা কেন ? না-মানুষী সেক্স-ভিডিওর তো ছড়াছড়ি চারিদিকে |তাছাড়া ভিপি ওইসব-ই বলল কেন ?

না | আর ভাবতে পারছে না কুশ | এতক্ষণে সত্যিটা বুঝেছে | বিরাট ষড়যন্ত্র আসলে | গহরা সাজিস | গ্যালাটি যে রোবো-গার্ল চেপে গেছে ব্যাঁটা | ঠক্করও আছে ওর সঙ্গে | দু’জনের ষড়যন্ত্র | সত্যিটা জানাজানি হলে বিচ্ছিরি কান্ড | সোসাইটিতে মুখ দেখাতে পারবে না| সবচেয়ে বড় কথা জালিয়াতির দায়ে পড়ে যাবে একেবারে | যৎসামান্য যা রেখে গিয়েছে গ্র্যানি সব নিলামে উঠে রাস্তায় বসবে ও |
ব্যাঙ্কে ফোন করল কুশ | রিসিভড মানি রির্টানের ভার্বাল মেসেজ দিয়ে দিল একটা | তারপর ময়াঙ্ককে কল করল | একবার | দু’বার | নো আনসার | রিসিভ করছে না হারামজাদা |

|| ৬ ||

গ্যালাটি আজ একটু বেশি খুশি খুশি যেন | ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনগুলো যেন বেশিরকম সজীব | সাজুগুজুও করেছে | স্টাইলটা ভিনটেজ |তবে মন্দ লাগছে না | হলদে শাড়ি | সবুজ ব্লাউজ | সিল্কি-সিল্কি চুলে ক্লিপ দিয়ে সাদারঙের একগুচ্ছ ফুল এঁটেছে | জেসমিনের ফ্লেভার | কাছাকাছি হলেই গন্ধটা নাকে আসছে | কিন্তু মুশকিল হচ্ছে গন্ধটা নাকি আসলেই কেমন একটা অস্বস্তি ফিল করছে কুশ | ময়াঙ্কের সঙ্গে কি কি ফস্টিনষ্টি করেছে কে জানে | এইসব শাড়ি ফুল সে ব্যাটারই ভেট হয়তো |

কুশ অবশ্য সব দেখেও না দেখার ভান করেছে | চুপচাপ ঘরে ঢুকে আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়েছে বিছানায় | না | কোনও ঝগড়া চেঁচামেচি করবে না ও | হার্টলেস একটা মেশিনের সঙ্গে কী নিয়ে মুখ লড়াবে | বরং কাল সক্কালে উঠেই কোনও ফিলানথ্রপিক রোবো-সেন্টারে ডোনেট করে দেবে যন্ত্রটিকে |চিন্তারও কিছু নেই | অ্যাডভ্যান্সের টাকা রির্টান হয়ে গিয়েছে | একটু আগেই কনফার্মেশন মেসেজ এসেছে মোবাইলে |

এবার কুশ সত্যি সত্যি মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে | গ্র্যানির সব বইপত্র পুড়িয়ে দেবে | তুলিটা ভেঙে ফেলবে | টেগোরের গানটান যা যেখানে আছে সব ডিলিট করে দেবে মেমরি থেকে | তারপর ? তারপরেও যদি কিসস্যু না হয় ‚কোনও সম্মানজনক কাজ না জোটে ‚ তখন মানুষের ভোল পাল্টে অ-মানুষ হবে ও | গায়ের চামড়া গ্রাফট করে হিউম্যানয়েড সাজবে | যন্ত্রের তো কাজের অভাব নেই এ যুগে |

‘আপনি রাগ করেছেন স্যার ?’- গ্যালাটি | কখন এসে দাড়িয়েছে অন্ধকারে | প্রশ্ন করছে কুশকে | প্রশ্ন! উত্তর দিল না কুশ!

‘আমি আপনাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম | আপনিই অনুমতি দিয়েছিলেন |’ নিজেই কৈফিয়ত দিচ্ছে সে |
তাই বলে নোংরা এগ্রিমেন্ট করে ? মিথ্যে কথা বলে ? রাগে উঠে বসল কুশ |

‘আপনি আমায় ভুল বুঝছেন স্যার | ফিসফিস করে বলল গ্যালাটি | আরও কাছে সরে এসেছে কুশের | পাশে বসল নরম করে | জেসমিনের সঙ্গে একটা অন্য সুবাসও ফিল করছে কুশ | কেমন একটা মন ভেজান গন্ধ | এটাই কি বহুখ্যাত ঐতিহাসিক সেই গন্ধ ? মোহিনী সুবাস |— সেন্ট অফ উওম্যান! ঘরে আলো জ্বলছে না | কেবল ডিজিটাল ঘড়ির লিকুইড ক্রিস্টালের অতি ক্ষীণ তরল আলো | সিল্যুয়েটের মতো লাগছে গ্যালাটিকে | সুডৌল বক্ষরেখায় যেন চাপা উত্তেজনার তরঙ্গ | হঠৎ সেই অস্বস্তিটা ফিরে এল কুশের | দুর্বল হয়ে পড়ছে ও | জোর করে নিজেকে শক্ত করল ও |
‘ঠিক আছে স্যার | আমি ক্ষমা চাইছি |’ গ্যালাটির বলে চলেছে, ‘কেবল আমাকে ভুল বুঝবেন না | মিথ্যে আমি একবারই বলেছি | কাল ফোনের অ্যালার্মটা আমিই অফ করেছিলাম | আপনার ভালর জন্যেই করেছিলাম | আজও যা করেছি তাও আপনারই জন্য স্যার | আপনাকে ফেরানর অন্য কোনও উপায় যে আমার ছিল না |’
আচকমা কুশের ডানহাতটা নিজের দু’হাতে ধরল গ্যালাটি | কেঁপে উঠল কুশ |যেন একরাশ গোলাপের পাপড়ি ছুঁয়ে দিয়েছে ওকে| এ স্পর্শ কস্মিনকালেও কোনও পলিইউরিথেন মেটিরিয়ালের হতে পারে না | বিবশ হতে হতেও সামলে নিল ও | হাতে ছাড়িয়ে নিয়েছে ঝটকায় |

‘তা তো বটেই | টাকাও আসবে | মস্তিও হবে | যন্ত্রেরও যে সুরসুরানি আছে জানা ছিল না | ময়াঙ্কের ঘরেই থেকে যেতে তো পারো |’

অদ্ভুত! রাগল না গ্যালাটি | যন্ত্র বলেই হয়তো | শান্ত অথচ কেমন কঠিন স্বরে বলল, ‘আপনি সত্যিই বুদ্ধিহীন হয়ে পড়েছেন | গোপনে কী কাজটা করতে পারতাম না আমি ? ডিলাটাও ফাইনাল ছিল না | একার নামেও করিনি | আসলে সত্যি কি জানেন, ময়াঙ্কেরও যে দৃষ্টি আছে সেটাও নেই আপনার | মানুষের যন্ত্রণা ফেরি করতে করতে আপনি নিজেও যন্ত্র হয়ে গিয়েছেন |

মস্তিষ্কে আগুন চড়ে গেল কুশের | কী অডাসিটি! একটা পাতি রোবাট হয়ে সৃষ্টিকর্তা মানুষের সঙ্গেই তর্ক | তাকেই কিনা মেশিন বলে তাচ্ছিল্য!

‘ইউ বিচ গেট আউট অফ মাই সাইট ইমিডিয়েটলি | আর কক্ষনো যেন এ বাড়িতে না দেখি আমি |’ চিৎকার করে বলল কুশ |

কেঁপে উঠল গ্যালাটি | তারপর উঠল | খুব ধীরে ধীরে উঠল | যেন খুব অভিমান হয়েছে | একবার চাইল কুশের দিকে | পর্যাপ্ত আলো নেই চোখের ভাষা পড়ার জন্যে | অবশ্য যন্ত্রের চোখে আছেও বা কি পড়বে | তবু কেমন অস্বস্তি হল কুশর | তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে নিল ও |

‘ইউ আর রাইট স্যার!’ কাঠ – কাঠ উচ্ছারণ করল গ্যালাটি | এতক্ষণে ঠিকে যন্ত্রের মতোই শোনাল ওর কন্ঠস্বর | ধীর পায়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ঘর থেকে | একটু বেশিরকম রুড হয়ে গেল কি কুশ ? না | ঠিকই আছে | লম্পট ময়াঙ্কের সঙ্গে কিনা ওর তুলনা |

সেডাটিভ খেয়ে শুয়ে পড়েছিল কুশ | তবু ঠিক যেন ঘুমটা হল না| ভোরনাগাদ চটকাটা ভেঙে গেল | গলাটা শুকনো লাগছে খুব | অভ্যাসমতো টেবিল হাতড়াতে জলের বোতলটা ঠিক পেয়ে গেল | রাতে খালি করে শুয়েছিল | গ্যালাটি ঠিক ভরে রেখেছে | এসব দিকে কোনও ত্রুটি নেই যন্ত্রকন্যার | দরকারি জিনিস ঠিক হাতের কাছে রেডি রাখে |
মনটা একটু খারাপ লাগল কুশের | যতই হোক ‚ গ্র্যানির খুব আদরের রোবো | একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলল কি ? খেতেও ডাকেনি কুশকে | বোঝাই যাচ্ছে ভালোরকম অভিমান হয়েছে ম্যাডামের |

উঠেই পড়ল কুশ | পা টিপে টিপে পাশের ঘরে এল | এ ঘরে কদাচিৎ আসে কুশ | গ্র্যানির ঘর | মাত্র ছ’মাস আগেও গ্র্যানি থাকত এই ঘরে | গ্যালাটি রেস্ট নিত ড্র্য়িংরুমের সোফায় | এখন এটা পুরোপুরিই গ্যালাটির ঘর | কুশ শুয়ে পড়লে সেও এসে মানুষের মতোই টানটান হয়ে যায় বিছানায় | স্ট্যান্ডবাই মোডে থাকে হয়ত | ভার্বাল কম্যান্ডেই উঠে আসে আবার | কুশ অবশ্য কখনও ডেকে দেখেনি | দরকারও পড়েনি | বিছানা ছাড়ার আগেই স্মাইলিং এক্সপ্রেশন নিয়ে সদা হাজির হয়েছে যন্ত্রমানবী |

অন্ধকার ঘর | দেওয়াল হাতড়ে নাইটবাল্বটা জ্বালল কুশ | কিন্তু গ্যালাটি কোথায় ? শূন্য ঘর | বিছানায় পড়ে আছে গ্যালাটির পরা কালকের সেই হলদে শাড়ি | সবুজ ব্লাউজ | রেশমচুলে ক্লিপ করে লাগান জুঁইয়ের থোকা | ফুলগুলো হাতে নিয়ে গন্ধ শুঁকল কুশ | আশ্চর্য! এ তো আসল ফুল! কাল ভাবছিল সিন্থেটিক নকল ফুল | এগুলো কোথায় পেয়েছিল গ্যালাটি | সত্যি ফুল এখনও ফোটে নাকি ? ফুটলেও সে ফুল পেল গ্যালাটি ? আবার একটা চোরা সন্দেহের স্রোত বইতে শুরু করেছে মনে | শাড়িটা অবশ্য চিনেছে | গ্র্যানির প্রপার্টি |

কিন্তু সে গেল কোথায় ? কিচেন টয়লেট ড্রয়িংরুম কোথাও নেই | একলা বাইরেও সে বেরয় না | বুকটা এবার সত্যিই দুরুদুরু করছে কুশের | তবে কি ময়াঙ্কের কাছেই চলে গেল ? ফোন করে দেখবে নাকি ?
নিজের ঘরে মোবাইল হাতে নিতে বুকটা ধক করে উঠল কুশের | টেক্সট মেসেজ রেখে গিয়েছে গ্যালাটি কয়েকটি লাইনের সংক্ষিপ্ত বার্তা :

আমি চলে যাচ্ছি স্যার | জানি না কেন ‚সেকেলে মানুষের কিছু বাতিল গুণ জন্মেছে আমার মধ্যে | অ্যাটাভিজম বলতে পারেন | কিংবা ডিসট্যান্ট মেটামরফোসিস | অকারণ | সন্দেহ সহ্য হল না | ব্যালকনিতে গেলে দেখবেন জুঁই ফুটিয়েছিলাম | সেই ফুল আমার চুলে দেখেছিলেন | গন্ধ পেলেন | ফুলও হয়তো ভাল লাগল | কিন্তু উৎস নিয়েই ভেবে গেলেন | আশা করি ‚শাড়িটাও এতক্ষণে চিনতে পেরেছেন | কোথায় যাব ‚ জানি না | খুঁজবেন না | তবে যন্ত্রের ঘরে ফিরব না!

থম হয়ে বসে রইল কুশ | বুকটা ফেটে যাচ্ছে কেমন | গতরাত্রের দৃশ্যগুলো ক্যালাইডোস্কোপের মতো মস্তিষ্কের কোষে কোষে রি-লোড হয়ে চোখের পর্দায় ফুটে উঠছে পর পর | একটা অসম্ভব সম্ভাবনায় তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সব | চিন্তাশক্তি কাজ করছে না কিচ্ছু | এ কী ভীষণ রহস্য! মানুষ মেশিন না মেশিন মানুষ ?

পায়ে পায়ে ব্যালকনিতে এসে দাড়াল ও | ঘোলাটে আকাশে ভেরের আভা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে | দিনের পৃথিবী জেগে উঠছে |- এবং সত্যিই তো | চল্লিশবর্গফুটের সীমিত পরিসরে কয়েকটা টেরাকোটা টব | ভোরের বাতাসে কাঁপছে ফুলেভরা কতগুলো জুঁইগাছ | না, সত্যি মেশিন হয়ে গিয়েছে ও | কতদিন নিজের ব্যালকনিতেই দাড়ায় না |
হাঁটু মুড়ে বসে ফুলগুলো স্পর্শ করল কুশ | নাক লাগিয়ে ঘ্রাণ নিল | কি মিষ্টি গন্ধ | কাল যেমন গ্যালাটির শরীর থেকে বেরচ্ছিল | …না ঠিক যেন তেমন নয় | কী একটা নেই | কী? সেটাও জানে ও | সেন্ট অফ উওম্যান মোহিনী সুবাস | বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠল কুশের | ফুলগুলো গালের কাছে চেপে ধরল জোরে | তারপর দ্রুত বেরিয়ে এল বাইরে | পৃথিবী এখনও গোল | কোথায় যাবে ওর গ্যালাটি!

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.