অটোগ্রাফ

485

বিকেলের নরম আলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে ভিড়ভর্তি বইয়ের দোকানগুলো | কাঁধের ঝোলাব্যাগ সামলে এগোচ্ছি সেই ভিড়ের মুখ দেখতে দেখতে | সবাই হন্তদন্ত হয়ে ঘুরছে বইয়ের খোঁজে | আমরা যারা বইপ্রেমিক, তারা এই বইকাতর মানুষগুলিকে একটু এক্সট্রা সমীহের চোখে দেখি |

কলেজ স্ট্রিটের এই বইজগতে আমারও নিত্য ঘোরাফেরা | সপ্তাহে একদিন কলেজ স্ত্রীতে গিয়ে খোঁজ করি নতুন বইগুলোর হালহকিকত | সেদিনও ঘুরতে ঘুরতে গিয়েছি এক প্রকাশকের ঘরে, সেলস-কাউন্টারে উপুড়ঝুপুড় ভিড় দেখে ভাবছি যাঁরা বিমর্ষ হন বাংলা বই আর কেউ পড়ে না তাঁদের ডেকে এনে দেখায় দৃশ্যটা | মাঝেমধ্যে চোখে পড়ছে সেই বিরল পাঠকশ্রেনির মুখের দিকে আর মনের মধ্যে আঁকছি তাঁদের অভিব্যক্তি |

ভিড়ের মধ্যে হঠাত নজর কাড়ল এক বোরখা-পরিহিতা | সর্বাঙ্গ কালো বোরখায় আড়াল করা, শুধু মুখের আবরণটি সরানো | দোকানের র্যা কে আকুল নয়নে খুঁজছে তার কাঙ্খিত বইগুলি |

এক ঝলক তার মুখের দিকে চোখ রাখি, একুশ-বাইশের মতো বয়স, ফরসা গায়ের রং, চোখে চশমা পরা | খুবই সুন্দর তার মুখ | চোখ কাড়ে একজোড়া শান্ত, সুন্দর চোখ | একটু পরেই দু’হাতে ছাপাছাপি বই, কাঁধে একটি ব্যাগ |

আমার কাঁধেও বইভর্তি একটি ব্যাগ | বইয়ের ভারে টনটন করছিল কাঁধটা | সামনেই একটি খালি বেঞ্চি দেখে একটু বসি জিরেন নেওয়ার অভিপ্রায়ে |

কিছুক্ষণ পরেই দেখি মেয়েটি এসে বসলো আমারই পাশে | বোধহয় তার বান্ধবী তখনও কাউন্টার থেকে বই পায়নি, সে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে তার জন্য | বেঞ্চিতে বসে নতুন কেনা বইগুলো দেখছে উল্টেপাল্টে | আবার এক ঝলক তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি নতুন বই হাতে পাওয়ার পর তার মুখ উজ্জ্বল আর খুশিতে ভরপুর |

তার দিকে আর মনোযোগ না দিয়ে আমি আবারও কাউন্টারে ভিড় করে থাকা পাঠকদের মুখ দেখতে থাকি | একজন পাঠক যেমন আর একজন পাঠককে শ্রদ্ধার চোখে দেখে, তেমনই দেখতে থাকি তাদের | অনেকেই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, পাঠ্যসূচির চাপে বই কিনতে এসেছে দোকানে |

ইতিমধ্যে এক তরুণ কবি বই কিনতে এসে হঠাত আবিষ্কার করেছে আমাকে | হাসি-হাসি মুখে কুশল জিজ্ঞাসা করে বলল তার একটি নতুন কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে, বলে তার ব্যাগ থেকে বার করলো বইটি | দ্রুত তার পৃষ্ঠায় আমার নাম লিখে দিয়ে এগিয়ে দিল,পড়বেন কিন্তু |

বইটা হাতে নিয়ে তখনই দু-তিনটি কবিতা পড়ে নিয়ে আলোচনা শুরু করি নানা বিষয়ে | সে চলে যেতে বইটা খুলে পড়ছি, হঠাত এক বিস্ময় | এতক্ষণ আমার পাশে বসে বোরখা-পরা মেয়েটি শুনছিল তরুণ কবির সঙ্গে আমার কথোপকথন | হঠাত মৃদু গলায় বলল, আপনার একটা অটোগ্রাফ পেতে পারি?

–অটোগ্রাফ! আমি একটু অবাক হই, বলি, তুমি তো আমাকে চেন না! অটোগ্রাফ নেবে কেন?

মেয়েটি হেসে বলল, চিনি না ঠিকই, কিন্তু আপনাদের কথা শুনে বুঝতে পারলাম আপনি কেউ একটা হবেন |

মেয়েটি তার ব্যাগ থেকে বার করলো তার একটি নোটবই, তার পৃষ্ঠা খুলে এগিয়ে দিল আমার দিকে |

আমি তখনও ঘোর অস্বস্তিতে | আমাকে ভালো করে চেনে না. আমার বই পড়েছে কি না তাও জানি না তাও অতগ্রাফা চাই! জিজ্ঞাসায় জানতে পারি সে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্রী, কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হবে তার ফাইনাল সেমিস্টারের পরীক্ষা | থাকে নিউ টাউনে |

বাংলার ছাত্রী বলে বেশ সমীহ বোধ করি তার সম্পর্কে | তার এগিয়ে দেওয়া নোটবইটা হাতে নিতে পরিক্ষনেই সে বাড়িয়ে দিল কালো রঙের একটি পেন | পেন দিয়ে নোটবুকে সই করে দিতে আরও বলল, শুধু সই করলে হবে না, কিছু লিখে দিন আমাকে |

দ্বিরুক্তি না করে তার নামটা জেনে নিয়ে লিখলাম, ভালো থেকো,জয়ী হও |

অটোগ্রাফ পেতে ভারী উল্লসিত দেখালো তার মুখ | প্রকাশকের সঙ্গে কাজ সেরে একটু পরেই ফিরে আসি বাড়িতে | হ্যাঙ্গারের সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম খুলতে গিয়ে হঠাত কী যেন চোখে পড়তে চমকে উঠি ভীষণ | আরে, আমার পকেটে এই কালো পেনটা কোত্থেকে এলো!

আমি সাধারণত ব্যবহার করি সবুজ পেন, চাকুরীজীবনের প্রথম দিন থেকেই সবুজ কালিতে আমি বেশি স্বচ্ছন্দ, অথচ তার পরিবর্তে কালো রঙের পেন দেখে আমি কিছুক্ষণ হতচকিত |

ততক্ষনাত মনে ভেসে উঠলো সেই বোরখাধারিনীর মুখ, আমার পকেটে পেন না থাকায় তার পেনটি আমার হাতে দিয়েছিল অটোগ্রাফ নেওয়ার সময় | নোটবইতে আমার স্বাক্ষর দেওয়ার অবব্যহিত পরে অভ্যাসমত পেনটি নিজের পকেটে ভরে ফেলেছি, তখন একবারও মনে পড়েনি, পেনটি আমার নয় | মেয়েটিও নিশ্চয় আমার কান্ডটি প্রত্যক্ষ করেছে, হয়তো চোখ বড় বড় করে দেখেছে আমি কী অভব্যের মতো তার পেনটা ভরছি আমার পকেটে, কিন্তু লজ্জায় বলতে পারেনি, পেনটা আমার |

আমি কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকি আয়নার সামনে | বুঝে উঠতে পারি না এই মুহূর্তে আমার কী করনীয় | আমার এই অমার্জনীয় অপরাধ সে কী চোখে দেখেছে কী জানি! মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তে তার কাছে গিয়ে ফেরত দিয়ে আসি পেনটা | অথবা একটা ফোন করেও তাকে বলতে পারি, পেনটা ভুলে ভরে ফেলেছি পকেটে, পেনটা ফেরত দিতে চাই |

মনে পড়ে গেল তার যে নামটা তখন নোটবুকে লিখেছিলাম, কিন্তু শুধু নাম জানলে তো কাউকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় | এক উপায়ে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তার খোঁজ করা | কিন্তু একজন অচেনা লোক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একটি মেয়ের খোঁজ করছে, তার পরিনাম কী হবে কে জানে!

বিষয়টা মাথার মধ্যে খচখচ করতে থাকে সারা রাত | অন্যের জিনিস এভাবে নিয়ে আসা খুবই অন্যায় কাজ | মেয়েটি আমার সম্পর্কে কী ভাবছে তা ভেবে-ভেবে অস্থির লাগছে | কীভাবে কলমটা তাকে ফেরত দেওয়া যায় এমন ভাবতে ভাবতে রাত পার হয়ে যায়, পরদিন সকালে উঠে সিদ্ধান্ত নিই মেয়েটি হয়তো ওই প্রকাশকের কাছে আরও বই কিনতে আসতে পারে | কলমটি একটি প্যাকেটে করে রেখে আসতে পারি সেখানেই | অতঃপর নিজের অপরাধ মোচনে কলমটিকে প্রকাশকের দরবারে গচ্ছিত রেখে বলে এলাম, দেখো, মেয়েটি যদি আসে, মনে করে দিয়ে দিও কলমটি |

জীবনের একটি আশ্চর্য এপিসোড যা ঘটে গেল আমার সামান্য অমনোযোগে তা সারাক্ষণ রইলো মগজের অনেকখানি জুড়ে | নিরন্তর একটা আলপিন ফুটে চলেছে মনের গহন কোণগুলিতে | এক টুকরো খিচখিচ ক্রমশঃ বিশাল হয়ে ছেয়ে ফেলছে গত চরাচর | ঘুরছি ফিরছি, আর মনে হচ্ছে কালো বোরখার অবগুণ্ঠনের ভিতর দিয়ে একজোড়া চোখ আমাকে অনুসরণ করছে সারাক্ষণ |

আমি তার নোটবুকে যেমন রেখে এসেছি আমার অটোগ্রাফ, সেও আমার মনে রেখে গেছে তার অটোগ্রাফ |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.