সাবেক বাড়ি, পুরনো অসুখ

আমাদের বাড়িটার বয়স তিনশো বছরের কাছাকাছি | তেতলার ছাদের মাঝখানে একটা টানা লম্বা ধাপ | সেটি চলে গেছে এ পাঁচিল থেকে সে পাঁচিল – বরাবর সিধে | বাড়িটার গড়ন এত উঁচু যে ওপর থেকে নিচের এলাকা খুবই ক্ষুদ্র দেখায় | এমনকি মানুষজনও |

শীতের দুপুরে আমার মা এই ছাদে বয়েম করে কুলের আচার আর আমতেল শুকোতে দেয় | যেহেতু ছেলেবেলা থেকেই শীতকালে আমার বনেদি শ্বাসরোগ বেড়ে যায় তাই দুপুরে এই ছাদে বসে আমি রোদ পোয়াই , মাথায় চাদর জড়িয়ে | ছাদের ধাপে আচার শুকোয় | এক পাশে চৌকোনা টিনের টবে ফনীমনসার গাছ বাজ থেকে বাড়ি রক্ষা করে চলে | তার গায়ে উড়ে আসা কাকও বসে না | যেমন কিনা এই সাতাশ বছর বয়সেও আমি বিয়ে করতে ভয় পাই ওই রোগের কারণে | ইনহেলার সম্বল জীবনে অন্য একটি প্রবল শ্বাসী মেয়ের ভরসা কেমন করে নিই!

তাহলেও আমার চেহারায় এই ব্যধির কোনো দাগ পড়ে না | মুখ এখনও টুলটুলে লাবণ্য ধরে রেখেছে শরীরের যাতনা চাপা দিয়ে | ফলে মেয়েরা আমায় পছন্দ করে | তারা জানে না আমার এই ব্যামোর কথা | আমাকে বলে – এ আবার রোগ নাকি! এখন তো প্রায় ঘরে ঘরে একজন করে হাঁপানি রোগী | কিন্তু এ কথায় আমার মন থমকায় না | নিজেকে কিরকম বুড়ো বুড়ো মনে হয় | এই অসুখটা যেন বৃদ্ধদেরই মানায় | তবু আমি স্থানীয় স্কুলে মাস্টারি করি | শরীর বিগড়োলে কামাই | ফলে শীতকালে প্রায়ই ছুটিতে থাকতে হয় |

স্কুলটা কো-এডুকেশন | অনেক সুন্দরী ছাত্রী আমায় পছন্দ করে | কাছাকাছি এসে নোট বুঝে নেয় | আমি যেহেতু পলিটিকাল সায়েন্স পড়াই তাই নোট দিই ক্লাস টেন থেকে | আমার নোট নাকি সোজা আর টু দি পয়েন্ট | তার বাইরেও যে তাদের অনেকেরই আমার প্রতি একটা চাপা আকর্ষণ আছে এটা আমি বুঝতে পারি বেশ ভালোই | কিন্তু আমি যে সব সময় মরমে মরে থাকি এটা তাদের বোঝাই কি করে! মনে হয় তারা যদি জেনে ফেলে আমার এই ব্যধির কথা তাহলে আমায় ঘেন্না করবে | আমার কাছাকাছি আসবে না |

আমার মনে পড়ে আমার সেই ক্লাস টেন বেলায় একবার ক্লাসে একজন মাস্টারমশাই কি একটা কথার পৃষ্ঠে আমার এই রোগের কথা সবার সামনে ঘোষণা করেছিলেন | আমার ভাবলে সব গুটিয়ে যায় – সেদিন আমার পাশে বসা বন্ধুরা নাকে মুখে রুমাল চাপা দিয়েছিল | এখনকার দিনে এরকমটা ভাবা যায় না |

easy-chairএমনকি সে বয়সে কোনো বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠানে আত্মীয় বাড়ি যেতেও আমার ভয় করত | বিশেষ করে আমার বাবার এক মামা দেখা হলেই সবার সামনে রীতিমতো গলা তুলে বলতেন, হ্যাঁরে – তোর হাঁপানি এখন কেমন? মনে হত মাটি ভেদ করে ভেতরে চলে যাই | চারদিকে এত সুন্দরী, সাজগোজ, বেল গোড়ের মালা – তার মধ্যে হাঁপানি! সেই লোকটি আমার পেছনে ধাওয়া করতেন – আমি সরে যেতে চাইলেও | কী রে, মাথায় মাফলার দিসনি কেন রে? তোর তো হাঁপের টান!

আমার বাবা ছোটখাটো হলেও এখনও হেঁকোডেকো গড়ন | এককালে কলকাতার নাম করা দলে ফুটবল খেলতেন | এখনও শীত ভোরেও কুয়োর জল মাথায় উপুড় করে ঢালেন | তারপর হাফ হাতা সোয়েটার পরে সাইকেল চড়ে বেরিয়ে যান নানা কাজে | তাঁর ছেলে বলে পরিচয় দিতে আমার লজ্জা হয় | তাঁর হাঁটার স্পিডের সঙ্গে আমি পেরে উঠি না |

আজ সকালে ঘটল এক কান্ড যা আগেও ঘটেছে অগুন্তিবার |আমার দাদুর কাছে যে মেয়েটি একদা ইংরেজি পড়তে আসতো বিনি দক্ষিণায় সে হঠাৎ এসে হাজির আমার তেতলার চিলে কোঠায় – আমার পড়ার ঘরে | আমার চেয়ে বয়সে খানিক বড় এই দিদিসমা মেয়েটি এসে আমার চেয়ারের হাতলে বসে পড়ল | আমি স্বাভাবিক অস্বস্তিতে বলি – আরে চেয়ারটা তো পলকা | ভেঙে পড়বে | অনিমা অমনি কোনো সুযোগ না দিয়ে আমার গলা জাপটে ধরে বলে, পড়বে না, পড়বে না | আমি তখন উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করি | সে অমনি আমায় আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে | তার মুখটা আমার মুখের কাছে নিয়ে আসে | সত্যি কথা বলতে কি আমার গা গুলিয়ে বমি পাওয়ার অবস্থা হয় – মুখের অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ | এমন দুর্গন্ধ আমি অনেক মানুষের মুখে পেয়েছি | কিন্তু এমন ধবধবে ফর্সা যুবতীর মুখ থেকে প্রাণঘাতী এই গন্ধ আমি ভাবতেও পারিনি | আমি অনিমাকে  দু হাতে ঠেলে ধরে কোনোরকমে নিবৃত্ত করি | দমবন্ধ স্বরে বলে উঠি, আমার অ্যাজমা আছে – সরে যাও সরে যাও | সে চোখ মুখ লাল করে ফুঁসে ওঠে, ওটা আবার রোগ নাকি!

অথচ এই আমিই ইচ্ছে সত্ত্বেও একজনকে চুমু খেতে পারিনি | আমি জানি সে আমায় কোনো বাধাও দিত না | সেই পরমার সঙ্গেও আমার চাপা প্রেম চলেছিল অনেক দিন | তার মাস্টারমশাই বাবার কাছে আমি মাঝে মাঝে পল সায়েন্স পড়তে যেতাম | ভদ্রলোক পড়াশোনার চেয়ে বকবক করতেন বেশি অন্য সব পাঁচ কথায় গিয়ে | তবে মাঝে মাঝে বাইরের ঘরে তার সঙ্গে দেখা হত | হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতে বসেছে | আমায় সোফায় বসতে বলত | প্রায়ই আমার অনুরোধের কিছু গান শোনাত | আমি প্রায়ই –‘বঁধু নিদ নাহি আঁখি পাতে’ গানটা শোনাতে বলতাম | সে প্রাণ ঢেলে গাইত তার অনবদ্য মিষ্টি আর চিকণ গলায় | বাইরের বারান্দায় এগিয়ে দিতে আসত | সেখানে দাঁড়িয়ে টুকটাক সাধারণ কথা হত | একদিন সে আমার হাতে বাগানের বেলফুল তুলে দিয়েছিল – কতক শেষ হতে না চাওয়া ধরণে | সেদিন শুনি তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে – এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে | সেদিন চলে আসার সময় হঠাৎ বলে উঠেছিল, তুমি যেন কোনোদিন বিয়ে করো না | কেন যে একথা বলল তা আমার কাছে স্পষ্ট হয়নি | সেদিন আমার খুব ইচ্ছে করেছিল তাকে চুমু খেতে | মনে হয়েছিল ওই ছোটখাটো ঠোঁটে আর মুখে বুঝি সত্যি সত্যিই পদ্ম গন্ধ লেগে আছে | পরে মনে হয়েছিল সে কি আমার শ্বাস অসুখটার কথা জানত!

দুপুর অনেকটাই গড়িয়ে গেছে | এখন রোদের ঝাঁঝ ঝরে এসেছে | খানিক পরেই নিচে নামব | ছাদে বসে চারপাশের বড় বড় গাছগুলো দেখি | লম্বা লম্বা নারকোল গাছ, গায়ে গায়ে আম-কাঁঠাল-বেল গাছের ঝাঁকড়া ঝাড় | গাছেদের মাথায় বেলা ফুরনোর লালচে রোদ ঘুরে বেড়াচ্ছে | ছোটো ছোটো পাখি উড়ছে | ডাকছে এক নাগাড়ে কিচির মিচির | দূরে কথায় মাইকে গান বাজছে | নিচের রাস্তা দিয়ে বেল দিতে দিতে সাইকেল যাচ্ছে | কে যেন পুকুর থেকে হাঁস ডাকছে – চৈ চৈ চৈ | সিঁড়িতে পায়ের শব্দ তুলে আমার ছোটো বোন বাণী এসে দাঁড়ায় | তার হাতে চায়ের কাপ |

– দাদা, চা |

– রাখ |

বাণী তাকায় আমার চোখে | তারপর বলে, মাকে ও পাড়ার অমলা পিসী আজ একটা কথা বলছিল |

আমি তার দিকে চোখ তুলি |

– বিয়ে করলে নাকি শ্বাসকষ্ট সেরে যায় |

– সে আবার কি |

– হ্যাঁ, বলল তো |

আমি একটু চুপ করে থাকি | তারপর বলি, তাহলে তো এমন একটা মেয়ে দেখতে হয় যার হাঁপানি আছে |

বাণী সামান্য হাসে, – মেয়েরা রোগ চেপে রাখে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.