ফিরব

1676

হাত ঘুরিয়ে ঘড়ি দেখলাম | ন’টা বাজে | নটা বেজে সাত মিনিট | সাত না আট মিনিট | স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম | টাইমের মধ্যেই ফিরেছি | স্বপ্না খুশি হবে | মুখে কিছু বলবে না, হাবভাবে বুঝিয়ে দেবে | তার আচার আচরণ বলবে, সে আমাকে মনে মনে ‘গুড বয়’ বলছে | না না, ‘গুড বয়’ নয়, গুড স্বামী |

আমি বাড়ির দিকে না গিয়ে বাজারের দিকে হাঁটলাম | বুটির জন্য একটা পটেটো চিপসের প্যাকেট কিনে নিয়ে বাড়ি ঢুকব | বুটি খুশি হবে | আজ সকালেই বুটি আমার কানে কানে বলে দিয়েছে |

‘অফিস থেকে ফেরবার সময় আমার জন্য চিপস আনবে বাবা | নরমালটা আনবে চিলিটা আনবে |’

আমিও গলা নামিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা আনব | কিন্তু চিলিটা তো ঝাল হবে |’

বুটি চট করে দরজাটা দেখে নিয়ে বলল, ‘ঝাল হবে বলেই তো চিলি আনবে | তুমি কিন্তু মাকে বলবে না |’

আমি হেসে বললাম, ‘আচ্ছা বলব না | তবে এই নিয়ে মাসে ছ’দিন হয়ে গেল, আর নয় | আর চাইবে না | কেমন?’

বুটি ঘাড় কত করে বলল, ‘আচ্ছা আর চাইব না |’

পটেটো চিপস পেলে বুটি আর কিছু চায় না | হাতে প্যাকেট দিলে আগে আমার গলা জড়িয়ে একটা চুমু দেবে | স্বপ্না পছন্দ করে না | রাগারাগি করে |

‘মেয়েকে এই সব হাবিজাবি খাওয়ানো বন্ধ করো |’

আমি বলি, ‘আহা! ছোটো মানুষ একটু হাবিজাবি তো খাবেই | আমরাও খেয়েছি | তুমি খাওনি? হজমি গুলি, কাঠি আইসক্রিম? খাওনি?’

স্বপ্না রাগ করে বলে, ‘তোমার মেয়ে ছোটো মানুষ! আর কতদিন ছোটমানুষ থাকবে তোমার মেয়ে? এগারো বছর বয়স হয়ে গেল |’

আমি চোখ বড় করে বলি, ‘এগারো! তাহলে তো অনেক বড় হয়ে গেল | মেয়ে আমাদের বুড়ি হয়ে গেল বলতে পারও |’

স্বপ্না রসিকতায় আরও রেগে যায় | বলে, ‘ঠাট্টা করবে না | এখন থেকে যদি রাশ টেনে না ধর, পরে সামলাতে পারবে না | মেয়ে চাইলেই জিনিস দেওয়ার অভ্যেসটা বন্ধ করও | তাছাড়া এসব খাওয়া ভাল নয় | মেয়ে মোটা হয়ে যাচ্ছে |’

আমি অবাক হয়ে বলি, ‘মোটা! বুটি মোটা হয়ে যাচ্ছে! ও তো যথেষ্ট রোগা স্বপ্না | বেশি করে খাওয়া উচিত |’

স্বপ্না কঠিন চোখে তাকিয়ে বলে, ‘মেয়ের খাওয়ার বিষয়টা আমার হাতে ছাড়লেই ভাল হয় না? তুমি এটা নিয়ে দয়া করে মাথা ঘামাতে এসও না | বুটির বেশি করে খাওয়া উচিত ঠিকই, তবে সেটা পটেটো চিপস নয় | সেটা ভাত, দুধ, মাছ | বুঝেছ?’

আমি বাধ্য স্বামীর মত ঘাড় নাড়ি | আমার বউ একজন সংসারি মহিলা | নরমাল  সংসারি নয়, বাড়াবাড়ি সংসারি | এই মেয়ের জন্মই নাকি সংসার লগ্নে | বিয়ের আগে যখন আমরা ফাইনাল মেয়ে দেখতে যাই তখন স্বপ্নার ছোটমামা হাসতে হাসতে এই রসিকতা করেছিলেন |

‘আমার ভাগ্নি গান বাজনা সেলাই বোনা পারে কিনা জানি না, তবে সংসার করতে যে পারবে এই ব্যাপারে হান্ড্রেড পার্শেন্ট গ্যারান্টি | খুব অল্প বয়েস থেকেই ওর ওদিকে ন্যাক | রান্নাবান্না, তেল মশলার হিসেব, ঘরদোর সাফসুতরো, সবার জন্য গুছিয়ে জিনিসপত্র কেনা – সব পারে | করতে ভালোওবাসে | কাউকে ছাড়তে চায় না | আমার তো মনে হয়, স্বপ্না জন্মেছে সংসার লগ্নে | হা হা |’

ঘটনা তাই | বিয়ের চোদ্দ বছর হয়ে গেল আমার সংসারের কন্ট্রোল নিজের হাতে রেখেছে স্বপ্না | খুঁটিনাটি সব ডিসিশন তার | এই যদি আমি না এনে স্বপ্না নিজে মেয়ের জন্য পটেটো চিপস আনত তাহলে কোনও সমস্যা হত না | অথবা আমি যদি ওকে জিজ্ঞেস করে আনতাম তাহলেও রাগারাগি করত না | করলেও অল্প করত | আমি নিজে ইচ্ছে করেই ওকে বলিনি | এই যে লুকিয়ে এনেছি, এতে বাপ মেয়ের মধ্যে একটা বেশ মজার সম্পর্ক থাকে | সংসারে স্বপ্না মজা পছন্দ করে না | সে মনে করে সংসার চলবে নিয়ম মেনে এবং সেই নিয়ম ঠিক করবে সে নিজে | আমার মনে হয়, এটা একধরনের সাইকোলজি | ‘সংসার আমার’ সাইকোলজি | বউয়ের এই স্বভাবের জন্য অনেক পুরুষমানুষই রেগে যায় | ঘরে মাতব্বরি করতে না পারলে তাদের হয় না | রোজকার বাজার কী হবে থেকে শুরু করে কাজের মাসির কামাই পর্যন্ত সব ব্যাপারে নাক গলাতে চায় | আমি একেবারেই সেই দলে নেই | বউ মেয়ে নিয়ে সংসারে থাকতে আমার খুবই ভাল লাগে, কিন্তু সংসারের কোনও কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে মোটে রাজি নই | স্বপ্নার ‘সংসার আমার’ সাইকোলজির কারণে আমি সুখে আছি | বাড়ির কোনও ঝামেলা আমার ঘাড়ে এসে পড়ে না | বাজার থেকে কাজের মাসি কোনও ভাবনাচিন্তা করতে হয় না | আমি আমার মত থাকতে পারি | সকালে চা খেয়ে স্বপ্নার দেওয়া লিস্ট মিলিয়ে বাজার করে আনি | পায়ের ওপর পা তুলে কাগজ পড়ি | তারপর স্নান করে খেতে বসি | স্বপ্নার নিয়মমত শুরুতে তেতো আর শেষ পাতে টক দই খাই |স্বপ্না জামা-কাপড় বেছে রাখে | সেই পোশাক পরে সোনা মুখ করে অফিস চলে যাই | বুটি হবার আগে অফিস যাবার আগে রোজ স্বপ্নকে চুমু খেতাম | বুটি হবার পরও খাই তবে রোজ হয় না | অফিস ছুটির পর কোনও কোনওদিন ক্লাবে গিয়ে তাস খেলি, কোনওদিন সোজা বাড়ি | স্বপ্না জলখাবার দেয় | কখনও মুড়ি বাদাম, কখনও পরোটা আলুরদম | স্বপ্না মেয়েকে পড়ায় | আমি টিভি দেখি | নিউজ দেখি, কুইজ দেখি | মেয়েকে মাঝে মাঝে ডাকি | স্বপ্না আসতে দেয় না |

‘আসুক না | কুইজ প্রোগ্রাম দেখলে নলেজ বাড়বে |’

স্বপ্না বলে, ‘টিভি দেখে নলেজ বাড়াবার কোনও প্রয়োজন নেই | নলেজ বাড়াবার জন্য বই আছে, স্কুল আছে, স্কুলের এক্সাম আছে | খবরদার মেয়েকে ডাকাডাকি করবে না |’

মনে মনে আমি খুশি হই | সংসারে একজন কড়া মানুষ থাকা ভাল | কড়া মানুষ হাল ধরে | সংসার ঠিক পথে চলে | শুধু টিভি বা চিপস নয়, মেয়ের আচার আচরণের ব্যাপারেও স্বপ্না যথেষ্ট নজর রাখে | আমি যেমন আদর দিই, স্বপ্নাও দেয়, তবে শাসনও করে | শাসন করবার সময় সে নির্মম | মাস কয়েক আগে স্কুলের ব্যাগে শাহরুখ খানের ফটো পাওয়া গেল | ফুটপাথে চার আনা ছ’আনায় ফিল্মস্টারদের যেসব ফটো বিক্রি হয় ওইরকম | মায়ের জেরে বুটি জানাল, এই ফটো তার বন্ধুর | ভুল করে তার ব্যাগে চলে এসেছে | তার কোনও দোষ নেই | স্বপ্না শুনল না | মেয়েকে শাস্তি দিল | আয়নার সামনে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখল | মুখ নামলে চলবে না, মুখ তুলে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে | নিজের শাস্তি নিজেকে দেখতে হবে | লজ্জায় বুটি ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল | আমি স্বপ্নকে বললাম, ‘আহা, ছোটো মেয়ে ভুল করে করে ফেলেছে | ছেড়ে দাও |’ স্বপ্না আমাকে ধমক দিল |

‘মেয়েকে কীভাবে মানুষ করতে হয় আমি বুঝব | আজ স্কুলের ব্যাগে ফিল্মস্টারের ফটো নিয়ে ঘুরছে কাল স্কুল পালিয়ে হলে চলে যাবে | তুমি নাক গলাবে না |’

বুটির জন্য আমার খারাপ লাগল, তবে আম্মি ভেবে দেখলাম, কথাটা স্বপ্না ঠিক বলেছে | ছেলেমেয়ে মানুষ করার জন্য কড়া হতে হয় |

শুধু মেয়েকে নয়, স্বপ্না আমাকেও শাসন করে | কদিন ক্লাব থেকে তাস খেলে ফিরতে দেরি হয়ে যাচ্ছিল | একদিন রাত সাড়ে দশটা বেজে গেল | রাতে বাড়ি ফেরার পর মুখে কিছু বলল না স্বপ্না, নিজে অনশন করল | রাতে খেলই না | অনেক সাধ্য সাধনা করেও লাভ হল না | মেয়েকে নিয়ে ঘরের দরজা আটকে দিল | আমি ড্রইংরুমের ডিভানে গিয়ে শুলাম | আমরা তিনজনে এক খাতেই শুই | যেদিন ভালবাসাবাসির ইচ্ছে হয়, মেয়ে ঘুমনোর পর আমি আর স্বপ্না ড্রইংরুমে চলে আসি | সেদিন রাতে স্বপ্নকে আদর করতে খুব ইচ্ছে করছিল | দরজায় টোকা দিলাম | স্বপ্না খুলল না | পরদিন স্বপ্না টাইম বেঁধে দিল | দশটার মধ্যে বাড়িতে ঢুকতে হবে |

‘আমি কী ছেলেমানুষ যে দশটার মধ্যে বাড়িতে ঢুকতে হবে?’

স্বপ্না বলল, ‘ছেলেমানুষ নয় বলেই তো দায়িত্ব বেশি | ভদ্রলোক রাত দশটায় বাড়ির বাইরে থাকবে কেন? ছিঃ | মেয়ে বড় হচ্ছে | সে কী ভাববে?’

আমি বললাম, ‘আরে বাবা, আমি তো মদ গাঁজা খাওয়ার জন্য বাইরে থাকি না | ক্লাবে তাস খেলতে খেলতে দেরি হয়ে যায়|’

স্বপ্না বলল, ‘ওই একই হল | কী করছো সেটা বড় কথা নয়, বাইরে আছো সেটাই বড় কথা | কাজের জন্য বাইরে থাকতে তার একটা মানে হত, শুধু আদ্দাবাজির জন্য থাকবে সেটা কেমন কথা? তোমার মেয়ে যদি তাস পাশা খেলে বেশি রাতে বাড়ি ফেরে? মেনে নেবে?

‘মেয়েরা ক্লাবে গিয়ে তাস খেলে না |’

স্বপ্না থমথমে গলায় বলল, ‘আচ্ছা, মেয়ের কথা বাদ দাও | বুটির বিয়ের পর তোমার জামাই যদি রাত করে?’

আমি হেসে ফেললাম | বললাম, ‘এখন থেকেই বুটির বর কেমন হবে সেকথা ভাবছো ! ভাবনাটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না স্বপ্না? আচ্ছা, তর্কের খাতিরে না  হয় তাই হল | কিন্তু সেখানে আমি অ্যালাও করবার কে? তোমার মেয়ে বুঝবে | সে তার সংসারে যেমন নিয়ম করবে তেমন চলবে | সে যদি নিয়ম করে দেরি করা যাবে না তো যাবে না |’

স্বপ্না শান্ত গলায় বলল, ‘এই সংসারটা আমার | নিয়ম আমি করব | তোমাকে তো আর মেয়ের মত কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারব না, যেদিন তুমি দেরি করবে সেদিন আমি নিজেকে শাস্তি দেব | রাতে খাওয়া অফ করে দেব | এবার তুমি যা ভাল বোঝো করবে |’

ঝামেলায় গিয়ে লাভ কী? ক্লাবে তাস খেলতে গেলে দশটার মধ্যেই এখন ফিরে আসি | ভালই হয়েছে | বাড়িতে এসে নিজের মত থাকি | তিনদিন হল স্বপ্না আমাকে মেয়ের স্কুলের একটা প্রজেক্ট করতে দিয়েছে | আজকাল স্কুলগুলোতে প্রজেক্ট নিয়ে খুব ঝামেলা করে | আমাদের সময় এসব ছিল না | আমাদের সময় কি ভাল ছেলেমেয়ে হয়নি? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র, প্রফেসর কম ছিল? নতুন যন্ত্রণা হয়েছে | এখন গল্প, কবিতা, ভূগোল, অঙ্ক, বিজ্ঞান সব ব্যাপারেই প্রজেক্ট চাই | কোনও মাথামুন্ডু নেই | মূল কাজ হল, বই থেকে কেটে, কম্পিউটার থেকে ছবির প্রিন্ট বের করে খাতায় সাঁটতে হয় | যা বইতে পাওয়া যায়, কম্পিউটারে মেলে সেটা আবার খাতায় লেখার কী আছে? ওতে কী বিদ্যে বাড়ে বুঝতে পারি না | খরচের ধাক্কা | আমার ঘাড়ে পড়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘ছোটো নদী’র প্রজেক্টের তৈরির দায়িত্ব | কবিতা হিসেবে সহজ | প্রজেক্ট হিসেবে বিরাট ঝামেলার | ছোটো নদীর ছবি যোগাড় করতে হচ্ছে | ছবিতে ছোটো নদী বোঝানো যে এত কঠিন ব্যাপার আমার জানা ছিল না | শুধু ছোটো নদী পেলেই হবে না, তা আঁকাবাঁকা হতে হবে | সে এক ঝামেলার | তারপরও দেখাতে হবে সেখানে হাঁটু জল | কী যে মুশকিল! এর থেকে বড় নদীর ব্যাপার হলে ভাল হত |

বুটির চিপস কিনে একটা সিগারেট ধরলাম | স্বপ্না বাড়িতে সিগারেট খেটে দেয় না | কোনও কোনও দিন ইচ্ছে করে | রাতে খাওয়া দাওয়ার পর মনে হয়, অন্ধকার  বারান্দায় দাঁড়িয়ে কটা টান দিই | মেজাজ করে ধোঁয়া ছাড়ি | এই সময় নিজেকে বেশ রাজা রাজা মনে হয় | মনে হয়, আমার মাথার ওপর কেউ নেই | আমিই আমার মালিক | ফুরফুর করে ধোঁয়া উড়বে, লাল হয়ে সিগারেট পুড়বে, তামাকের ঝিম ধরা গন্ধ…আহা! কিন্তু তা মোটেও সম্ভব নয় | গন্ধ পেলেই স্বপ্না ছুটে এসে ধমক ধামক শুরু করবে | আমি তাড়াতাড়ি ভয়ে সিগারেট ফেলে দেব | রাগ হয় | এ কেমন অবস্থা | নিজের বাড়িতে কি আমি কোনও শখ আহ্লাদ মেটাতে পারব না ? একটা সিগারেট খেতেও বাধা! পরে অবশ্য অন্যরকম মনে হয় | মনে হয়, ধমক দিয়ে ভালই করে স্বপ্না | এটা একটা বাজে অভ্যেস | অনুচিত কাজ | নিজেকে ‘রাজা’ মনে করবার লোভে অনুচিত কাজ করা ঠিক নয় | ভাগ্যিস স্বপ্নার মত একটা মেয়ে আমার বউ |

বাড়ির গেট খুলে ঢুকলাম | গেট থেকে বাড়ির দরজা পর্যন্ত একফালি জায়গা রয়েছে | আজকের দিনে বাড়ির সামনে জমি যে সে কথা নয় | কলকাতা থেকে দূরে থাকি বলেই সম্ভব | এই যদি কলকাতা হত তাহলে ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকতাম | সেখানে ফাঁকা জমির কথা ভাবাই যায় না | ফাঁকা জমি মানে গ্যারেজ | গ্যারেজে ঠাসাঠাসি করে গাড়ি | বাগানে একসময় অল্পস্বল্প গাছ ছিল | ফুল গাছ | জবা, গান্দা, রঙ্গন এইসব | গড়াই নামে একজন মালি অস্ত | জল টল দিত | গাছের মাটি খুচিয়ে দিত | ফুল নিতে পাড়ার লোকজন ভোরবেলা হুত্পাত ঢুকে পড়ত | বিয়ের পর স্বপ্না রাগারাগি করল |

‘তোমাদের পাড়ায় এসব কী! অন্যের বাড়িতে ঢুকে ফুল তলা কেমন ভদ্রতা?’

আমি বললাম, ‘এতে ভদ্রতা অভদ্রতার কী আছে স্বপ্না? প্রতিবেশীরা পুজোর জন্য ফুল ফল নিয়ে যায়, ভালই তো!’

স্বপ্না বিরক্ত হয়ে বলে, ‘মানে! পুজোর জন্য ফুল তুলে নিয়ে যায় মানে কী? তোমাদের বাড়িটা পুজোর ফুলের দোকান নাকি!’

আমি বলি, ‘আহা, অনেকদিন ধরে নিচ্ছে…|’

স্বপ্না ঠাণ্ডা গলায় বলে, ‘অনেকদিন ধরে একটা অন্যায় হচ্ছে বলে সেই অন্যায় চলতেই থাকবে? যে কেউ বাড়িতে ঢুকে পড়বে? এদের মধ্যে যদি চোর ডাকাত থাকে?’

গেটে তালা পড়ে গেল | শেষঃ পর্যন্ত বাগানই তুলে দিয়েছে স্বপ্না | প্রথম প্রথম আমি রেগে গিয়েছিলাম | এতদিনের একটা জিনিস | সকালবেলা মর্নিং ওয়াকের সময় পাড়ার দিদা, ঠাকুমা, মাসিমা, মেসমশাইরা আসতেন | দুটো ফুল নিয়ে যেতেন | এটা এভাবে বন্ধ করা ঠিক হল? পরে বুঝেছি স্বপ্না ঠিকই করেছে | বাড়িতে হুত্পাত লোক ঢুকে পড়া ঠিক নয় | আগে স্বপ্না ছিল না, এখন স্বপ্না থাকে | একটা কম বয়সী মেয়ে | সকালে ঘরের দরজা জানলা খুলে দেয় | ঘুম থেকে উঠে স্বপ্না বারান্দায় বেরোয় | স্নান করে কাপড় শুকোতে দিতে ছাদে ওঠে | বাইরের লোক দেখতে পাবে | শুধু যে মহিলারা ফুল নিতে বাগানে ঢোকে তা তো নয়, পুরুষমানুষরাও আসে | বয়স্ক হলেও, তারা তো পুরুষই | কথায় আছে বয়স্ক পুরুষমানুষরা…| এতদিন কিছু হয়নি ঠিকই, কিন্তু হতে কতক্ষণ? মনে মনে বউয়ের তারিফ করি | সত্যি স্বপ্না একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মেয়ে | সংসারে এরকম একজন থাকলে সংসার অনেক নিশ্চিন্ত, নিরাপদ হয় |

গত চোদ্দ বছর ধরে আমি এই নিশ্চিন্ত, নিরাপদ সংসারে বাস করছি | মাঝে মাঝে নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে হয় | ভাগ্যিস স্বপ্নার মত মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে | মোট আটচল্লিশটা পাত্রী দেখা হয়েছিল | আমার বড়পিসির মেজো ননদ হুট করে একদিন স্বপ্নার খবর ও ফটো নিয়ে এল |

একটা সত্যি কথা বলব? ফটো দেখে কিন্তু আমার স্বপ্নাকে আহামরি কিছু লাগেনি | চেহারায় তেমন চটক নেই | বরং একটু ডালই বলা চলে | বোকা-বোকা | তারপরেও দেখাদেখির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় | শেষ পর্যন্ত বিয়েও করে ফেলি | বুঝেছি ফটো দেখে মানুষ চেনা যায় না | মানুষ মানুষ, ফটো ফটো |

স্বপ্নকে বউ হিসেবে পেয়ে আমি খুব খুশি |

আমি ডোরবেল টিপলাম | একবার, দু’বার | তৃতীয়বার বাজাতে গিয়ে থমকে গেলাম | দু’বারের বেশহি কলিং বেল বাজালে স্বপ্না বিরক্ত হয় | কানে লাগে | এতে নাকি বেল নষ্ট হয়ে যায় | আমি হেসে ফেলি |

‘বেল নষ্ট হলে হবে | নতুন আর একটা কিনব | আসলে কী জান স্বপ্না, বাড়ির দরজায় পৌছে তোমায় দেখবার জন্য মন ছটফট করে | জানি একটু পরেই দেখা হবে, তবু তর সয় না |’

কথা শেষ করে হাত বাড়িয়ে স্বপ্নাকে কাছে টানি | স্বপ্না ডান হাত দিয়ে আমার নাক  নেড়ে আদর করে | বলে, ‘তা হোক | সংসারের একটা এটিকেট আছে | এটা মেসবাড়ি নয় | পাড়ার লোকে শুনলে কী ভাববে? ভাববে বউটা সারাদিন ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোয় | বেল্ বাজালে শুনতে পায় না |’

আমি দু’বারের বেশি বেল বাজাই না | আজও বাজালাম না |

ওই তো দরজা খুলছে | আমি চট করে কাঁধের ব্যাগে চিপসের প্যাকেটটা ঢুকিয়ে নিলাম | স্বপ্না দেখে না ফেলে | তাহলে শুরুতেই চেঁচাবে | ব্যাগে টিফিন বক্স, জলের বোতল, ফোল্ডিং ছাতা আছে | টিফিন বাক্স গুছিয়ে দেয় স্বপ্না | কোনওদিন ডিম পাঁউরুটি, কোনওদিন পরোটা | ফল একটা থাকবেই | হয় কলা, নয় পেয়ারা, নয় চারটে আঙুর | প্রথম প্রথম অফিসে বউয়ের গুছিয়ে দেওয়া টিফিন খেটে লজ্জা করত | লুকিয়ে খেতাম | বাড়ি ফিরলে স্বপ্না বাক্স চেক করে | টিফিন না খেলে রাগারাগি করে |

‘সারাদিন শরীরে একটু ফল না গেলে চলবে না |’

একটা লোক দরজা খুলল | আমি চমকে উঠলাম |

লোকটা কে? এই সময় কে এসেছে আমার বাড়িতে? শুধু এসেছে না, দরজা বন্ধ করে আছে! তাও না হয়, বেল বাজতে দরজা খুলে দিয়েছে | বাইরের লোক, অন্য বাড়ির দরজা খোলে কখনও ?

লোকটা চশমা ঠিক করতে করতে বলল, ‘বলুন?’

একই কথা ! নিজের বাড়িতে ঢুকছি আর একটা বাইরের লোক বলছে বলুন! বাড়িতে কোনও পাগল ঢুকল নাকি? জোর ধমক দিতে গিয়ে থমকে গেলাম, লোকটা লোকটাকে চেনা লাগছে | কথায় দেখেছি? কথায়? আরে আমার মত দেখতে না? হ্যাঁ, তাই তো! এ তো আমি ! অবিকল আমি | গায়ের রঙ কালো | সরু গোঁফ | টাক ঢাকা দেওয়ার জন্য সামনের চুলগুলো কপালের ওপর ফেলে আঁচড়ানো | গায়ে ঘরে পরবার পায়জামা পাঞ্জাবি | চোখে চশমা | আমারই চশমা!

লোকটা ঘাড় কাট করে ভুরু কুঁচকে বলল, ‘কাকে চাই?’

আমি কিছু একটা বলতে গেলাম | পারলাম না | ভিতর থেকে স্বপ্নার গলা ভেসে এল |

‘হ্যাঁ গ কে এসেছে ?’

আমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল | কোনও রকমে বললাম, আমি… আমি…|’

লোকটা এবার হেসে ফেলল | হাসিটাও আমার! একটু চওড়া ধরনের | লোকটা শান্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি কী?’

একটা ছোট্ট মেয়ে এসে লোকটার পিছনে দাঁড়াল | বুটি! আমার মেয়ে | বুটির হাতে চিপসের প্যাকেট | বুটি আমার দিকে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তাকিয়ে লোকটাকে বলল, ‘ বাবা, ছোট নদীর প্রজেক্ট শেষ হয়েছে? কাল কিন্তু স্কুলে নিয়ে যেতে হবে | তুমি অফিস থেকে ফিরে শেষ করবে বলেছিলে |’

আমার হাত পা কাঁপছে | আমি ঘামছি | এসব কী হচ্ছে! কী হচ্ছে এসব ! আমার মেয়ে একটা অন্য লোককে ‘বাবা’ ডাকছে ! আমাকে চিনতে পারছে না !

লোকটা নরম গলায় বলল, ‘আপনি কি ভিতরে আসবেন? ভিতরে বসে কথা বলবেন?’

কী উত্তর দেব? আমার বাড়ি, আমাকেই জিজ্ঞেস করছে বিতরে আসব কীনা! আমি কি স্বপ্ন দেখছি ? নিশ্চই তাই | আমি চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে গেলাম | স্বপ্নার গলা ভেসে এল | রাগ রাগ গলা |

‘উফ আজ টিফিন খাওনি | পেয়ারার টুকরো দুটো পড়ে আছে |’

বউয়ের চিত্কারে লোকটা যেন খানিকটা বিব্রত বোধ করল |

‘আমার মনে হচ্ছে, আপনার ঠিকানা ভুল হয়েছে | কত নম্বর বাড়ি খুঁজছেন?’

লোকটার কথা শেষ হবার আগেই স্বপ্না এসে গেল | তার হাতে আমার টিফিন বাক্স | দরজার গোড়ায় আমাকে দেখে থমকে গেল | ভুরু কুঁচকে বলল, ‘কী হয়েছে?’

লোকটা স্বপ্নার দিকে ঘি=উড়ে বলল, ‘এই ভদ্রলোক মনে হয় ঠিকানা ভুল করে ফেলেছেন…| আমাদের বেল বাজিয়েছেন |’

স্বপ্না চাপা গলায় ধমক দিল | বলল, ‘সে আবার কী! এই রাত দুপুরে এসন আবার কী? তুমি সরো তো আমি দেখছি |’

লোকটার কনুই ধরে সরিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে এল স্বপ্না | আমার স্বপ্না | সে এমন ভাবে এই লোকটার কনুই ধরল, যেন লোকটা আমি ! আমার মাথা ঘুরছে | আমি কি অজ্ঞান হয়ে যাব ? স্বপ্না এবার আমার মুখোমুখি | মাঝে একটা দরজার ফারাক | খোলা দরজা | আমার দরজা | তবু আমি পেরোতে পারছি না | স্বপ্না ঘাড় কাত করে কড়া গলায় বলল, ‘আপনি কোন বাড়িতে যাবেনা?’

আমি নিজেকে সামলালাম | স্বপ্নার থেকে মুখ সরালাম | ওর গলার কাছে ঘাম চিকচিক করছে | সবার আগে স্বপ্নার গলা ঘামে | আমার শরীর ঝিমঝিম করে ওঠে | কতবার আমি ওর এই ঘাম চিকচিকে গলা দেখে কাছে টেনে নিয়েছি |

‘চুপ করে আছেন কেন ? বলুন | এত রাতে হুট করে অন্যের বাড়িতে ঢুকে বেল বাজাচ্ছেনা কেন ? কে আপনি ?’

স্বপ্নার কথায় আমার মত দেখতে লোকটা তাড়াতাড়ি বলল, ‘স্বপ্না উনি নিশ্চই ভুল করেছেন | অভাবে বলছ কেন?’

স্বপ্না লোকটার দিকে ঘুরে চাপা গলায় ঝাঁঝিয়ে উঠল |

‘তুমি চুপ কর | তোমার মত স্বামীকে নিয়ে হয়েছে মুশকিল | কে না কে তাকে নিয়ে আদিখ্যেতা করছ কেন ? এতরাতে এরকম ভুল করবার মানে কী?’ স্বপ্না ফের আমার দিকে তাকিয়ে কঠিন ভাবে বলল, ‘আপনি এবার আসুন | বুঝতেই পারছেন, আপনার ভুল হয়েছে | আপনি ভুল বাড়িতে এসেছেন | তাছাড়া অনেক রাত হয়েছে |’

আমি কিছু একটা বলতে গেলাম | মুখ তুলে দেখি বুটি ভয় পাওয়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে | বুটি আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে ! আমার মেয়ে আমাকে চিনতে পারছে না ! আমি ‘বুটি’ বলে ডাকতে গেলাম | ডাকলামও | গলা দিয়ে স্বর বেরোল না | আমার হাত পা কাঁপছে |

স্বপ্না দরজা আটকে দিল | ভিতর থেকে তার গলা ভেসে এল |

‘নিশ্চই নেশা ভাঙ করেছে | এই সব লোককে ধরে পুলিশে দিতে হয় | বদ কথাকারে |’

আমি আমার ফুলহীন বাগান পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম | অন্ধকার গলি | এবার আমি কী করব ? কোথায় যাব ? আমার বাড়ি কোথায়? আমার সংসার কোথায় ? আমি মাথা ঠান্ডা করবার চেষ্টা করলাম | সবই কি আমার ভুল? স্বপ্না বলে কি আমার কোনও বউ নেই? বুটি নামে মেয়ে? নিরাপদ, নিশ্চিত সংসার বলে কি কিছু হয় না? মিথ্যে? কল্পনা? নাকি সব ঠিক আছে, শুধু আজকের এই সময়টুকু ভুল ? খানি পরে দেখতে পাব, স্বপ্না, আমি আর বুটি একসঙ্গে দিনার করছি | বুটি খেটে চাইছে না | তার মা বকাঝকা করে তাকে খাওয়াচ্ছে | আবার এমনও তো হতে পারে, এই পৃথিবীতে ঠিক আমারই মত আরও একজন আছে | তার আমারই মত নিরাপদ, নিশ্চিন্ত সংসার আছে | সেখানে স্বপ্না আছে, বুটি আছে | আমার টিফিনবাক্স আছে, বুটির পটেটো চিপস আছে | আজ আমি ভুল করে সেই বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম | হতে পারে না? আরও একটা অপশন আছে | যাকে বলা যায় চার নম্বর সম্ভাবনা | আমার নিরাপদ, নিশ্চিন্ত সংসার থেকে আমার অবচেতন মন মুক্তি চাইছে | ছুটি চাইছে | স্বপ্না তার স্বামী নিয়ে, বুটি তার বাবাকে নিয়ে নিশ্চিন্তে, নিরাপদে থাকুক | সে চলে যাবে | এই কারণে সে একটা মিথ্যে গল্প ফেঁদে তার মধ্যে আমাকে নিয়ে ফেলেছে |

যা খুশি হোক | ঠিক ভুল, সত্যি মিথ্যে যা খুশি | গল্পটা কাউকে না বললেই হল |

এতক্ষণে আমার হতভম্ব ভাব খানিকটা কাটল | আমি মনে জোর পাচ্ছি | তাড়াতাড়ি পা চালাতে হবে | মনে হচ্ছে, সামনের পথটুকু শেষ হলে আমি ছোটো নদীটার দেখা পাব | আঁকাবাঁকা নদী | জল হাঁটু পর্যন্ত | অনায়াসে হেঁটে পার হওয়া যাবে | আমি সেই নদী পেরিয়ে আমার বাড়ি ফিরব |

Advertisements
Previous articleব্রহ্মা না বিষ্ণু‚ কে বড়‚ সমাধান করতে গিয়ে সৃষ্টি দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ
Next articleসোনার বাংলায় গালিভার (পর্ব ২)
প্রচেত গুপ্ত
জন্ম : ১৪ অক্টোবর, কলকাতায়, ১৯৬২ সালে | কলকাতার গায়ে বেড়ে ওঠে শহরতলি বাঙুর এভিনিউতে স্কুলের পড়াশোনা, বড় হওয়া | স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে লেখালেখির নেশা | প্রথম লেখা মাত্র ১২ বছর বয়সে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় | তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখা চলতে থাকে | গোড়ার দিকে ছোটদের জন্য লেখাতেই বিশেষ ঝোঁক ছিল | স্কুল শেষ হলে স্কটিশ চার্চ কলেজ | এরপরই একটা দুটো করে বড়দের জন্য লেখার শুরু | অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়া | বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত | প্রথম উপন্যাস 'আমার যা আছে' প্রকাশিত হয় আনন্দলোক পত্রিকায়, ২০০৪ সালের পূজাবার্ষিকীতে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.