জীবন যেরকম

574

হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে গেল রাজধানী এক্সপ্রেস | ট্রেনের ল্যাজটা যতক্ষণ দেখা গেল চুপ করে সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল দীপক | তারপর আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল | পার্কিং লট থেকে গাড়িটা নিয়ে হাওড়া ব্রিজ আর ব্রাবোর্ন রোডের যানজট কাটিয়ে কার্জন পার্ক | সোজা না গিয়ে ডানদিকে ঘুরে গেল দীপক | আকাশবাণী ভবনের সামনে দিয়ে এসে গঙ্গার ধারে গাড়িটা পার্ক করল | ইদানীং এ জায়গাগুলো বেশ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে | ঝুপসি ঝুপসি অন্ধকার | তার মধ্যে মদ-গাঁজার ঠেক আর চুরি-ছিনতাইয়ের অবাধ ব্যবস্থা, সেসব আর নেই | সার সার রূপোলি আলোয় ঝলমল করছে চারিদিক | গাড়িটা লক করে নেমে গাড়িতেই ঠেস দিয়ে দাঁড়াল দীপক | বর্ষা শুরু হয়ে গেছে | নদী একেবারে টই-টুম্বুর | বয়াগুলো ভাসছে | একটু দূরে দূরে |

কফি নেবেন নাকি স্যার?

টিনের কৌটোয় স্টোভে বসানো কেটলিতে দুধ মেশানো গরম জল | বালতিতে সাজানো কাগজের কাপ | ছোকরা ছেলে |

দিন একটা |

কফিটা দিয়ে পয়সা নিয়ে চলে গেল ছেলেটা | কফিতে চুমুক দিতে দিতে দীপকের হঠাৎ চোখে পড়ল স্কুপ থেকে বেরিয়ে আসছে তিন-চারটে ছেলেমেয়ের একটা দল | স্কুল থেকে এসেছে নির্ঘাৎ | ইউনিফর্ম পরা, পিঠে ব্যাগ্ | আচ্ছা রিয়াকে যখন প্রথম দেখেছিল দীপক, তখন রিয়া কি এরকম বয়সী ছিল? তাই-ই হবে নির্ঘাত | এই বাচ্চাগুলো তো হাইস্কুলেই পড়ে মনে হচ্ছে | রিয়া তখন ক্লাস নাইন | বিপাশাটা এমন হাঁদা যে মেয়েকে নিয়ে অত গল্প করেও মেয়ে যে কোন ক্লাসে পড়ে একবারও বলেনি | দীপকের কেন জানি না ধারণা হয়েছিল বিপাশার মেয়েও তার ডোডো-তাতাইয়ের সমবয়সীই হবে | তাই বাড়িতে ঢোকার আগে একটা বেশ বড়সড় চকোলেট কিনে নিয়ে গেছিল | আর তাই দেখে রিয়ার কী হাসি |

আমি একটা গ্রোন আপ গার্ল দীপকমামা | আমার জন্য তুমি চকোলেট নিয়ে এসেছ?

মনে মনে অপ্রস্তুত বোধ করলেও দীপক সেটা বুঝতে দিতে চায়নি মোটেই | তাই হাসতে হাসতে বলেছিল, কেন, সব চকোলেটের বিজ্ঞপনেই তো দেখি গ্রোন আপ গার্লরা রীতিমতো গালে-মুখে চকোলেট মেখে ফেলছে |

সে যদি তাদের বয়ফ্রেন্ডরা দেয় তবে | মায়ের বয়ফ্রেন্ডরা দিলে মোটেই নয় |

আঃ, রিয়া কী হচ্ছেটা কী?

মেয়ের কথায় অপ্রস্তুত হয়ে ধমকে উঠেছিল বিপাশা | আর দীপক হো হো করে হেসে উঠে বলেছিল, আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে | গ্রোন আপ গার্ল আজ চকোলেটটা খেয়ে নিক | পছন্দমতো গিফট পরের দিন নিয়ে আসা যাবে |

প্রমিস |

প্রমিস |

নিজের নরম দু’হাতের মধ্যে দীপকের হাতটা নিয়ে ভাল করে ঝাঁকিয়ে দিয়ে ভিতরে চলে গেছিল রিয়া | বিপাশা ততক্ষণে দীপকের জন্য কফি নিয়ে এসেছে |

বিপাশার সঙ্গে দীপকের বন্ধুত্ব অনেকদিনের্ | স্কটিশ চার্চ কলেজের ইংরাজি অনার্সের ফার্স্ট ইয়ার | ক্লাসের অধিকাংশ ছেলেমেয়েই উত্তর কলকাতা অথবা সল্টলেক, কালিন্দী কিংবা দমদমের ওদিক থেকে আসত | দক্ষিণের তারা মাত্র দুজন | তাই ভাব হয়েছিল প্রথমদিনেই | বিপাশার বাড়ি ছিল মনোহরপুকুরে | দীপকরা তখন থাকত রাজা বসন্ত রায় রোডে তাদের পৈতৃক বাড়িতে | অধিকাংশ দিন মেট্রোতে যাওয়ার সময়ই দেখা হয়ে যেত দুজনের | বিপাশার স্বভাবটা ভারি মিষ্টি, খোলামেলা | দীপকও খানিকটা তাই | ঘোরালো-প্যাঁচালো কথাবার্তা পছন্দ করে না | সোজা সাপটা স্বভাব | তাই বন্ধুত্ব হতে দেরি হয়নি | ক্লাস, আড্ডা, কফি হাউস, সিনেমা দেখা | এর ফাঁকেই কলেজ ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় | পাঁচটা বছর যেন হু হু করে কেটে গেল | এম এ পড়ার দ্বিতীয় বছরে বিয়ে হয়ে গেল বিপাশার | সম্বন্ধ করে বিয়ে | পাত্র চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট | মোটা মাইনের চাকরি করে | বিয়েতে দীপকরা দল বেঁধে গিয়ে হৈচৈ করেছিল | তারপর যা হয় | আস্তে আস্তে যোগাযোগ কমে এল | পাস করে দীপক প্রথমটায় একটা ইংরাজি খবরের কাগজে চাকরি নিয়ে চলে গেছিল দিল্লি | মনীষার সঙ্গে বিয়েটা ঠিক ছিল আগে থেকেই | চাকরিতে পার্মানেন্ট হওয়ার পরেই বিয়ে | বছরখানেক পরে ডোডো-তাতাই | ছেলেরা যখন বছর তিনেকের তখন কলকাতার একটা বাংলা চ্যানেল থেকে ভাল অফার পেয়ে ফিরে আসে দীপক | তারপর গত সাত বছর ধরে কলকাতাতেই আছে | রাজা বসন্ত রায় রোডের শরিকি বাড়ি অবশ্য অনেকদিন আগেই বিক্রি হয়ে গেছে | দীপক ফ্ল্যাট কিনেছে যাদবপুরে | তবে এই সাত বছরের মধ্যে ক্লাসের দু-একজন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ হলেও বিপাশার কোনও খবর পায়নি | বিপাশার স্বামী চাকরি করতেন ব্যাঙ্গালোরে | বিয়ের পর বিপাশা সেখানে চলে যাবে এরকমটা জানা ছিল | তাই অফিসের বেয়ারা যখন এসে বলেছিল বিপাশা মিত্র নামে একজন দেখা করতে এসেছে, তখন বিশেষ কারোর কথা মনেই হয়নি দীপকের | চ্যানেলের অফিস, হাজারটা লোক প্রতিদিন দেখা করতে আসে | সেরকমই কেউ ভেবে নিয়ে ঘরে ঢুকে বিপাশাকে দেখে সে তো অবাক |

প্রথমটায় খানিকক্ষণ হৈচৈ, পুরনো কথা চালাচালি | তারপর বিপাশা বলেছিল, তোর সঙ্গে আমার খুব জরুরি দরকার আছে দীপক | তুই এখন ব্যস্ত জানি | কখন ফ্রি থাকবি বল, আমি দেখা করে নেব |

দীপক লক্ষ্য করেছিল, চেহারাটা প্রায় একইরকম আছে বিপাশার | মুখের ডৌল এখনও ভারি মিষ্টি | কিন্তু হাসিখুশি মুখটার ওপর একটা যেন বিষন্নতার সর পড়েছে | সেই শনিবার বিকেলেই গড়িয়াহাটের একটা কফিশপে মুখোমুখি বসেছিল দুজনে | তখনই দীপক জানতে পেরেছিল বিবাহিত জীবন মোটেই সুখের হয়নি বিপাশার | তার স্বামী চরিত্রহীন, লম্পট | বিভিন্ন মহিলার সঙ্গে তার সম্পর্ক | সংসারের দিকে কোনও মন তো নেই, এমনকী টাকা-পয়সাও ঠিকমতো দেয় না |

বিয়ের কিছুদিন পর বিপাশার বাবা হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান | তার বছরখানেকের মধ্যে মাও |

দাদা তো অনেকদিন থেকেই বিদেশে | আসলে সুগত বুঝে গেছে আমার কোনও ফলব্যাক করার জায়গা নেই | তাই যা খুশি তাই করছে | ব্যাঙ্গালোরে অবস্থাটা ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছিল | ও তো বিয়ের অনেক আগে থেকেই ওখানে থাকত | তাই চেনা-পরিচিত সবই ওর | আমি সাংঘাতিক হেল্পলেস ফিল করছিলাম্ | তাই খানিকটা জোর-জবরদস্তি করেই বছর পাঁচেক হল কলকাতায় চলে আসি | একটা চাকরিও জোগাড় করেছি | কিন্তু মাইনেটা এমন নয় যে মেয়েকে নিয়ে, তার পড়াশোনা চালিয়ে আলাদা থাকতে পারি | তাই ডিভোর্স করতে পারছি না | আর সেই সুযোগটাই নিচ্ছে সুগত |

বিপাশার কথা শুনে মনটা ভারি খারাপ হয়ে যায় দীপকের |

আমার কাছে তুই কী সাহায্য চাস বল, আমি সাধ্যমতো নিশ্চয়ই করব |

সুগতর কাছে আমার আর কোনও এক্সপেক্টেশন নেই দীপক | সংসারে যেটুকু টাকা দেওয়া জরুরি সেটুকু দিয়ে ও বাইরে কী করল না করল আমার কিচ্ছু আসে যায় না | আমার দুশ্চিন্তা রিয়াকে নিয়ে | ও বড় হচ্ছে | আমি বুঝতে পারি প্রতিদিন আমার আর সুগতর ঝগড়া দেখতে দেখতে ওর মধ্যে কতগুলো অদ্ভুত ধারণা তৈরি হয়েছে | ও ধরে নিয়েছে পুরুষমানুষ মাত্রই এরকম | তারা ইনসেনসিটিভ | তাদের বিশ্বাস করা যায় না | তুই বুঝতে পারছিস, এই ধারণা থেকে যদি ও বেরোতে না পারে তাহলে তো ওর জীবনটাও নষ্ট হয়ে যাবে | ওকে বোঝাতে হবে যে না ব্যাপারটা এরকম নয় | ছেলেরা ভাল বন্ধু, ভাল বাবা, ভাল স্বামী হয় | সেটাই স্বাভাবিক | তুই আমাকে এটাতে একটু হেল্প কর দীপক |

কীভাবে বল?

বিপাশার প্রস্তাবে একটু অবাকই হয় দীপক |

কিছুই না | তুই মাঝে মাঝে আমার বাড়িতে এলি | মনীষা আর বাচ্চাদেরও নিয়ে এলি | আমরা একসঙ্গে কাছাকাছি কোথাও বেড়াতে গেলাম | এরকম আর কী | দ্যাখ তুই আমার অনেক দিনের বন্ধু | তোকে আমি যত সহজে কোনও কথা বলতে পারব অন্যদের তো পারব না | তাছাড়া তোকে আমি অনেক বেশি বিশ্বাস করি | তুই যদি রিয়াকে নিয়ে কোথাও বেরোস আমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারব | আসলে ওর একটা ফাদার ফিগার দরকার | তোর একটা প্লিজিং পার্সোনালিটি আছে | আমার মনে হয় সেটা রিয়াকে ইনফ্লুয়েন্স করবে | তোর সঙ্গে মিশলে যদি একটা সুদিং ইমপ্যাক্ট হয়, তাহেল সেটা ওর মনের অন্ধকার জায়গাগুলো ভাঙতে সাহায্য করবে | ইনফ্যাক্ট এটা যে আমি খুব আন্দাজে বলছি তা কিন্তু নয় | রিয়ার ব্যাপারটা নিয়ে আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কথা বলেছিলাম | তিনিই আমাকে এটা বলেন | তখন আমার প্রথমেই তোর কথা মনে হল |

দীপকমামা যেদিন প্রথম তাদের বাড়িতে এসেছিল‚ সেদিনটা বেশ মনে আছে রিয়ার | মায়ের বন্ধু আসবে, ক্লাসফ্রেন্ড | মা কিংবা বাবার কোনও বন্ধুই তাদের বাড়িতে কখনও আসেনি | ব্যাঙ্গালোরেও না, এখানেও নয় | কথাটা শুনে তাই একটু অদ্ভুত লাগলেও বিশেষ কোনও আগ্রহ বোধ করেনি রিয়া | কিন্তু প্রথমবার দীপকমামাকে দেখেই বেশ একটা চমক লাগল তার | ফেডেড ব্লু জিনস আর নেভি ব্লু টি শার্ট পরা | বেশ লম্বা, ছিপছিপে, ল্যাঙ্কি ধরনের চেহারা | মাথায় কাঁচাপাকা ঘন চুল | সব থেকে ইন্টারেস্টিং হাসি আর চোখ | খোলামেলা হাসিতে যখন চোখ দুটো অব্দি হেসে ওঠে, তখন দারুণ দেখায় | প্রথম নজরেই দারুণ লেগেছিল রিয়ার, আর কথাবার্তা শুনে তো পুরো ফিদা | উইম্বলডন থেকে সঞ্জয় লীলা বনশালী সব বিষয়েরই দিব্যি গল্প করা যায় আর এমন চমৎকার সেন্স অফ হিউমার যে খানিকক্ষণ কথা বললেই একেবারে দিলখুশ | মায়ের যে এরকম একখানা সেক্সি, অ্যাট্রাক্টিভ বন্ধু আছে সেকথা রিয়া কোনওদিন ভাবেইনি | সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ অব্দি দীপকমামার কথা, হাসি, অপ্রস্তুত হলে নাকের ডগাটা চুলকে নেওয়ার মুদ্রাদোষ এসবগুলোই মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে থাকে তার | মা-যে এরকম একখানা বন্ধু থাকা সত্ত্বেও কেন বাবাকে বিয়ে করতে গেছিল ভেবে বেশ একটু রাগও হয় |

দীপকমামার প্রতি রিয়ার এই মুগ্ধতাটা কিন্তু প্রাথমিক আলাপের পর্ব পেরিয়ে যাওয়ারও পরও কমল না মোটেই | বরং বাড়তে লাগল | দীপকমামা মাঝে মাঝেই আসে | রিয়ার সঙ্গে, রিয়ার মায়ের সঙ্গে গল্প করে কফি খায় | রিয়ার পড়াশোনা নিয়ে খোঁজখবর নেয় | ইংলিশ, হিস্ট্রি, বাংলা এগুলোতে নিজে যেচে হেল্প করে | সবটাই ভীষণ ভাল লাগে রিয়ার | ইচ্ছে করে দীপকমামা শুধু তার সঙ্গেই গল্প করুক, অন্য কারোর সঙ্গে নয় এমনকী মায়ের সঙ্গেও নয় |

দীপকমামার বউয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছে | মনীষা নাম | বেশ চটপটে, স্মার্ট, হাসিখুশি | দুটো গুবলু-গাবলু দুষ্টু বাচ্চাও আছে | কিন্তু মনীষাকে দেখেই কীরকম যেন একটা ভয়ানক হিংসে হয়েছিল রিয়ার | একটুও কথা বলতে ইচ্ছে করেনি | মনে হচ্ছিল দীপকমামার পাশ থেকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয় | সেদিন সারাক্ষণ প্যাঁচার মতো মুখ করে বসেছিল রিয়া | কোনও কথার ভাল করে উত্তর দেয়নি | মা ভীষণ বিরক্ত হয়েছিল | কীরকম একটা অজানা অভিমানে অনেক রাত অব্দি একলা শুয়ে শুয়ে কেঁদেছিল | দীপকমামা বোধহয় কিছু আন্দাজ করেছিল | তারপর থেকে আর মনীষাকে নিয়ে আসত না | একলাই আসত |

রিয়ার যে তার প্রতি এক ধরনের মুগ্ধতা তৈরি হয়েছে সেটা বুঝতে দীপকের অসুবিধা হয়নি | কিন্তু সে খুব সাবধানে একটা না বোঝার ভান চালিয়ে যাচ্ছিল | কিন্তু রিয়া যে এই ভানটা রাখতে দিতে রাজি নয় সেটা স্পষ্ট করে বোঝা গেল ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে | অনেক আগে থেকেই রিয়া বলে রেখেছিল সেদিন তাকে আইসক্রিম খাওয়াতে নিয়ে যেতে হবে দীপককে | কিন্তু দিল্লিতে একটা জরুরি মিটিং পড়ে যাওয়ায় অনেক কষ্টে ব্যাপারটা এড়ানো গেল | সেদিন রাত বারোটায় দীপকের মোবাইলে রিয়ার এস এম এস এল ‘হোয়েন আই ফিল আলোন, আই ওয়ান্ট টু বি উইথ ইউ, হোয়েন আই ফিল ওয়াইল্ড, আই ওয়ান্ট টু বি উইথ ইউ ….’ | এস এম এস-টা পড়ে বেশ কিছুক্ষণ মোবাইলটা হাতে নিয়ে চুপ করে বসে রইল দীপক | পাঁচতারা হোটেলের এসি ঘরেও কেমন যেন একটু গরম বোহ হচ্ছিল তার | বিপাশার এই নচ্ছার মেয়েটার কানটা বেশ করে মুলে দেওয়ার একটা ইচ্ছেও হচ্ছিল | কিন্তু পরক্ষণেই সুগতর মুখটা চোখের ওপর ভেসে ওঠায় মনটা নরম হয়ে এল | মোবাইলটা খুলে দীপক লিখল, ‘রোদে রাঙা ইটের পাঁজা, তার ওপরে বসল রাজা | ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা, খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না |’

দীপকের ওপর রিয়ার আধিপত্য আর অধিকারবোধ দুই-ই ক্রমশ বাড়ছে | সব কিছুতেই তার দীপকমামাকে চাই | ক্রিকেট খেলা দেখতে যাওয়া হোক কিংবা কফি শপ | অন্য কেউ সঙ্গে না থকলেই ভাল | ইনফ্যাক্ট কেউ না থাকলে রিয়া বেশ একটা ফুর্তির মুডে থাকে | নানারকম উল্টোপাল্টা বকবক করে | বেশিরভাগটাই তার স্কুল, টিচার আর বন্ধুবান্ধবদের প্রসঙ্গ | কদাচিৎ বাবার কথা তোলে | সুগতকে যে রিয়া পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে চায় সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না দীপকের | কিন্তু তাহলেও এসব দিনে রিয়ার ছেলেমানুষি কথাবার্তা, হো হো হাসি কিংবা মাঝে মাঝে বোকা বোকা ইয়ার্কি দিব্যি এনজয় করে দীপক্ | ও নিজে ইচ্ছে করেই এমন ভাবে কথা বলে কিংবা রসিকতা করে যে সেটা বুঝতে রিয়ার বেশ একটু সময় লাগে | অনেক সময় তো এমনও হয় যে দীপক তার লেগ পুল করছে নাকি সিরিয়াসলি কিছু বলছে, সেটা ঠিকঠাক বুঝতে না পেরে রেগে যায় রিয়া |

তবে দুজনের এই আড্ডা দেওয়ার সময় রিয়া যে খুব ভালমানুষ হয়ে থাকে তা কিন্তু মোটেই নয় | দীপক লক্ষ্য করেছে তারা দুজনে একসঙ্গে বেরোলেই রিয়া ছোট স্কার্ট পরে পায়ের ওপর পা তুলে বসে | ডিপ নেক জামা পরে হাত থেকে ইচ্ছে করে জিনিস ফেলে দিয়ে নিচু হয়ে কুড়োয় | কিন্তু এসবই একটা ষোল বছরের বাচ্চা মেয়ের দুষ্টুমি বলে মেনে নিতে অসুবিধা হয় না দীপকের | সমস্যাটা দাঁড়ায় সঙ্গে অন্য কেউ থাকলে | দীপকের ওপর যে শুধুমাত্র তারই অধিকার এটা বুঝিয়ে দিতে রিয়া তখন মরিয়া হয়ে ওঠে | ফলে পরিস্থিতিটা বেশ অস্বস্তিকর হয়ে যায় |

মনীষা যথেষ্ট সেনসিটিভ এবং বুদ্ধিমতী বলে বাড়িতে দীপকের কোনও সমস্যা হয়নি | রিয়া মাঝে মাঝে এমন এস এম এস পাঠায় যে সেটা পড়লে যে কোনও মানুষেরই তাদের সম্পর্ক নিয়ে ভুল ধারণা হওয়াটাই সঙ্গত | কিন্তু মনীষা মাত্র দুদিন বিপাশার বাড়িতে গিয়ে রিয়াকে দীপকের সঙ্গে কথা বলতে দেখেই ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছিল |

আমি থাকলে ওর জেলাসি হবে | তাহলে ওর কষ্টটা আরও বাড়বে | আমার না যাওয়াই ভাল | ওকে যদি ট্রমা থেকে বের করে আনতে হয়, তাহলে তোমার একার ওর সন্গে সময় কাটানোটাই বেশি জরুরি |

কিন্তু আমি যদি সত্যিই রিয়ার প্রেমে পড়ি তাহলে কী হবে?

মনীষার পিছনে লাগার জন্য বলেছিল দীপক |

হাসিও নাতো | ওইটুকু একফোঁটা তার প্রেমে পড়বে তুমি | চেষ্টা করে দেখতে পার, বেশ কঠিন কাজ |

কিন্তু রিয়া তো আমার প্রেমে পড়েছে …

হ্যাঁ সে তো পড়েইছে, একেবারে হাবুডুবু …

হেসে ফেলে মনীষা | পরক্ষণেই একটু গম্ভীর হয়ে বলে, ওর বয়সে এটা স্বাভাবিক | কিন্তু তুমি সতর্ক থেকো | এমন কিছু যেন না ঘটে যাতে রিয়াকে সারাজীবন নিজের কাছে ছোট হয়ে থাকতে হয় | এখানে কিন্তু দায়িত্বটা পুরোপুরি তোমার |

মনীষা রিয়ার মনের গতিপ্রকৃতি অত সহজে বুঝে ফেললেও বিপাশা কিন্তু মোটেই কিছু বোঝেনি | ইদানীং তার কাজের জায়গায় চাপ খানিকটা বেড়েছে | তাছাড়া সুগতর নানারকম বদমাইসি থেকে মেয়ে, সংসার আর নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার এমন একটা দুরূহ দায়িত্ব তাকে সারাক্ষণ বয়ে বেড়াতে হয়ে যে অন্য কোনও দিকে মন দেওয়ার সময়ই পায় না | রিয়া দীপকমামার সঙ্গে সিনেমা দেখতে কিংবা রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে চাইলে সে এককথায় রাজি | যদিও নিজে যেতে পারে না অধিকাংশ সময়েই | কিন্তু রিয়া যে সন্ধেবেলা দীপকের আসার কথা থাকলেই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে কিংবা মধ্যরাত অব্দি ইন্টারনেটে দীপকমামার সঙ্গে চ্যাট করে সেসব সে জানে না | তেমন কোনও ভাবনাও তার মাথায় উদিত হয়নি |

কিন্তু একদিন হঠাৎই দীপকের প্রতি রিয়ার এই বিশেষ মনোভাবটা তার চোখে পড়ে গেল | আসলে ব্যাপারটা ঘটেছিল খুব আকস্মিকভাবেই | কদিন ধরে রিয়ার জ্বর হয়েছে | ভাইরাল ফিভার | শরীরটা দুর্বল | দুপুরবেলা ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল | মেয়ের শরীর খারাপ বলে বিপাশাও সেদিন অফিস যায়নি | রিয়ার বালিশের পাশে রাখা ছিল তার মোবাইলটা | পাছে ফোন কিংবা এস এম এস এলে মেয়ের ঘুম ভেঙে যায়, তাই মোবাইলটা বিপাশা তুলে এনে নিজের কাছে রেখেছিল | যথারীতি একটু পরেই টুং করে এস এম এস | বিপাশা খুলে দেখে দীপক পাঠিয়েছে | স্ক্রিনে লেখা আছে, ‘পান্তো ভুতের জ্যান্ত ছানা করছে খেলা জোছনাতে |’ ভারি অবাক হয়ে, এটা কোন এস এম এস-এর উত্তর বুঝতে মেয়ের সেন্ট মেসেজের বক্সটা খোলে বিপাশা | খুলে তো তার চোখ চড়কগাছ | রিয়া লিখেছে, ‘ সেদিন যে ওরকম সুন্দর একটা ড্রেস পরলাম, কীরকম লাগছে কিছু তো বললে না | সেজন্যই তো মন খারাপের চোটে আমার জ্বর এসে গেল | এক্ষুনি জানাও কেমন লেগেছে তোমার | নাহলে কিন্তু জ্বর ছড়বে না বলে দিচ্ছি |’ চমকে উঠে কারসার নামিয়ে নামিয়ে দীপককে লেখা একটার পর একটা এস এম এস পড়তে থাকে বিপাশা আর প্রতিবারই আঁতকে আঁতকে ওঠে | কী সর্বনাশ! একরকম ভেবে দীপককে সে বাড়িতে ডেকে এনেছিল কিন্তু এ তো আর একরকম বিপদ তৈরি হয়েছে | দীপক তো তাও না হয় তার অনেকদিনের বন্ধু | কিন্তু মনীষা যদি জানতে পারে তাহলে যে কী হবে | মা-মেয়ে মিলে তার সংসার ভাঙার চেষ্টা করছে মনে করে যদি | ডুঃখে-অপমানে চোখে জল এসে যায় বিপাশার | ইচ্ছে করে ঘুমন্ত মেয়েটাকে তুলে আছাড়ি-পিছাড়ি করে মারে | এ কীরকম অসভ্যতা! বাবার বয়সী একটা লোককে এরকম সব কথা লিখতে একটু লজ্জা হল না! এদের কাছে কী কোনও সম্পর্কেরই কোনও দাম নেই? বিপাশা ঠিক করে সে নিজের দীপকের বাড়ি গিয়ে ওদের দুজনের কাছে ক্ষমা চাইবে | দীপককে বলে দেবে আর কোনওদিন যেন তাদের বাড়িতে না আসে | রিয়া ঘুম থেকে উঠলে বিপাশার মেয়ের সঙ্গে সেদিন আর কথা বলতেও ইচ্ছে করে না |

দীপক আর মনীষা কিন্তু রিয়ার এই অস্বস্তিটাকে একেবারে পত্তাই দিল না | মনীষা তো হাসতে হাসতে বলল, আমি তো জানি বিপাশাদি | ইনফ্যাক্ট ওর আগেও আমিই বুঝতে পেরে ওকে বলেছিলাম, রিয়ার সঙ্গে যখন কোথাও যাবে তখন আমাকে নিয়ে যেওনা | ওর হিংসে হয় | তাতে যে জন্য তুমি ওর কাছে যাচ্ছ, সেটাই আলটিমেটলি ব্যর্থ হবে | আমাদের দায়িত্ব ওকে ক্রাইসিসটা থেকে বের করে আনা | সেটা অনেক বেশি জরুরি |

মনীষা ঠিকই বলেছে রে বিপাশা | কারোর ওপর বিশ্বাস রাখা, সম্পূর্ণ নির্ভর করা,এটা রিয়ার জন্য এখন খুব জরুরি | তুই চেয়েছিলি আমি ওর কাছে ফাদার ফিগার হয়ে উঠি | আমিও তাই চেয়েছি | কিন্তু পুরোটা তো আমাদের চাওয়ার নির্ভর করে না | আমাদের বোঝা উচিত ছিল, রিয়ার কাছে ওর বাবার ইমেজটা খুব ভাল নয় | তাই যাকে ভাল লাগছে তাকেও সেই জায়গাটায় সহজে বসাতে চাইবে না | আসলে ওর বয়সে যে সম্পর্কটা সম্বন্ধে আকর্ষণ সবথেকে স্বাভাবিক ও সেটাই তৈরি করতে চাইছে | আমার ভয়টা কোথায় জানিস, আমাকে তো ওকে আঘাত না দিয়েও ওর ইচ্ছেগুলোতে লাগাম পরিয়ে রাখতে হবে | সেটা ভারি কঠিন কাজ | সেখানে তোর সাহায্য আমার দরকার হবে | রিয়াকে বুঝতে দেওয়া চলবে না কিন্তু আমরা নিজেদের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এ সিচুয়েশন সামলে নেব | নে এখন রিল্যাক্স করে বোস | চিন্তা করিস না | রিয়া তো আমাদেরও মেয়ে | ওর মনটা কিন্তু একদম জলের মতো স্বচ্ছ | জলটা না ঘুলিয়ে যাতে শাপলা আর পদ্মতে ঢেকে যায় তার জন্যই চেষ্টা করতে হবে আমাদের | কফি নিয়ে এল মনীষা | সঙ্গে ধনেপাতার বড়া | কফির কাপে চুমুক দিয়ে এতক্ষণ পরে একটু হেসে বিপাশা বলল, তোর পান্ত ভুতের জ্যান্ত ছানাটা পড়ে … মানে ব্যাপারটা এরকম না হলে তো আমি বোধহয় হেসে গড়িয়ে পড়তাম | প্রোভোকেটিভ একটা ড্রেস পরে বয়ফ্রেন্ডকে কেমন লাগছে জিজ্ঞাসা করছে আর তার এরকম উত্তর! ভাব একবার ব্যাপারটা!

হেসে গড়িয়ে পড়ে দীপক, মনীষা, বিপাশা তিনজনেই |

মাধ্যমিক পরীক্ষায় রীতিমতো ভাল নম্বর পেয়ে পাস করল রিয়া | ওর স্কুলের টিচার কিংবা বিপাশা নিজেও এতটা ভাল ফল আশা করেনি | সবাই ভারি খুশি | দীপক, বিপাশা আর রিয়াকে একদিন রেস্তোরাঁয় খাওয়াল | মেয়ের এমন ভাল রেজাল্ট দেখে সুগতও একদিন ওদের বাইরে খাওয়াতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু রিয়া রাজি হল না কিছুতেই | আসলে রিয়ার রেজাল্ট দেখে অন্যরা খুশি হলেও রিয়া নিজে কিন্তু পুরোপুরি খুশি হতে পারেনি | কারণ দীপকমামার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যত বাড়ছে, তত রিয়ার মধ্যে কতগুলো অজানা দিক খুলে যাচ্ছে, যেটা সে নিজেও বেশ বুঝতে পারে | আজকাল তার পড়াশোনা করতে বেশ ভাল লাগে | পড়াশোনা ব্যাপারটা যে কত ইন্টারেস্টিং সেটা দীপকমামা তাকে বুঝিয়েছে | কিন্তু সমস্যা হচ্ছে দীপকমামার নাগাল পাওয়া ভারি কঠিন | মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের কথা তো আদৌ বলে না | ভীষণ ভীষণ রোমান্টিক সময়েও এমন এমন সব কথা বলে যে রিয়া বুঝতেই পারে না আসলে কী বলতে চাইছে | একদি তো থাকতে না পেরে বলেই ফেলল, তুমি যে কী বল, অর্ধেক সময় বুঝতেই পারি না | একটু সোজা করে বলতে পার না |

আমি তো সোজা করেই বলি |

তাহলে আমি বুঝতে পারি না কেন?

কারণ তোমার ইনটেলেকচুয়াল লেভেল আমার থেকে কম | তাছাড়া তুমি পড়ার বই ছাড়া আর বিশেষ কিছু পড় না | তাই আমার কথাগুলো বুঝতে পার না | কিন্তু আমি তো আমার লেভেলের নিচে নামতে পারব না | আমার ওটাই অভ্যাস হয়ে গেছে | তোমাকে যদি আমার কথা বুঝতে হয়, আমার সঙ্গে তাল মেলাতে হয়, তাহলে আমার লেভেলে উঠে আসতে হবে |

শুনেই রাগে গা জ্বলে গেছিল রিয়ার | তবু রাগ চেপে বলেছিল, তারজন্য কী করতে হবে শুনি? রোজ তোমাকে পেন্নাম করতে হবে?

মোটেই না | একটু বেশি পড়াশোনা করতে হবে | পড়ার বই নয় | অন্য নানারকম বই | তাছাড়া ভাল নাটক দেখতে হবে, সিনেমা দেখতে হবে | সেগুলো নাহয় আমিই নিয়ে যাব | কিন্তু শুধু যদি টেলিভিশন আর ওই পচা পচা হিন্দি ছবি দেখ, তাহলে চিরকালই আমার কথা তোমার হিব্রু-ল্যাটিন মনে হবে |

বয়ফ্রেন্ড, সে বয়সে যত বড়ই হোক না কেন, এরকম ভাবে কথা বললে কার না গায়ে লাগে | রিয়া ঠিক করেছিল দীপকমামাকে কিছু জানাবে না, কিন্তু ওর সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য নিজেকে তৈরি করবে | তাই নিজের উদ্যোগেই নানারকম বই পড়া শুরু করল | আর তার ফল হল এই যে এগারো ক্লাসে পড়তে পড়তেই রিয়া কেমন যেন একটা নানা ধরনের পড়াশোনার জগতে ডুবে গেল | সিলেবাসের পড়াশোনা তো আছেই, তার ফাঁকে নানা ধরনের বই পড়া, বিভিন্ন বিষয়ে জানা, সেটা নিয়ে ইন্টারনেটে সার্চ করা এগুলো যেন ক্রমশ নেশার মত পেয়ে বসল তাকে | আজকাল দীপকমামা বাড়িতে এলে সে ইচ্ছে করেই আলোচনার জন্য নানারকম বিষয় তোলে | কখনও সাহিত্য, কখনও ইতিহাস, কখনও আবার একেবারে সদ্য কাজজে বেরোন কোনও খবর | চেষ্টা করে নিজের মতামতটা স্পষ্টভাবে বলে দীপকমামাকে ইমপ্রেস করার | মাঝে মাঝে তার কথা শুনে দীপকমামা যে বেশ চমকে যায়, সেটা বুঝে মজাও পায় | তখনও ইচ্ছে করে দীপকমামার গলাটা জড়িয়ে ধরে জোরে একটা চুমু খেতে | দু-একবার যে চেষ্টা করেনি তাও নয় | কিন্তু এইসব ব্যাপারে দীপকমামা কেমন যেন একটু ক্যাবলা গোছের | বুঝতেই পারে না রিয়া কী চাইছে | রিয়ার ক্লাসমেটদের বয়ফ্রেন্ডরা কীরকম পটাপট চুমু খায়, আর এমন হাঁ করে তাকিয়ে তাকে যে সময় পেরিয়ে যায় আর মা নির্ঘাত ঘরে ঢুকে পড়ে | সিনেমা-টিনেমা দেখতে গেলে তো বড়জোর একটু হাতটা ধরে বসা যায় | চুমুটুমু তো আর খাওয়া যায় না | এই একটা ব্যাপার এতদিনেও ঠিক ম্যানেজ করতে পারেনি রিয়া | মাঝে মাঝে তার মনে হয়, এই ক্যাবলামিটা দীপকমামার ভান নয়তো? মণীষামামির সঙ্গে তো বিয়ের আগে থেকেই প্রেম করতো | কে জানে বাবা, ওদের সময় বোধহয় প্রেম করলেও চুমুটুমু খাওয়ার চল ছিল না |

রিয়ার বদলটা কিন্তু বিপাশা কিংবা দীপক কারুরই চোখ এড়ায়নি | রিয়াকে বুঝতে না দিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে | কারণে-অকারণে দীপক নানারকম বই গিফট করেছে | বিপাশাও নানাভাবে মেয়ের মনের খোরাক জোটানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছে | রিয়াকে ঘিরে তাদের দুই বন্ধুর এই চেষ্টা, আলোচনা কোনও কিছুর মধ্যেই অবশ্য সুগতর কোনও ভূমিকা নেই | ইদানীং সে এক টেলিভিশনের অভিনেত্রীর প্রেমে পড়েছে | তার সঙ্গেই ঘুরে বেড়াচ্ছে | অধিকাংশ দিন রাতেও বাড়ি ফেরে না | খবরটা দীপকের কাছ থেকেই পেয়েছে বিপাশা | তবে তাতে তার বিশেষ কোনও হেল-দোল হয়নি | তবে দীপকের মত একজন জাঁদরেল সাংবাদিক তার বন্ধু জেনেই হোক কিংবা অন্য কোনও কারণে, সুগত বাড়িতে টাকা-পয়সা দেওয়ার ব্যাপারে কোনও ঝামেলা করেনি | রিয়ার স্কুলের মাইনে, টিউশনের টাকা, অন্যান্য খরচ-খরচা সবই সময় মত পাওয়া গেছে | বিপাশাও তাই খানিকটা নিশ্চিন্তে নিজের কাজ আর মেয়ের দেখাশোনা দুই-ই করতে পেরেছে |

এরকম একটা তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির মধ্যেই রিয়ার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাও হয়ে গেল | গত তিন বছর রিয়ার কথা ভেবেই মণীষা কিংবা ডোডো-তাতাইকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যায়নি দীপক | রিয়ার পরীক্ষা শেষ হতে মণীষা তাই দিন পনেরোর জন্য একটা ট্যুরের প্রসঙ্গ তুললেও দীপক কিন্তু রাজি হল না |

দেখ, এবার কিন্তু তোমাকে একটু অ্যালুফ হতে হবে | রিয়া এবার কলেজে ঢুকবে | নতুন বন্ধু, নতুন জীবন | তখন যদি তোমার জন্য ও নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে না পারে, তাহলে জটিলতা কিন্তু বাড়বে | মাণীশার যুক্তি মেনে নিয়েও দীপক বলল, হ্যাঁ, সেটা আমি জানি | কিন্তু এই রেজাল্ট বেরোনোর আগে অব্দি আমি রিয়ার কোনও ধরনের মানসিক ডিসটার্বেন্স চাইছি না | আমার একটা নির্দিষ্ট প্ল্যান আছে | আশা করছি সেটা ঠিকঠাক হবে | তাহলে তখন আমরা বেড়াতে যাব |

দ্যাখো, তুমি যেমন ভাল বোঝো |

মণীষা যে একটু মনঃক্ষুণ্ণ হল সেটা বুঝেও দীপক আর এ নিয়ে আর কথা বাড়াল না |

রীতিমত নিয়ম মেনে ঠিক সত্তর দিনের মাথায় ফল প্রকাশ করল উচ্চামাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ | রোল নম্বর জানাই ছিল | রিয়া আগে থেকেই বলে রেখেছিল দীপকই যেন রেজাল্টটা দেখে তাকে জানায় | অন্য কারুর কাছ থেকে রেজাল্ট শুনতে সে মোটেই রাজি নয় | কিন্তু দীপকমামার মুখেও সে প্রায় ছিয়ানব্বই শতাংশ নম্বর পেয়েছে শুনে প্রথমটায় বিশ্বাস হয়নি রিয়ার | তাড়াতাড়ি ওয়েবসাইট খুলে নিজের রোল নম্বর বসিয়ে সার্চ করতে সন্দেহভঞ্জন হল | মেয়ের রেজাল্ট শুনে বিপাশার তো প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার যোগাড় |

প্রেসিডেন্সি আর যাদবপুরে ফর্ম ফিল আপ করব তো?

বসার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে দীপকের কাছে জানতে চাইল রিয়া |

তা করতে পার, তবে ভর্তি হবে সেন্ট স্টিফেন্স কলেজে, দিল্লিতে |

মানে?

রিয়া তো অবাক | দীপকের জন্য ফিস-ফ্রাই নিয়ে ঘরে ঢুকছিল বিপাশা | বেশ খানিকটা অবাক হল সেও |

কলকাতায় পড়ব না?

না পেলে পড়তেই হবে | তবে যা নম্বর পেয়েছো চান্স না পাওয়ার কোনও কারণ নেই | কালই মেইলে ফর্ম ফিল আপ করে পাঠিয়ে দেবে |

আমি তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না |

বিপাশা চা আনতে রান্নাঘরে গেলে ফিসফিস করে বলল রিয়া |

তোমাকে সেন্ট স্টিফেন্সে পড়তে যেতেই হবে রিয়া | এটা তোমার কেরিয়ারের জন্য জরুরি | মাত্র তো তিনটে বছর | আমি এখানেই থাকব | ছুটিতে তুমি আসবে | আমাকে অফিসের কাজে অনেক সময়ই দিল্লি যেতে হয় | তখন তোমার সঙ্গে দেখা করে আসব | পরে যদি ইচ্ছে হয় তখন মাস্টার ডিগ্রিটা না হয় কলকাতায় করবে |

আমি কিছুতেই তোমাকে ছেড়ে দিল্লি যাব না |

বেশ তো যেও না | তবে আমি কিন্তু তাহলে আর তোমাদের বাড়িতে আসব না বা তোমার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখব না | তুমি তো চাও রিয়া, যে তোমার সঙ্গে আমার একটা সমানে সমানে বন্ধুত্ব হবে | তাহলে একজন ম্যাচিওর গ্রোন আপ গার্লের মত এই ডিসিশনটা নাও |

ইকনমিকসে অনার্স নিয়ে দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজে ভর্তি হয়েছে রিয়া | বিপাশার বেশ মন খারাপ হলেও সে দীপকের সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা কথাও বলেনি | মা-মেয়ে গিয়ে ভর্তি হয়ে এসেছে | এবার একেবারে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে হোস্টেলে গিয়ে ওঠার পালা |

দীপকমামা আমাকে স্টেশনে পৌঁছতে যাবে | আর কারুর যাওয়ার দরকার নেই |

সেকি রে? দীপক কেন যাবে? আমি আর তোর মা পৌঁছতে যাব তোকে |

সুগতর কথা শুনে রিয়া শুধু একবার কঠিনভাবে বাবার দিকে তাকাল, তারপর বলল তাহলে আমার টিকিটটা ক্যানসেল করে দাও |

কেন ঝামেলা করছ? বিরক্ত হয় বিপাশা |

ঠিক আছে | দীপকই তোকে পৌঁছে দিয়ে আসবে | ট্রেন ছাড়লে আমাকে একটা ফোন করে দিস |

ডিকিতে জিনিসপত্র তুলে, মা-বাবাকে হাত নেড়ে হাসিমুখেই গাড়িতে ওঠে রিয়া | কিন্তু তারপর থেকেই ভারি চুপচাপ | রেড রোডের কাছে এসে দীপক জিজ্ঞাসা করে, কী ব্যাপার, এত চুপচাপ যে?

তুমি আমাকে রোজ মেইল করবে তো? রাতে কিন্তু রোজ চ্যাট করব | ইচ্ছে হলেই ফোন করব |

এস টি ডি-র খরচ অনেক বেশি | হোস্টেলে কিন্তু হিসেব করে চলতে হবে |

ঠিক আছে তাহলে রোজ চ্যাটে আসবে বল?

এর আগেও তো অনেকবার বলেছি |

বলেছো, কিন্তু আমার কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না | কেমন যেন মনে হচ্ছে তুমি ইচ্ছে করে আমাকে দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছ |

রিয়ার কথার উত্তর না দিয়ে সামনের গাড়িটাকে ওভারটেক করে দীপক |

প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ায় | রিয়া এসে গেটে দাঁড়িয়েছে | ট্রেনের হুইসিল শোনা গেলে হাতটা বাড়িয়ে দেয় দীপকের দিকে | হাতের উল্টোপাতায় ভারি আলতো করে একটা চুমু খায় দীপক | আঙুল দিয়ে মুছে দেয় গালের ওপর গড়িয়ে আসা জলে ফোঁটা | রাজধানী এক্সপ্রেস ততক্ষণে নড়তে শুরুর করেছে |

কফির কাপটা ফেলে দিয়ে গাড়িতে ওঠে দীপক | রিয়া যথেষ্ট বুদ্ধিমান | ঠিকই বুঝেছে, ইচ্ছে করেই তাকে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছে দীপক | আসলে দীপকের তো কিছু করার নেই, রিয়ার সামনে এখন নতুন জীবন, নতুন রাস্তা তৈরি করে এগিয়ে চলার সময় | সেখানে দীপকের কোনও জায়গা নেই | রিয়াকে স্টার্টিং পয়েন্টে ঠিকঠাক পৌঁছে দেওয়াই ছিল তার দায়িত্ব | দীপক নিশ্চিতভাবে জানে, আঠারোয় পা দেওয়া যে রিয়া রাজধানী এক্সপ্রেসে উঠে দিল্লি চলে গেল, সেই মেয়েটা আর কোনও দিন কলকাতায় ফিরবে না |

মোবাইলটা বার করে মণীষাকে ধরে দীপক, জিনিসপত্র গোছাতে শুরু কর | শনিবার আমরা নেপাল বেড়াতে যাব | হোটেল বুকিং, টিকিট সব হয়ে গেছে | ছেলেদের স্কুল খোলা, তাই মাত্র পাঁচদিনের ট্রিপ এখন | লম্বা বেড়াতে যাওয়া পুজোতে |

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.