বাংলা ওয়ার্ল্ডওয়াইড আয়োজিত রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় ঘটল দুই বাংলার মেলবন্ধন

Bangla World Wide cultural event

বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ,/বারান্দায় ঝরে জ্যোৎস্নার চন্দন।শামসুর রাহমানের এই কবিতা পড়লেই বোঝা যায় বাংলা ভাষার প্রতি প্রীতি ও শ্রদ্ধা।এই ভাষাই  আমাদের সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পথকে সুদৃঢ় করে।আর সাংস্কৃতিক যোগাযোগই পারে বিশ্বজোড়া বাঙালির বন্ধন অটু্ট রাখতে।বাঙালি শুধু কলকাতায় সীমাবদ্ধ নেই।বাঙালি বিস্তৃত বিশ্বের সর্বত্র।সেই বহু বিস্তৃত বাঙালিদের একত্রিত করার মঞ্চ বাংলা ওয়ার্ল্ডওয়াইড।যা একান্তই বাঙালির নিজস্ব মঞ্চ। 

গত ১৩ জুলাই সন্ধ্যায় বাংলা ওয়ার্ল্ডওয়াইড এবং কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপদূতাবাসের সহায়তায় দুই বাংলার শিল্পীদের নিয়ে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছিল আই সি সি আর প্রেক্ষাগৃহে।অনুষ্ঠানের সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত একটা কথাই  বারবার মনে এলো।আর তা হল —দুই বাংলার হৃদয়ে রবীন্দ্র-নজরুল চির উজ্জ্বল।চির শাশ্বত।এদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার,প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গাঙ্গুলী,বিচারপতি সমরেশ ব্যানার্জী,বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রদূত জনাব তৌফিক আসান, ফার্স্ট সেক্রেটারি প্রেস জনাব ইকবাল মোফাকখারুল, সমাজকর্মী সাহানা পরভিন ডলি,বিচারপতি চিত্ততোষ মুখার্জী এবং বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।বিশ্ব বাঙালি যেন ভাষার বন্ধনে গড়ে ওঠে এবং এর সঙ্গে ধর্ম ও সঙ্কীর্ণ রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই — সে কথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন অনুষ্ঠান কমিটির সভাপতি প্রাক্তন অ্যাডভোকেট জেনারেল ব্যারিস্টার অনিন্দ্য মিত্র মহাশয়।

পবিত্র সরকারের বক্তব্যে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে  বাংলা ওয়ার্ল্ডওয়াইডে তার ভূমিকা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে দূর দূরান্তে প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং বাংলা ভাষায় শিক্ষা দানকেই অগ্রাধিকার দেন মাননীয় পবিত্র সরকার।   এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক সুকুমার মুখোপাধ্যায়।তিনি বলেন -‘ বাংলা ওয়ার্ল্ডওয়াইডের মাধ্যমে আমরা মানুষের কাছাকাছি যেতে পারব।এর মাধ্যমে আমরা সারা পৃথিবীর ৪২টা দেশের কাছে সংস্কৃতি ,স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তিগত বিষয়কে তুলে ধরতে পারি।বিশেষ করে ইউ কে-তে আমাদের নতুন পর্ব শুরু হয়েছে।এই যোগাযোগকে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বলা যায়।’পরবর্তী বক্তা বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রদূত জনাব তৌফিক আসান।তিনি বলেন, দুই দেশের সেতু বন্ধনের জন্য এরকম অনুষ্ঠানের আরো প্রয়োজন।জনাব ইকবাল মোফাকখারুলের মতে,পবিত্র সরকার এবং সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহর মতো ব্যক্তিত্ব থাকলে আমাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে।আবার সমাজকর্মী সাহানা পরভিন ডলি মনে করেন,দুই বাংলা নয়,বাংলা আসলে এক ও অভিন্ন। রবীন্দ্রগান, সকলের প্রাণের মধ্যে আছে।আর নজরুল, সাম্যের ও বিদ্রোহের কবি।এরপর বাংলা ওয়ার্ল্ডওয়াইডের সভাপতি বিচারপতি চিত্ততোষ মুখার্জী, সংস্থার আগামী সাফল্যের জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হয় সঙ্গীত।শিল্পী শ্রীমতী অপর্ণা খান। তাঁর কণ্ঠে ভেসে আসে রবীন্দ্রসঙ্গীত —‘জগত জুড়ে উদার সুরে’।এরপরেই তাঁর কণ্ঠে গীত হয় —‘একলা বসে বাদল শেষে’।শিল্পীর উদাত্ত পরিবেশন মুগ্ধ করে প্রত্যেককেই।এপার বাংলার শিল্পী শ্রীমতী সুস্মিতা গোস্বামীর তিনটি নজরুলগীতির অসামান্য পরিবেশনা  নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটায়।পারভেজ চৌধুরীর আবৃত্তি অনুষ্ঠানে বাড়তি মাত্র যোগ করে। কবিগুরুর ভানুসিংহের পদাবলী এবং নজরুলের বিদ্রোহী, শিল্পীর কণ্ঠে শুনে নিশ্চিত রূপে বোঝা যায়  স্বরক্ষেপণ,অভিব্যক্তিএবং উচ্চারণে শিল্পীর পারদর্শিতা। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী দেবারতি সোম শোনালেন দুটি বর্ষা পর্যায়ের সঙ্গীত।

পরের শিল্পী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের দৌহিত্র কাজী অরিন্দম।তার যন্ত্রানুসঙ্গীতে প্রস্ফুটিত রবীন্দ্র ও নজরুল গীতি।শিল্পী বিজন মিস্ত্রীর কণ্ঠে শোনা যায় নজরুল গীতি ও কীর্তন।আবৃত্তিকার প্রণতি ঠাকুরের নিবেদনে ছিল রবি ঠাকুরের ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ এবং নজরুলের ‘সাম্যবাদী’।অনুষ্ঠানের শেষ শিল্পী ছিলেন —-অনিন্দ্য নারায়ণ বিশ্বাস (পেশায় আই এস অফিসার)।তার দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে।প্রথমটি ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’, এবং পরেরটি ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’।সঙ্গীত এবং আবৃত্তির সঙ্গে যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন অঞ্জন বসু (এসরাজ),কীবোর্ডে দেবাশীষ সাহা,পারকাশনে  সজ্ঞীবন সাহা এবং তবলায় সিদ্ধার্থ  ভট্টাচার্য ।এই মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানে দর্শকাসনে ছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ।  

সামগ্রিক অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রাক্তন বিচারপতি চামেলী মজুমদার।অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক সৌম্যব্রত দাশের ভাষায়, “বাংলা ওয়ার্ল্ডওয়াইড তো বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে হয় না।আর কাঁটাতারের বেড়া,লাল ফিতের বাঁধুনি দিয়ে বাংলাভাষা আর সংস্কৃতিকে আটকানো যায় না।তার প্রমাণ বাংলা ওয়ার্ল্ডওয়াইড।পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে সমস্ত বাঙালিরা ছড়িয়ে আছে,তাদের নিয়ে বাংলা ওয়ার্ল্ডওয়াইডের মঞ্চকে আমরা তৈরি করতে চাইছি”। সব শেষে এটুকুই বলার, এমন অনুষ্ঠানের রেশ থেকে যাবে বহুদিন। এ যেন ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’।  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.