বাংলালাইভ রেটিং -

প্রায় থ’ মেরে গেলাম রেশমি মিত্রের নতুন ছবি ‘বারান্দা’ দেখতে গিয়ে।

Banglalive

মনে হচ্ছিল, ভদ্রমহিলার কাছে গিয়ে জানতে চাই যে, আপনি করেছেন কী এটা রেশমি? এমন শক্তিশালী দুই অভিনেতাকে লিড রোলে নেওয়ার সুযোগ পেলেন এভাবে। আর সেই সুযোগটা তারপর হেলা-ফেলা করে নষ্ট করলেন জাস্ট?

এতটা অবহেলা কি সত্যি প্রাপ্য ছিল নাকি ব্রাত্য এবং ঋতুপর্ণার?

যদি নাট্যমঞ্চের অভিনয়টাকে সরিয়ে রেখেও ধরি। তাহলেও তো ব্রাত্য বসু মানে সেই লোকটা, যে এই ক’দিন আগে মারকাটারি অভিনয় করলো ‘অসমাপ্ত’র মতো ছবিতে। এর আগেও মতি নন্দী’র উপন্যাস নিয়ে ‘পারাপার’ ছবিটাতে চমকে দিয়েছে যে। আরও অগুন্তি ছবিতে হীরের কুচির মতো যার অভিনয়ের টুকরো রয়েছে পড়ে।

আর ঋতুপর্ণা মানে তো সেই মেয়েটা যে একই দিনে এবেলা-ওবেলা চুপচাপ শুট করে নামিয়ে দিতে পারে ‘পারমিতার একদিন’ আর ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ – পুরো একশো আশি ডিগ্রি উলটো দুটো ছবি। যার ফিল্মোগ্রাফিতে রয়েছে ‘দহন’ কিংবা ‘বেদেনী’র মতো মাস্টারপিস ফিল্ম। ‘রাজকাহিনী’র মতো খাজা সিনেমাতেও যে নিজের অভিনয় এমন লেভেলে রাখে, যে তারপর ওই ছবির হিন্দি ভার্সনে বিদ্যা বালনের অভিনয়টাও ম্যাড়মেড়ে বলে ঠ্যাকে!

রেশমি’র ছবির শুরুর থেকে শেষ তো বলতে গেলে এই দুজনকে ফোকাসে রেখেই তৈরি। কিন্তু, ওঁদের দেখে মুগ্ধ হবো কোথায়, তার বদলে একটু পর থেকেই তো যাকে বলে প্রায় ছেড়ে-দে-মা-কেঁদে-বাঁচি হাল! সত্যি রেশমি, আপনি বলুন – যে ছবির প্রধান রোলে এমন দুই শিল্পী, সেই ছবি এত অবহেলা করে বানাতে পারে কি কেউ?

ওঁদের দুজনের বুঝি এই অবহেলাটাই প্রাপ্য?

মতি নন্দীর উপন্যাসে ব্রাত্য এবং ঋতুপর্ণার কম্বিনেশন এবারে এই প্রথমবার নয়। বছর দুয়েক আগের ছবি ‘পারাপার’-এ ঠিক এই কাস্টিংটাই ছিল। এই ছবির কাস্টিং বুঝি সেখান থেকেই টোকা?

আপনি বলুন, স্রেফ ওটুকু টুকে কি আর পুরো ছবিটার পাসমার্ক তোলা যায়!

গভীর গহন উপন্যাসকে সিনেমার ভাষায় পালটে দেওয়ার বেসিক জ্ঞানটা যেখানে নেই! স্ক্রিপ্ট কী করে লিখতে হয়, সিকোয়েন্স সাজিয়ে গল্প বলার রীতিটা ঠিক কী, সেটা যেখানে জানে না কেউ। কনটিন্যুইটি কাকে বলে, তার কোন সেন্স তৈরি হয় নি যেখানে। শুধু টুকে মারা কাস্টিং দিয়ে সেই পরীক্ষা উতরানো যাবেটা কী করে, বলুন?

এক এক করে লিখছি পুরোটা, দাঁড়ান। শুরুটা না হয় ছোট একটা ক্যারেক্টার দিয়ে করি – ‘বুলি’। কেমন দেখতে বুলিকে? বুলিকে প্রথমবার দ্যাখার পর গল্পের মূল চরিত্র গিরিজা’র কী মনে হয়েছিল, উপন্যাসে মতি বিশদে লিখেছেন সেটা। ‘রুগ্ন অপুষ্ট দেহ। মুখে বসন্তের ক্ষতের দাগ যে এতটা গভীর হবে সে (গিরিজা) ভাবে নি। বাঁ চোখটিতে মণি নেই তাই বন্ধ পাতা ভিতরে ঢুকে আছে। বুলিকে কখনও কোন যুবক কামনা করবে না।’ স্নান সেরে আসা বুলিকে নিয়ে মতি লিখছেন, ‘ভিজে চুল দু’ভাগে পাট করে আঁচড়ানো। মাথায় চুল কম। কপালের চামড়া খসখসে এবং ফ্যাকাশে। সারা শরীর হাহাকার করছে ভিটামিন ও স্নেহ পদার্থের জন্য।’ যখন একটা শব্দে বুলির অ্যাপিয়ারেন্স বোঝাতে হয়েছে মতিকে, প্রায় নিষ্ঠুরভাবে মতি তখন ব্যবহার করেছেন ‘কুদর্শনা’ শব্দ।

গিরিজা’র মুখোমুখি বুলি। বুলিকে দেখে কি সত্যি মনে হচ্ছে কুদর্শনা বলে!

এই বুলির রোলে এই ছবিতে কাকে বেছে নেওয়া হয়েছে জানেন? অভিনেত্রী মানালিকে! মতি যেখানে বুলির বাঁ চোখের মণি না থাকার কথা লিখেছেন, ছবিতে সেখানে সেটা পালটে ডান চোখ হয়ে গেল কেন, ঈশ্বর জানেন। মতি লিখেছিলেন, ‘(চোখের) বন্ধ পাতা ভিতরে ঢুকে আছে’। সেরকমটা না দেখিয়ে বুলির ক্ষতিগ্রস্ত চোখের মণি দ্যাখান হল প্রায় যেন ভূতের চোখের মতো। এই পালটে দেওয়ার তাৎপর্যটা কী?

আর বুলির রূপ সম্পর্কে মতি বাকি যে কথাগুলো লিখেছেন, সেগুলো নিয়ে আমি কিছু লিখতে চাই না আর। পাশের ছবিতে মানালি অভিনীত বুলির সঙ্গে সেই কথাগুলো আদৌ ম্যাচ করছে কিনা, নিজে দেখে সেটা মিলিয়ে নিন প্লিজ।

অম্বরের ভূমিকায় সাহেব ভট্টাচার্য। মিল পাচ্ছেন কি মূল উপন্যাসে অম্বরের বর্ণনার সঙ্গে!

আসুন আরেকটা ক্যারেক্টারের কথায়। গিরিজার জ্ঞাতিভাই অম্বর। এঁর সম্পর্কে মতি লিখছেন, ‘সামনের দুটি উঁচু দাঁত, কালো পুরু ঠোঁট, ব্রনের দাগে ভরা গাল, কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত ফুলে থাকা শিরার শাখা প্রশাখা’। এই বর্ণনাটার সঙ্গে এই ভূমিকায় কাস্ট করা হল যাকে, সেই সাহেব ভট্টাচার্যের ‘লুক’ আদৌ মিললো কিনা, সাহেবের ছবি দেখে সেটা মিলিয়ে নিন আপনি। 

আরও পড়ুন:  রেশিখোলা

হ্যাঁ, এটাই হল এ ছবির কাস্টিংয়ের ছিরি।

এবার শুনুন এর সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে ছবিতে ডায়ালগ রাখা হয়েছে কী রকম। কী ভাবে বুলি আর মোহনের নতুন আস্তানা খুঁজে বের করছে গিরিজা (অভিনয়ে ব্রাত্য বসু), সেটা লেখার সময় মতি লিখেছিলেন, গিরিজা পাড়া প্রতিবেশীর কাছে বুলির রূপবর্ণনা করে চেষ্টা করছে ঠিকানা খোঁজার। আর সেই রূপ বর্ণনা হচ্ছে এইভাবে, ‘একটা চোখ কানা, মুখে বসন্তর দাগ’।

এবার ছবির কেমন বোধবুদ্ধিহীন মেকিং দেখুন, মতির উপন্যাসের ওই লাইনটা হুবহু তুলে এনে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই ছবিতেও। তা সে ছবির বুলি ওরফে মানালির মুখে আদৌ কোন বসন্তের দাগ থাকুক চাই না থাকুক। এর ফলে কী হল, জানেন? যে সিনগুলোয় মানালিকে দ্যাখা যাচ্ছিল, হাঁ করে ওঁর গালের দিকে চেয়ে থাকছিলাম আমি। খুঁজতে চেষ্টা করছিলাম, সত্যি লুকনো কোন বসন্তের দাগ-টাগ রয়েছে কিনা, যেটা ডিরেক্টর দেখতে পেয়েছেন, কিন্তু আমার চোখেই এড়িয়ে যাচ্ছে শুধু।

উপন্যাস থেকে মূর্খের মতো লাইন-কে-লাইন তুলে নিয়ে সিনেমার ডায়ালগ লেখার আরেকটা উদাহরণ শুনুন এবারে। দুপুরবেলা বুলি আর মোহনের আস্তানা খুঁজে বের করে সেখানে গিয়ে পৌঁছেছে গিরিজা, উপন্যাসে দেখছি, ওকে দেখে অবাক হয়ে মোহন বলছে, ‘এই দুপুরে, মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, কেউ বেরোয়?’ এখন এই সিনটা এই ডায়ালগ নিয়ে শুট করতে গেলে যে গিরিজার মাথায় একটা ব্যান্ডেজ বাঁধা থাকার কথা, এই মিনিমাম সেন্সটাও এই ছবির কারুর ছিল না বোধহয়! সুতরাং এখানে দ্যাখা গেল, গিরিজা মোহনের বাড়িতে এসেছেন, কপালের বাঁ দিকে এইটুকু একটা ব্যান্ড এড লাগিয়ে! আর সেটাকে যেন দেখেও দেখতে পাচ্ছে না মোহন, জাস্ট আউড়ে যাচ্ছে সেই বইয়ের সংলাপটা, ‘মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে কেউ দুপুরে বেরোয়?’

এই সিনটার রগড় কিন্তু এখানে শেষ নয়, এরপর আরও আছে, দাদা! এই সিনেই দেখতে পাবেন ওই ব্যান্ড এডের ওপর হাত দিয়ে দলে মুচড়ে কপাল ঘষছেন ব্রাত্য। এটা দেখে আপনি থতমত খেয়ে যখন ভাবতে বসবেন, যে ব্যান্ড এডটা বোধহয় সত্যি সত্যি নয়, গিরিজার একটা লোক দ্যাখান গিমিক, তখনই শুনবেন, বইয়ের লাইন কপি করে গিরিজা বলছে, ‘মাথায় এমন গর্ত হয়েছে যে ডাক্তারেরা মনে করেছিল যেন কেউ ডাণ্ডা দিয়ে মেরেছে’। এই লাইনটা বলতে বলতে বইয়ের গিরিজা মাথার ব্যান্ডেজে আঙুল ছুঁইয়েছিল। সিনেমার গিরিজা আঙুল ঠ্যাকাল ব্যান্ড এডে!

গিরিজার কপালে যে ব্যান্ড এড লাগানো – তার আড়ালে কি ডাণ্ডা দিয়ে মারা গর্ত থাকা সম্ভব!

একটু আগে যেমন হাঁ করে মানালির মুখে বসন্তের দাগ খুঁজছিলাম, এখন তেমনি হাঁ করে ব্রাত্য’র কপালের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবছিলাম, ওই পুঁচকে ব্যান্ড এডের আড়ালে ‘ডাণ্ডা দিয়ে মারা গর্ত’ কোন লজিকে থাকে।

একটু আগে যে ব্যান্ড এডের ওপর নিজে হাত দিয়ে টিপে ধরে কপাল ডলতে থাকে গিরিজা, অথচ মুখে ব্যথার এক্সপ্রেশন দ্যায় না কোন, সেই গিরিজা এবার ওর ওপর একবার বুলি হুমড়ি খেয়ে পড়ার পরেই কপালের সেই ব্যথার চোটে কাত! মাথার সেই ব্যান্ড এডের ক্ষতের ব্যথায় যেন এবার বেঁকে যাচ্ছে ছেলে!

বুঝুন ছবির হাল!

এই ঢপের কীর্তন দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল যে ব্রাত্যের মতো সু-অভিনেতাকে কোন আক্কেলে এরকম তামাশার খোরাক বানিয়ে দিলেন রেশমি?

কোথাও কোথাও খুব বুদ্ধি খাটিয়ে সিন লিখেছেন ওঁরা (স্ক্রিপ্ট, স্ক্রিনপ্লে অ্যান্ড ডায়ালগস – রেশমি মিত্র এবং মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়)। কী রকম, তার এবার একটা স্যাম্পেল বলি শুনুন। মতির মূল উপন্যাসে কোথাও সরাসরি এরকম কিছু নেই। নির্মাতা ভদ্রজনেরা কিন্তু দেখিয়ে দিলেন, বাড়ির পেয়িং গেস্ট অম্বর (অভিনয়ে সাহেব ভট্টাচার্য) চলে যাবে শুনে তার ওপর প্রায় বলতে গেলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে গিরিজার লিভ-ইন সাথী রুনু (অভিনয়ে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)। আকুল হয়ে বলছে, ‘আমার কী কিছুই নেই তোমাকে ধরে রাখার মতো অম্বর? আমার কি কিচ্ছুই নেই? দ্যাখো? আমার কি কিছুই নেই?’ সংলাপের এই শেষটা বলতে বলতে নিজের আঁচল ফেলে দিয়ে ব্লাউজের ভেতরে থাকা শরীরের অংশটাকে হাত দিয়ে দ্যাখাতে চাইছে রুনু। এক লাইন বাড়িয়ে লিখছি কিনা, সেটা চাইলে ইউটিউবে এ ছবির ট্রেলার দেখে চেক করে নিন আপনি।

আরও পড়ুন:  ক্ষীরকান্তি

সিনটা দেখে মাথায় হাত আমার। উপন্যাসে মতি বুনেছিলেন সম্পর্কের কুয়াশামাখা কুশলী সব জাল। সেই সব রহস্যময় যাপনলীলার বারোটা বাজিয়ে সিনেমার নামে কোন চচ্চড়ি রান্না হচ্ছে এটা?

আবার উলটো ঘটনাও আছে। উপন্যাসে যে ব্যাপারগুলো খুব স্পষ্ট করে লেখা, সিনেমা বানাতে গিয়ে সেটাকে আধাখ্যাচড়া ঝাপসা বানিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল স্ক্রিনে।

যেমন, রুনুর মা মিসেস মজুমদারের (অভিনয়ে শ্রীলা মজুমদার) স্বামীর কেসটা ধরুন। মহিলা যখন বাড়িতে বসে বেশ্যাবৃত্তি করেন, তখন মহিলার বর অর্থাৎ রুনুর বাবা যে ঠিক কোথায় থাকেন, মতি কাহিনীতে সেটা স্পষ্ট করে জানান। মতি লিখছেন, ‘একদিন কথাপ্রসঙ্গে গিরি বলেছিল, ‘তোমাদের বাড়িতে যতবার গেছি, রকে একটা লোককে বসে থাকতে দেখেছি। বরাবর একই ভঙ্গিতে, দেয়ালে ঠেস দিয়ে, উপরের দিকে তাকিয়ে।’ রুনু ইতস্তত করে বলে,‘আমার বাবা। ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। তারপর একটা ব্যাপারে কিছুদিন জেলে ছিলেন।’

রেশমির বানানো এই ছবিতে গিরিজা এবং মোহনের সেই বেশ্যাগমন আছে। বেশ্যা, মানে মিসেস মজুমদারের বাড়ির রকে বসে থাকা কিছুটা হাবা গোছের সেই লোকটাও আছে। শুধু সেই লোকটা যে পরিচয়ে আসলে ওই মিসেস মজুমদারের স্বামী, মানে এই রুনুর বাবা, গোটা সিনেমায় সেটা কোথাও জানতে পেরেছি বলে তো মনে পড়ছে না আমার!

দুজনের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান – তবু ছবির শুরুতে দুজনে হৈ হৈ করে গল্প করেন – এইভাবে উপন্যাসে মতির লেখা বর্ণনা দর্শকদের জানিয়ে দেওয়া হয়!

রুনু বা গিরিজা কোথায় থাকে, সেটা মতির উপন্যাসে খুব স্পষ্ট করে লেখা। পড়ুন এই লাইনগুলো – ‘রাস্তা পার হয়ে ওরা উত্তর দিকে এগোতে থাকল। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর মাঝখানে কালী মন্দির। তার পুবের রাস্তাটাকে দেখিয়ে গিরি বলল, ‘এটাকে ছোটবেলায় আমরা রাজা রাস্তা বলতাম। রাস্তার দুধারেই শোভাবাজার রাজবাড়ি। পুজোয় এখানে মেলা বসত।’ জায়গার নামগুলো ডিকোড করুন, টের পাবেন সুকৌশলে কলকাতার কোন বিশেষ পল্লীর কথা রচতে চাইছেন লেখক। লাইনের মাঝে লুকিয়ে থাকা এই ইশারা-টিশারা এই সিনেমায় হাওয়া। একবার শুধু সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর রেফারেন্স এসেছে কথায়, কিন্তু বিশাল সেই রাস্তার কোন প্রান্তে রুনু এবং গিরিজা থাকে তার কোথাও হিন্ট দেওয়া হয় নি কোন।

সত্তর দশকে লেখা উপন্যাসকে টেনে হিঁচড়ে আজকের সময়ে নামিয়ে আনছেন ভাল। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে গল্পের মধ্যে আকাটপনা ঠুসতে দেখলে রাগ হবে না, বলুন? উপন্যাসটা যখন লেখা হয়েছিল, শোভাবাজার থেকে রাসবিহারী মোড় পৌঁছতে ট্যাক্সি বোধহয় ছিল সবচেয়ে দ্রুতবেগের যান। তাই মুক্তাঙ্গনে নাটক দেখতে যাওয়ার জন্যে অম্বর আর রুনুকে সেখানে ট্যাক্সি ধরতে দেখি। এবার এই ঘটনা আজকের দিনে কাট-পেস্ট ঘটতে দেখলে হেঁচকি উঠবে না, ভাই? এই রুটে তাড়াতাড়ি যেতে গেলে এখন আপনি মোটা টাকা খরচ করে ট্যাক্সি ধরবেন নাকি গোটা দশেক টাকা খসিয়ে মেট্রো নেবেন, বলুন আমায় সেটা।

ট্যাক্সি পালটে মেট্রো করলেন না কিন্তু ‘মুক্তাঙ্গন’ পালটে দিয়ে করে দিলেন রাস্তার উলটো পিঠের ‘তপন থিয়েটার’! এই চেঞ্জটা করার মানে বুঝিয়ে কেউ বলতে পারেন আমায়?

রাস্তার দোকানের সাইনবোর্ডে মোবাইলের অ্যাত্ত বড় অ্যাড। মানে বুঝতে পারছি, স্ক্রিনে যেটা দেখছি সেটা এই যুগের গল্প। এদিকে গোটা সিনেমায় কারুর বোধহয় মোবাইল ফোন নেই! কাউকে কোন ফোন করার বালাইপাট দেখি না কারুর মধ্যে! রুনু একবার অফিসে ফোন করার কথা বলতে গিয়ে কোন শব্দটা ইউজ করে, জানেন? ‘টেলিফোন’! আপনি বলুন এই শব্দটা আজকের দিনে শহুরে লব্জে আর ইউজ হয় কিনা!

আরও পড়ুন:  ৮ মে বিয়ে আনন্দ-সোনমের, পাত্র সম্বন্ধে জানেন কিছু?

হ্যাঁ, মতি ওই যুগের মতো করে ‘টেলিফোন’ শব্দটা লিখে গেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটা পালটে নেওয়ার মতো বুদ্ধি আর এলো না কারুর ঘটে?

বাড়িতে টিভিও তো নেই কারুর। আর কী কাণ্ড দেখুন, সেটা নিয়ে কারুর কোনও অভিযোগও নেই কিছু! টিভি ব্যাপারটা এই পৃথিবীতে একজিস্ট করে না যেন! অডিও ট্র্যাকে পাশের বাড়ির নানা শব্দ ভেসে এসে এই বাড়িতে ঢুকতে শুনি। কিন্তু তার মধ্যেও কোথাও কোন টিভি সিরিয়ালের শব্দ-টব্দ নেই!

উলটে ঘরের মধ্যে ইয়াবড় আদ্দিকালের রেডিও সাজানো আছে!

প্রায় হাফ শতক আগের লেখা ওই লোকগুলোকে আজকের দিনে এনে বসাতে গিয়ে ডিরেক্টর কোন লেভেলে কেস খেয়েছেন, বুঝতে পারলেন তো!

ছবির মধ্যে বেশ কয়েকবার গরম এবং ঘামের কথা আছে। কিন্তু পুরো ছবিতে একবারও কাউকে পাখা চালাতে দেখেছেন কিনা, বলুন? ছবির শেষের দিকে বুলি যখন স্যুইচ টিপে টেবিল ফ্যান চালায়, সেই সিকোয়েন্স আর ডায়ালগ কিন্তু স্বয়ং মতির লিখে যাওয়া। তিনিও লিখেছেন আর পরিচালক রেশমি সেটা তুলে নিয়ে সোজা ছেপে দিয়েছেন স্ক্রিনে। কিন্তু রাতের বেলা মশারির মধ্যে যে বৌয়ের সঙ্গে শুচ্ছে গিরিজা, একবারও সেখানে কখনও পাখা চলছে না কেন ভাই?

উত্তর কলকাতার স্যাঁতসেঁতে পুরনো বাড়ির যাপন নিয়ে ‘পারমিতার একদিন’ থেকে শুরু করে ‘হারবার্ট’ অবধি এত রকম কাজ দেখেছি যে তারপরে এই লেভেলের আনাড়িপনা দেখতে হলে রাগ ধরে যায় খুব!

একেকবার তো মনে হচ্ছিল, ডিরেক্টরকে গিয়ে শুধিয়ে আসি যে আজও কারুর নাম এরকম ‘গিরিজাপতি বিশ্বাস’ হয় বলে শুনেছেন কিনা তিনি। নর্থ কলকাতায় লোডশেডিং কি এখনও এতটা বেশি যে বুলি হাতের কাছে হ্যারিকেন রেখে দ্যায়? আর ছবির ক্লাইম্যাক্সে হঠাৎ একটা খুন করে ফেলে, লাশটাকে সামনে রেখে গিরিজা এবং বুলির পক্ষে ঠাণ্ডা মাথায় আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাওয়া কি ওই রকমের ইজি?

উপন্যাসের পরিসরে যদি এরকম লিখেও থাকেন মতি – কিন্তু সিনেমায় চোখের সামনে এটা ঘটাতে দেখলে তার কি আর আদৌ কোন ক্রেডিবিলিটি থাকে?

সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপারটা হল, উপন্যাসে গিরিজার নিজের মনের যে কথা আর যে আলোড়ন মতি নন্দী লিখতে লিখতে গেছেন, তার প্রায় পুরোটাই এই ছবিতে ছেঁকে তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছেন রেশমি! বসিয়েছেন কোথায় জানেন? ডায়ালগের মধ্যে! স্ক্রিনে ব্যাপারটা দ্যাখাচ্ছে এরকম যে, পনের বছর ধরে দু’জন ঘর করার পর হঠাৎ একদিন গিরিজা আর রুনু দুজনে দুজনকে বলতে লাগলো প্রায় অফুরান সব কথা! আর কোন কারণ নেই এত কথার পেছনে, কারণ শুধু একটাই – এত বকবক না ঘটালে দর্শক ওদের রিলেশন আর উপন্যাসের সেই লাইনে লেখা গল্পের খেই ধরবে কী করে তাই।

পরিচালক রেশমি মিত্রের বিশদ পরিচয় দেওয়া আছে ছবির ফেসবুক পেজে।

এই ছবির ফেসবুক পেজ ঘাঁটতে গিয়ে খুব ইন্টারেস্টিং একটা তথ্য পেলাম, জানেন? জানতে পারলাম, ছবির পরিচালক রেশমি মিত্র এর আগে নাকি ১০৫ টা টেলিফিল্ম বানিয়েছেন, আর পূর্ণদৈর্ঘ্যের বাংলা ছবি বানিয়েছেন সাতটা! আর সেই সাতটা ছবিই নাকি আবার সর্বজনপ্রিয় ছবি – ইংরেজিতে যেটা লেখা হয়েছে ‘লাভ্‌ড বাই অল’ বলে!

এই সব দাবি সত্যি কিনা, আদৌ জানি না আমি। শুধু এটুকু জানি, বছর পাঁচেক আগে সাত কোটি টাকা ‘খরচ’ করে অ্যাকশন প্যাক্‌ড একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন তিনি। হিরণকে নিয়ে তৈরি সে ছবি ‘মাচো মস্তানা’ সুপারফ্লপ হয়। তার বহু পরে এ বছর গোড়ার দিকে একটা লো বাজেট ফিল্ম ‘হঠাৎ দেখা’ও তৈরি করেন তিনি। তাঁর বাকি আর কোন ছবির হদিশ অন্তত আমার কাছে নেই! ‘গুগল’ কিংবা ‘আই এম ডি বি’ও এই ব্যাপারে মুখে প্লাস্টার এঁটে চুপ।

এমনতর ফিল্মোগ্রাফি যাঁর, মনে রাখবেন তাঁর এই ছবি ‘বারান্দা’ কিন্তু এবার কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও ছিল।

তাই কে বলেছে রহস্য গভীর শুধু গিরিজা রুনু আর বুলির জীবনে শুধু? খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনি, কিছু রহস্য অন্যখানেও আছে!

NO COMMENTS