বাঁধের পাড়ে বড়ন্তি

1545
বাঁধের একদিকে জল অন্যদিকে ধানক্ষেত

ভোর ছ’টায় আদ্রা-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে করে এসে আদ্রা স্টেশনে নেমে দেখলাম বেশ ভালোই ঠান্ডা | সঙ্গে ছিল হাতকাটা পাতলা একখানি জ্যাকেট | সেটাই গায়ে চাপিয়ে মুরাডি যাবার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ভাবছিলাম বড়ন্তিতে গিয়ে যদি আরও ঠাণ্ডা পাই তখন কী হবে | সবে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ, কলকাতায় ভালোই গরম, তাছাড়া যাচ্ছি তো বর্ধমান আর পুরুলিয়ার প্রায় বর্ডারের কাছাকাছি বাঁধের ধারে ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেরা একটা জায়গায় | তাই বেকার একগাদা গরম জামা বয়ে আনিনি |

মুরাডি রেলস্টেশন
মুরাডি রেলস্টেশন

মুরাডি স্টেশন থেকে সাইকেল রিকশা করে ‘বড়ন্তি’ পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় আটটা বেজে গেল – ততক্ষণে সূর্য উঠে গিয়ে চারদিকে বেশ গরম | এখানে থাকার জায়গা বলতে একটাই – ‘আকাশমনি রিসর্ট’ (এটা ২০০৯ সালের কথা, ইদানীং আরও হোটেল ইত্যাদি হয়েছে), অবশ্য রিসর্ট শুনে উল্লসিত হবার কিছু নেই – একটা ঘেরা বাগানের মধ্যে নেহাতই সাদামাটা দু-সেট বাড়ি, তবে কিনা বেশ পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম ব্যবস্থা | ফটোগ্রাফার বন্ধু হীরক নন্দীর কাছে খবরাখবর নিয়ে কলকাতা থেকেই বুকিং করে এসেছি – টাকা নিয়ে রসিদ দিতে গিয়ে মি. চ্যাটার্জী বলেছিলেন – ‘আপনাকে একেবারে সেপারেট কটেজটা দিচ্ছি |’ সেপারেট বলে সেপারেট – বাগানের একেবারে শেষ প্রান্তে – পাঁচিলের ওপার থেকে ঘন জঙ্গল প্রায় সিকি মাইল পেরিয়ে ‘বড়ন্তি’ গ্রাম অবধি চলে গিয়েছে |

ঘরে ঢুকে মালপত্তর নামিয়ে একটু হাওয়া খাব বলে পাখার সুইচ খুঁজতে গিয়ে কোথাও পেলাম না | মাথা তুলে সিলিং-এর দিকে তাকাতেই বুঝলাম এখানে ইলেকট্রিসিটি আসেনি তাই পাখা-আলো কিছুই নেই | আলো ছাড়া বহু জায়গায় রাত কাটিয়েছি কিন্তু সমস্যা হয় দিনের বেলা ঘুরে ঘুরে যে সব ছবি আঁকি রাতে ঘরে বসে সেগুলোকে সামান্য ফিনিশ-টিনিশ করে নিই – পাশে দু-চার লাইন লিখি – হ্যারিকেনের আলোয় রঙের কাজটা অন্ততঃ সম্ভব নয় – ‘বড়ন্তি’র ছবি তাহলে সাদা-কালোতেই থাক |

রিসর্ট-এ ‘জীবন’ থাকে – এখানকার কুক-কাম-কেয়ারটেকার | ওকে সঙ্গে নিয়েই গ্রাম পেরিয়ে গাছপালার মধ্যে দিয়ে হাঁচড়-পাঁচড় করে সামনের পাহাড়টার মাথায় গিয়ে উঠলাম | ওপর থেকে বিশাল জলাধারটা বহুদূর অবধি দেখা যায় – যার একদিকে রয়েছে ‘গোরোঙ্গি’ পাহাড় – অন্যদিকে সবুজ ক্ষেতের মধ্যে ছোট ছোট গ্রাম | দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোথায় এসব দৃশ্য দেখব, জীবন ওদিকে তাড়া দিতে শুরু করেছে – ‘স্যার, আপনার তো কিছুই খাওয়া হয়নি, এখন কী বানাব? রাত্তিরে কী চাই? আসলে রিসর্টে রানার ব্যবস্থা থাকলেও মাল-মশলা সবই কিনে আনতে হয় গেস্টদের অর্ডার মাফিক | আমি একা এসেছি ফলে চাল, ডাল, তেল, নুন মায় রান্নার চার্জ মিলিয়ে দু-দিনে আমার খরচটা একটু বেশি হলো বটে – কিন্তু জীবনের রান্নার হাতটা সত্যিই খাসা | প্রথম দিন পায়ে হেঁটে চলে গেলাম মাইল দেড়েক দূরে রামজীবনপুর বলে একটা গ্রাম অবধি – ছবি-টবি এঁকে ফিরতে প্রায় বিকেল গড়িয়ে গেল – রিসর্ট-এর বাগানে চেয়ার নিয়ে বসলাম – জীবন আমায় চা দিয়ে কাছেই একটা গ্রাম ‘মানপুর’ গেল আমার জন্য মুড়ি-তেলেভাজা আনতে | -ওখানেই ওর বাড়ি | বাগানটার আদৌ দেখাশোনা হয় না, নিখিল রায় বলে যে লোকটি এখানে ম্যানেজারি করেন তাঁর কথা অনুযায়ী – গ্রামের লোকজন সব বেআইনিভাবে কয়লা তোলার কাজ করে অনেক বেশি পয়সা পায় – তাই চট করে কাউকে পাওয়া যায় না |

সন্ধের পর ঝপ করে ঠাণ্ডা নামল – আমি সকাল সকাল খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়লাম – মোটা কম্বল রাখা ছিল – মাথা অবধি মুড়ি দিতে হলো |

তালবেড়িয়ার পথে
তালবেড়িয়ার পথে

পরদিন আর হাঁটাহাঁটি নয়, জীবনের সাইকেলটা বাগিয়ে নিয়ে আরও দূরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম – বলে গেলাম মুরগির কারি রেঁধে রাখতে | প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার কল্যানে এ অঞ্চলে পাকা রাস্তা হয়েছে প্রচুর – আরামসে দু-চাকায় চেপে চলে গেলাম ‘তালবেড়িয়া’ পর্যন্ত – রাস্তাটা শেষ হয়েছে ‘সাতুরি’ গিয়ে, যেখান থেকে আসানসোল খুব কাছে | রবিবার, তাই পথে ছেলেপিলেদের ভিড়, তবে ছবি আঁকার সময় কেউ তেমন ডিস্টার্ব করল না | সব গ্রামেই দেখেছি একটা ছাউনির নীচে বসে গোল হয়ে সবাই জটলা করে |

তালবেড়িয়া গ্রাম
তালবেড়িয়া গ্রাম

রিসর্ট থেকে দু’পা হাঁটলেই বাঁধ শুরু হয়েছে – একদিকে জল অন্যদিকে ধানক্ষেত | সূর্যাস্তের ঠিক আগে কচি সবুজ রঙা মাঠের পাশ দিয়ে সাদা আর মেটে লাল রঙের একপাল গরু গ্রামের পথে ফিরে চলেছে – দৃশ্যটি ভোলবার নয় |

দণ্ডহিত গ্রামের শক্তিপদ তন্তুবায়
দণ্ডহিত গ্রামের শক্তিপদ তন্তুবায়

অন্যদিকে বাঁধ পেরিয়ে গোরোঙ্গি পাহাড়ের গায়ে তখন ধীরে ধীরে মেঘ জমে উঠছে – জলের মধ্যে ছোট্ট একটা ডিঙি নৌকো বয়ে চলেছে একজন – ….. কমলা হয়ে আসা সূর্যের আলো ভেদ করে সেটা কুয়াশার মধ্যে কেমন মিলিয়ে গেল |

মেঘের আড়ালে সূর্য কখন ডুব দিল বুঝতেই পারলাম না, আগেভাগেই চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল, ঘড়িতে তখন সবে সোয়া পাঁচটা | ফিরে চললাম রিসর্টে – গেটের কাছে পৌঁছে দেখি জীবন হ্যারিকেন রেখে গিয়েছে | পূর্নিমা পার করে এসেছি – চারদিকের অন্ধকারটা তাই ক্রমে ঘন হয়ে উঠছে – চেয়ার টেনে কটেজের বারান্দায় এসে বসলাম – বাগানে ঘুরপাক খাচ্ছে কত জোনাকি – সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথার ওপর চোখ গেল – দেখলাম আকাশেও অসংখ্য তারা গিজগিজ করছে – মনে হলো হাত বাড়ালেই ছোঁওয়া যাবে এত কাছে নেমে এসেছে | দারুণ এক নিস্তব্ধতার মধ্যে বসে আকাশ আর বাগানের অদ্ভুত মিশে যাওয়া দেখতে দেখতে গোটা সন্ধে দিব্যি কেটে গেল | এবার হ্যারিকেনের আলোয় ডিনার করার পালা |

Advertisements

2 COMMENTS

  1. দেবাশীষদা-র সঙ্গে আলাপ ১৯৯৮ সালে, আনন্দবাজার পত্রিকায় কাজ করতে গিয়ে। সাময়িকী দফতরে লেখালেখি, সম্পাদনা আর পাতা বানানো ছিল আমার শিক্ষানবিশির সময়ের কাজ। পাতা বানাতে আর্ট ডিপার্টমেন্টে যেতে হত… দেখতাম বিমলদা, সুব্রতদা, অনূপদা, দেবাশীষদা, চাকীদারা কাজ করছেন, আর তার সঙ্গে সঙ্গেই চলছে গল্প, আড্ডা আর হাসির হুল্লোড়…

    দেবাশীষদা বলতেই এখনও আমার সেই ছবিটাই মনে পড়ে। সবসময় হাসছেন, নতুনদের উৎসাহ দিচ্ছেন, আর তারই সঙ্গে আশ্চর্য সব কাজ করে চলেছেন রঙে অথবা সাদায়-কালোয়… দেখে মনে হত, কার্টুন আঁকা বুঝি এতই সহজ!!! অথচ চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝেছি আসলে কতটা কঠিন… একের পর এক কলম ভেঙেও একটা রেখা হাত দিয়ে বের করতে পারিনি…

    সেই থেকে শুরু। তারপর কত বছর ধরে একই রকম উৎসাহে কাজ করে চলেছেন দেবাশীষদা… বেড়েছে বিষয়ের বিস্তার, অথচ কাজের মধ্যে সেই অফুরাম প্রাণশক্তি বয়সের সঙ্গে বেড়েছে বই কমেনি… বিশেষ করে এই ট্র্যাভেলগগুলো যেন হয়ে উঠেছে আদ্যন্ত নতুন এক জঁর… সহজ, প্রাণবন্ত রেখায়, অনাবিল দেখার চোখে, আর তার সঙ্গে আন্তরিক অনুভবের রাজযোটকে ঝকঝকে এক নতুন তুলি-কলমের যুগলবন্দি…

    ভালো থাকো দেবাশীষদা… আরও বেড়াও… আরও দ্যাখো… আরও আঁকো, লেখো…

  2. এত সহজ সরল ভাবে এরকম একটি জায়গার বর্ণনাতে ছবির মত জীবন্ত হয়েছে এই ছোট্ট গ্রামটি | তার উপর আপনার অপূর্ব স্কেচ বারেবারে দেখতে ইচ্ছে করছে | স্কেচের সাথে লেখার ভিতরের অনুভূতি আমার ভিতরেও গভীর ভাবে প্রবেশ করেছে | এরকম ছোট ট্র্যাভেলগ লেখা সহজ ব্যাপার নয় | অমিতাভ বার করে দিল বলে এই অনাস্বাদিত রসের সন্ধান পেলাম| অনেক ধন্যবাদ আপনাকে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.