ভেজাল মাছ খাচ্ছেন না তো ? ক্যান্সার হতে পারে কিন্তু

উত্তর কলকাতার যে মোটামুটি বিখ্যাত বাজার থেকে বাজার করি, সেখানে এক মৎসবিক্রেতাকে ‘মাছ ভালো হবে তো’ জিজ্ঞাসা করলে তিনি একগাল হেসে উত্তর দেন, ‘কর্ণের রথের চাকার কথা জানেন তো দাদা? সেই চাকা যেমন মাটি ছোঁয়নি, তেমনিই ভেজালও আমার এই মাছ ছোঁয়নি কোনও দিন।’ মাছ কখন মরেছে জিজ্ঞেস করলে সাধারণত বলে থাকেন, এখনও ডেথ সার্টিফিকেট পাননি। প্রায়ই ‘অর্গানিক লোটে, অর্গানিক লোটে’ বলে বাজার মাথায় তোলেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘লইট্যা মাছের আগে আবার অর্গানিক কেন?’ বলেছিলেন, ‘এত সুন্দর গেরুয়া আভা, অর্গানিক না হয়ে যায়? এ হল হার্বাল মাছ!’ তাও, যেন ঠকে না যাই, তার জন্য প্রতিদিনই মাছ কেনার আগে, তাঁর কাছে মাছের কুশল জিজ্ঞেস করি। যেমনটা করে থাকি কাঁচালঙ্কা কেনার সময়। ‘লঙ্কায় ঝাল হবে তো?’ কলকাতার যত জায়গা থেকে লঙ্কা কিনেছি, শুনেছি, তা নাকি বেলডাঙার লঙ্কা! যাই হোক, সপ্তাহখানেক আগে সেই মাছবিক্রেতা যখন মাছের সুখ্যাতির একই রেকর্ড বাজাচ্ছিলেন, পাশ থেকে পথচলতি এক মহিলা নাক সিঁটকিয়ে মুখ ঝামটে বলে ওঠেন, ‘এই যে ভাই, কাল যে চিংড়িগুলো নিয়ে গেলাম সাড়ে পাঁচশ টাকা কেজি করে, তেলে ছাড়তেই তো উৎকট বন্ধ। পচা মাছ বেচছ? ব্যবসা ঘুচিয়ে দেব।’ তর্ক জুড়ে যায় রবিবাসরীয় সকালে। মাছওয়ালার দাবি, ওই মহিলা রাঁধতে জানেন না। অথবা তাঁর বাড়িতে বিপিএল তেল। হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম দেখে কেটে পড়তে শুরু করি। বাবা বলে, রাস্তাঘাটে ঝুটঝামেলায় জড়াস না। আর লোকনাথ বাবার রণে-বনে-জলে-জঙ্গলের মধ্যে আবার বাজার নেই। ফুটদশেক এগোতেই পাশের মাছবিক্রেতা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে কানে কানে বলেন, ‘আরে ও তো ফর্মালিন লাগানো মাছ বেচে। জানেন না? ওর কাছে যান কেন?’ প্রথম জন হয়ত আঁচ করেছিলেন উনি কি বলছেন। কম্পিটিশনের বাজার। সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট। অগত্যা তিনি হুঙ্কার ছাড়েন, ‘ফর্মালিন দেখাচ্ছ না? লুঙ্গির কোঁচড় থেকে আলতার শিশিটা বের করে দেব?’ ঝগড়ার ভরকেন্দ্র পালটে যায়। সেদিন আমাদের বাড়ি নিরামিষ হয়েছিল।

যাক পুরাতন, যাক ঘুচে যাক জপতে জপতে ভাগাড় কান্ডের পরে বাঙালি আবার মাংস খাওয়া ধরেছে। যে চিকেন একশ দশ টাকা কেজিতে নেমেছিল, মোরে আরও একটু আরও একটু দাও প্রাণ গুণগুণিয়ে খাঁচাভর্তি মুরগী খিলখিলিয়ে কোঁকরকোঁ করেছিল, তাদের হাসি মাসদুয়েকের বেশি স্থায়ী হয়েনি। রেস্তোরাঁকর্তাদেরও আর অ্যান্টি রিংকল ক্রিম কিনতে হয়নি দোকান থেকে। কপালের বলিরেখা মিলিয়ে গিয়েছে। ওয়েস্টবিনে মুরগীর হাড় উথলে উঠছে আবার। তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ। ইতিমধ্যে আবার এসেছে এক ‘উটকো’ খবর। ফর্মালিন। যা নাকি মাছে দেয়। মৎস মারিব খাইব সুখেতে আমরা যারা মজে আছি মজ্জাগতভাবে, তাদের এখনও এই নিয়ে টনক নড়েনি।

রাজ্য মৎস উন্নয়ন নিগমের জেনারেল ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) বি কে মন্ডল একটি দৈনিক সংবাদপত্রকে সম্প্রতি বলেছেন, ‘মানুষের স্বাস্থ্যর পক্ষে ক্ষতিকর, এমন কোনও রাসায়নিক খাবারে ব্যবহার করা যাবে না, এই মর্মে খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থার একটি পরামর্শ বা উপদেশ রয়েছে মাত্র। কিন্তু সেটা যাঁরা মানবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, এমনটা বলা নেই।’ তাই তো আজও কোনও মাছ তাজা কিনা তা পরখ করার মাপকাঠি কানকোর রং। বলা যেতে পারে, এ হল ‘স্বীকৃত’ মাপকাঠি। যাচাই করতে উৎসুক খরিদ্দারকে মাছের কানকো ফাঁক করে লাল দেখানোর ব্যাপারটা মাছের বাজারে হরদম দেখতে পাওয়া যায়। আর আমরা বুঝি, মাছের ঔৎকর্ষ কানকোর লাল রঙের সঙ্গে সমানুপাতিক। যে কানকো যত লাল, সে মাছ তত তাজা। আর টাটকা প্রমাণের যে নাটক, তাতে মুখ্য চরিত্রে থাকে আলতা। দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তবে শুনেছি, ভোররাতে, পাইকারদের থেকে মাছ কেনার পরই নাকি খুচরো ব্যবসায়ীরা কানকোয় ভাল করে আলতা মাখান। পাইকাররা যখন মাছ কেনেন, তখনও এক পরত আলতা রাঙান কিনা জানা নেই। উত্তরটা হ্যাঁ হলে অবাক হব না। তরিতরকারি-সব্জির মতো কাঁচা মাছও কৃষিপণ্যর আওতায় পড়ে। আর কৃষিপণ্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংরক্ষণের জন্য আমাদের দেশে যা আইন, তার বাঁধুনির থেকে ফাঁকের পরিমাণ বেশি। কোনও কৃষিপণ্য যতক্ষণ না পর্যন্ত প্যাকেটজাত, ব্র্যান্ডেড না হচ্ছে, ততক্ষণ তাতে বেস্ট বিফোর ডে, অর্থাৎ, কতদিন পর্যন্ত তা ব্যবহার করার উপযোগী, তা লেখার কোনও নিয়ম নেই। আর যেখানে নিয়মই নেই, তাতে বাধ্যবাধকতার কোনও প্রশ্ন আসে না। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, আলতার অন্যতম উপাদান হল রোডামন-বি নামে একটা সিন্থেটিক ডাই। যা কার্সিনোজেনিক।

ফর্মালিন বললেই মনে পড়ে যায় ফেলে আসা স্কুলজীবনে জীবন বিজ্ঞানের প্র্যাক্টিকাল করার ঘর। ছোট ছোট কাঁচের সিলিন্ডারের মধ্যে ফ্যাকাশে সোনালী একটা তরল। আর সারবন্ধ সিলিন্ডারে বন্দি ফিতাকৃমি, অক্টোপাস, সি-হর্স। ফর্মালিন আর মৃতদেহ কেমন যেন অস্বস্তিমাখানো সমার্থক শব্দ। বছর চোদ্দর অজ্ঞাতবাসের পর সেই সিএইচটুও যে আবার মাছের সঙ্গে প্রেম করে রোজনামচায় ফিরে আসবে ভাবিনি। এ বছরের জুনে কোল্লাম জেলা থেকে প্রায় সাড়ে নহাজার কেজি ফর্মালিনে সংরক্ষণ করা মাছ বাজেয়াপ্ত করেছিল কেরল সরকার। তার মধ্যে শুধু চিংড়িই ছিল সাত হাজার কেজি। কালীপুজোর আকাশে রকেটবাজির মতো এর পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, বিশেষ করে মৎসপ্রেমী রাজ্যগুলো থেকে একের পর এক আসতে শুরু করে ফর্মালিনসিক্ত মাছের খবর। যা বুঝলাম, হয়ত খাচ্ছি অনেকদিন থেকেই। প্রকাশ্যে এল এই সবে। জানতি পারি নি। মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের কথা শুনেছিলাম আগেই। বিদেশে রপ্তানী করা মাছের সিকিভাগই যে গত কয়েক বছরে লাল পতাকা দেখে ফেরত এসেছে অ্যান্টিবায়োটিক থাকার কারণে, সেই নির্লজ্জ তথ্যটাও অজানা ছিল না। কিন্তু ফর্মালিন কান্ড নিয়ে এ দেশেরই কয়েকটা রাজ্য যেভাবে খেয়োখেয়ি শুরু করল, তার ফলে নিজেদের মাথা নিজেরাই আরও হেঁট করে দিলাম আমরা। অসম সরকার অন্ধ্রের মাছ নেওয়া বন্ধ করল। কারণ, মাছে ফর্মালিন। অন্যদিকে দক্ষিণী রাজ্যটির দাবি, মাছে ওই রাসায়নিক মেশানোর কথা তাঁরা ভাবতেও পারেন না। বিশ্ব বাংলার মৎস্য ব্যবসায়ীরাও ফর্মালিন শব্দটা শুনলেই আঁতকে উঠে বলেন, রাম রাম! আমরা মেশাই না। আবার মুশকিলের ব্যাপার হল, মাছের নিজের শরীর থেকেও ফর্মালিন বেরোয় না! নেহা ধুপিয়ার ছেলে হবে না মেয়ে—এটা আমাদের কাছে কোটি টাকার প্রশ্ন হতে পারে। কিন্তু যে বিষটা রোজ খাচ্ছি, ও কিছু নয়। খাবারে ভেজালের কথা শুনলেই সরকার নাকি নড়েচড়ে বসে। এই নড়াটা অনেকটা অ্যাকোরিয়ামের ক্রোকোডাইল ফিসের মতো। যাঁরা চেনেন, তাঁরা জানেন। লাল ফিতের ভেজাল অমনিবাসে আরও একটা পাতা জুড়ল মাত্র। অথচ, দিনের পর দিন শরীরে যদি ফর্মালিন ঢোকে, ক্যান্সার হতে পারে। অবশ্য শুধু ফর্মালিনই না, কাঁচা মাছ সংরক্ষণ করার জন্য নাকি ব্যবহার করা হচ্ছে অ্যামোনিয়াও। কার কি যায় আসে!

মৎসবিজ্ঞান নিয়ে চর্চার জন্য ভারতবর্ষে যে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানটি আছে (সিআইএফটি), সেখানকার কয়েকজন গবেষক সম্প্রতি একটি সহজ উপায় বের করেছেন, যা দিয়ে সহজেই পরখ করে নেওয়া যাবে মাছে ফর্মালিন আছে কি না। গবেষনার নেতৃত্ব দিয়েছেন দুজন মৎসবিজ্ঞানী—এস যে লালি এবং ই আর প্রিয়া। তৈরি করা হয়েছে এক রকমের রেপিড [rapid] ডিটেকশন কিট। বড়সড় কোনও যন্ত্র ভাবলে ভুল হবে। কিট বলতে লিটমাস স্ট্রিপের মতো একটা ছোট্ট কাগজ আর সঙ্গে সামান্য রিএজেন্ট। পদ্ধতিটাও সোজা। কাঁচা মাছের গায়ে কাগজটা কয়েকবার ঘষতে হবে। তারপরে কিটে দেওয়া রাসায়নিকের এক-দুফোঁটা ওই কাগজের উপরে ফেলতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে আধ মিনিট। মাছে যদি ফর্মালিন থাকে, সাদা কাগজের রং পাল্টে নীল হবে যাবে ওই সময়ের মধ্যেই। আর এক রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসরের মতো মাছে যদি অ্যামোনিয়াও মেশানো থাকে, তাহলে ওই নীল হয়ে যাওয়া কাগজ এ বারে ক্রমশ সবুজ হবে। এর জন্য অবশ্য মিনিটদুয়েক অপেক্ষা করতে হবে। রাসায়নিক সহ পঁচিশটা স্ট্রিপের ওই কিটের দাম হতে পারে পঞ্চাশ টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ, মাঝারি সাইজের ইলিশের এক টুকরোর থেকেও কম। কিটটা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ। হয়তো আর কয়েক মাসের মধ্যেই বাজারে আসবে। তবে সমস্যাটা হল, অনুপ্রেরণামাখা মা-মাটি-মানুষ কিংবা জয় রামজির প্রজাবাহিনী—কারওরই কোনও উৎসাহ নেই খাদ্য সচেতনতা নিয়ে। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, কিটটি বাজারজাত হল এবং পঞ্চাশটি টাকা খরচা করে কেউ কেউ হয়ত সেই কিট কিনলেন। কিন্তু সেটা ব্যবহার করতে পারবেন তো বাজারে? হাতের লক্ষ্মী ঠেলে দেওয়ার আগে, বুক বেঁধে দাঁড়িয়ে, প্রিয় মাছটা ওজন করানোর আগে ওই কাগজ দিয়ে মাছের গায়ে ঘষার মতো ‘দম’ থাকবে তো? বিরাট বঁটি দা-র পিছনে তখন সব সার দিয়ে থাকা মগনলাল মেঘরাজ। হামি কি আপনাকে মিথ্যা কথা বলছি?

মুখ চেনা এক মাছ-ব্যবসায়ীর সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচনা করছিলাম দিনকয়েক আগে। ওনার হাতে আবার একটা সুতো বাঁধা। বিপত্তারিণী হলে তো লাল হত। সুতোটা একটু নীল আর একটু সাদা। আলতা-ফর্মালিন-অ্যামোনিয়া-অ্যান্টিবায়োটিক শুনে খুব হাসলেন। ওনাদের ট্রেড সিক্রেট জিজ্ঞেস করার সাহস আমার ছিল না। তবে এত সমস্যা শুনে উনি উপায় বাতলালেন। বললেন, ‘এর পর থেকে সিনেমায় মাছ খাওয়া দ্যাখালেই দাদা নিচ দিয়ে সরকার লিখে দেবে, ফিশিং ইজ ইনজুরাস টু হেল্থ। ফিশিং কজ ক্যান্সার। হি হি।’

‘পবলেম মিটল কি না, বলেন।’

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.