বুলেটে চড়ে বরাকর

995
বরাকরের মতো পাথরের দেউল পশ্চিমবঙ্গে বিরল

নতুন  বুলেট  বাইকটা  কেনা  ইস্তক  সায়ন্তন  আমার  কানের  পোকা  নড়িয়ে  দিয়ে  ক্রমাগত  বলে  চলেছিল  ” ও কাকা , চলো না একটা  লং ড্রাইভ ট্রাই করে আসি । বেড়ানো হবে আর বাইকের  মাইলেজটাও পরীক্ষা  করা  হবে।”   সায়ন্তন আমার  অনুজপ্রতীম  বন্ধু । পেশায় ফ্যাশন  ফটোগ্রাফার। যখন  ওর হাতে  তেমন  কাজ  থাকে না, আমার  সাথে  ছোটখাটো আউটিং করতে ভালবাসে । কিন্তু  বাইকে  করে  লং  ড্রাইভ ? ওর  আগের বাইকে চড়ে একবার গাদিয়ারা যাওয়ার  চেষ্টা করেছিলাম , কিন্তু  ভুল  রাস্তায়  গিয়ে অর্ধেক দিন নষ্ট  করে ব্যর্থ  মনোরথে বাড়ি  ফিরেছিলাম । সেই  ড্রাইভটাতে  সায়ন্তন একটা  বাম্পার  বুঝতে না পারায় সেটার  উপরে ফুল স্পীডে বাইক চালিয়ে দিয়েছিল । বাইকের কিছু হয়নি, কিন্তু  আমি  কয়েক সেকেন্ডের জন্য  শুন্যে উঠে  গেছিলাম আর আশেপাশের লোকেরা  ‘গেল, গেল’ করে  উঠেছিলো ।

তাই  বাইকে  চড়ে লং ড্রাইভের প্রস্তাবটা আমি  কাটিয়ে যাচ্ছিলাম , কিন্তু  সায়ন্তন  ছাড়ার পাত্র নয় । সে বলল ” আরে কাকা , ওটা  কি বাইক ছিল আর এটা কোন লেভেলের বাইক সেটা ভাবো ।  আর শেষ কয়েক বছরে  আমি  বাইক রাইডার হিসেবে  অনেক পরিণত । পরীক্ষা  প্রার্থনীয়  কাকা।  তুমি শুধু  লোকেশন সিলেক্ট  করো ।  বাকি দায়িত্ব আমার ।”

লং ড্রাইভের  লোকেশন খুঁজতে গিয়ে  বরাকরের নামটা প্রথমে  মাথায় আসেনি । আমি দীঘা, মন্দারমণি, বিষ্ণুপুর  ইত্যাদি চেনা  জায়গার কথা  ভাবছিলাম।  এর মধ্যে আমার এক বন্ধু  আমায় জানাল যে বরাকরের বেগুনিয়া বাজারের কাছে চারটে উড়িষ্যা ঘরানার পাথরের দেউল মন্দির দেখে এসেছে। ওরা মাইথনে পিকনিক করতে গিয়েছিল, সেখান থেকে মাত্র ১২ কি.মি দূরে মন্দিরগুলি অবস্থিত। ওর মন্দিরগুলোর উপস্থিতি নিয়ে কোনও ধারণা ছিল না।

বরাকরের মন্দিরের কথা  আমি আগেই শুনেছিলাম। পাথরের  তৈরি মন্দির পশ্চিমবঙ্গে বিরল। আকার আর অলঙ্করণের দিক দিয়ে তুলনা করলে একমাত্র  পুরুলিয়ার বান্দার দেউলের সাথে বা তেলকুপীর দেউলের সাথে করা যেতে পারে।  ভাবলাম  এই সুযোগে উড়িষ্যা ঘরানার রেখ-দেউল রীতির তৈরি এই চারটি মন্দির  দেখে  আসা যেতে পারে !

বরাকরের  নাম শুনেই  সায়ন্তনের  চোখ  চকচক  করে উঠল ।  সে বলল ” এটা  ফাটাফাটি  প্রস্তাব কাকা। NH2 দিয়ে  সিঙ্গুর , পানাগড় , দুর্গাপুর  আর আসানসোল দিয়ে বরাকর পৌঁছতে প্রায়  ২৪০ কি.মি যেতে হবে। তুমি ২৫০ ই ধরো। যদি সেদিনই রিটার্ন করি , তাহলে একদিনে  ৫০০ কি.মি র  মতো ড্রাইভ করা  হবে। আমি ধানবাদ একদিনে ড্রাইভ করে গেছি, কিন্তু সেদিন রিটার্ন  করিনি। তবে সেরকম চাপের কিছু নয়। কিন্তু তুমি পাঁচশো কি.মি ব্যাক সিটে  টিকতে পারবে তো?”

আমি  গাদিয়ারা মনে করে  একটু  নার্ভাস বোধ করছিলাম । কিন্তু  মুখে সাহসের ভাব দেখিয়ে বললাম – “আরে না পারার কি আছে? মাঝে  মাঝে  থামবে তো  রে বাবা।”

“সে তো থামবই । প্রথম  হল্ট  হবে  শক্তিগড়।  ওখানেই  ব্রেকফাস্ট সেরে  নেব।”

নির্দিষ্ট দিনে ভোর সাড়ে ছ ‘টা  নাগাদ আমরা যাত্রা শুরু করলাম । সেটা ছিল জানুয়ারির শেষের দিকে , তাই  সকালের  দিকে একটু  ঠান্ডা ঠান্ডা  লাগছিল। সায়ন্তনের বাইকের মডেল ছিল  রয়েল এনফিল্ড থান্ডারবার্ড । তার পিছনে বসে দুটো জিনিস বুঝলাম এক, এই  বাইকটা অনেক আরামদায়ক । দুই, সায়ন্তন বাইক চালানোয় বেশ উন্নতি করেছে ।

শক্তিগড় পৌঁছতে  লাগলো  দেড় ঘন্টা।  ওখানে  একটু কচুরি তরকারি  দিয়ে  ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম। ল্যাংচা খাবো ভেবেছিলাম। কিন্তু প্রথম দোকানটার  সামনেই  রাস্তার  পাশে ঘাসের উপর  যেভাবে ছানা শুকানো হচ্ছে দেখলাম , তাতে  খাওয়ার প্রবৃত্তি চলে গেল। হয়ত এটা সব দোকানে হয়না, কিন্তু চোখে পড়ে গেলে কিছু করার নেই।

সায়ন্তন  ও তার বুলেট থান্ডারবার্ড  বাইক
সায়ন্তন ও তার রয়েল এনফিল্ড থান্ডারবার্ড বাইক

হাইওয়ের মাখনের মতো রাস্তা দিয়ে বাইক ছুটে চলল। রানীগঞ্জের পাঁচ কিলোমিটার আগে আমরা আবার একটু দাঁড়ালাম । সামনের মাইলস্টোনে  লেখা “বারানসী – ৪৮০  কি.মি.”। সায়ন্তন  সেইটা দেখে চোখ টিপে বলল  “আর ৪৮০ কি.মি. গেলেই বেনারস। রাতে একটা ব্রেক নিয়ে চালালেই কাল সকালে বারানসী। উফ কি থ্রিলিং হতো কাশী।”

“থাক, আর বেনারস যেতে হবে না। এবার বরাকর চলো। ১০:৩০ বেজে গেছে।” তাড়া লাগিয়ে বললাম আমি| রানীগঞ্জ পেরিয়ে কিছুদূর গিয়ে আমরা হাইওয়ে ছেড়ে আসানসোলের  রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। আর এটাই হলো আমাদের ভুল।

ম্যাপে দেখলে মনে হয় আসানসোলের রাস্তা ধরে গেলে বরাকর অনেক চটপট পৌঁছানো যাবে। কিন্তু আদতে তা নয়। প্রথমত: হাইওয়ে ছেড়ে শহরের রাস্তায় ঢুকতেই সেই ফুরফুরে ব্যাপারটা চলে গেল। সেই সময় আসানসোলের স্টেট হাইওয়ের অবস্থা শোচনীয় ছিল। তার উপরে শহরের ট্রাফিক।

স্পিড কমিয়ে সাবধানে চালাতে হচ্ছিল। গাদিয়ারার অভিজ্ঞতার মতো মাঝেসাঝে বাম্পারও পড়ছিল। তখন আমি চমকে চমকে উঠছিলাম | কিন্তু সব খারাপ জিনিস একটা সময় শেষ হয়। ২৩ কি.মি  ড্রাইভ করার পর আমরা ডান দিকে মাইথন যাওয়ার রাস্তায় ঢুকলাম|

এই রাস্তায় একটু এগিয়েই বাঁ দিকে  ছোট একটা গলির মধ্যে ঢুকলাম। গলিটার শেষে একটা  মাঠ। রাস্তা থেকে দুটো মন্দির দেখা যাচ্ছিলো। আর একটু এগোতেই বাকি দুটো মন্দির দেখা গেল। এই মন্দিরগুলো বর্তমানে ASI (Archeological Survey of India)র তত্ত্বাবধানে  রয়েছে। মন্দিরগুলোতে পুজো হয়, বান্দার দেউলের মতো অবহেলিত অবস্থা নয়। তবুও কেমন যেন বেখাপ্পা লাগছিল। মাঠের বাইরে চারপাশে ইতস্ততঃ অনেক বাড়ি উঠে গেছে। আসলে এত প্রাচীন সব মন্দিরের পাশে হাল আমলের বাড়ি দেখলেই আমার একটু অস্বস্তি হয়। তারপরে এলাকাটা এত ঘিঞ্জি বলেই মন্দিরগুলো আরও বেমানান লাগছিলো।

বেগুনিয়া বাজারের প্রথম আর দ্বিতীয় মন্দির
বেগুনিয়া বাজারের প্রথম আর দ্বিতীয় মন্দির

সায়ন্তন মন্দিরগুলো দেখছিল। একসময় সে প্রশ্ন করল “কাকা, এই এলাকাটাকে বেগুনিয়ার বাজার বলে কেন ? এখানে কি খুব বেগুনের চাষ হতো?”

আমি বললাম “বেগুনিয়া নামটার উৎপত্তি নিয়ে চালু গল্পটা হল যে এই মন্দিরগুলোর শিখরের আকৃতির সাথে বেগুনের আকারের  সাদৃশ্য আছে। তাই  জায়গাটার নাম বেগুনিয়া আর মন্দিরগুলোকে বলা হয় বেগুনিয়ার মন্দির|”

“ইন্টারেস্টিং।” পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে বলল সায়ন্তন। তারপর প্রশ্ন করল “একরকম জায়গায় একসাথে এতগুলো মন্দির কে বানিয়েছিলো?”

আমি একটু থেমে বললাম “বলা মুশকিল। বিনয় ঘোষের পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি পড়ে জেনেছি যে ওই যে পাশাপাশি দুটো মন্দির দাঁড়িয়ে আছে, ওদের মধ্যে একটার দরজায় প্রতিষ্ঠা ফলকে বা শিলালিপিতে লেখা আছে যে ১৩৮২ শকাব্দে (১৪৬২ খ্রিস্টাব্দে) ফাল্গুন শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রাজা হরিশচন্দ্রের স্ত্রী হরিপ্রিয়া তাঁদের আরাধ্য দেবতা শিবের উদ্দেশ্যে এই মন্দির নির্মাণ করেন। তিন নম্বর মন্দিরটি থেকেও একটা শিলালিপি পাওয়া গিয়েছে। তাতে লেখা আছে যে ১৪৬৮ শকাব্দে (১৫৪৬ খ্রিস্টাব্দে), নন্দ নামক এক ব্রাহ্মণ ও তার স্ত্রী  মন্দিরটি সংস্কার করেন। আর চার নম্বর মন্দিরটি আরও আগের, বোধহয় অষ্টম বা নবম খৃষ্টাব্দের সময়কার। ওটা যে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা সেটা খুব সম্ভবত: পরে হয়েছে। আসলে এই চার নম্বর মন্দিরটা অন্য তিনটের থেকে অনেকটাই আলাদা। তাই এখন এই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা সিদ্ধেশর শিব হলেও, অনেকে মনে করেন এটি আসলে জৈন মন্দির ছিল।”

বরাকরের তৃতীয় মন্দির
বরাকরের তৃতীয় মন্দির

“আর বাকিগুলো?”

“প্রথম মন্দিরে তিনটে শিবলিঙ্গ আছে সাথে একটি মূর্তি -সম্ভবত কালী। দ্বিতীয়টিতে রয়েছে তিনটে শিবলিঙ্গ আর একটি গনেশ মূর্তি। তিন নম্বরটা  সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং -একটা পাথরের মাছের উপর পাঁচটি শিব লিঙ্গ। পাথরের মাছ নাকি নারী শক্তির  নিদর্শন।”

“আরিব্বাস,পাথরের মাছ? চলো দেখি।” সায়ন্তন উৎসাহের সঙ্গে বলল |

মন্দিরগুলো ভালো করে দেখতে দেখতে একটা বেজে গেলো। আমি মন্দিরের কারুকার্যগুলো মন দিয়ে দেখছিলাম। প্রথম দুটি অলঙ্করণে উড়িষ্যা ঘরানার ছাপ স্পষ্ট বোঝা যায়। উদাহরণ স্বরূপ মন্দিরের চূড়ার কাছে উড়ন্ত সিংহের মোটিফ উল্লেখ করা যেতে পারে। এছাড়া মন্দিরগাত্রে আরো অজস্র নানা ধরনের অলঙ্করণ রয়েছে। কয়েকটা রাক্ষস প্যাটার্নের মুখ চোখে পড়ল। যেহেতু মন্দিরে শিবলিঙ্গ রয়েছে, এগুলো কীর্তিমুখও হতে পারে। উড়িষ্যার শিবের মন্দিরের বাইরে কীর্তিমুখের ছড়াছড়ি থাকে।

সোয়া একটা নাগাদ রওয়ানা দিলাম। এবার আসানসোলের দিকে না গিয়ে মাইথনের দিকের রাস্তা ধরলাম। লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে, রামনগর কোলিয়ারি ছাড়িয়ে নিমেষের মধ্যে হাইওয়েতে পড়লাম। বুঝলাম প্রথমবার এই রাস্তা দিয়েই আসা উচিৎ ছিলো।

বরাকরের চতুর্থ  মন্দির । এটি সবচাইতে পুরানো ।  সম্ভবতঃ অষ্টম বা নবম খৃষ্টাব্দের সময়কার।
বরাকরের চতুর্থ মন্দির । এটি সবচাইতে পুরানো । সম্ভবতঃ অষ্টম বা নবম খৃষ্টাব্দের সময়কার।

হাইওয়েতে পৌঁছতেই আমার মোবাইলে একটা ফোন এলো। আমার বন্ধু অমর ফোন করেছে । সে যা বলল তাতে পিলে চমকে গেল। তেলের দাম বাড়ার প্রতিবাদে বিভিন্ন হাইওয়েতে অবরোধ হচ্ছে। আসানসোলের দিকেও হওয়ার কথা। বলতে না বলতেই চোখে পড়ল সামনে সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। হাইওয়ে থেকে আসানসোল ঢোকার মুখেই নাকি অবরোধ হয়েছে। দশ কিলোমিটার আগে থেকে গাড়ির লাইন পড়েছে। আমরা বরাকর ঢুকেছি মাত্র দেড় ঘন্টা আগে। তার মধ্যেই এত কান্ড ঘটে গেছে।

বরাকরের মন্দিরগাত্রে কারুকার্য
বরাকরের মন্দিরগাত্রে কারুকার্য

সায়ন্তন একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে তবুও মাথা ঠান্ডা রেখে ট্রাকগুলোকে কাটিয়ে কাটিয়ে এগোচ্ছিল। কিন্তু তিন কি. মি. যাওয়ার পর আর এগোনো গেল না। অনেকগুলো ছোট গাড়ি একই কায়দায় এগিয়ে গিয়ে রাস্তাটা পুরো জ্যাম করে রেখেছে।

দেখতে দেখতে দুটো বেজে গেল। ক্ষিদেয় পেট চুইঁ চুইঁ  করছিল। এমন সময় একটা ট্রাক ড্রাইভার জানাল যে আলোচনার পর অবরোধকারীরা জানিয়েছে যে আধ ঘন্টা পরে তারা একটা দুটো করে গাড়ি ছাড়বে। আমি প্রমাদ গুনলাম। ছয় কি.মি জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি যদি একটা দুটো করে ছাড়ে তাহলে তো বিকেল হয়ে যাবে। হঠাৎ মনে হল উল্টো দিকের লেনটা তো ফাঁকা। কারণ ওদিক দিয়েও গাড়ি আসছে না। কোনওভাবে ওদিকের লেনে গিয়ে যদি ড্রাইভ করে একদম সামনে চলে যাওয়া যায় তাহলে গাড়িগুলো ছাড়ার সাথে সাথে আমরাও বেরিয়ে যেতে পারি।

Picture7
উড়িষ্যা ঘরানার ছাপ – উড়ন্ত সিংহের মোটিফ

কিন্তু ডিভাইডার টপকে ওদিকে এই সাতমনি বাইকটা নিয়ে যাবো কি করে? সায়ন্তনকে কথাটা বলতে সে হাত তুলে বলল “মাপ করো কাকা, আমি আর তুমি মিলে ডিভাইডার টপকে বাইক নিয়ে যেতে পারবো না।” আমি ওকে বোঝালাম সেটা সম্ভব নয় আমি জানি। অন্য কোনও উপায় ভাবতে বলছিলাম।

রাক্ষস মুখ - কীর্তিমুখও হতে পারে
রাক্ষস মুখ – কীর্তিমুখও হতে পারে

কথার মধ্যে কখন পাঞ্জাবী ট্রাক ড্রাইভারটা নেমে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। এবার সে গোঁফে তা দিয়ে বলল “গাড্ডি উধার লেনা হ্যায় ক্যা?”

আমি একটু ভয়ে ভয়ে বললাম “হো সকতা হ্যায় ক্যা?” পাঞ্জাবী লোকটি হেসে বলল “জরুর হো সকতা হ্যায়”। তারপর সে হাঁক পেড়ে তার সাথীদের ডেকে এনে অবলীলাক্রমে বাইকটা ডিভাইডার টপকে ওদিকের লেনে নামিয়ে দিল। ভারতবর্ষে যেমন রাস্তা অবরোধ হয়, তেমনি ডিভাইডার টপকে বাইক নামিয়ে দেওয়ার লোকও পাওয়া যায়।

আমাদের সাহায্যকারী বন্ধুদের ধন্যবাদ দিয়ে আমরা বাইকে চেপে উল্টো দিকের লেন ধরে ধীরে ধীরে এগোতে থাকলাম। সায়ন্তন বলল “এটা টোটাল বেআইনি কাজ হচ্ছে। হাইওয়েতে উল্টো দিকের লেনে গাড়ি চালাচ্ছি। পুলিশ ধরলে সোজা চালান। আর যদি এখন এই লেনটা ছেড়ে দেয় তো কেলোর কীর্তি হবে।” আমি বললাম “এই চান্সটা নিতেই হবে। কিচ্ছু করার নেই। আর অবরোধকারীরা খুব আইন মেনে কাজ করছে বুঝি?”

একটু পরেই আমরা অবরোধের জায়গায় পৌঁছে গেলাম। সেখানে দেখি প্রচুর শোরগোল। অনেক লোক, পুলিশ, ফেস্টুন, ব্যানার ইত্যাদির মধ্যে কেউ খেয়াল করলো না যে উল্টো দিকের রাস্তার পাশ ধরে একটা বাইক খুব চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

সায়ন্তন বলল “এসে তো গেছি। এবার কি করবো?”

আমি বললাম “চুপচাপ অপেক্ষা করো। যেই ওরা অবরোধটা খুলবে, তুমি ওই দুটো পুলিশের  মাঝখান দিয়ে স্পিডে বেরিয়ে যাবে। এখন আস্তে আস্তে বাইকটা নিয়ে রাস্তা ক্রস করে ডিভাইডারের পাশে দাঁড়াও। ডিভাইডারের আসে পাশে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। আমাদের কেউ খেয়াল করবে না।”

সায়ন্তন নার্ভাস গলায় বলল “আজ হাজতে পাঠাবে। কাকা, আমার কিন্তু একটু নেচারস কল আসছে, চট করে সেরে আসি?”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম “হ্যাং ইওর কল। চটপট রাস্তাটা ক্রস করো। ওরা এক্ষুনি অবরোধটা খুলবে। কোনও গাড়ি বেরোবার আগে আমাদের বেরোতে হবে। সামনের পুলিশ দুটোকে ডজ করলেই ফাঁকা রাস্তা।“

সায়ন্তন আস্তে আস্তে রাস্তা ক্রস করে পুলিশটার পিছনে দাঁড়াল। আমি ফিস ফিস করে বললাম “অবরোধ খুললেই জোরে হর্ন দেবে। পুলিশটা চমকে সরে যাবে। আর তুমি সোজা বেরিয়ে যাবে। তোমার বাইকের পিক আপ ও টেস্ট হয়ে যাবে।”

সায়ন্তন বলল “আমাকেই না পিক আপ করে নেয়।”

বলতে বলতেই দেখলাম অবরোধকারীরা রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে। দুমিনিটের মধ্যে রাস্তা ফাঁকা। আমি বললাম “এবার হর্ন মারো।”

কোনও গাড়ি হর্ন দিচ্ছিল না। সেই অবস্থায় বুলেটের হর্নটা লাউডস্পিকারের মতো শোনাল। পুলিশটা পিছন থেকে কোনও গাড়ি আশা করছিল না। সে একটা চিল চিৎকার দিয়ে রাস্তা ছেড়ে ডিভাইডারে উঠে পড়ল। আমি চেঁচিয়ে বললাম “গো”।

বুলেটের পিক আপটা রকেটের মতো হলো। পাশের লেন থেকে পরের লেনে ঢুকে যখন সায়ন্তন বাইক ছোটাল, আমি নিশ্চিত ওখানকার দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের লোকগুলো ব্যাপারটা বোঝার আগে বাইক অনেকদূর এগিয়ে গেছে।

আমাদের ক্ষিদে মরে গিয়েছিলো। তাই নেচারস কলের ব্রেক নেওয়ার পর একটা ছোট দোকানে শুকনো কিছু খেয়ে নিলাম। কলকাতার কাছে আসার সাথে সাথেই ঝপ করে অন্ধকারটা নেমে এল আর তার সাথে ঠান্ডাটা। পা দুটোকে খুব ঠান্ডা লাগছিলো, তাই
এক সময় সায়ন্তনকে থামতে বলে একটু পায়ে ম্যাসেজ করে নিলাম।

“তোমার এখন ম্যাসেজে কাজ হবে না।” বলল সায়ন্তন। তারপর বলল “ক্ষিদেটা আবার পাচ্ছে, তাই না?”

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

“চলো সব প্রবলেম সলভ করে দিচ্ছি। তোমার একটা ওষুধ দরকার।” বলে সায়ন্তন বুলেট ছোটাল। আর থামল একেবারে আর্সালানের সামনে।

আহা, আর্সলানের বিরিয়ানি, কাবাব আর মাটন স্টুর মতো ওষুধ হয় ! হাভাতের মতো গোগ্রাসে গিললাম। খেয়ে দিয়ে শরীর মন সব চাঙ্গা হয়ে গেল। আর্সালানের সামনের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে সায়ন্তন বলল “তাহলে বাইক টেস্ট, ফিটনেস টেস্ট সব হয়ে গেল। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার থেকে বেঁচে গেলাম। এবার বুলেটে করে বেনারসটা যেতেই হচ্ছে।”

তার পর চার বছর কেটে গেছে। বুলেটে করে বেনারস আর যাওয়া হয়নি। তবে একদম হালে সায়ন্তন প্রায় ৪০০ কি.মি বাইক চালিয়ে পুরুলিয়া ঘুরে এসেছে, এবং দু’দিন পর আবার ৪০০ কি.মি বাইকে করেই ফিরেছে। সেই ইস্তক মাথার মধ্যে  চিন্তাটা ঘুরছে – বুলেটে করে বেনারসটা ঘুরে আসলেই হয়।

Advertisements

7 COMMENTS

  1. khub sundar lekha. jayga tay jawa ja kivabe theke suru kore okhaner architecture ba specialty ta eto sundar vabe bola hoyeche j kichu jiggasa korar thake na. description ta o khub sundar.. darun laglo.

  2. বেশ ঝরঝরে লেখা । ট্রাক- এর line -এর ছবি নেই ?

    Photo no 6 : Lakulisha ?

  3. খুব ভালো লাগল। খুব সুন্দর outing হল তোমাদের।
    খুব তারাতারি বেনারসের গল্প শুন্তে চাই

  4. Amitabha da r sathe amar porichoie tao prai 16 bochor hoye galo. Rosik, mishuke Amitabha de sohojaie bhalo lege jaie. Majhe besh kichudin amar desho tyag r fole jogajog ta kome eshechilo. Abar notun kore bondhutto jora legeche. Bhalo chobi tola, ghuchiye golpo bola Amitabha dar hallmark. Tai aie lekha ta pore mone holo, jano samne boshe sunchi. Amitabho da, Jai Baba Biswanath , bole beria e poro…

  5. এই জন্যই বার বার বলি বাঙলায় লেখ। খুব সুখপাঠ্য হয়েছে। মন্দিরগুলোর আরেকটু বিশদ বর্ণনা আার ছবি থাকলে ভাল হত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.