বাঙালির ঝি সংস্কৃতি

ক্লাসিক্যাল মিউজিকে রাগ-রাগিণীর কথা অনেকেই শুনেছেন । বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রাগ আছে । যেমন ভৈরবী সকালের রাগ , ইমন সন্ধের । তবে বাঙালির জীবনে প্রত্যেহ সকালে যে রাগ বাজে তার নাম ‘ভৈরবী’ নয় । সেটি হল ‘ঝি রাগ’ ।

বাঙালির পকেটে নাকের সিকনি মোছার রুমাল এবং সংস্কৃতিমনস্কতা পাশাপাশি বিরাজ করে । এই নিয়ে বাঙালির দেমাগ খাটালে বাসি গোবরের গন্ধের মতন সবসময় জেগে থাকে , চোখ লাগার সিন নেই । অনেকে আবার ন্যাকা ন্যাকা গলায় বলে – ‘আমার জীবনে গুরুদেব ছাড়া আর কেই বা আছেন’ । না , খালি গায়ে টসটসে পুংস্তনযুক্ত সাইজ জিরো ফিগারের কোনো বাবাজী নন এই গুরুদেব । এই গুরুদেব হলেন রবীন্দ্রনাথ । কিন্তু, সকালে উঠে এরাই যদি দেখেন মাসি , মালতির মা , উল্লাসী এরকম কেউ কাজে আসেনি , তখন কোনো গুরুদেবকে স্মরণ করেন না এরা । মেঘের কোলে রোদ হেসেছে , ঝি গিয়েছে ছুটি । হা হাহা হা হা নয় , হায় হায় হায় ! সকালে একটা প্রত্যাশিত কলিং বেল না বাজলে কিমবা নির্ভুল সুরে ‘বউউউউউউউউদি’ না শুনলে বাঙালির ছিটকিনি জ্যাম হয়ে যেতে বাধ্য ।

এই কাজের লোকের নিয়োগ একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । ঝি এর রিক্রুটমেন্টের সঙ্গে কর্পোরেট রিক্রুটমেন্টের অনেক মিল আছে । বেশীরভাগ রিক্রুটমেন্ট হয় কারো রেফারেন্সের মাধ্যমে । সবিতা বৌদি অবনী বাবুদের বাড়ির জন্য তার ঝি মালতীর মৌখিক সিভি ফরোয়ার্ড করলেন । ‘মালতী’ ঝিয়েদের জেনেরিক নাম বলতে পারেন । বাঙালিদের মধ্যে কিছু অদ্ভুত স্বভাব দেখা যায় , যেগুলি সারা পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির মধ্যে খুঁজে পাবেন না । এই যেমন ‘জল ঘাঁটা’ , ‘ঝ্যাঁটা ন্যাতা’, ‘ছুঁচিবাই’ । আপাতদৃষ্টিতে দেখতে গেলে এই কাজগুলি আসলে জীবনের মূল্যবান সময়কে অবাঞ্ছিত কেশ ভেবে উৎপাটন করা ছাড়া কিছুই নয় । কিন্তু , এগুলি ছাড়া বহু মানুষ বেঁচে থাকাটা কল্পনাই করতে পারবেন না । এই ধরনের মানুষের সংখ্যা খুব অল্প নয় , বরং বেশী । সকালে হাগু শেষে যথেচ্ছ জল অপচয়ের পর ‘স্বচ্ছ পাছা অভিযান’ শেষ হলে অনেকেরই মনে হয় যেন গোটা কলঘর ‘হেগো’ হয়ে গেছে । তাই কলঘরের দেওয়ালগুলোকেও জল দিয়ে ভেজানো হয় , এটাই ওই ‘জল ঘাঁটা’র একটা টাইপ । হোসপাইপের অভাবে ছাদটা বাদ পড়ে । এই ‘হেগো’ ধারনাটাই সাহেবদের থেকে বাঙালিকে আলাদা করেছে । সাহেবদের সব কাপড়ই ‘হেগোকাপড়’ , কিন্তু বাঙালির নয় । আমাদের দেশের পতাকা একটাই । কিন্তু, প্রত্যেক বাঙালি ঘরের একটা করে নিজস্ব পতাকা আছে । এটাকে ‘ন্যাতা’ বলে । ছাদের দেওয়ালে বা ঘরের কোনে বড় অবহেলায় পড়ে থাকে এই পতাকা থুড়ি ন্যাতা । যদিও এই ন্যাতা ছাড়া বাঙালি জীবন অচল । ন্যাতা অনেকরকম হয় । সাধারণত বাতিল গেঞ্জি বা জাঙ্গিয়া ন্যাতা হিসেবে জনপ্রিয় । কিছু কিছু ন্যাতায় এতো ছিদ্র থাকে যে দেখে বুলেট মার্ক মনে হয় । কে যেন বলেছিল , আরে তোদের বাড়ির ন্যাতা দেখে মনে হয় জেনারেল ডায়ার জালিয়ানওয়ালাবাগের ফায়ারিং এর শেষে বেঁচে যাওয়া বুলেট তোদের বাড়ির ন্যাতায় ফায়ার করেছিল । যেটা বলছিলাম ঝিয়েদের রিক্রুটমেন্ট নিয়ে বাঙালি হেবি চাপ নেয় । হাজার হোক যে সে লোক তো আর ঘরে ঢোকানো যায় না । একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতেই হবে । একটু বেশি ছুকরি ঝি হলে চাপ আছে । পাড়ার কোন লক্করের সঙ্গে ‘এক দু যে’ কেলিয়ে কেলো হতে পারে । ভবানীবাবুদের বাড়ির ঝি তো ওই কেসেই ভবানীবাবুদের বাড়িতেই গলায় দড়ি দিলো । তন্বী ঝি হলে বাড়িতে লাস্ট স্টোরিজ এর রিস্ক থেকেই যায় । ঝি রিক্রুটমেন্টে ওয়ার্ক এক্সপিরিয়েন্স খুবই ম্যাটার করে । কাজের লোকেরাও জয়েন করার আগে ডিটেলে জব ডেসক্রিপশন চেয়ে নেন । আগেই বলেছি কর্পোরেটের সঙ্গে অনেক মিল । কটা ঘর মুছতে হবে , সপ্তাহে কতবার ঝাঁট দিতে হবে , কাপড় কাচতে হবে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি । এছাড়াও ঝিয়েরা খবর নিয়ে রাখেন সেই বাড়িতে ভীমরতিযুক্ত বুড়ো আছে কিনা । সেইদিন দূর নেই যেদিন কাজের লোকেরাও ‘মি টু’ ব্লগ শুরু করবে । বৃক্ষ তব ফলে পরিচয় , বাঙালি তব ঝিয়ে পরিচয় ! কিছু কিছু বাড়ি দাগী হয়ে যায় , কারণ সেই বাড়িতে ঝি বেশীদিন টেকেনা বলে । ঝিয়েরাও নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে সেইসব বাড়িগুলোকে ব্ল্যাকলিস্টেড করে দেন । কিছু কিছু বাড়ি আবার ঝি টিকিয়ে রাখতে নানান স্কিম চালু করেন । বাড়ির বাসি খাবার , পচা ফল , মিষ্টি , পুরনো জামাকাপড় মাঝেমাঝেই বিতরন করেন । কেউ কেউ ঝিয়েদের সঙ্গে বসে সিরিয়ালের রিপিড টেলিকাসট দেখেন । শুধু তাই নয় , সিরিয়াল সংক্রান্ত তত্ত্বালোচনাও করে থাকেন । আমাদের পাড়ায় এক জেঠিমা তাঁর ঝিয়েদের নিয়ে গান গেয়ে থাকেন –

“আমার মালতী লতা , ওগো কি আবেশে দোলে” । মালতী বাসন মাজে আর লতা কাপড় কাচে । মালতী কাজ ছেড়ে দিলে শ্যামলী চাকরী পায় । শ্যামলী ডুব মারলে সেই জেঠিমা গাইতেন –

“শ্যামলী করেছে কামাই ,

আজকে আসবে আমার জামাই ,

জীবনে দুদণ্ড শান্তি নাই ।”

সকালে বাড়িতে ঝি আসার সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি হঠাৎ সকলেই কেমন যেন বিএসএফ জওয়ানদের মতন হয়ে যান । তাঁদের যেমন সীমান্তে সর্বদা সজাগ দৃষ্টি , তেমনি বাঙালিরও ঝিয়েদের উপর সজাগ দৃষ্টি । ঘরের মেঝের একটা কোনাও যেন বাদ না যায় । সব জায়গায় ন্যাতা পৌছোনো চাই । গোটা ঘর যেন ক্যানভাস , আর ন্যাতা হল পেন্ট ব্রাশ ! ঝিয়েরাও হেবি ঘাঘু মাল । একদিন সজাগ দৃষ্টি ঢুলু হলেই , ন্যাতা মেঝের বহু জায়গা স্কিপ মেরে বেড়িয়ে যায় । সকালে ঝিয়েদের পেছনে একটা নির্দিষ্ট সময় বাঙালি বরাদ্দ করে রাখে । এই যেমন আমার বাড়িতে । আমি সকালে দেরীতে উঠি । মাঝে মাঝেই কেউ একজন জোর করে ঘুম থেকে তুলে দেয় – ‘তাড়াতাড়ি ওঠ , মাসি এসে গেছে ।’ সারা বাড়ি জুড়ে সাজো সাজো রব । চেয়ার , টেবিল সরিয়ে , মশা উড়িয়ে সব রেডি করতে হবে । যেন মন্ত্রী আসছেন জেড ক্যাটেগরি নিয়ে ! সাধারণত রোবটরূপী ঝিয়েদের পেছনে রিমোট হয়ে বাড়ির মহিলা অথবা রিটায়ার করা ভাঁটবকায় সিদ্ধিলাভ করা উজবুক বুড়োভাম থাকেন । এরা ঝিয়েদের ডিরেকশন দেন , মেঝের কোন কোনে ময়লা জমে আছে , দেওয়ালে কোন জায়গা ন্যাতার টাচ পায়নি , কোন জায়গায় ন্যাতার আর একটা টাচ দরকার ইত্যাদি ইত্যাদি ।

ইজরায়েলের মোসাদ আছে , আমেরিকার ‘সিআইএ’ আছে , পাকিস্তানের ‘আইএসআই’ আছে , ভারতের ‘র’ আছে । সে যার যা খুশি থাকুক , বাঙালির ঝি আছে । এরা খবর এদিক ওদিক করে বেড়ান । কার বাড়ির বউ শাশুড়িকে খিস্তি করে , কার বাড়িতে পরিষ্কার মেঝেতে বিড়াল ন্যাড় ফেলে , কার বাড়ির ছেলে বখে গেছে , কার বাড়ির খাট দামী , কার বাড়িতে পচা মাছ খেয়ে অম্বল হয়েছে , কার বাড়ির মেয়ের বাচ্চা হবে , কোন বউদি মক্ষিচুস মাল , কোন বাড়ির রুটি শক্ত ইত্যাদি সবরকম ইনফো ঝিয়েরা শেয়ার করে । বলা উচিত ভাইরাল করে দেয় । বাড়ির মহিলারা ‘ঝি মিতালি’ পাতিয়ে ইনফো আদায় করে নেন । কারণ , তাঁরা যখন পরে পিএনপিসি করবেন এগুলোই হবে রসদ । পুলিশের চাকরীতে বলা হয় , যে অফিসারের ইনফরমারের নেটওয়ার্ক যত শক্তিশালী সে তত বেশি সফল । যেসব মহিলাদের ঝিয়েরা ভালো খবরি , তাঁরা পিএনপিসির মেহেফিলে শোস্টপার । পিএনপিসির মানে অনেকেই হয়তো জানেন বলে ভাবছেন । তাঁরা মনে রাখবেন জানার শেষ নেই । পিএনপিসি মানে ‘পর নিতম্বে প্রিয় চুলকুনি’ । অনেকটা ঘাড় ঘোরালেও বাঙালিরা নিজের নিতম্বটা ভালো করে দেখতে পায়না , তাই পরের নিতম্বে তাঁদের বড়ই আগ্রহ । আর চুলকুনি তো রক্তে আছে ।

স্বর্ণযুগের বাংলা গান আছে – ‘ছি ছি ছি , আমি বাড়ির ঝি’ । কলকাতার ফিলিম ফেস্টিভালে কোন এক বক্তৃতায় শুনলাম , বাংলা সিনেমা নাকি হলিউডকেও টেক্কা দেবে । অবশ্যই দেবে । এই ঝি কালচার তো সারা পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র বাঙালিদের মধ্যেই আছে । ঝি চালচার নিয়ে বাংলা সিনেমা হলে অস্কারও দিয়ে দিতে পারে । ঝি যদি একদিনও আগে থেকে না জানিয়ে ডুব মারে বাঙালির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে । অফিস লেট করেও লোকে অন্য বাড়িতে খোঁজ নিতে যায় , যে মালতী এসেছে কিনা । মালতী না এলে বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া লাগতে পারে , শাশুড়ি বাথরুমে আছাড় খেতে পারে , বাড়ির ছোটোটি এক্সট্রা প্যাঁদানি খেতে পারে , খুচরো ডিপ্রেশন হবারও চান্স আছে । আর যদি মালতী পাতা ফেলে দেয় ( কর্পোরেটে যাকে পেপার ডাউন বলে ) , তখন তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় । তাঁর মাইনে বাড়ানোর , পুজোয় আগের বারের তুলনায় আরও ভালো শাড়ি দেবার , কাচাকুচির লিস্ট থেকে মশারি-ভারি চাদর বাদ দেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় । মালতী তবুও না মানলে মালতীর কাজ ছাড়ার নেপথ্যে বাঙালিরা ধরে নেয় অমুক বাড়ির ষড়যন্ত্র আছে ।

আমি কিছুদিন পেটের দায়ে ব্যাঙ্গালোর নামে একটি শহরে ছিলুম । সেখানে যাবার আগে শুনলুম ওখানে নাকি থিকথিক করছে বাঙালি । মানে রাস্তায় হিসি করার সময় যদি পাশে কেউ এসে দাঁড়ায় সে হয়তো বলবে – ‘আরে এখানে কদিন করছেন , আমার তো দু-বছর হয়ে গেলো । কলকাতায় তো হেবি গরম পড়ছে আজকাল ।’ যাই হোক , সেই শহরে বন্ধু সৌমিকের বাড়ি ছিলুম । সেখানে অবশ্য কাজের লোকেদের ‘মালতী’ জেনেরিক নাম চলে না । ওঁর বাড়ির ঝিয়ের নাম রিটা ! এই বঙ্গে কাজের লোকেদের রবিবার ছুটি নেই , কিন্তু ব্যাঙ্গালোরে রবিবার ছুটি । ওখানে বৌদি চলে না , স্যার অথবা ম্যাডাম বলে ডাকেন ওঁরা । চকচকে শাড়ি পরে , খোপায় ফুল গুজে সকালে কাজ করতে আসেন । ন্যাতা নয় , লম্বা হ্যানডেল দেওয়া ব্রাশ দিয়ে কুচিপুড়ি নাচের পোজ দিয়ে ঘর মোছে । ওঁরা আমাদের বা আমরা ওঁদের ভাষা বুঝিনা । ওঁরা হিন্দিও বোঝে না । ঘরের অমুক জায়গাটা আর একটু ভালো করে মুছে দিন , অথবা বাসনে এঁটো লেগে আছে এমন অভিযোগ জানাতে গেলে কন্নড় শিখতে হবে ! বাংলাটাই আদ্ধেক বাঙালি ভালো করে বলতে পারে না তো কন্নড় ! ফলে বাঙ্গু ঝি সংস্কৃতি কবরে । ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে আধুনিক বাংলা গদ্যের যাদুকর চন্দ্রিল ভট্টাচার্য আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিদের উদ্দেশ্যে বলছেন – “আমাদের একটা জিনিস আছে যা আপনাদের নেই । তা হচ্ছে মালতীর মা , মিনতির মা , আরতির মা । লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা রোজকার করে , রাতে ফিরে যদি নিজের এঁটো থালা নিজেদের মাজতে হয়… ।”

সুমন সরকার
পড়াশুনা প্রেসিডেন্সী কলেজে স্ট্যাটিস্টিকস নিয়ে । বর্তমানে আইএসআই , কলকাতায় ডক্টরেট করছেন । ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে লেখালিখি শুরু । যেভাবে গীটার বাজিয়ে গান গাইতে ভালো লাগে , সেভাবে লিখতে ভালো লাগে , তাই লেখেন । লিখেছেন রম্যগদ্যের দুটো বই- 'লাকি থারটিন' , 'ফাউ' ।

5 COMMENTS

  1. আপনার লেখার আমি ফ্যান হয়ে গেছি ভাই সুমন, আপনার প্রতিটা লেখা এত সাবলীল আর রম্যম্য় যে শুরু করলে এক নিঃশ্বাসে শেষ না করে আর না হেসে পারা যায় না। আমি শেয়ার করলাম আপনার লেখা আমার ফেস বুকের টাইম লাইনে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here