‘আপনি অভিনয় করেছেন কখনও?’

‘হঠাৎ এমন কথা শুনে আমি থ! চায়ের দোকানে বসেছিলাম বন্ধুদের সঙ্গে। একটু সামলে নিয়ে ভদ্রলোককে বললাম, না। অভিনয় করিনি কখনও। কিন্তু কেন বলুন তো?’

হেসে বললেন, ‘যদি সুযোগ পান সিনেমায় অভিনয় করবেন?’

‘আরও বেশি অবাক হলাম এবারে। সরাসরি আমাকে দেখে সিনেমায় নামার প্রস্তাব কেউ দেবেন ভাবতেই পারিনি। আমি তখন বেশ নার্ভাস। কী বলি! এদিকে বন্ধুরা আমায় হাত দিয়ে ঠেলে বিড়বিড় করে ইশারায় বলতে চাইছে, অভিনয় করতে রাজি হতে। আমি রাজি আছি শুনে ভদ্রলোক তাঁর নাম, ঠিকানা দিয়ে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও-য় বিকেল নাগাদ দেখা করতে বললেন। তারপর তিনি চলে যেতেই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বন্ধুরা কোরাসের সুরে বলে উঠল, ‘ঘরে বসে সিনেমায় নামার সুযোগ কেউ পায়? যা না, স্টুডিওয় গিয়ে একবার দেখা করে আয়। সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে নেই। গিয়ে দেখ না, কি হয়।’

Banglalive-8

বন্ধুদের ঠ্যালা খেয়ে স্টুডিওয় গিয়ে দেখা করলাম ভদ্রলোকের সঙ্গে। তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন পরিচালক কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাঁর পাশে বসেছিলেন স্বনামধন্য সঙ্গীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়াল।

Banglalive-9

ওঁদের পছন্দ হল আমায় দেখে। পড়ে ভয়েস আর স্ক্রিন টেস্টে উতরে যাবার পর আমি নির্বাচিত হলাম ওঁদের ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’ ছবির নায়ক নিমাইয়ের ভূমিকায়। আমার ভয়েস টেস্ট নিয়েছিলেন নটসূর্য অহীন্দ্র চৌধুরী।

এতক্ষণ আপনাদের ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’র নায়ক অসীমকুমারের অভিনয়ে আসার গল্প বলছিলাম। সে প্রায় ৮২ বছর আগের কথা। তখন তিনি তরতাজা ২৫ বছরের যুবক (১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩১)। ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’ সুপারহিট হওয়ার পর একলাফে যেন অসীমকুমার সুপারস্টার। সুদর্শন-সুপুরুষ নায়কের মতোই তখন তাঁর চেহারা। দেখতে দেখতে নাম-যশ-অর্থ অসীমকুমারকে ঘিরে ধরল। আর জুটল জনপ্রিয়তা। রাস্তায় বেরোলেই ফিসফিসানি, ‘দেখ দেখ নিমাই যাচ্ছেন।’ বহু বয়স্ক মহিলা এসে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে চাইতেন! খ্যাতির বিড়ম্বনা এক একসসময় সত্যিই বড়ো অস্বস্তিতে ফেলত তাঁকে। আর ভালোলাগা? তৃপ্তির হাসি হেসে উত্তর ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, ‘অর্থ-যশ-খ্যাতি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। তারপর দেহপট সনে নট সকলি হারায়—জানেন সবাই। সাফল্যের এই স্মৃতিটুকুই তো রয়ে যায়।’

‘নীলাচলে মহাপ্রভু’র অভাবিত সাফল্যের পর অসীমকুমার তখন ভক্তিমূলক ছবির একচেটিয়া হিরো। ‘নদের নিমাই’ আর ‘শচীমা-র সংসার’-এ নিমাই, ‘সাধক রামপ্রসাদ’-এ রামপ্রসাদ, ‘যুগমানব কবীর’-এ কবীর, ‘মহাকবি কৃত্তিবাস’-এ কৃত্তিবাস, ‘নলদময়ন্তী’-তে নল, ‘সীতা’য় রাম, ‘তানসেন’-এ তানসেন। ভক্তিমূলকের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ছবিতেও অভিনয় করেছেন তিনি। এভাবে একচেটিয়া এক ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে করতে একঘেয়ে লাগত না? কী করতেন তখন অসীমকুমার? ‘এতটাই বিরক্তি এসে গেছিল একসময় যে ঠিক করেছিলাম অভিনয়ই ছেড়ে দেব। কিন্তু অভিনয় ততদিনে আমায় গিলিয়াছে গোটা। এদিকে নাম-ডাক হতেই সিনেমায় মজে সরকারি চাকরিটাও ঝোঁকের বশে ছেড়ে দিয়েছি। ফলে, অভিনয় না করলে খাব কী? শেষে নিজেই যোগাযোগ করলাম অন্যান্য পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম।’

এর ফলও মিলল হাতেনাতে। অভিনয়ের জোরে অসীমকুমার কাজ পেলেন ‘মর্মবাণী’, ‘জোনাকির আলো’, ‘কাজল’, ‘রাতের অন্ধকারে’, ‘কিছুক্ষণ’, ‘অগ্নিশ্বর’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’তে। পাশাপাশি সুযোগ এল মুম্বইতেও। কাজ করলেন ‘সরস্বতী চন্দ্র’তে। নায়িকা নূতন। ছবি রিলিজ হতেই ‘চন্দন সা বদন চঞ্চল চিতবন’ গান কাঁপিয়ে দিল হিন্দি গানের দুনিয়া। হিন্দিতেও অসীমকুমার সুপারহিট। তবে অসীমকুমার নামে নয়। মুম্বইতে নতুন নায়কের নয়া নাম মণীশ। কারণ, ততদিনে সাগরপারে আরেক অসীমকুমার বেশ জনপ্রিয়। প্রথম ছবি সুপারহিট হতেই অসীমকুমার কাজ করলেন ‘বিষ্ণুপুরাণ’, ‘ছট মাইয়া’তে। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই আবার পৌরাণিক চরিত্র! নিজেকে বাঁচাতে মুম্বই থেকে রীতিমতো পালিয়ে এলেন অসীমকুমার।

ছবির পাশাপাশি অভিনয়ের খিদে মেটাতে এবার মঞ্চকে বাছলেন অভিনেতা। নাটকে তাঁর প্রথম অভিনয় ছয়ের দশকে। বিশ্বরূপা থিয়েটারের ‘সেতু’ নাটকে। নায়িকা কে জানেন? তাঁর নায়ক হওয়ার পেছনেও নাকি রয়েছে মজার গল্প। ঠিক কী ঘটেছিল অসীমকুমারের সঙ্গে? ‘‘সেতু’-র পরের নাটকে আমার নায়ক হওয়ার কথা। সেই সূত্রে মাঝেমাঝে যাই বিশ্বরূপায়। কী কারণে একদিন ‘সেতু’র নায়ক অসিতবরণের সঙ্গে মনোমালিন্য হল প্রযোজক দক্ষিণেশ্বর সরকারের। ফলে, আর অভিনয় করতে চাইলেন না অসিতবরণ।

সেই দিন ঘটনার সময় আমি বসেছিলাম দক্ষিণেশ্বরবাবুর ঘরে। তিনি আমার দু’হাত ধরে বললেন, ‘আপনাকে আজই হিরো হতে হবে। ওঁর কথায় আকাশ থেকে পড়লাম। কী বলব, কী করব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সেই মুহূর্তে দক্ষিণাবাবুর ঘরে ঢুকলেন ‘সেতু’র নায়িকা তৃপ্তি মিত্র। তাঁরও সেই একই অনুরোধ, ‘আপনি নামুন। নাটককে বাঁচান।’ আমার তো মাথায় হাত। এবার আমি না বলি কী করে! বিপদ যেন আমায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। শেষে নিরুপায় আমি ঢোক গিলে বলেই ফেললাম, এ কী করে সম্ভব! রোলটা কী? জানি না! ডায়লগ মুখস্থ নেই। নেমে পড়তে বললেই কি নেমে পড়া যায়?’

কিন্তু কে, কার কথা শোনে? ওঁদের তখন মহা বিপদ। অগত্যা দক্ষিণাবাবুকে বাঁচাতে নামতেই হল নাটকে। নাটক শুরুর আগে দর্শকদের সামনে স্টেজে দাঁড়িয়ে তৃপ্তি মিত্র বললেন, ‘অসিতবরণের জায়গায় আজ থেকে অসীমকুমার অভিনয় করবেন। আপনারা দয়া করে দেখুন।’ প্রফেশনাল স্টেজে সেই আমার প্রথম অভিনয়। কী আশ্চর্য! দর্শকদের মন জয় করে নিলাম প্রথম দিনেই।’’ এরপর একের পর এক নাটক ‘অনন্যা’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘প্রিয়ার খোঁজে’, ‘মোহিনী পিঙ্গলা’, ‘অগ্নিকন্যা’য় একদম অন্য অসীমকুমারকে দেখল দর্শক।

তারপরেও বয়স গড়াতেই অভিনয়পাড়া থেকে ডাক বন্ধ হল অভিনেতার। বেকার অসীমকুমারের দিন কেটেছে নিজের জীর্ণ বাড়িতে। আর পাড়ার রকে, চায়ের দোকানে। স্মৃতিতে জাবর কেটে মনকে শান্ত করেছেন, ‘জায়গা তো ছেড়ে দিতেই হবে। ক’জন উত্তমকুমার হতে পারে?’ একদম শেষদিকে অর্থের অভাবে নাকি পেট ভরে খেতেও পেতেন না তিনি। চেহারার লাবণ্য মুছে থাবা বসিয়েছে দারিদ্র্যের মালিন্য। শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগে তাই অনেক যন্ত্রণায় অসীমকুমার আক্ষেপ করেছিলেন, ‘রূপনগরের রূপে-মোহে অন্ধ হয়ে গেছিলাম। বুঝিনি, রূপ ফুরোলেই চিরতরে বন্ধ হবে রূপনগরের দরজা!’  

আরও পড়ুন:  ১০ বছর পর ফের ভারতীয়র হাতে উঠল অস্কার

NO COMMENTS