আমি স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি : তনিমা সেন

তনিমা সেন | বাংলা টেলিভিশন ও ফিল্মের জগতে অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় একটি নাম | সদাহাস্যময় মানুষটির উপস্থিতিই যেন এক ঝলক টাটকা বাতাস | তাঁর বেড়ানোর গল্প বললেন বাংলালাইভকে |

(ভাবলিখন : তন্ময় দত্তগুপ্ত)

বেড়াতে যাবার নামে আমি এক পায়ে খাড়া।বিকেল বেলা সবাই এক সঙ্গে কথা বলছি।হঠাৎ ঠিক হলো আমরা বেড়াতে যাবো।এই বেড়ানোর গন্তব্য খুব দূরে নয়।এই দেওঘর,শান্তিনিকেতন,পুরী,কোনারক ।বেড়ানোকে ঘিরে  মজার ঘটনা আছে।বীরভূমের কোনও অঞ্চল থেকে ফিরছি।গভীর রাত।সেই সময় ওই অঞ্চলে খুব ডাকাতি হতো।আমরা চটিতে বসেছিলাম।ওখানকার লোকেরা বলল পরে রওনা হতে।মনের মধ্যে ভয় ছিল ঠিকই।পাশাপাশি ছিল রোমাঞ্চ।সে যাত্রায় অবশ্য ডাকাতের পাল্লায় পড়িনি।আগে যে দেওঘরের কথা বললাম,মার মুখে সেই দেওঘরের কথা অনেক শুনেছি।আমার দাদু ডাক্তার ছিলেন।দেওঘরে ছিল ওনার বাড়ি।দাদু ছিলেন বিধান রায়ের খুব ঘনিষ্ঠ।সেই সুবাদে বিধান রায় দাদুর বাড়িতে মাঝে মধ্যে থাকতেন।এসব যত শুনেছি দেওঘর দেখার আগ্রহ বেড়েছে।দেওঘরের মন্দির অত্যন্ত জনপ্রিয়।সেখানে ভক্তদের ভক্তি উল্লেখযোগ্য।এছাড়া ত্রিকুট পাহাড়ে আমরা খুব হৈ হুল্লোড় করেছি।এরপরেও বহুবার গিয়েছি দেওঘর।

আমার জীবনের স্মরণীয় ভ্রমণ-স্থান রাজস্থান।রাজস্থানের রাজকীয় অভিজ্ঞতা আমার মনে গভীর ছায়া ফেলেছে।আমি,আমার স্বামী,শ্বাশুড়ি,মেয়ে জামাই প্রায় সতেরো জনের একটা গ্রুপ রাজস্থানের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি।আমরা ওখানে ছিলাম চোদ্দ দিন।রাজস্থানের জল হাওয়া বাতাস আমাদের মন জয় করেছিল।আকাশের নীলাভ আলোয় বারে বারে মুগ্ধ হয়েছি।আর ভেবেছি সুন্দর! তুমি কত সুন্দর! ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সুন্দরের সংজ্ঞা বদলায়।পাল্টাতেই থাকে।রাজস্থানের কেল্লার কারুকার্য অবাক করার মতো।অতো বছর আগে মানুষ পাথর কেটে যে শিল্প উপহার দিয়েছেন,তাকে শত কোটি প্রণাম।ওখানে একটা জায়গা আছে। নাম শাম।শামের সূর্যাস্ত দেখলে মনে হয় প্রকৃতি পেখম মেলেছে।

একদিন আমরা পথ ভুল করে চলে গিয়েছিলাম পাকিস্তান বর্ডারে।গিয়ে হতবাক।চারদিকে মিলিটারি।মন্দির মসজিদের সহাবস্থান।মিলিটারিদের আমরা জিজ্ঞাসা করলাম —‘এটা কি শাম’?ওরা বলল — ‘না।আপনারা পাকিস্থান বর্ডারে চলে এসেছেন’।ভয় পেয়ে আমরা গাড়ি করে দে দৌড়।রাজস্থানের সোনার কেল্লা যে এরিয়ায়, সেখানে একটা গ্রাম আছে।চারশো বছরের পুরানো।কুসংস্কারের জন্য কেউ বসবাস করে না।তবে তার স্থাপত্য পরিণত শিল্পের নিদর্শন।একটা বাড়িতে গ্যারেজের মতো ঘর দেখেছি।সেই গ্যারেজে দেখেছি উট বা ঘোড়ায় টানা গাড়ি।ভাবা যায়!অতো বছর আগে গ্যারেজের কনসেপ্ট!চৌকো চৌকো সব জানলা।সেটা কিন্তু কাঠের ফ্রেমের নয়।পাথর সাজানো ফ্রেম।রাজস্থানের খাবারের সুনাম  থাকলেও আমাদের সে ব্যাপারে মিশ্র অভিজ্ঞতা হয়েছে।মনে আছে।প্রথম দিনের মেনু ছিল ঢ্যাঁড়সের ঝোল আর রুটি।রাস্তায় কিছু বাঙালি মিষ্টির দোকান দেখেছি।খেয়েছি পেট ভোরে।একদিন দেখি বহু মানুষ লাইন দিয়ে এক জনের কাছে থেকে খাবার নিচ্ছে।আমি ভাবলাম এ আবার কী?আমাকে বুঝিয়ে বললেন ওখানকার বাসিন্দারা। একজন মানুষের মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে বলে,সে সকলকে খাওয়াচ্ছে।সকলের হাতে থার্মোকলের থালা।আমি কোনওরকম দ্বিধা না কোরে,ওদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়ালাম।ওই খাবার না খেলে,সত্যি মিস করতাম।বাসন্তী পোলাউয়ের মতো।ওই পোলাউ ছিল মিষ্টি স্বাদের।আর এক ধরনের পোলাউ ছিল।সেটা নোনতা।এছাড়া ছিল সিমুইয়ের পায়েস।এগুলো কিন্তু হাই কোয়ালিটির খাবার।ওই স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে।

বাঙালি ভ্রমণ পিপাসু।রাজস্থানের কিছু বাঙালি আমাকে দেখেই চিনতে পেরেছে।তারা আমার সঙ্গে ছবি তুলছে।হঠাৎ দুজন খঁটি বিদেশী আমার দিকে এগিয়ে এলেন।ছবি তোলার হিড়িক দেখে বিদেশীদের  মনে প্রশ্ন এসেছিল,আমি কে?সকলের কাছে ওরা আমার পরিচয় জানতে চাইল।সকলেই বলল আমি তনিমা সেন।বাংলার এক জনপ্রিয় শিল্পী।ওরা আমার সঙ্গে ছবি তুলেছে।ওরা হয়ত ভেবেছে আমি সুচিত্রা সেনের মতো নায়িকা।এই ঘটনায় আমি খুব হেসেছি।আমি ভাবলাম যাক,এবার আমার ছবি বিদেশে শোভা পাবে।

শান্তিনিকেতন যাওয়ার আনন্দই আলাদা।গিয়েছি বহুবার।একবার পুজোর ছুটির আগে গিয়েছিলাম।তখনও আমি তনিমা সেন হইনি।রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত অনেক তথ্য এক ভদ্রলোক আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের বলছিলেন।আমরা বিশ্বভারতীর প্রতিটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত দেখেছি।ভেবেছি আর ভেবেছি।ভেবেও নাগাল পাইনি রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভার।রবীন্দ্রনাথের মেয়ে বেলার একটা বড় ছবি আছে ওখানে।বেলার ছবি দেখে আমার মনে হলো “তুমি কি কেবলই ছবি”?আমি ভেবেছিলাম শান্তিনিকেতনে একটা ছোট বাড়ি করব।

আমি স্বপ্ন দেখি।স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি।স্বপ্নে বানিয়ে ফেলি একের পর এক বাড়ি।পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গলের মধ্যে সমুদ্র, আমার খুব বন্ধু।সমুদ্রে সব কেমন লীন হয়ে যায়।সমুদ্র স্নানের পর আমাকে অদ্ভুত জন্তুর মতো লাগে।গায়ের রং পুড়ে যায়।এই জন্য আমার স্বামী আমার সঙ্গে ঝগড়া করে।ও যাই বলুক আমি সমুদ্রে স্নানে যাবোই।ভাইজ্যাগের পাহাড়-সমুদ্র আমার খুব প্রিয়।গম্ভীর পাহাড়ের কাছেই সমুদ্র।একজন যেন ‘মম উন্নত শির’,অন্যজন অকৃপণ উদার জলরাশি।

দেশের বাইরেও আমি গিয়েছি।আমেরিকার ন্যাসভিল একটা পরিচ্ছন গ্রাম।শৃঙ্খলার উপযুক্ত জায়গা।তখন ছিল ভোটের সময়।কিন্তু কোথাও কোন পোস্টার নেই।দিনটা ছিল শনিবার।একটা জায়গায় গিয়ে দেখি ছোট ছোট বাড়ি।গেটগুলোর উচ্চতা খুব বেশি নয়।প্রায় সমস্ত বাড়িই তালা বন্ধ।বাড়ির বাইরে ছোট লন।সেখানে চেয়ার টেবিল সুন্দর করে সাজানো।শনিবার, রবিরার ওদের ছুটির দিন।সবাই বেড়াতে যায়।গাড়ির ওপরে অনেকের ছোট ডিঙি রয়েছে।বাড়ির কাছে যাদের দীঘি,তারা দীঘির জলে ডিঙি ছাড়ে।একদিন দেখি দুজন বৃদ্ধা ।একজন হুটার চালাচ্ছে,অন্যজন পিছনে বসে।আমি মুখ বাড়িয়ে হাত নাড়লাম।তারাও একগাল হেসে হাত নাড়ল।

বিদেশের মধ্যে লণ্ডনের আভিজাত্য দেখলে মুগ্ধতার রেশ কাটে না।আমি রানির বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি।রানি মানে ডায়না।চারদিকে সবুজের উপত্যকা।আমাদের মহাকরণের লাল বাড়ির সঙ্গে ওখানকার স্থাপত্যের খুব মিল।বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনে শো করতে গিয়ে এসব আমি দেখেছি।আমাদের দেশের মতো ওদের রাস্তায়ও অসংখ্য গাড়ির চলাচল।কিন্তু ট্রাফিক সিগন্যালের সিস্টেম সম্পূর্ণ অন্যরকম।রাস্তা পার হওয়ার সময় আমরা নিজেরাই ট্র্যাফিক সুইচ টিপে দিয়েছি।স্তব্ধ সমস্ত গাড়ি।আবার ওপারে সুইচ টিপে সিগন্যাল অফ করলেই সমস্ত গাড়ির চলালচল।মানে আমরা সবাই রাজা।আমাদেরই রাজত্বে।সেই জায়গায়ই ঘুরে আনন্দ যেখানে নেই কোনও ভেদাভেদ।নেই কোন বেড়াজাল।আমি-তুমি,তুমি-আমি মিলে মিশে একাকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here