অস্কারে যাক ছায়া… ছবি… শব্দ

কৌশিক গাঙ্গুলীর নতুন ছবি ‘শব্দ’-র কথা শুনে আমার প্রথম যে ছবিটার কথা মনে পড়ে গেছিল, সেটার নাম ‘নিঃশব্দ’ | না, এই নামটা শোনা মাত্র যদি আপনার মনে পড়ে যায় সেই অমিতাভ বচ্চনের শান্ত-সৌম্য দাড়িওয়ালা মুখটা আর ভরাট যুবতী জিয়া খানের শরীরে লেপ্টে থাকা ভেজা পোশাক, মাখন-মসৃণ উরু ইত্যাদি, তাহলে ভুলটা একটু সংশোধন করে দিয়ে বলি, আমি আদপেই সেই ছবিটার কথা বলছি না | আমি বলছি ২০০৫ সালের বাংলা ছবি ‘নিঃশব্দ’-র কথা | ইংরেজিতে নাম, ‘রিচিং সাইলেন্স’ | জহর কানুনগো নামে জনৈক পরিচালকের এই ছবিটা যে সেইসময়ে প্রায় খান কুড়ি আন্তর্জাতির চলচিত্রোৎসব ঘুরে অন্তত খান ছয়েক দেশী-বিদেশী পুরস্কারও পেয়ে গেছিলো, তা সত্যি বলতে কি মিডিয়ার রহস্যময় নিস্পৃহতার দৌলতে বাঙালি বিদ্বজনেদের অজানাই রয়ে গেছিল | বাংলা ছবিতে (সম্ভবত ভারতীয় ছবিতেও) শব্দ্-ভুবনকে এতটা সিরিয়াসলি ট্রিট করা হয়েছিল সেই ছবিতেই স, তৃণা নিলীনা ব্যানার্জি, প্রমুখ |

সেই ঘটনার দীর্ঘ ৮ বছর পরে ভারতীয় সিনেমার গতিপথে বড়-সড় জার্ক দেবার জন্যেই যেন বা এই ‘শব্দ’ ছবির আবির্ভাব | সিনেমার পর্দার আড়ালে থাকা মানুষগুলোর জীবনযাপনটাও যে প্রকৃতপক্ষে সিনেমা-যাপন হয়ে ওঠে, তার এক প্রায় অ-বিশ্বাস্য ধারাবিবরণী দিতে থাকে কৌশিকের এই ছবি | পর্দার আড়ালে থাকা মানুষ মানে কারা? ওই তাঁরা তো, যাঁরা পরিচালনা করেন, চিত্রনাট্য লেখেন, কিংবা ক্যামেরা চালান? না, এঁরা তো আজকাল মিডিয়া আর ককটেল্-মোচ্ছবের কল্যাণে দিব্যি মুখ দেখাচ্ছেন ইতি-উতি, এঁ্রা নয়, এই ছবি আলো ফেলল আরও গহন গভীরে, সৃজনের যে হরিৎক্ষেত্র এতদিন অব্দি অ-মিডিয়া-স্পৃষ্টই ছিল |

সেই গহন গভীরে থাকেন ছবির ফলি-শিল্পীরা | ফলি সাউন্ড কাকে বলে, সেটা যদি এতদিনে এই ছবি নিয়ে এত হৈ-চৈ-এর পরেও (ইতিমধ্যেই এই ছবি দুটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে) আপনার অজানা থাকে, তাহলে বলি, সংলাপের আর আবহসঙ্গীতের পাশাপাশি ছবিতে আরও একরকম শব্দ সংযোজনের দরকার হয় | সেই শব্দ আমাদের চেনা প্রতিবেশের শব্দ | পাখা ঘোরার শব্দ থেকে শুরু করে পায়রা ওড়ার শব্দ, পদক্ষেপের শব্দ থেকে শুরু করে আগুনের শব্দ, এই সব শব্দই খুব কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত হয় অডিও-স্টুডিওতে | পুরনো কাগজ হাওয়ায় নাড়িয়ে পায়রা ওড়ার শব্দ পাওয়া যায়, কিম্বা কাগজের ঠোঙা মুচড়ে আগুন জ্বালানোর শব্দ | এই শব্দ-বিনির্মাণ খেলায় খেলতে নেমে শব্দ-কারিগরকে শরীর থেকে তার পোশাক অব্দি খুলে ফেলতে হয়, নাহলে পোশাকের শব্দ তার সৃজিত শব্দকে নষ্ট করে দিতে পারে বলে | এই অবাক করা অজ্ঞাত-রূপকথাটাই হলো ফলি সাউন্ড্-এর আঁতুড়-বৃত্তান্ত আর এটা যাঁরা করেন, তাঁরাই হলেন তিন কোটি টাকা বাজেটের ছবিতে প্রাণপাত করা তিন হাজার টাকা পারিশ্রমিকের ফলি-শিল্পী | পারিশ্রমিকে বেশ কয়েকটা শূন্য কম থাকলেও, আসল মজাটা হল এঁরা না থাকলে ছবির জগৎটাই হত মিছে | মহা-নায়কের হাতের চুটকি কিম্বা মহা-নায়িকার অলঙ্কারের লচক-মচক, সমস্ত মোহজাল-রচনার মূল কারিগরটাই তো হলেন এঁরা |

এই ছবির নায়ক তারক (ঋত্বিক চক্রবর্তী) তেমনই এক ফলি-শিল্পী | দেব, প্রসেন্জিৎ, মিঠুনদারা এই তারকের তৈরি শব্দের ক্রাচে ভর দিয়ে স্টারডমের ফানুস ওড়ান, কিন্তু তারক থেকে যান অন্ধকারেই | এই পেশা থেকে আক্ষরিক অর্থেই খুদ-কুঁড়োর বেশি তাঁর বোধ হয় কিছু জোটে না, তাই তাঁকে এর পাশাপাশি চালাতে হয় এল আই সি-র ধান্ধা | তাঁর বৌ রত্নাকে (রাইমা সেন) কাজ করতে হয় বুটিকে | কিন্তু নিজের ভাঙা ঘরের যাবতীয় মালিন্যকে অগ্রাহ্য করে তারক ডুবে থাকেন শব্দ সৃষ্টির আনন্দে | মুশকিল হল, এই করতে করতেই শব্দ নিয়ে তার অবশেসন পৌঁছে যায় চূড়ান্ত শিখরে | এতটা চূড়ান্ত যে, মানুষের সাধারণ সংলাপমালা তাঁর কাছে গৌণ হয়ে পড়ে, তিনি শুধু শুনতে থাকেন পারিপার্শ্বিক আবহ-শব্দটুকুই | স্ত্রী এবং সহকর্মী রেকর্ডিস্ট দিব্যেন্দু (সৃজিত মুখার্জি)-র সৌজন্যে সেসময়েই তারকের জীবনে আসেন এক মনোচিকিৎসক স্বাতী (চূর্ণী) | কিন্তু সেই চিকিৎসকও দিশা খুঁজে পান না তারকের রোগমুক্তির | তারক নিজে অবশ্য মনেই করেন না তাঁর কোনও প্রবলেম আছে | তিনি তাঁর নিজের শাব্দিক-ভুবনে বিন্দাস থাকেন | এমনকি এক অপ্রীতিকর ঘটনার জেরে যখন তাঁর সাধের অডিও-স্টুডিও থেকে তাঁর কাজ চলে যায়, সেসময় তিনি বাড়িতে বসে কী করতে থাকেন, জানেন? , কোনও ছবির ফলি-র কাজে তাঁর একচুল খুঁত রয়ে গেছে | খালি কাপ আর ভরা কাপ টেবিলে রাখার সাউন্ডের ফারাক কতটা হওয়া উচিৎ | তারকের এই আশ্চর্য অসুখ (তৃতীয় বিশ্বে যা অসুখ, প্রথম বিশ্বে আবার সেটাই প্রতিভা( সারাতে যখন মনোচিকিৎসক বা তাঁর গুরু ভিক্টর ব্যানার্জি দুজনেই ফেল মেরে গেলেন, সেইসময়ে হঠাৎ তারকের জীবনে আরেক চিকিৎসকের আবির্ভাব | এই ভূমিকায় আছেন স্বয়ং পরিচালক , তাতে আরেকবার করে তাঁকে সাবাশ বলা ছাড়া আর উপায় রইল না |

বিনোদনী আর দেখনদারির দুনিয়ায় মিডিয়ার আর্কলাইট যাদের ওপর মোটে পড়ে না, তাদের কৃতিত্বও যে এককণা কম নয়, সেটা কিছুটা বোঝা গেছিল সত্যজিৎ রায়ের — ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ (১৯৭৬) আর ‘মাস্টার অংশুমান’ (১৯৮৬) থেকে | যাঁদের নাম এই সেদিন অব্দি ক্রেডিট টাইটেলে অব্দি আসত না (পাছে হিরোর মহিমা ক্ষুন্ন হয় কিছুটা), সেই স্টান্টম্যানদেরকেই প্রকৃতপক্ষে হিরো বানিয়ে এই দুটো কাহিনিতে সত্যজিৎই বোধহয় প্রথম পাশার দানটা ঘোরাতে চেয়েছিলেন কিছুটা | শিল্পের কৃতিত্ব যে এক শিল্পীর নয়, সহশিল্পীরা তার অনেকটারই ভাগীদার, সেটা জানাতে এর কিছু পরে সুমন গেয়ে ফেললেন ‘সহশিল্পীরা এসো’-র মতো গান (ক্যাসেট ‘চাইছি তোমার বন্ধুতা’, ১৯৯৬) | আর সেই গানের রেশ মেলাতে না মেলাতে আমরা পেলাম এক স্তব্ধ করে দেওয়া টেলিফিল্ম : ‘ছায়া…ছবি’ | এক টেলিফিল্ম-খ্যাত নামী বাংলা চ্যানেলের সেই টেলিফিল্ম-এর পরিচালক ছিলো কে বলুন তো? এই কৌশিক গাঙ্গুলীই! ২০০৪ সালে তৈরি সেই টেলিছবিতেই কিন্তু নিহিত ছিল আজকের এই ‘শব্দ’ ছবির বীজ | কীরকম বীজ? না, সেই ছবি ফলি আর্টিস্টের জীবন নিয়ে ছিল না ঠিকই | কিন্তু সেই ছবিতে ঠিক একই সুরে কৌশিক বলেছিলেন শহরতলিতে থাকা সিনেমার এক গরীব সহকারী পরিচালক বাবলুর গল্প, যিনি কোনওভাবে ভাতে-ভাত খেয়ে একদিন বড়কিছু করার স্বপ্ন দেখে প্রাণপাত করেন টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় আর দিনের শেষে তার সবটুকু ক্ষীর খেয়ে মুখ মুছে চলে যান নামী পরিচালক | বাবলুর প্রেমিকা যখন তাকে ছেড়ে দিয়ে অন্য পুরুষের হাত ধরতে চলে যায়, সে সময়টাকেও দু হাত জুড়ে ক্যামেরার ফ্রেমে মেপে নিতে চন সেই সিনেমা-যাপন করতে থাকা বাবলু | আজকের তারক যে সেই কালকের বাবলুরই এক জাদুবাস্তবীয় এক্সটেনশন, সেটা কি এরপরেও বলে দিতে হবে?

টেলিভিশনের জন্য ছবি বানিয়ে নিজের গল্প লেখার হাত আর মানুষ দেখার চোখ পাকিয়েছিলেন কৌশিক | সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলোর অসহায়তার কথামালা তাঁর ক্যামেরার চোখে ভর করেই তো জানতে পেরেছিল তাবৎ বাংলা | বাংলা মূলস্রোতের বিনোদনে সমকামী মানুষদের কথা মরমী বেদনায় প্রথম শোনান তিনিই | টেলিফিল্ম ‘উষ্ন…তার জন্য’ (২০০২) এবং পরবর্তী কালে বহুল আলোচিত ছবি ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ (২০১০) | ‘ভিকি ডোনর’ (২০ এপ্রিল ২০১২) নিয়ে আজ যত হৈ-চৈ হোক না কেন, এই ছবির বহু আগেই কৌশিক বলে ফেলেছিলেন শুক্রানুদাতাদের গল্প — টেলিছবি ‘উৎস হতে’ (২০০১) এবং বড়পর্দার ছবি ‘ল্যাপটপ’ (১৩ এপ্রিল ২০১২) | স্তনের আকৃতি ছোট, এমন নারীর দুঃখ আর কে বলবেন, কৌশিক ছাড়া? ছবি ‘শূন্য এ বুকে'(২০০৫) | এর পাশাপাশি রাখুন এক পুরুষের দুই ভালোবাসার গল্প ‘ওয়ারিশ’ (২০০৪) আর এক নারীর প্রায় অলৌকিক স্বয়ংবরসভার গল্প ‘রংমিলান্তি’ (২০১১) | ‘এক মুঠো ছবি’ (২০০৫) সিনেমায় কৌশিকের ছোট ছবি ‘প্রোগ্রেস রিপোর্ট’ তো বোধহয় চালু তথাকথিত মানবিক মূল্যবোধকেই নিল-ডাউন করে রেখে দিয়েছিল বেশ খানিকক্ষণ | ‘ব্রেক ফেল’ (২০০৯) বা ‘জ্যাকপট’-এর (২০০৯) মতো দু, এটাই অনুরোধ |

আর এই ‘শব্দ’ তো শুধু ছবি নয় | কীভাবে ছবি তৈরি হয়, সেই গোপন রসুই-ঘরের সুলুক-সন্ধান-দেওয়া এক অবাক-করা মায়া-কাহিনি | গোটা ছবির নানা অংশে যে রকম মুচমুচে ভঙ্গীতে সাধারণ দর্শকদের জন্যে ফলি-সাউন্ডকে ব্যাখ্যা করতে করতে গেছেন কৌশিক, তাতে একেকবার মনে হয়ে আম-দর্শককে সিনেমা-শিক্ষিত করে তোলার মহা-দায়িত্বটাও কি জেনেবুঝে নিজের ঘাড়ে নিলেন তিনি? গোটা ছবিতে কোনও আবহসঙ্গীত রাখেননি পরিচালক, মিডিয়ার কল্যাণে সেটা নিশ্চয় ইতিমধ্যে আপনার জানা | আসলে কিন্তু বাস্তবটা ঠিক এর উল্টো, গোটা ছবিটায় ফলি সাউন্ডকেই আবহসঙ্গীতের মতো করে ব্যবহার করেছেন তিনি (সাউন্ড ডিজাইনিং অনি) | এই ব্যাপারে পরিচালকের যুক্তি অকাট্য, আমরা যখন আমাদের বাস্তব জীবন যাপন করি, তখন তো কেউ আমাদের পেছনে সারেঙ্গিতে সুর তোলে না, তাহলে সেলুলয়েডে ওই মিথ্যে আরোপটুকু না থাকলে কী বা ক্ষতি?

এতদিন জানতাম সমসাময়িক বাংলা ছবিতে ধাক্কা দেওয়ার মতো স্বপ্ন-দৃশ্য বানাতে পারেন শুধু ঋতুপর্ণ ঘোষই একমাত্র | কিন্তু এই ছবিতে তারকের এমন এক স্বপ্ন-মায়া-বিভ্রম-সাগর রচেছেন কৌশিক, যে কেয়াবাত! এক ঝলক দৃশ্যটা দেখলে লাতিন আমেরিকার পরিচালক এলিজিও সুবিয়েলার ছবির স্বপ্ন-দৃশ্য বলে ভুল হওয়াও অসম্ভব নয় কিন্তু |

আর হ্যাঁ, এই ছবির রিয়েল-লাইফ ফলি-আর্টিস্ট হলেন গয়াধর নায়েক, যাঁর নাম সসম্মানে ছবির শুরুতে রেখেছেন পরিচালক | কৌশিকের ঠিক এর আগের ছবি ‘ল্যাপটপ’-এর ফলিও করেছিলেন এই গয়াধর-ই, কিন্তু সেখানে তাঁর নাম যথারীতি হারিয়ে গেছিল ছবির শেষে আরও হাজারো নামের ভিড়ে | আফশোসটা শুনে নিন খোদ তারকের মুখ থেকেই, ‘স্বয়ং রাষ্ট্রপতি আমাদের তৈরি ছবিগুলোর নাম জানেন, কিন্তু আমাদের নাম কেউ জানে না’!

আজ অব্দি ভারত থেকে কোনও বাংলা ছবি অস্কারে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কখনও | এই ছবিটার জন্য সেরকম কোনও উদ্যোগ নেওয়া যায় কি? প্রযোজকমশাই শুনছেন?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here