কালীপটকা আর ছুঁচোবাজি

কালীপুজো এলেই সেই দম্পতির গন্ধমূষিক নৃত্যের দৃশ্যটা মনে পড়ে যায়। ইস্কুলবেলা পেরিয়ে তখন আমরা কলেজের চৌকাঠে।

জায়গাটার নাম কালীতলা। কালীমন্দির সামান্য দূরে। ঘটা করে কালীপুজো হতো মন্দিরের পাশে। রাস্তায় বাঁশ ফেলে, টায়ার ফেলে চাঁদা তুলে মোচ্ছবের কথা ভাবাও যেত না আজ থেকে দশক তিনেক আগে।ভাবতে পারলে বাড়ি আর পাড়ার গার্জেনরা চামড়া গুটিয়ে নিতেন।নিজের চামড়া দিয়ে তৈরি ঢাক নিজে পেটানো যেত কালীপুজোর রাতে। নিজের ঢাক অনেকেই পেটান আজকাল। নিজের চামড়ার ঢাক নয়।

কালীতলায় পাঁচিল দিয়ে ঘেরা সুন্দর একটা দোতলা ধবধবে সাদা বাড়ি। বাড়িটার নাম ‘একান্তে’। সুদর্শন, মাখনসাদা কর্নেল বোসের বাড়িটা ছিল স্বপ্নের মতো। কর্নেল যতটা টানটান, কর্ণেলের স্ত্রী তার চাইতে বেশি।রূপসী, সুন্দরী, পরীপরী। আমরা ডাকতাম মোনালিসা বউদি। অবশ্য মনে মনে। মোনালিসার গালে টোল পড়া হাসি দেখলে বুকে ডানা ঝাপটাত ঝাঁকঝাঁক বুনো হাঁস।

কর্তা-গিন্নির মাখোমাখো প্রেম। যুগলে বসে থাকতেন বারান্দায়। হাঁ করে দেখতে দেখতে চোয়াল টনটন করত। সেবার কপাল ঠুকে কালীপুজোর বিল বই হাতে আমরা চলে গেছি কর্নেলের বাড়ি। ‘চাঁদা? পুজোর চাঁদা তো ? দেব। আগে বলো, চাঁদের গ্র্যাভিটেশন পৃথিবীর তুলনায় কতটা? সূর্যের?’ জিভ শুকিয়ে বাসি রুটি হয়ে গেছে আমাদের। কোথায় চাঁদ আর কোথায় চাঁদা ! মোনালিসা খিলখিল করে হাসছেন, ‘রবার্ট ফ্রস্টের একটা কবিতা শোনাও তো, আমার প্রিয় কবি।’

কালীপুজোর চাঁদা তুলতে গিয়ে কেউ কেউ বাড়ির পোষা কুত্তার কামড় খেয়েছে জানতাম। তাই বলে মা কালীর চাঁদা চাইতে গিয়ে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আর বিদেশি কবিতা মুখস্থ ধরা! ঘেমে নেয়ে একশা হয়ে পালিয়ে এলাম আমরা। ডানাকাটা পরী দেখতে গিয়ে ঝুঁকে পড়ল মাথা। ছিঃ ছিঃ। এর চাইতে জ্যান্ত বলি দিলি না কেন মাকালী!

‘কর্নেলটা একটা কালীপটকা’, মাঠে বসে ধাতস্থ হয়ে বলল পল্টন।‘কালীপটকা না রে, মস্ত চকলেট বোম, ভুল বললাম, দোদমা ওটা,’ বলল পটাই। ‘আর তোর পরী? মোনালিসা!’ আমার পেটে একটা কোঁৎকা মারল পাতলু,‘ ওটা একটা উড়নতুবড়ি। হাসতে হাসতে যেন উড়ছিল!’ মাঠের ঘাস চিবোতে চিবোতে এতক্ষণ গম্ভীর হয়ে বসেছিল চম্বল। হঠাৎ করে হাতে ঘুঁষি পাকিয়ে ফেলল, জয় মা কালী! পেয়ে গেছি। চাঁদা আদায়ের রাস্তা ।’

কর্নেলের বাড়িতে চাঁদা চাইতে গিয়ে আমাদের চরম হেনস্থার কাহিনি চলে গেল বন্ধুদের কানে। খোরাক হয়ে গেলাম। কেউ হাসছে শেয়ালের মত খ্যাক্‌খ্যাক্‌ করে। কেউ বলছে, আহারে! বেচারারা!’ চোয়াল শক্ত হয়ে যাচ্ছে পল্টনের, চম্বলের।

তৃতীয় দিন রাতে আমাদের ডেকে নিল চম্বল। কৃষ্ণপক্ষের রাত। রাস্তায় নিভু নিভু স্ট্রীটবাল্ব। শুরু হল অপারেশন। রাত সাড়ে দশটা। নিঃশব্দে, পা টিপে টিপে কর্নেলের বাড়িতে ঢুকে গেল পল্টন, পাতলু, পটাই আর চম্বল। একটু দূরে গেটের আড়ালে আমি পাহারায়। নাইটল্যাম্প জ্বলছে একতলার ঘরে। অনেক ধ্যান দিয়ে ব্যাপক একটা বস্তু কাগজ দিয়ে বানিয়ে এনেছে চম্বল। কুমিরছানার মত ছোট্ট কাগজটা গলে গেল দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে। ল্যাজের পলতেতে আগুন লাগিয়ে পিছনে চলে আসছে ওরা।

ঘরের দরজা বন্ধ। তবু যেন দেখতে পাচ্ছি অন্দরমহল। ‘একান্তে’র মধুরাতে শয়নকক্ষের মেঝে জুড়ে জ্বলন্ত ছুঁচোর দাপাদাপি। এই ডাইনে ছুটছে, এই বাঁয়ে। হঠাৎ করে পেছনদিকে। ‘হেল্প! হেল্প! ওরে বাবারে! মেরে ফেলল রে!’

‘জল ঢালো, জল, কুইক!’ কর্নেলের কথার পিঠে মোনালিসা বউদির আর্ত কণ্ঠ।

আমরা পাঁচিলের আড়ালে লুকিয়ে। হঠাৎ করে দরজা খুলে বাইরে চলে এলেন কর্নেল। সঙ্গে বক্ষলগ্না পরী। ঘরে ছুঁচোর নাচ থেমে গেছে। কর্তা গিন্নির আতঙ্ক তবু তুঙ্গে। কর্নেল বোসকে জড়িয়ে ধরে কাঁপছেন মোনালিসা বউদি। ঘরের দিকে তাকাচ্ছেন আর নাচছেন। জ্বলন্ত ছুঁচো বাজির নাচ থেমে গেছে। এখন বারান্দায় চলছে দুই জ্যান্ত ছুঁচোর যুগলনাচ !

‘কালীপটকা জানত না, পটকারও পটকা হয়, বাপের হয় বাপ!’ ফিরতে ফিরতে বলল চম্বল। ‘এতবড় ছুঁচোবাজি বানাল কে?’ ‘আমি আর পল্টন! এক প্যাকেট কালীপটকার মশলা খুলে বানানো মাল।’ ‘তাই বল, কর্নেল আর একটু হলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেত।’ ‘তোর পরী তো একেবারে কাটা কলাগাছের মত কাঁপছিল।’ ‘ কলাগাছ আবার কি! শুদ্ধ বাংলায় বল, রম্ভা!’ আমার পেটে একটা বিরাট চিমটি কাটল পল্টন।

পরদিন সকালেই উদয় হলেন জাম্বোদা। আমাদের ক্লাবের সেক্রেটারি। ‘করেছিস কি! সক্কালবেলা বাড়ি এসে কড়কড়ে একুশ টাকা চাঁদা দিয়ে গেছে কর্নেল বোস। হেভি কঞ্জুষ, কোনওবার দেয় না। এই প্রথম।’ ‘ছুঁচোবাজির চালে কালীপটকা পুরো ফিউজ! এবার থেকে প্রত্যেকবার দেবে বলেছে।’ হাসছে পল্টন। ‘ছুঁচোকে যতই নিম্নস্তরের প্রাণি বলি আমরা, ছুঁচোবাজির জবাব নেই জাম্বোদা।’ বলে উঠল রামবিচ্ছু চম্বল।

পরের গল্পটাও আমাদের কলেজবেলার। কালীপুজোর আগের রাতগুলো গা ছমছমে, পিচকালো। চোরডাকাতদের দাপট বাড়তো এরকম কৃষ্ণপক্ষের রাতে। ব্রজ মজুমদার ছিলেন ধনি গৃহস্থ। অগাধ সোনাদানা, টাকাপয়সা থাকত মজুমদারের ঘরে। ঘোর কৃষ্ণপক্ষের রাতে মাঝ রাতে  ঘরে ফুট করে একটা আওয়াজ। ঘুম ভেঙে গেল ব্রজকর্তার। ঘরে চোর। হাতের কাছে লোহার রড নিয়ে শুয়ে থাকেন। তাড়া করলেন পটকাকে। তাড়া খেয়ে পটকা পটাপট উঠে গেল বিশাল লম্বা একটা নারকেল গাছের মাথায়।

পটকা ছিল অসম্ভব ধুরন্ধর। থানার জাঁদরেল বিপিন দারোগা পর্যন্ত সমঝে চলতেন পটকাকে। বেশ কিছুদিন তল্লাটের বিখ্যাত ডাকাবুকো ডাকাত দোনলার শাগরেদি করে পটকা তখন প্রায় ডাকাত। পুলিশের খাতায় চোর আর ডাকাতের মাঝের সাঁকোতে থাকা পটকা তখন না চোর, না ডাকাত। চোকাত!থানার মেজ বাবু অঘোর সামন্ত টক্করে এঁটে উঠতে না পেরে তার নাম দিয়েছেন কালীপটকা। লোক মুখে ছড়িয়ে পড়েছে পটকার নতুন নাম।

কালীপটকা নারকেল গাছের মাথায়, টর্চ জ্বেলে ওপরে ফোকাস করে হম্বিতম্বি করছেন ব্রজকর্তা। কর্তার তিন জোয়ান ছেলেও পাশে। ‘নেমে আয় ব্যাটা, আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।’ চেচাচ্ছেন কর্তা। পটকা নামল না, কোমরের গামছায় বাঁধা একেক গোছা কালীপটকায় বিড়ির আগুন লাগিয়ে ছুঁড়তে শুরু করল নীচে। না পালিয়ে উপায় ছিল না গাছতলার মানুষগুলোর।

সরসর করে গাছ বেয়ে নেমে এল পটকা। একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে অপেক্ষা করছেন দশাসই চেহারার ব্রজকর্তা। কালীপটকাকে আজ ছাড়বেন না। কালীপটকার চোখ এড়ায়নি একটা ঝোপ নড়ছে। কোমরবন্ধনী থেকে কী একটা বার করে টুক করে আগুন জ্বেলে ছুঁড়ে দিল ঝোপটার দিকে। জ্বলন্ত একটা অগ্নিপিন্ড ছুটে আসছে তাঁর দিকে, ঝড়ের বেগে। দেখে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারালেন প্রবলপ্রতাপ ব্রজ মজুমদার।

কর্তার ঘুম ভাঙার আগেই প্রচুর সোনাদানা হাপিস করে দিয়েছিল পটকা। হাওয়ার মত হাওয়া হয়ে গেল পটকা। শুধু কালীপটকায় হত না, ঝোপের দিকে ছুটেছিল পটকার নিজের হাতে বানানো দ্রুত ধাবমান এক আতসবাজি। আসলে বারুদঠাসা গন্ধমূষিক। ছুঁচোবাজি!

তিন পুরুষের আতশবাজি বানানোর কারখানা ছিল পটকাদের। পরিবারে আর সবাই এটাকে পেশা বানালেও চুরি না করলে সোয়াস্তি পেত না পটকা। ব্রজকর্তাকে ছুঁচোবাজি ছুঁড়ে ঘায়েল করার কাহিনি ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত। হাফ-চোর-হাফ-ডাকাত থেকে পুরোদস্তুর ফুল ডাকাত বনে গেল কালীপটকা।

পৃথিবী বদলে গেছে। দীপাবলীতে তেলের প্রদীপ আর সেভাবে জ্বলে না। বাড়ির ছাতে দেওয়ালে জ্বলতে থাকে ইলেকট্রনিক টুনি। মিনিয়েচর। নানা কায়দায় জ্বলে আর নেভে, নানা রঙে ভরে ওঠে চারপাশ। পুজো আর আগের মত ফ্যাকাসে, ম্যাড়ম্যাড়ে নেই। রাস্তায় রাস্তায় চোখ ধাঁধানো জেল্লাদার একশো হাত, দেড়শো হাত কালীপুজো।

চাঁদা আর চাইতে হয় না এখন, না চাইলেও পাওয়া যায়। বাড়ি বাড়ি না গেলেও চলে। ছোট ছোট গ্রুপে বড় রাস্তায় বাঁশ, টায়ার ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করে, হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়ালেই ভক্তি ভরে চাঁদা দিয়ে দেন জনগণ। কোনও অভক্ত, অবিশ্বাসী রুখে দাঁড়ালে, চাঁদা না দিতে চাইলে স্বয়ং ভগবান ভক্তের লাঠিতে ভর করে সেই পাপিষ্ঠকে শাস্তি দেন। দেবদ্বিজে ভক্তিহীন, অবিশ্বাসী মানুষকে সহবত শেখাতে রাস্তায় রাস্তায় নেমে পড়েছে ধানিপটকা ও কালীপটকার দল! হাতে লাঠি, হাতে বিল। মাথা নাড়লে পিঠে কিল।

ন্যাংটো বয়েস থেকে রাস্তা আটকে মায়ের প্রণামী তোলা। সাইকেলে চেপে যাচ্ছিলেন কাঠবাঙাল কেষ্টজ্যাঠা। দাঁড় করাল এক দঙ্গল কালীভক্ত। কিছুতেই চাঁদা দেবেন না জ্যাঠা। দু’চার ঘা পড়ল পিঠে। ব্যাথায় কাতর হয়ে শুয়ে আছেন বিছানায়। অভক্তির মাসুল গুনছেন শুয়ে শুয়ে। বাইরে কালী মণ্ডপ। মাইকে ভেসে আসছে উদাত্ত শ্যামা সঙ্গীত। ‘সকলি তোমার ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি, তোমার কর্ম তুমি কর মা, লোকে বলে করি আমি …….’

দোদমা, চকলেট, বাক্সবোম, রকেট, রংমশালে চারপাশ সরগরম। কালীপটকার দিকে আর কেউ তাকায় না।লাল ছোট্ট ওই পটকা আর পটকা নেই, ছোট বড় কালীপটকায় ভরে গেছে দেশ। ভক্তির প্লাবনে চারপাশ ডুবে আছে। ‘ডুব দে রে মন কালী বলে’।

—- কাল রাতে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম। ‘ছূঁচোবাজি আর নেই রে’, হাউ হাউ করে কাঁদছে চম্বল। ‘ওঠো, জাগো, চলো বাঙলার বুকে ছুঁচোবাজি শিল্প গড়ে তুলি’, বলছে পল্টন। তারপরই দেখি, লক্ষ লক্ষ ছুঁচোবাজি তৈরি হচ্ছে আমাদের কারখানায়। সুন্দর প্যাকেজিং। ‘গন্ধমূষিক’ মার্কা ছুঁচোবাজি লরিতে চেপে চলে যাচ্ছে গ্রামেগঞ্জে। নগরেপাহাড়ে। অসংখ্য শ্রমিক কাজ করছেন কারখানায়।

বাংলার বুকে ছুঁচোবাজি। আবার। হেভি ডিমান্ড। জয় মা কালী।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nayak 1

মুখোমুখি বসিবার

মুখোমুখি— এই শব্দটা শুনলেই একটাই ছবি মনে ঝিকিয়ে ওঠে বারবার। সারা জীবন চেয়েছি মুখোমুখি কখনও বসলে যেন সেই কাঙ্ক্ষিতকেই পাই