সন্ধ্যামালতী

735
Bengali story

সে ছিল একটা সাদাকালোর দুনিয়া। ফুটপাত, নোংরা ছড়ানো ডাস্টবিনের গলি, ধুলো ওড়া বড় সড়ক, মাথায় ডান্ডা বাঁধা ট্রাম, এক ধাক্কায় আকাশে তুলে দেওয়া টানা রিক্সা, দুদ্দাড় গাড়ির দৌড়… সদর দরজা পেরোলেই ছেলেধরার ভয় । শুধু সাদা আর কালো রঙ। একটা ঘুপচি ভাড়ার ঘর। কপাল কুচকানো-তেল হলুদের গন্ধ মাখা মা। আচমকা ঘুম-ভাঙা রাতে বাবলুর বুকের ওপর একটা শিরা ওঠা হাত। ভূতুড়ে লোকটার নাম বাবা, রবিবারেও তার জুটমিলে ওভারটাইম। একঘেয়ে লাগত। খুব ভয় পেত ও। মনে হত সাদাকালো শহরটা ওকে গিলে খেয়ে নেবে!

তারপরে একটা অন্যরকম বিকেল। রঙীন…রঙচঙে। ছাইছাই আকাশে ফুলোফুলো গোলাপি মেঘ ।রাস্তার দুপাশে গাছ আর গাছ। কতরকমের সবুজ! সেই ছোট্টবেলার চাঁপাপুর।

গেরস্থালির জিনিসপত্র ডালায় বাঁধা একটা টেম্পু। কেবিনে বাবার কোলে বাবলু । একটা নতুন দুনিয়ার দরজা খুলে যাচ্ছিল। বিকেল পেরিয়ে নেমে আসা সেই সন্ধ্যায় ফুল দেখেছিল বাবলু। সেটাই কি তার প্রথম ফুল চেনা! মনে নেই। সে ফুলের অনেক রঙ!হালকা হলুদ, ফ্যাকাশে কমলা, গাঢ় নীল, পাঁচটা সাদা পাপড়ির একটাতে গেরুয়া ফালি। তবে সব থেকে বেশি, …রাস্তার দুপাশে, বাড়িগুলোর উঠোনে, রোয়াকের পাশে, বাখারি-কঞ্চির বেড়ার গায়ে…ঝাঁকে ঝাঁকে একটা অচেনা রঙ । মা বলেছিল—রানি কালার। রঙের কী দারুন নাম! তাহলে রানিদের এটাই গায়ের রঙ! নাকি এটাই ফুলেদের রানি! সেকথা আর জানা হয়নি। অনেক পরে ও জেনেছে , রঙটার আসল নাম ম্যাজেন্টা রোজ। ভাল লাগে নি। ম্যাজেন্টা নামে কি ঐ মনখারাপের সন্ধে-রূপ থাকে!

মা আরও বলেছিল। ফুলটার নাম সন্ধ্যামালতী। বাহ্‌…বেশ! সন্ধ্যা আর মালতী। দুটো মেয়েদের নাম মিলে এত সুন্দর ফুল! বাবলুর খুব ভালো লাগে। টেম্পু থামে। ডালা থেকে বাবা মাল নামাতে থাকে। মা চলে যায় নতুন ভাড়া বাড়ির ভেতরে। অনেকগুলো মানুষ বেরিয়ে আসে। দুই বাড়িওলা, আরো তিন ঘর ভাড়াটে…একদঙ্গল বাচ্চা, কেউ ওর মত, কেউবা বড়, আবার কেউ ছোট। ইজের পরা, খালি গা, ফর্সা, গোল মুখের একটা মেয়েও এল ।বাবলুর হাতে ছিল একটা প্লাস্টিকের রেল-ইঞ্জিন।মেয়েটা নিয়ে নিল যেন সেটা নিজের তারপর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। সে মেয়েটার দুকানে…ঐ রানি কালারের সন্ধ্যামালতী। দুই গোছা ফুল হয়ে দুলছে।

সবাই মিলে ওদের মালপত্র নিয়ে চলল বাড়ির ভিতরে।বস্তার ভেতরে রাখা খেলনাগুলো বের করে নিয়েছিল ছেলেমেয়েগুলো। তারপর ভেতরের গোল উঠোনটায় খেলা শুরু। উঠোনের একপাশে সেই সন্ধ্যামালতীর ঝাড়। একটা হালকা মিস্টি গন্ধ উঠে আসছিল…

একসময় অন্ধকারের চাদর ঢেকে দিল সবকিছু। উঠোনের পশ্চিমপাশে বেড়ার মনসামন্দির। টিমটিমে প্রদীপের আলো উকি মারছিল। আঁধারের চাদরটার ওপর তারপর লাখ লাখ রেশমি-বাসন্তি আলোর ফুল… জ্বলল, নিভল, উড়ল, থামল। খালি গায়ে মেয়েটা ওর ডানহাতটা ধরে আকাশের দিকে দেখিয়ে বলল, ‘ কতগুলো জোনাকি আছে বলতে পারবি?’ মাথা নেড়ে না বলেছিল বাবলু। ‘তাহলে চল গুনি।’ তার সাথে বাবলু সেই প্রথম জোনাকি গুনতে শুরু করেছিল।

রাতে ঘুম ভেঙে গেল বাবলুর। মা বলছে, ‘ নতুন কাজকম্ম কিছু পাওয়া যাবে… কী বল!’ বাবার ঘুমজড়ানো চোখ, ‘ হুঁ! লেদের কাজটা তো জানি! এদিকে মিস্তিরিও কম…কিন্তু কম্পানির মত মাইনে হবে না! কীভাবে চলবে?’ ‘ তুমি কী করবে! সব তো ঠাকুরের হাত…’ সেরাতে মা কান্না চেপেছিল। তারপর বাবা যাতে বুঝতে না পারে তাই কি মা বলেছিল, ‘বাবুর অনেক বন্ধু হয়েছে দেখলে!’

‘ হুঁ…একটা বান্ধবীও জুটেছে। কানে সন্ধ্যামালতী ফুল।’ চোখ বুজে বুজে মেয়েটার গোল মুখ দেখছিল বাবলু। তার নাকে একটা সরু দুল। অদ্ভূত নাম তার…বোচা। খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আর সেই হালকা মিস্টি গন্ধটা ভেসে আসছিল।

(২)

বোচার বিয়ে হয়ে গেছে… তাও বছর বিশেক। বিয়ের দু-তিনদিন আগের সন্ধে। কলতলায় বাসন মাজছিল বাবলু। বাবা মারা গেছে আগের বছর। মার বাড়াবাড়ি হাঁপানি। সেদিন মার্কেট তেমন ভাল ছিল না। কালিঘাটে ডিস্ট্রিবিউটারের ঘর। সব বুঝিয়ে বিকেল বিকেল ফিরে এসেছিল সে। বোচা আসল একটা ছাড়া কাপড় ধুতে। তারপর গায়ে জড়ানো গামছা দিয়ে দেয়ালে ঝোলানো হলদে আলোর ডুমটা খুলে নিল। ভ্যাবাচাকা বাবলু উঠে দাড়াল।

বাঁগালে চড়ের জ্বালা বেশি ছিল? নাকি বোচার ফিসফিসে গলার ঝাঁঝ! তখনও আলো নিভলে জোছনা ঝাপ দিত চাঁপাপুরে। মনসামন্দির থেকে কলতলা জোড়া ফুট তিরিশেক চিলতে জমি। শুধু সন্ধ্যামালতী…সেই ‘রানি কালার’। চোখ চলে যাচ্ছিল বাবলুর। অধৈর্য মেয়েটা শেষে চেপে ধরল বাবলুকে নিজের বুকের মধ্যে। ‘ এ বাড়ি ছেড়ে উঠে যা না তোরা! আমি তোর সাথে পালিয়ে যাব… যাবই। কথা দিচ্ছি।’

ওর পা মচকেছিল একবার। পায়ের পাতায় পুকুরের ঠান্ডা পাঁক লাগিয়েই ফুটন্ত গরম জল ঢেলে দিত বাবা। অনেকক্ষণ; এইভাবে বারবার চলত। দুরকম কষ্ট। ঠান্ডার কনকনে আর গরমের জ্বালাপোড়া।সেই সন্ধেতে আবার!

বোচা! … ওকে ভালবাসে? ওর সাথে পালাবে? এও সম্ভব? কেস চলছে। বোচার বাবা আর জ্যাঠাদের সাথে ভাড়াটাদের। ওরা কেউ উঠবে না। তিন বছর কথা নেই বোচার সাথে। এই কলতলাতেই যেটুকু দেখা। বোচার দাদারা একদিন মেরেওছে বাবলুকে। পাশের ঘরের ভাড়াটে জয়ন্ত কাকাও হাত চালিয়েছিল ওদের। সেটা নিয়েও আরেকটা ক্রিমিনাল কেস চলছে। সেই বাড়ির মেয়ে তো বোচা!

হাতের মধ্যে নিলে সন্ধ্যামালতীরা মিলিয়ে যায়। সেদিন বোচাও মিলিয়ে যাচ্ছিল বাবলুর মধ্যে। মানুষের শরীর এত নরম হতে পারে! অমন মিস্টি গন্ধ সেদিন কোথা থেকে ভেসে আসছিল? বোচাও কি সেই সন্ধেতে ফুল হয়ে ফুটেছিল? তাহলে বোচা কেন খামচাচ্ছিল ওর বুক? যন্ত্রণা হচ্ছিল। ‘কলেজ শেষ করলি না। কী হাবিজাবি কাজ করিস? পাটিটাও তো করতে পারতিস? কতলোক গুছিয়ে নিল! উঠে যা না তোরা! যেখানে রাখবি আমি সেখানেই থাকবো…যা না!’

মিছরি মিছরি হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছিল ওদের। খুব ইচ্ছা করছিল বাবলুর। সন্ধ্যামালতীর ফুল তুলে বোচার দুহাত ভর্তি করে দিতে। সেই ছোটবেলার মত। উঠোনে, পাশের মাঠে, খোয়া ওঠা রাস্তার ধারে, বোচা ঘর বানাত…খেলার ঠাকুর ঘর। বাবলু সন্ধ্যামালতী তুলে আনলে ঠাকুর সাজানো, সিংহাসন সাজানো হত। মালাও গাঁথা হত।পুজোর পরে সেই মালাদের জায়গা হত, বোচার গলায়।

বারবার এক ফুল… বোচা খুব রেগে যেত । কিন্তু লালজবা আর সাদা টগরের জন্য বাড়িসুদ্ধ কত ভাগীদার! সুযোগ কোথায়? আর গোটা পাড়াতে কটাই বা গাছ। কয়েকটা কলকে ফুলের গাছ, সেই দূরের পিচকলের মাঠে। অন্য বাড়ির বাগানের গন্ধরাজ, জুঁই, শিউলিতে হাত দিলে বাবার শক্ত হাতের কিল! তাই…আগাছা, সন্ধ্যামালতী! বোচার প্রশ্ন কিন্তু থামছিল না। ‘ কবে যাবি? যাচ্ছিস না কেন?’

একবার…একটাই কথা বলল বাবলু। ‘এই ফুলগুলোর জন্য!’ এ উত্তর কেউ বিশ্বাস করতে পারে ? ফোপানি থেমে গিয়েছিল বোচার। বাবলুর বুকের মাংসে বোচার নখগুলো বসে যাচ্ছিল। কাপড়, বালতি কলতলায় ফেলে রেখেই বোচা চলে গিয়েছিল।

তার চলে যাওয়ার পরও বাবলুর কানে শুধুই বোচার গলা , ‘মর তুই। তোর এই সন্ধেবেলার টাইমফুল নিয়ে। মর, মর…মরুক তোর সন্ধ্যামালতী…মর। দাঁড়া যাওয়ার আগে গরম জল ঢালব। তারপর পুরো ঝাড়টাকে উপড়ে দিয়ে যাব। দাঁড়া…’

না…সেসব কিছুই করেনি বোচা। ওর বিয়ের সন্ধে থেকে সারা রাত কলতলাতে দাঁড়িয়েছিল বাবলু। ভাবছিল, মারল না কেন এই ঝাড়টাকে?বোচা কি বুঝেছিল… বাবলু রঙের কাঙাল! ভয় পায় সাদা আর কালোকে।

চাঁপাপুরে এসে সন্ধ্যামালতী চিনেছে বাবলু। চিনেছে রঙের দুনিয়া। কত নতুন নতুন রঙ! সন্ধ্যামালতীর পাপড়িতে পাপড়িতে… ওদের ঘরেও। দুবেলা গরম ভাত, মার মুখে হাসি, ইস্কুলের সবুজ-হলুদ প্যান্টজামা, বাবার নীল সাইকেলের কেরিয়ারে চড়ে ঘুরে বেড়ানো, রঙচঙে শুকতারা-চাঁদমামা।কী মজা! খুঁজে খুঁজে কত নতুন নতুন রঙের সন্ধ্যামালতী নিয়ে আসত বাবা। উঠোনের পাশে এই চিলতে জমিতে লাগাত। খুরপি দিয়ে মাটি আলগা করত। রোজ জলও দিত। যেদিন বাবা পারত না সেদিন মা দিত। বাবলুর ভয় যায়নি… সাদা-কালো এসে আবার গিলে খাবে না তো সব রঙ!

তারপর টালি নালায় ব্রিজ হল। শহরের হাত ঢুকে পড়ল চাঁপাপুরে। সাদা আর কালো ছড়াতে শুরু করল ! বেহালার কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। হাওড়ায় যেতে হচ্ছিল বাবাকে। একদিন বাসের পেছনের চাকায় পিষে গেল রাশি রাশি সন্ধ্যামালতী। বি কমটাও শেষ হল না বাবলুর। এলাকা জুড়ে ফাকা জমি, ডোবা…সব বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল। হারিয়ে যাচ্ছিল সন্ধ্যামালতীরা। রঙআর খুঁজে পাচ্ছিল না বাবলু।

দুই বাড়িওয়ালাই বেচে দিল জমি…পার্টিরই প্রোমোটার। কোথায় যাবে বাবলুরা, অন্য ভাড়াটেরা…। সাদা-কালো গিলে খাবেই সব রঙ। কিন্তু মরার আগে কী করে মরে মানুষ? তাই একদিকে বোচার বাবাদের সাথে কেস লড়া আর সাইকেলে ঘুরে ঘুরে অর্ডার আনার কাজ। আর নিয়ম করে বাবার মত সন্ধ্যামালতীর ঝোপঝাড়কে বাঁচানোর চেষ্টা…এই এতখানি গল্প, সবটা কি বুঝেছিল বোচা সেদিন? নাকি কাপুরুষ বাবলু্র জন্য ঘেন্নায় সন্ধ্যামালতীর ঝোপে গরম জল ঢালেনি!

(৩)

উত্তরটা জিজ্ঞাসা করতে পারেনি বাবলু। বোচার চোখ তখন ক্লান্তির পুকুর। তাতে কাগজের নৌকা হয়ে কী ভাসছিল বিস্ময় নাকি পুরোনো প্রেম। ঠিক করতে পারছিল না বাবলু। অন-লাইন শপিং-এর ডেলিভারিটা দিয়ে নীচে নামছিল সে। ভর্তি একটা বাজারের ব্যাগ নিয়ে থেমে থেমে উপরে আসছিল বোচা। একটা ধাপের আগে থামল ওরা দুজন।

‘তাহলে এই কাজ করছিস?’

‘হুঁ!’

‘বাহ! আর খবর?’

‘এই চলছে…তোর?’

‘দেখে বুঝতে পারছিস না?’ বোচার সিঁথিতে সিঁদুর নেই। হাতে শাখাও নেই। নজরে পড়ল। ছাপা শাড়ি পড়া বোচা লিপস্টিক আর মেক-আপ ছাড়া , সাদা-কালো পাসপোর্ট ফটো। তারপরেই মনে পড়ে বাবলুর… কতদিন দেখেনি বোচাকে!

‘ কবে হল এসব?’

‘এই বছর পাঁচেক। আর্মিতে ছিল। কাশ্মীরে পোস্টিং। তারপর; বাদ দে…কোথায় আছিস এখন?’

‘কেন? তুই জানিস না? ঐ ওখানেই। তোদের বাড়িতে!’

‘আর আমার বাড়ি! বর মরল। টাকার ভাগ চেয়েছিলাম। কেউ যোগাযোগ রাখে না। চল, ওপরে চল।’ সেই খেলনাবাটির দিনেও বোচার কথা না মেনে উপায় ছিল না । সেদিনও মানল বাবলু। ঢুকল বোচার ফ্ল্যাটে।নাকে নল দেওয়া শাশুড়ি বিছানায়। কোনো বাচ্চা হয়নি বোচার। অয়েল পেন্ট, দেয়ালজোড়া টিভি, চামড়ার সোফা সবই আছে কিন্তু সারাটা ঘর দেখে ভয় লাগছিল বাবলুর। সাদাকালো একটা ভূত, এই যেন গিলে খেয়ে ফেলবে!

‘ এখনও পড়ে আছিস কেন? যা শুনলাম। ওরা এবার মস্তান লাগাবে। কোর্ট-ফোর্টে কিচ্ছু হবে না!’ শহরের এই উল্টোদিকে থেকেও বোচা সব খবর রাখে? কেন? ওরা উঠে গেল কি বোচা নতুন করে টাকা পাবে? না জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হল না বাবলুর। চা শেষ করে উঠে দাঁড়াল।

‘চলি।’

‘দাঁড়া…আয় ব্যালকনিতে আয়।’ যেতেই হল বাবলুকে। তারপর… শুধু চোখদুটোই না , বাবলুর গোটা শরীরটাই যেন রঙবেরঙের গ্যাস বেলুনের গোছা হয়ে গেল! ওর খুব উড়তে ইচ্ছা হল! বড় বড় সাত আটটা টবে সন্ধ্যামালতী। সবকটা সেই ‘রানি কালার’।

‘কী রে যাবি না, বাড়ি?’

‘যাই…একটা কথা বলব?’

‘কী?’

‘ চাঁপাপুরে আর কোথাও নেই রে! শুধু কলতলার জমিতেই ফোটে বোচা…তোর সন্ধেবেলার টাইমফুল! তোর দুকানে যখন দুল হয়ে জ্বলে; আমার দারুন, দারুন…লাগে! একদিন আসবি?’ কোথা থেকে রঙে রঙে ভরে গেল বোচার ঘর , বারান্দা সামনের বড় রাস্তা ওপারের বড় বড় হাউসিং। বোচার দুচোখে, গালেও যেন ‘রানি কালার’। কিন্তু আচমকা নিভে গেল বোচা।

‘তুই এখন বাড়ি যা বাবলু। আর ও বাড়ি তুই ছেড়ে দে…তোর পায়ে পড়ি!’ জীবনে প্রথম বোচার চোখে বৃষ্টি দেখল বাবলু।

‘তাহলে কী তোকে ওরা টাকা দেবে?’ বৃষ্টি শুকিয়ে কড়কড়াৎ বেগুনি বিজলি আর বাজে কেঁপে উঠল সারা পৃথিবী।

‘বেরো, বেরো বলছি…বেরো!’ দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল বাবলুর মুখের ওপর। ম্যাড়মেড়ে সিঁড়ি বেয়ে সাদাকালো দুনিয়াতেই আবার নেমে এল বাবলু। তবুও ওর মনে হচ্ছিল! আকাশের কোথায় যেন একটা আবছা ছবি ভাসছে। ‘রানি কালারের’ সন্ধ্যামালতী দুকানে একটা মেয়ের ছবি!

ছবিটা স্পষ্ট হল। বেশি দেরি করতে হল না। টালির চাল আর জিনিসপত্রই শুধু ভাঙেনি তারা দুটো পাও ভেঙে দিয়েছিল। জয়ন্ত কাকারা প্লাস্টার করিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করাতে চাইলেও বাবলু রাজী হয়নি। সন্ধ্যামালতীর জমিটার জন্যই চলে এল। সবাইকে বলল ঘুম হবে না। কেউ কি বিশ্বাস করবে আসল কথাটা!

ডেলিভারির কাজটাও গেল নিশ্চই। ‘এমার্জেন্সির’ ‘এক্স-রে প্লেট’ দেখে ডাক্তার বলেছিল- অপারেশন করিয়ে দুটো পায়েই লোহার রড বসাতে হবে। চ্যাঙদোলা হয়ে বাড়িতে ঢোকার সময় দেখল, যা ভেবেছিল ঠিক তাই। চিলতে জমিটায় হাজার হাজার নতুন ইটের পাঁজা।

ছেড়াখোরা বিছানায় দুপায়ের যন্ত্রনা নিয়ে এপাশ ওপাশ করছিল বাবলু। নাহ! যতদূর চোখ যায়, কোত্থাও আর কিচ্ছু নেই কালো আর কালো…কোথাও একটু একটু সাদা। আর কোন আশা নেই। পেটের তাগিদ, পাটি-পলটিক্স, কথা কথায় ঠকানো আর আপস…অনেক অনেক রকমের ভয় একঘেয়েমি! এবার গিলে ফেলবে ওকে। সেদিন বোচার চোখে প্রথম জল দেখেছিল। আজ প্রথমবার নিজেরই কাঁদতে ইচ্ছা হল বাবলুর। আর তখনই ভেজানো দরজা ঠেলে সেই নাকে দুল, খালি গায়ের ইজের পরা মেয়েটা ঘরে ঢুকল। তার হাতে… ফোটা সন্ধ্যামালতী ভর্তি একটা টব।

‘গরু…সেই সন্ধেবেলার কলতলায়। কেন বলিসনি আমায়? আমার কানে টাইমফুলের দুল দেখতে চাস…বল! কেন বলিসনি? তাহলে তো এখানেই থাকতাম। যা হত…যত ঝামেলা…দেখে নিতাম!’

‘তুইও কি আগে আমায় কিছু বলেছিলিস?’

‘ইঃ, গাধা! তোমার কাছে কে আগে; তা বুঝি আমি জানি না? আমি না …ঐ টাইমফুলই, তোমার কাছে সব কিছু!’

‘না রে…রঙ। তুই আর সন্ধ্যামালতী রঙে রঙে মিলে যাস…’

মেয়েটা দরজাটা ভেজিয়ে দেয়। বাবলুর কপালে অনেক জ্বর।

‘কী করছিস! সবাই কী বলবে, তোর বাবা, কাকা, দাদারা?’

‘তোকে ভাবতে হবে না…তুই তোর সন্ধেমালতী দেখ!’

ভাঙা টুলটার ওপরে টবটা বসিয়ে দিয়েছে মেয়েটা। খোলা জানালা দিয়ে আসা জোছনা আর ভেপার আলোর যুগলবন্দীতে রানি কালার জ্বলজ্বল করছে। পেছনের মজা ডোবা দিয়ে বহুকাল পরে আজ আবার মিছরি মিছরি হাওয়া।

—————–*———————-

Advertisements

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.