শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়
শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক চল্লিশ ছুঁয়ে ফেলা সাহিত্যপ্রেমী। পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক। জন্ম, বেড়ে ওঠা, থাকাথাকি সবই হাওড়া জেলার এক বর্ধিষ্ণু মফস্‌সল জনপদে। পছন্দের ক্ষেত্র মূলত গদ্য। চারপাশে ঘটে চলা আর হারিয়ে যাওয়া সময়। মজার মিশেল অথবা অন্যভাবে ভাবা। গল্প লেখার ব্যাপারে আলসেমি। এখনো অবধি একমাত্র প্রকাশিত গল্পের বই 'জেড মাইনাস' (২০১৪)। পেশাগত ভাবে একটি অগ্রণী ইংরাজি প্রকাশনা সংস্থায় যুক্ত।

পাগলছাগল, হাবাগোবা এইসব বলে জীবনের মূলস্রোত থেকে যাদের দীর্ঘ সময় ধরে আমরা তুড়ি মেরে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি, পশ্চাতে রেখেছি, পশ্চাতে টানিছে তারা এবার আমাদের। ফলে ঘোঁতন এগিয়ে যেতে পারছে তার স্বপ্নের রাজকুমারী, পড়শি পপিন্সের দিকে। যেখানে পাড়ার বাকি সমবয়সিরা, যারা সামাজিক সকল স্কেলে নিখুঁত, যারা এতদিন রাস্তায় ঘোঁতনের পিছনে লেগে এসেছে, হ্যাহ্যাহিহি করেছে, তারা এক ধাক্কায় ব্যাকফুটে। পপিন্স তাদের কাউকে পাত্তা দেয়নিকো!

Banglalive

বাবা আর মা ছাড়া কেউ ছিল না ঘোঁতনের। দুজনকেই হারিয়ে অকূল পাথারে পড়া একটি ছোটো ছেলে, তার ওপর আবার প্রতিবন্ধী। শারীরিক নয় যে আহারে একটা পা নেই বা চোখে দেখে না। ঘোঁতনদের প্রতিবন্ধকতা ততটা নজরে পড়ে না অন্যের। তার স্বপ্ন সাকার হওয়ার, লড়াই জিতে যাওয়ার গল্প নিয়ে সিনেমা ‘রেনবো জেলি’।

থোড়বড়িখাড়া দক্ষিণী রিমেক একদিকে ধড়ধড়িয়ে চলছে বাংলা সিনেমাকাশে, আর অন্যদিকে প্রচুর মোচড়ঠাসা মৌলিক কিছু গল্প, এই থুড়ি, সিনেমা। আছে আরও: রহস্য গোয়েন্দা, রোমাঞ্চ অভিযান, উচ্চমধ্যবিত্ত সুখী বাঙালির সংকটময় উচ্চকিত পারিবারিক মেলোড্রামা। এইসবের মাঝে অনুচ্চকিত, মৃদুমেদুর সিনেমারা একটু কোণঠাসা বই কী! দর্শকবিচারেও, আবার সিনেমা ব্যাপারীদের গভীর আঁকিবুঁকিতেও।

রেনবো জেলি’র মতো ফুডফ্যান্টাসি জঁরের সিনেমা ভারতে আগে হয়নি মনে হয়। সিনেমা শেষে দর্শকের চোখেও ভেসে উঠবে কাছের কোনো এক বা একাধিক অসহ্য মুখ। ইচ্ছে করবে তাকে এন্তার টক খাইয়ে দিতে, অথবা তুঁতেরঙা কিছু।

নয়ের দশকে বাড়িতে টিভি অ্যান্টেনার এন্ট্রি যাদের, সেই দলে আমিও। প্রথম দেখেছিলাম কৌশিক সেনকে চোরের ভূমিকায়। একটি টেলিসিরিয়ালে চুরি করতে এসে ধরা পড়ে বকাঝকা খেয়ে এক সময় ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে সে, চুরি করতে আসা বাড়ির মালকিনের পায়ের কাছটিতে, গুটিসুটি মেরে। অনেক মাইলফলক পেরিয়ে তিনি কমিক ভিলেন এই সিনেমায়, সম্পর্কে ঘোঁতনের মামা। কমিক শুধু তাঁর তোতলামিতেই নয়। ঘোঁতনের বাবা গোপন কুঠুরিতে রেখে গেছে ধনসম্পদের হদিশ। কুঠুরিটি ভয়েস পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড। মামা সেই পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করতে অনেক কিছু বলে চেষ্টা করে যায়। ঠিক হয় না কোনোটাই। যন্ত্র যান্ত্রিক স্বরে বলে যায়ভুল। কানের পোকা বেরোনো একঘেয়ে সেই ‘ভুল’ শুনতে শুনতে মামা ‘গণ্ডারিয়া’ কৌশিক সেন বলেনচুপ। যন্ত্র ‘চুপ’ পাসওয়ার্ডকেও জানায়ভুল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় গণ্ডারিয়া কুটো ধরার চেষ্টায় পাসওয়ার্ড বলেবেগুনি। অনবদ্য!

শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়কে প্রথম দেখি নয়ের দশকের আরেক টেলি সিরিয়ালে। বন্ধু চন্দন সেন এবং শান্তিলাল দোঁহে বেশ্যাগমন করে। সেই মহিলা চরিত্রে সম্ভবত সুদীপা বসু। ক্রমে প্রেম বিচ্ছেদ ইত্যাদি। ঘোঁতনের বাড়ির উলটোদিকের ফুটপাথে চায়ের দোকানি অনাদিরূপী সেই শান্তিলাল অসাধারণ। তিনিও অভিনয়ের অনেকগুলি শীর্ষ ছুঁয়ে এসেছেন ইতোমধ্যে। ঘোঁতনের মতো কিশোরের এমন একজন পড়শি বুঝি জুটেই যায় পৃথিবীটাকে নরম রাখতে। বহুকৌণিক তাঁর অভিনয়।

শ্রীলেখা মিত্র তাঁর আবির্ভাবলগ্ন ‘তৃষ্ণা’ মেগাসিরিয়াল থেকেই বহু হৃদয়ের ক্রাশ। বর্মিবাক্সর পদিপিসির আধুনিক ভারশন পরিপিসি এই সিনেমার অন্যতম বলিষ্ঠ স্তম্ভ। বলা যায়, তাঁর আগমনেই সিনেমাটি ডানার জোরে উড়াল দেয়।

আরেক চরিত্রের কথা বলে প্রসঙ্গান্তরে যাই। সে হল পপিন্স। এমন মিষ্টি মেয়েদের জন্যই তো ঘোঁতনরা সূর্যের সাতরং দেখতে পাওয়ার সাহস করে। লাথিচড় আর গালাগালি খাওয়া ম্যাড়মেড়ে জীবনেও ফুটে ওঠে স্পষ্ট রামধনু।

বিভিন্ন মিডিয়ায় সিনেমাটি তৈরির সময়জুড়ে বের হয়েছিলএবার পর্দায় আসছে অটিস্টিক চরিত্র। এবং জানানো হয়েছিল, মহাব্রত এক অটিস্টিক কিশোর।

ঘোঁতন চরিত্রের সঙ্গে বাস্তবে ওই চরিত্রে অভিনয় করা মহাব্রত বসু নাকি অনেকটাই এক, এমন শুনেছি আমরা। তাহলে কি সিনেমায় যেমন দেখলাম, বাস্তবে মহাব্রত রোজের জীবনে ওইরকম! তাহলে সমস্যা কোথায়!?

আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে নাচিনলেও জানি, ব্যাপারটা এত সহজ নয়। তার স্নায়ু আয়ত্তে নয় পুরোটা। অনেক মেহনত, কসরত এবং ওয়ার্কশপ থাকতেই হবে এর পিছনে। অন্যথায় অসম্ভব।

কিন্তু অটিজম কতটা তা? অটিজম থাকলে শিডিউল ব্যতীত বাজারে গিয়ে যেদিন যা পাওয়া যায় সেইমতো পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে একেকদিন একেকরকম ঘুরিয়েফিরিয়ে বাজার করা সম্ভব? বিবিধ নতুন নতুন পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করা সম্ভব? মায়ের রূঢ় মৃত্যুবৃত্তান্ত কর্কশ ভঙ্গিতে পেশ করায় তা জেনে, বুঝে, দুঃখে ভেঙে পড়ে মায়ের ছবির সামনে অঝোর নয়নে কেঁদে মাকে সত্যিটা বলে দিতে বলছে তাকেসম্ভব?

অটিজমের একটি বিভাগ হিসেবে ধরা হয় বেটার ফাংশনিং। আইকিউ বেশি হয় ওদের। কার্যকারণ বোধ, আগেপিছেউপরেনীচে সংখ্যা গণনা ইত্যাদি স্বচ্ছ হয় অনেকটাই। কিন্তু বিস্তৃত প্রেক্ষিত এবং পরিস্থিতি হতে হয় কন্ডিশনড, শিডিউলড। সে বাজারে যাবে আলু, পটল, মাছ কিনতে। বাজারে পটল নাপেলে ঝিঙে কেনা মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার সমান তার কাছে। এবং বাজারে এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক। চেন রিয়্যাকশনে পরের সব কাজই ঘেঁটে ফেলবে সে। অন্যের আবেগ বোঝা এবং নিজের আবেগ বোঝানো খুব চ্যালেঞ্জের ব্যাপার সকল অটিস্টিকদেরই, বলা ভালো যথেষ্ট কঠিন। তেঁতো খাবার খেয়ে মামা মুখে দিতে নাপেরে ঘোঁতনকে চড়চাপড় গালাগাল দিলে, তার পরিবর্তে আরেকটা অন্য স্বাদু খাবার নিয়ে এসে মামাকে ব্যাখ্যান দিতে পারবে না। মা গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে জেনে সে কষ্ট পাবে, কারণ তার কন্ডিশন ঘেঁটে যাচ্ছে, সে জানত মা হারিয়ে গেছে মহাকাশে। এসব আবার কী, আত্মহত্যা, গলায় দড়ি! তার উদ্বেগমাত্রা (অ্যাংজাইটি লেভেল) হু হু করে বেড়ে যাবে, আউটকাম হতে পারে কান্না, বা অন্য কিছুও।

এতক্ষণ বললাম বেটার ফাংশনিং অটিস্টিকদের কথা। খুব ছোটো থেকে নিয়মিত থেরাপি এবং গাইড্যান্স পেলে এরা অনেক কিছু করতে পারে। যদিও তা খুবই বিরল। আর ঘোঁতন তো সেসব কিছুই পায়নি।

এছাড়া আছে বিপুল সংখ্যক লোয়ার ফাংশনিং অটিস্টিক। তাদের ক্ষেত্রে এসব ভাবতে গেলে মাটিতে পা রেখে কল্পনার ডানা মেলা বিলকুলই সম্ভব নয়।

তাহলে ‘সিনেমার ফ্যান্টাসি’ শব্দবন্ধেই মুখবন্ধ করতে হয়।

বন্ধ করার আগে বলে নিতে চাইছি, বয়সানুপাতে আইকিউ বা বোধ্যাঙ্ক কম এবং কিছু স্নায়বিক ডিজঅর্ডারের কারণে সাধারণ ইশকুলে ঘোঁতন পড়তে পারেনি, তাকে রেকমেন্ড করা হয়েছিল বিশেষ ইশকুলে ভরতি করার। সিনেমায় এতটাই বলা বা বোঝানো হয়েছে। এবং তা সুস্পষ্ট ও যথাযথ। পরিভাষায় বলা যায় সে স্লো লার্নার।

অটিজম বা অটিস্টিক এই শব্দগুলোকে অহেতুক টেনে নাআনলেই ভালো হত। হতে পারে, এটা মিডিয়াগুলির কাজ। ছায়াছবিটির তরফেও এপ্রসঙ্গে দুকথা বলে তাতে স্পষ্টতা দেওয়া যেত না কি?

তবুও ইন্ডিফিল্ম নির্মাতা হিসেবে এবং গড়পড়তা বিষয় থেকে সরে সিনেমা বানানোর জন্য যাবতীয় কুর্নিশ বেশিবেশি করেই প্রাপ্য তরুণ পরিচালকের। সঙ্গে অনুরোধ রাখা যায়, নিখাদ অটিজমকে কেন্দ্র করে আগামীতে ভালো সিনেমা একটি বানান তিনি।

ধরা যেতেই পারে, অটিস্টিক সন্তানদের বাবামায়েদের তরফেই এই আবদার রইল। আর রইল মহাব্রতর জন্য এক আকাশ ভালোবাসা।

আরও পড়ুন:  সেলেরিগাঁও...এবার গিন্নি সমেত

2 COMMENTS

  1. বেটার ফাংশানিং হোক বা লো, যেকোনো ধরনের অটিস্টিকদের একটা কমন ফিচার হল তাদের ডেলি লাইফ টোটালি কন্ডিশনড এবং শিডিউলড। শিডিউলের বাইরে স্পনটেনিয়াসলি কোনো কাজ তারা নিজে থেকে করতে পারবে না। অটিজম এখন খুব পরিচিত একটি শব্দ। অটিস্টিক কারা, বা তারা আসলে কেমন, সেটাও নিশ্চয়ই সকলে জেনে যাবে আস্তে আস্তে। অটিজম নিয়ে এত আন্তরিক কাজ হচ্ছে এটাই সবচেয়ে আশার খবর। পরিচালককে হাজার কুর্ণিশ।