নিভাননীর উপত্যকা (চতুর্থ পর্ব )

হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে এসে যুগল বলল, ‘কী? কী? কী হয়েছে? কেসটা কী হয়েছে?’

বাবলি আরো চটে গেল তাতে, বলল, ‘কেন কে বলল তোমাকে যে কিছু হয়েছে?’

‘বলো কী? কে বলল না তাই বলো! রায় মেডিকেলের মোড়ে দাঁড়িয়ে টুলুর সঙ্গে একটু গ্যাঁজাচ্ছি, একবার অভিজিৎ এসে বলে গেল যুগলদা বাবলিদি খুব চ্যাঁচাচ্ছে, তারপর শান্তনু বলে চলে গেল দ্যাখ গিয়ে বাবলি ক্ষেপে গ্যাছে কেন? শেষে বাবা ফোন করতে ছুটতে ছুটতে আসছি! তা কেসটা কী? কেসটা কী? কে তোমাকে ক্ষেপাবার সাহসটা দ্যাখালো বলো তো? কতদিন প্র্যাকটিস করেছিল সেটা জানা দরকার!’

বাবলি আবার মুখ ফোলাতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ঢুকে এল টুলু, টুলুও বলল, ‘কী, কী, কী হয়েছে?’

বাবলি সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে আঙুল নেড়ে বলল, ‘এই অভিজিৎ মালটা কে আগে আমাকে বলো!’

টুলু বলল, ‘এই বাবলি তুই এরকম করে কথা বলছিস কেন?’

যুগল বলল, ‘অভিজিৎকে তুমি চেনো না, ওই তো বাচ্চাদের গ্রুপের ছেলেটা, লম্বা, ফর্সা, ওই যে কাঙালি ভোজনের দিন তোমার খিচুড়ির ডেকটা ধরে থেকেছিল! পরে তুমি বললে না ছেলেটা বড় হয়ে জ্যাকি শ্রফের মতো দেখতে হবে!’

বাবলি হাত পা নেড়ে বলে উঠল, ‘জানি জানি ওই বাচ্চাদের গ্রুপটাকে দিয়েই এ সব ফাজলামিগুলো করায় খচ্চরের দল! নইলে আমি কী এমন চেঁচিয়েছি যে ও তোমাকে রায় মেডিকেলে গিয়ে খবর দিয়ে এল?’

‘আহা তোমায় গলায় তো ভল্যুম কন্ট্রোল করার রেগুলেটার নেই, তাই বেশি চেঁচানোর জন্য তুমি নিজেকে দোষ দিতে পারো না বাবলি!’ বলল যুগল, বুঝদার স্বামীর মতো|

টুলু পকেটে হাত ঢুকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘কিন্তু আর যাই হোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে গালাগালি করাটা তোর ঠিক হচ্ছে না| পাড়া ভর্তি বয়স্ক লোক, তুই শান্ত হয়ে কথা বল!’

‘একটা নয় তিন তিনটে কার্তিক ফেলে দিয়ে গেছে বাড়িতে, আর আমি শান্ত হয়ে কথা বলব? আমার যা মাথা গরম হয়েছে না, এখন আমি কাউকে পরোয়া করব না, যা মুখে আসে তাই বলব!’ বলে উঠল বাবলি|

এক মুহূর্ত থমকে গিয়ে পরমুহুর্তে হেসে উঠল যুগল আর টুলু উভয়েই| ভাবখানা, ‘ও, এই ব্যাপার?’ ‘তুমি হাসছো যুগল?’ রাগে বাবলির ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে|

‘হাসব না কেন? আচ্ছা তো!’ যুগল বলল|

‘তোমার লজ্জা করে না? প্রতি বছর পাড়ার লোকরা আমাদের নিয়ে এরকম ঠাট্টা করে? কেন, আমাদের কী বাচ্চা নেই যে আমাদের বাড়িতে কার্তিক ফেলবে? আমি কি আঁটকুড়ো বাঁজা? কী মনে হয় তোমার যুগল?’

‘যাঃ ঠাট্টা হতে যাবে কেন, এরকম তো সবাই একটু বিরিয়ানি খাবে বলে করেছে!’ বলে উঠল টুলু|

‘দ্যাখ টুলু পাকামি মারবি না! তুই এ সবের কী বুঝিস? চল্লিশ বছর বয়েস হলো একটা বউ তো জোটাতে পারলি না! যুগল কান খুলে শুনে নাও, আমার দুদুটো মেয়ে আছে, আমি আর বাচ্চাও চাই না, অতএব কার্তিকের আমি ইয়ে করি! আমি কিছুতেই এবার পুজো হতে দেবো না, ব্যস! যা পারো করবে!’

যুগল আবার হেসে উঠল, ‘বাবলি তুমি কিন্তু সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাচ্ছ! কার্তিক ফার্তিক বুঝি না তুমি কষ্ট পেলে আমি জানো তো কেমন হয়ে যাই!’ বলে যুগল চোখ টিপল টুলুকে|

বাবলি সেটা দেখে ফেল, অমনি মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল ওর, ‘টুলু, এই কার্তিক ফেলার পেছনে যুগলের হাত আছে জানবি| আমি জানি ওর মনে কী আছে, আমি জানি ও কী চায়|’

টুলু বলল, ‘ফালতু কেসটাকে মাইন্ডে নিচ্ছিস তুই! বরং তোরা ওপরে গিয়ে কার্তিক রাখবি কী ফেলবি সেই ডিসিশনটা নিয়ে ফ্যাল, এসব কথা রাস্তার মধ্যে বলবি কেন?’

‘না, কোন কথা নেই, আগে দূর করো কার্তিক!’ জেদ পেয়ে বসেছে বাবলিকে|

যুগল কার্তিকগুলোকে দেখতে দেখতে বলল, ‘যাঃ, এদের ফেলা যায়? দ্যাখো এই কার্তিকটার কোলে আবার বাচ্চা কার্তিক রয়েছে একটা, ফেলতে মায়া লাগে না?’

বাবলির চোখ জলে ভরে উঠল, আর একটা কথাও না বলে ও হনহন করে ভেতরে চলে গেল|

টুলু বলল, ‘কী হলো ও কাঁদছে কেন?’

‘বহুকাল কাঁদে না তো, তাই একটু ঝালিয়ে নিচ্ছে অভ্যেসটা!’ বলল যুগল|

‘অদ্ভুত!’ টুলু বলল, ‘তোদের সবটাই অদ্ভুত!’

যুগল কাঁধ ঝাঁকাল, ‘বুঝবি না, তুই বুঝবি না, মেয়েদের এই রহস্যময় হাসি কান্না বোঝা তোর কম্ম নয়! চিঠি তো তোকে কোনোদিনও কাছেই ঘেঁষতে দিল না! একটা মেয়ের সঙ্গে চব্বিশ ঘন্টা থাকার কনসিকোয়েন্সগুলো তুই কী বুঝবি? থাকলেই বোঝা যায় এরা চাঁদ, ফুল, পাখি টাখির থেকে কোথায় আলাদা! চাঁদ মানে গেরণ লাগা চাঁদ, ফুল মানে চোখে সর্ষে ফুল! ভাবিস না এসব উত্তম দাসকে কোট করছি, এসব আমার নিজস্ব এক্সপিরিয়েন্স! বুঝলি?’

টুলু মাথা নাড়তে লাগল, ঘন কোঁকড়ানো চুলে আঙুল চালিয়ে যুগল পিঠ চাপড়ে দিল তার, ‘চিঠির কথা বললেই তোর কাঁধ দুটো কেমন ঝুলে যায় লক্ষ্য করেছি আমি, যাই হোক কার্তিক যখন এসেই পড়েছে তখন কাল সন্ধেটা ফাঁকা রাখিস টুলু!’

‘পুজো হবে?’ চোখ বড় বড় করে বলল টুলু|

‘কেন হবে না? বাবলিকে বোঝাতে হবে যে কার্তিক ফেলে দিলে দিয়া, টিয়ার অকল্যাণ হবে! ব্যস! আর কী, প্রবলেম আপনা আপনি সলভ হয়ে যাবে তখন!’

পরেরদিন সন্ধেবেলা যোগেশ ভবনে ঢুকে টুলু দেখল গ্যারেজের একটা পাশে রঙিন সামিয়ানা টাঙিয়ে কার্তিকত্রয়কে অর্চনা করা হয়ে গেছে যুগলদের| দু পাশে দুটো ঝিনচ্যাক আলো জ্বলছে নিভছে, দুপাশের দুটো বক্স থেকে হিমেশ রেশমিয়ার নাঁকি গলার গান বেরোচ্ছে| সবই আছে শুধু সেখানে উপস্থিত ব্যক্তি বলতে যুগলদের ড্রাইভার বিহারীকাকা, জগন্নাথদা আর ফাইফরমাশ খাটার ছেলে পল্টু! যুগলরা কেউ নেই! তাকে দেখেই বিহারীকাকা বলল, ‘উপরে চলে যাও টুলুবাবু, সব উপর হ্যায়! ছাত পে!’

টুলু দেখল বাচ্চা কার্তিকটা কেউ একটা বাবা স্যুট পরিয়ে দিয়েছে হলুদ রং-এর! এ নির্ঘাত যুগলের কান্ড! হাসি চাপতে চাপতে ছাদে উঠে গেল সে| ছাদে ভিড়ে ভিড়াক্কার| কে নেই সেখানে? তাদের গ্রুপটার সবাই আছে মোটামুটি, সঙ্গে বাচ্চাদের গ্রুপেরও কেউ কেউ রয়েছে| কালকের অভিজিত ছেলেটাকেও দেখতে পেল সে| তার বন্ধুর দলটা, পূর্ণেন্দু, বিতান, বাপি, সজল, কানু, সুখবীর, সবাই কোণের একটা টেবিলে গোল হয়ে বসছে| যুগলও রয়েছে সেখানে| সবার গ্লাসে গ্লাসে পানীয় ঢালতে ব্যস্ত ও| বিতান, পূর্ণেন্দু, সবার বউ বাচ্চারাও রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে| বাবলির মেয়েদুটো খুব হুটোপাটি করে খেলছে সবার সঙ্গে| তাকে দেখেই হেলেদুলে এগিয়ে এল বাবলি| খুব সেজেছে বাবলি, লাল কালো ঘটচোলা পড়েছে, গলা থেকে ঝুলছে মোটা মফ চেন, কানে বড় ঝোলা দুল| এই মুহূর্তে বাবলিকে দেখাচ্ছে সম্পূর্ণ অভিযোগহীন আর সুখী| অলরেডি গলায় কিছুটা ঢালা হয়ে গেছে বাবলির,  বোঝা যায়, হাঁটার ভঙ্গিটাই বলে দিচ্ছে সে কথা| তার কাছে এসে বাবলি আচমকা ব্লাউজে হাত ঢুকিয়ে দিল, তারপর ‘এই নে টুলু’, বলে বের করে আনল এক টুকরো ভাঁজ করা কাগজ| ‘পড়ে দ্যাখ’ বলে টুলুর হাতে দিল কাগজটা| বাবলি ব্লাউজে হাত ঢুকিয়ে দিতে একটু নার্ভাস হয়ে গেছিল টুলু, সে কাগজটা হাতে নিয়ে পিটপিট করতে লাগল| বাবলি বলল, ‘ কী রে পড়ে দ্যাখ!’ কাগজটা তখনও গরম| টুলুর অস্বস্তি হলো কেমন যেন! আসলে সেই কোন ছোট্ট থেকে টুলুকে রাখি পরায় বাবলি, বাবলিকে কোনদিন অন্য চোখে তাকিয়ে দেখার কথা মনেও আসেনি তার, তবু যতই হোক বাবলি একটা মেয়ে তো বটে, ও ভাবে বুকে হাত ঢুকিয়ে দিলে, টুলু একটা পুরুষ মানুষ, তার ওপর অবিবাহিত, জীবনে কোন মেয়েকে ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখেনি, – একটা ছ্যাঁকা খাওয়া অনুভূতি তো হতেই পারে! টুলু কাগজটা খুলেই ফেলল যা হোক, তাতে লেখা, ‘মা, মা আমাকে কোলে নাও!’

বাবলিই বলে দিল তাকে, ‘এটা কার্তিকের গায়ে পিন দিয়ে সাঁটা ছিল| দ্যাখ তো হাতের লেখাটা কোন হারামজাদার?’

সে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল এটা জেনেই যে হাতের লেখাটা কার তা খুঁজে বের করা তার পক্ষে দুঃসাধ্য! বাবলি তার এক্সপার্টস কমেন্টের জন্য অপেক্ষা করল না, বলল, ‘যুগল চিনতে পেরেছে, কিন্তু বলছে না! তুই আমার একটা কাজ করে দিবি রে? একটু পরেই যুগলের বেশ নেশা হয়ে যাবে, তখন ওকে খেলিয়ে কথাটা বের করে নিতে পারবি সোনা?’

সে বলল, ‘কিন্তু এটা জানার এত কি দরকার পড়ল তর, বাবলি, তাই বুঝতে পারছি না আমি! প্রতি বছরই কারও না কারও বাড়িতে কার্তিক পড়ে, আমরাই তো একবার তোর মামাবাড়িতে ফেলেছিলাম একটা কেলে কার্তিক! তোর মনে নেই?’

‘কেন মাথা ঘামাচ্ছি সেটা তোকে পরে বলব! তুই কিন্তু কথাটা কাউকে বলবি না! আমার এই নিয়ে হেব্বি টেনশান আছে!’

বাবলি চলে গেল অন্যদিকে, টুলু চিন্তায় পড়ে গেল বেশ, সত্যি বাবলির যে মাথায় কি চলছে সব সময়! যেটাকে ডিফেন্ড করে এত চেঁচাচ্ছিল কাল, আজ আবার তাকেই সেলিব্রেট করতে এত সেজেছে, অথচ মনে একটা অশান্তি রয়েছে যে তাও বোঝা যায়! টুলুর নিজের মাথায় জট পড়ে যাবে এদের পাল্লায় পড়ে| বাবলিটা আগে এরকম ছিল না! খুব মুখচোরা আর লাজুক প্রকৃতির ছিল ছোটবেলায়| পরে কলেজে উঠে ওর মধ্যে খানিকটা ফ্রিনেস এল| অবশ্য অল্প কথা বললেও বাবলি হাসত খুব| সেই সময়ই যুগলের সঙ্গে প্রেম হলো বাবলির| টুলুর মনে আছে যুগল তাকে বলেছিল বাবলির তখন মনের জোর বলে কিছুই ছিল না| যুগল বাবলিকে গাড়িতে তুললে বাবলি গাড়িতে উঠে চুপ করে বসে থাকত| দরজাটা টেনে বন্ধ করার সাহসটুকু পর্যন্ত ছিল না ওর! যুগল বলত, ‘বাবলি দরজাটা বন্ধ করো!’ বাবলি কাঁদো কাঁদো হয়ে যেত তাতে, বলত, ‘আমি পারবো না যুগল, বন্ধ করতে গিয়ে দরজাটা যদি খারাপ হয়ে যায়?’ সেই বাবলিই দু-তিন বছর আগে বি টি রোডে গাড়ি চালাতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করেও বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে আহতকে নিয়ে সোজা আর জি কর! যাকে গুঁতো মেরেছিল এখন আবার তার বউয়ের সঙ্গে বাবলির খুব ভাব! আগে বাবলি গাড়ির হর্ন না বলে বলত, ‘জোরে বেল বাজাও যুগল, লোকটা সরছে না!’ আগে বাবলি রাস্তায় হেঁটে জল তেষ্টা পেলে যুগলকে বলত, ‘একটু ড্রিঙ্কস না পেলে এবার মরে যাবো!’ যুগল তো প্রথম দিন শুনে ভিমরি খেয়ে পড়ে আর কি!

বাবলির এই পরিবর্তনই স্বাভাবিক ছিল হয়ত| কিন্তু এত কিছু স্বত্ত্বেও বাবলির আচরণের মধ্যে কোথাও একটা অসুবিধাও টের পেয়েছে টুলু| যেন একটা ব্যালেন্সের অভাব| একটা স্থিরতার অভাব| বারবার কারণে অকারণে বাবলিকে বার্স্ট করতে দেখেছে সে| বাবলির জীবনচর্চার মধ্যে রয়েছে এরকম প্রচুর অসংলগ্নতা| কি যে করবে কখন তার ঠিক নেই কোন| এই কালী পুজোর দিন সবাইকে ফোন করে ডাকাডাকি করে জড়ো করল ছাদে, কি না ‘দারুণ সব বাজি কিনেছি, একসঙ্গে ফাটাব’, অথচ সেদিনই সবাই জড়ো হওয়ার পর বাবলির মুখ কি গম্ভীর, কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বলে দিল, ‘পরেরবার থেকে কিন্তু যে যার বাজি নিয়ে আসবে!’ মোহনা তো সেদিন আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না, চলে গেল মেয়েকে নিয়ে| এখন তারা সবাই একসঙ্গে বড় হয়েছে, বাবলির এমন আচরণ তারা মেনে নিলেও বাইরে থেকে আসা বউরা কি সেটা পছন্দ করতে পারে? এ কারণে বেড়াতে টেড়াতে গেলে লাগেও খুব|

বাবলি একটা সোনালী তরলপূর্ণ গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে এখন আর বাপির বউয়ের কাঁধ ধরে কিছু একটা বলছে, গ্লাসে চুমুক দেওয়ার মধ্যে, বাপির বউকে কিছু বলার মধ্যেও একটা অতিরিক্ত প্রচেষ্টা রয়েছে বাবলির|

সে এগিয়ে এল যুগলদের দিকে! যুগল বলল, ‘আয় টুলু এত দেরী করলি কেন?’

টুলু বসতে বসতে বলল, ‘এই তো ফিরলাম কাজ শেষ করে!’

বিতান বলল, ‘ভাগ শালা কর্মবীর!’

টুলু বিতানকে কিছু বলার আগেই যুগল বলল, ‘কার্তিক কাল পূর্নেন্দুদের বাড়িতেও পড়েছে টুলু!’

মওকা পেয়ে হেসে উঠল সে, ‘কোন বছরই বাদ যাচ্ছে না! পূর্ণেন্দু হাল ছেড়ে দিলে কি হবে, ওরা হাল ছাড়েনি গুরু!’

যুগল পূর্নেন্দুকে বলল, ‘টুলুকে কবিতাটা পড়তে দে!’

পূর্ণেন্দু পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দিল টুলুর হাতে, একই পাতার থেকে ছিঁড়ে লেখা, টুলু পড়তে লাগল,

পূর্ণ বাবা, তিথি মা

শীতে আমার কাঁপছে গা

তোমরা কিন্তু ভীষণ ভালো

এবার আমায় ঘরে তোলো!

টুলু হাসতেই যুগলও হেসে উঠল হে, হে করে, ভুঁড়ি কাঁপিয়ে| পূর্ণেন্দু ছাড়া সবাই যোগ দিল সেই হাসিতে| পূর্ণেন্দু সবার মুখ দেখল চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, তারপর বলল, ‘শালা তিথিকে বলে দেব তোরা হেসেছিস!’ অমনি জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো থেমে গেল সবাই| তিথি খুব শান্তশিষ্ট মেয়ে, একটুতেই কেঁদে ফ্যালে, ওর মনে কেউ কষ্ট দিতে চায় না| বেচারি বাচ্চা চায়, কিন্তু বাচ্চা হচ্ছে না কিছুতেই! দশ বছর হয়ে গেল| তিথির ইচ্ছে থাকলে কি হবে, পূর্নেন্দুরই নাকি কোন গা নেই এ ব্যাপারে| থাকবে কি করে, পূর্নেন্দুর অন্য ব্যস্ততা আছে না কত?

বিতান বলল, ‘ওসব ছাড়, পূর্ণেন্দু, তুই চন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে কথা বলেছিস?’

‘বলেছিলাম, কিন্তু চন্দ্রবিন্দু, ভূমি, ফুমি এ বছর আর হবে না, ওদের ডেট নেই! তোদের আরো আগে থেকে প্ল্যান করা উচিত ছিল!’

বিতান চটে গেল, ‘তোদের বলতে কী বলতে চাইছিস তুই? তুই আমাদের থেকে বাদ গেলি কিসে, সুযোগ মতো কথা বলিস? বহুত আগে কথা হয়েছিল এবার ফাংশানে চন্দ্রবিন্দু আসবে, তুই নিজে আগ বাড়িয়ে বললি ওরা তোর চেনা কার খুব ক্লোজ, সে রিকোয়েস্ট করলেই চন্দ্রবিন্দু চলে আসবে, বেশি টাকাও নেবে না!’

‘বলেছিলাম তো কী হয়েছে? তুই জানিস না, ঠাকুমাকে নিয়ে গেল মাসটা কি যমে মানুষে টানাটানি গেল আমার? আমার কিছু মাথায় ছিল না বস!’ হাত পা নেড়ে বলে উঠল পূর্ণেন্দু|

বাপি বলল, ‘আবার যমে মানুষে টানাটানিতে তুই গেলি কেন, পূর্ণেন্দু?’

‘ফালতু কথা বলবি না বাপি!’ চটে গেল পূর্ণেন্দু| ‘আমার ঠাকুমাকে আমি একশো বছর বাঁচিয়ে রাখব রে শালা, ডায়মন্ড জুবিলি করব, তোকে তখন নেমতন্ন করব না, একটা চিঠি যাবে তোর বাড়িতে, মিস্টার এন্ড মিসেস বাপি দে, অমুক দিনে যেন আপনাদের ত্রিসীমানায় না দেখা যায়, পত্র দ্বারা ফুটিয়ে দেওয়ার জন্য ত্রুটি স্বীকার করছি!’

‘সেটা কথা নয়, সেটা কথা নয়’ বলে উঠল সুখবীর, ‘কথা হচ্ছিল ফাংশানে আর্টিস্ট নামানো নিয়ে, তোরা ঝামেলা না করে কনস্ট্রাকটিভ আলোচনা করতে পারিস না?’

যুগল ঝগড়াঝাঁটি খুব পছন্দ করে, বলল, ‘ঝামেলাটা শেষ পাতে, ঝামেলাটা শেষ পাতে! তবে আমার মনে হয় নাটক ফাটক, বসে আঁকা, কম্বল দান – এগুলো এখন হয়ে যাক, আর ফাস্ট জানুয়ারি ফাংশানটা হোক| তাহলে হাতে মাস দেড়েক সময় থাকছে, আটিস্ট ফাটিস্ট যা দরকার ঠিক জোগাড় হয়ে যাবে!’

কানু মুখ গোমড়া করে বলল, ‘এ বছর তাহলে সে অর্থে কোন ফাংশানই হলো না?’

‘কোন অর্থে বে? পারিস ঘচু, পারিস বটে, একত্রিশে ডিসেম্বর হলে চলবে তোর, সত্য সেলুকাস কী বিচিত্র এই চুলকানি!’

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.