নিভাননীর উপত্যকা (পর্ব ৫)

বিতান বলল, ‘ফাজলামি ছাড়, পূর্ণেন্দু যা ঝোলাবার ঝুলিয়েছে, আমি কিন্তু সামনের সপ্তাহে এক মাসের জন্য ট্যুরে চলে যাচ্ছি, বাজেট ফাজেট নিয়ে যা কথা বলার আজ কাল করে বলে নিলে ভালো হয় আমার! এই আলোচনাগুলো পুজো থেকে পেন্ডিং রয়েছে, সবাই মস্তি করতে চায়, টাকা পয়সা নিয়ে কথা বলার আগ্রহ কারও নেই!’

গদা বলল, ‘এ বছর টাকা পয়সার অবস্থা খুব টাইট!’

হঠাত্ বাপি লাফ দিয়ে উঠলো, ‘বেড়ানো? এ বছর বেড়ানো হবে না? কেউ তোরা কিছু বলছিস না যে?’

যুগল বলল, ‘বেড়ানো ঠিক হয়ে গেছে!’

‘কোথায় কোথায়, আমি কিছুই জানি না! যাঃ শালা!’

‘জানবি, জানবি, তোকে তো জানাতেই হবে, নইলে বুকিং ফুকিং করবে কে? এবার অরুণাচল যাওয়া ঠিক হয়েছে!’

‘কবে? কতদিনের জন্য?’

‘জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে, দিন দশ বারোর জন্য, ওই সময় অরুণাচল বরফে ঢাকা! হেভি সিন! নিসর্গ, ফিসর্গ ছড়াছড়ি!’

টুলু এতক্ষণ সব শুনছিল, এবার বলল, ‘আমার কিন্তু এবার আর বেড়াতে যাওয়া হবে না! আমাকে তোরা প্ল্যান থেকে বাদ দিয়ে এগোস!’

বিতান বাঁকা হাসি দিল একটা. ‘কেন তুই চিঠিকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছিস নাকি? তা আমাদের সঙ্গেই চল, তোদের আলাদা রুম ছেড়ে দেবো | লজ্জা কী?’

‘ভাট বকিস না তো, আর যেন কথা নেই|’ বলল সে |

‘দ্যাখ টুলু, তোর গা থেকে একটা মেয়েলি পারফিউমের গন্ধ বেরোচ্ছে! বল ব্যাটা চিঠি তোকে আজ কবার জড়িয়ে ধরে বুক ঠেকিয়েছে গায়ে? বল শালা!’

টুলু দেখল যুগল, বিতান, পূর্ণেন্দু সবারই ভালো মতো নেশা হয়ে গেছে, এখন কথা বাড়িয়ে লাভ নেই| ‘তোরা যা নিয়ে কথা বলছিলি সেটা আগে সেরে নে, তারপর চিঠি, আমি তো রইলামই!’

‘শোন,শোন, আই অ্যাম টু ওল্ড টু বি কট উইথ চ্যাপস, ওকে?’ ঠোঁট উল্টে বলল বিতান |’ আমাকে টুপি পরাস না! আজ বিকেলেও আমি তোকে আর চিঠিকে পার্ক স্ট্রিটে হাঁটতে দেখেছি | তুই এতক্ষণ ওর সঙ্গে ফস্টি নস্টি করছিলিস, সেই জন্যই তর আসতে এত দেরী হলো!’

টুলু রাগ হওয়াটা আটকাতে পারল না, ‘মুখ সামলে কথা বল বিতান!’ চিত্কার করে উঠল|

টুলুকে কেউ সহজে রাগতে দেখে না| মোহনা, তিথি, বাবলি যে যেখানে ছিল তার চেঁচানি শুনে এসে এই টেবিলে জড়ো হলো| মোহনা বলল, ‘কী হলো, এরকম ক্ষেপে গেলে কেন?’

সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ছাড়, আমি চললাম, আমার কাজ আছে!’

যুগল টলতে টলতে টুলুর কাঁধ চেপে ধরল, ‘বোস, বোস, টুলু কিচাইন করিস না!’

টুলু বলল, ‘আমি কিচাইন করছি? আমাকে বলে এক রকম, চিঠির সম্পর্কে এমন সব মন্তব্য করার কী অধিকার আছে ওর?’

‘বেশ করেছি মন্তব্য করেছি!’ হুঙ্কার দিলো বিতান, ‘তোর লজ্জা করে না? সাত সাত বার ল্যাং খেয়েছিস মেয়েটার কাছে, তাও ওর পায়ে পায়ে ঘুরছিস? চল্লিশ বছরের বুড়ো শালা, এখনও নিকার বোকার পড়ে লাল ফেলতে ফেলতে চিঠির কলেজের সামনে হত্যে দিচ্ছিস, তুই একটা —ছাড়া কী? তোকে আমি যা খুশি বলব, যা খুশি করে নে!’

বাপির বউ রাখি সশব্দে মুখে হাত ছাপা দিলো, ‘ওমা, টুলুর বয়েস চল্লিশ? কিন্তু ওকে কই দেখে তো বত্রিশের বেশি মনেই হয় না!’

কথাটা খয়ে গেল বাপি, ভুরু তুলে বলল, ‘তার মানে কী? আমাকে দেখে বুঝি চল্লিশ মনে হয়?’

‘বাবা, তোমাকে কখনো কখনো পঞ্চাশও মনে হয় বাপি, যখন কোঁত পেড়ে ঘুমোও, তখন দেখে মনে হয় বুড়ো গাধা একটা!’ রাখিরও যথেষ্ট নেশা হয়েছে বোঝা যাচ্ছে!

‘মামারা তো আমার মাকে বলেই ছিল, শেষে রাখিকে একটা বুড়োর গলায় ঝুলিয়ে দিলি?’

বাবলি বলল, ‘আমার কথাটা তোরা শুনবি? সংসারের দায় দায়িত্ব ঘাড়ে চাপলে মানুষ একটু বুড়োটে মেরে যায়, যেটা যুগলের হয়েছে!’

যুগল আকাশ থেকে পড়ল, লে হালুয়া, আমার আবার সংসারের দায় দায়িত্ব কী ঘাড়ে চাপল বাওয়া? বাবা মা সংসার সামলাচ্ছে, তুমি মেয়েদের সামলাচ্ছ, আমি তো দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরছি! আমাকে কোথায় বুড়ো দেখায়?’

বিতান বলল, ‘কিন্তু বাবলিকে তো তোকেই সামলাতে হয় যুগল! সেই ঝড় ঝাপটা সামলেও যে তুই এত হাসি খুশি থাকার চেষ্টা করিস সব সময়, এটাই আমাদের অ-অবাক করে দেয়!’

বাপি বলল, ‘উঁহু এ তো আঙুর ফল টক কেস! কী বাবলি?’

‘যাক তুই সময় মতো কথাটা বললি বলে তোকে ধন্যবাদ বাপি!’ বলল টুলু, ‘আজকাল তো কেউ সত্যি কথা বলে না!’

আসলে যুগলের সঙ্গে বাবলির প্রেম হওয়ার আগে, বেশ আগে, চোদ্দ পনেরো বছরের বাবলিকে দুধের ডিপোর গলিতে, দুধ আনার বাহানায় হাজির হয়ে, দুধের লাইনে দাঁড়িয়েই প্রোপোজ করেছিল বিতান | তখন বাবলি ভীষণ ভীতু টাইপের ছিল, কেউ সাইকেল চালাতে চালাতে ওর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বেশি বেল বাজালেও বেচারি ভ্যাবাচাকা খেয়ে যেত! সেদিনও বাবলি এতই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছিল যে ওর হাত থেকে দুধের বোতল পড়ে ভেঙে যায়!আর দেন এন দেয়ার ফাইন হয়ে যায় এক টাকা | এই কারণে বাবলি ওর মাইমার কাছে বকাও খায় নাকি! আর তাতে বিতান এত ঘাবড়ে যায় যে দুদিন আর বাড়ির বাইরে পা দেয়নি | ও ভেবেছিল বাবলির মাইমা ওর বাড়িতে এসে দুধের বোতল ভেঙে যাওয়া বিষয়ে একটা বিহিত দাবি করবে | যুগলই শেষে বিতানকে ভরসা জোগায় যে ও আছে, প্রয়োজনে বাবলির মাইমাকে ওই ট্যাকল করে নিতে পারবে!

টুলুর কথায় বিতান টুলুর দিকে কটমট করে তাকাল, যুগল বলল, ‘শোন বিতান, ব্যাপারটা আমি খুব ভালো করে জানি! পার্ক স্ট্রিটে ঘোরা টোরা ঠিক আছে কিন্তু চিঠি টুলুকে তার বেশি কিছু করতে দেওয়ার লোক নয়! কিছু একটা কারণ আছে, চিঠি আজকাল টুলুকে একটু বেশি সময় অ্যালট করছে! তাই এই সময় টুলু চিঠিকে ছেড়ে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতে পারছে না! তবে ফেব্রুয়ারি মাস আসতে আসতে সিচুয়েশন চেঞ্জ হয়ে যাবে আশা করা যায়, বাপি বুকিং-টা করে রাখ, তেমন হলে ক্যান্সেল করতে কতক্ষণ?’

‘এত বছর ধরে এত মুরগি তো করলি, লাভটা কী হলো তোদের?’ বলল টুলু |

‘তুইও তো এত বছর ধরে এত ঘুরলি চিঠির পেছনে, তোরই বা কী লাভ হলো….?’ পূর্ণেন্দু বলল, ‘আমরা তো তবু বিশুদ্ধ আনন্দ সেবন করি, তুই কী পাস, অ্যাট দ্য এন্ড অফ সেভেনটিন ইয়ার্স, বল শালা ব্যালেন্স কী?’

‘আমি কী পাই তা তোকে বললে তুই বুঝবি নাকি পূর্ণেন্দু? তোর প্রেমের কনসেপ্ট আমাদের সবার জানা আছে| আমার মুখ খোলাস না! আনন্দ পাচ্ছিস পা, আমার রাস্তায় আসিস না! আমাকে আমার মতো থাকতে দে!’

‘তোর রাস্তায় কই আসছি বস, কবে থেকে তো সাইড দিয়ে যাচ্ছি! চিঠি তো আমাকেও ঝারি মারত, শুধু তোর কথা ভেবে আমি ওর দিকে তাকাইনি!’

‘কেন, আমি যে চিঠির সঙ্গে দেখা করি, ওর বাড়িতে যাই, এ সব বিতান আমার মাকে, বোনকে লাগিয়েছে| কোন মানে হয়? আমি কি কচি খোকা?’

এ কথায় সবাই চুপ করে গেল, একটু পড়ে গম্ভীর গলায় মোহনা বলল, ‘টুলু, বিতান তোমাকে খুব ভালোবাসে বলেই সাবধান করতে যায়| চিঠি তোমার সঙ্গে যা করেছে সেটা তোমার বন্ধুদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব বলো?’

টুলু মোহনার দিকে তাকাল না, ‘আমি বলছি যে আমি ঠিক আছি, আমাকে নিয়ে না ভাবলেও চলবে তোমাদের!’

‘ঠিক আছি বললেই হয় না টুলু,’ বাবলি বলল, ‘কাকু, কাকিমার কথাটা ভাব, এখন তুই দাঁড়িয়ে গেছিস, এখন ওঁরা তোর বিয়ে দিতে চান, চিঠিকে তো কেউ মেনে নেবে না!’

টুলু মাথায় হাত দিল, ‘তোদের না মাথা খারাপ হয়েছে, মেনে নেওয়ার কথা আসছে কেন? তুই ভাবছিস চিঠি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে? হলে মা বাবা কোন প্রবলেম হতো না!’

‘কিন্তু টুলু, কাকিমা তোর বিয়ের কথা বললেই তুই বলছিস মেয়ে পছন্দ করা আছে, কোন মেয়ে জানতে চাইলে বলছিস মেয়ে তোমার দেখা, এদিকে কথা বলতে চাইলে এড়িয়ে যাচ্ছিস! তুই নিজেই ভেবে দ্যাখ সব জিনিসটা কোন দিকে ইঙ্গিত করে?’

সে বলল, ‘হ্যাঁ, চিঠিই আমার পছন্দের সেই মেয়ে, এ কথা লুকিয়ে লাভ নেই, তবে তোরা চিন্তা করিস না, আমি চিঠিকে পছন্দ করলেও ও আমাকে বন্ধুর বেশি কোন জায়গা দিতে রাজি নয়!’

‘এই বন্ধু শব্দটার না আমি একদিন পেছন মেরে দেব শালা!’ বলে উঠল বাপি, ‘যত ধান্দাবাজ ছেলেমেয়েগুলোর আজকাল এই এক বুলি, আমরা বন্ধু, পারলে নন্দনের রেলিং-এ শুয়ে পড়ছি, কিন্তু আমরা বন্ধু! একটা সেল্ফ সেন্টারড, ডেসপারেট মেয়ে, হার্টলেস, চোদ্দ বছর বয়েসে এক সঙ্গে পাড়ার তিনটে ছেলের সঙ্গে প্রেম করত, তার জাস্ট রূপে মজে আজ এত বছর ফেউ ফেউ করছিস কেন রে বে? এখন তোর ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গেছে, ভালো রোজগার পাতি করছিস, তাও তোর এতটুকু আত্মবিশ্বাস আসছে না?’

টুলু এবার পা বাড়াল. ‘আমাকে যেতে দে রে ভাই, তোদের জ্ঞান শোনার জন্য আমি এখানে আসিনি!’ চিঠির সম্পর্কে এত খারাপ কথা শোনার ক্ষমতা ঈশ্বর তাকে দেননি!

বাবলির এক মুহূর্ত গ্লাস ফাঁকা হয় না, তা স্বত্ত্বেও ও যথেষ্ট স্টেডি থাকে, বাবলি বলল, ‘অ্যাই, না খেয়ে যাবি মানে, প্রণ পাকোড়া আসছে! কবিরাজি কাটলেট, মোগলাই পরোটা রয়েছে|’

বলে তার হাত চেপে ধরল বাবলি| কিন্তু আটকাতে পারল না, হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে তরতরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল সে|

যুগলদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েক পা হন হন করে হাঁটল টুলু| এক সময় তার মনে হলো, ‘কী ব্যাপার এত জোরে হাঁটছি কেন?’ তখন নিজের গতি কমিয়ে ফেলল সে| ধীরে সুস্থে গিয়ে বসল বটুক জ্যাঠাদের রকে | এই রকটা হলো ‘এ’ ক্লাস রক| এই রকটায় বসলে রায় মেডিকেলের মোড় থেকে শুরু করে ঘোষ বাগান, হলধর বসু তিনদিক একসঙ্গে দেখা যায়| এ পাড়ার ছোট ছোট ছেলেরা স্বপ্ন দেখে কবে তারা এই রকটার দখল নিতে পারবে| টুলু বসতেই একে একে বাবলি, রাখি, পূর্ণেন্দু আর সজলের ফোন এল তার মোবাইলে, কিন্তু সে একটা ফোনও ধরল না| বরং একটু পরে সে ফোন করল চিঠিকে| কয়েকবার বাজতে ফোন ধরল চিঠি, ‘বলো টুলু!’

টুলুর ভেতরের খাঁচাটা ছটফট করে উঠল চিঠির গলার আওয়াজ পেয়ে| সে ভেবেছিল এক্ষুনি যা কথা হলো যুগলদের বাড়িতে চিঠিকে তার সবটা বলবে, কিন্তু চিঠির গলার স্বরটা এত খসখসে আর শুকনো ঠেকল তার কানে যে সে কিছুই বলতে পারল না, শুধু চুপ করে ধরে রইল ফোনটা!

চিঠি দুবার হ্যালো, হ্যালো, দুবার টুলু, টুলু বলে বিরক্ত হয়ে গেল, বলল, ‘যদি কিছু বলার নাই থাকে তাহলে অকারণে ফোন করো কেন?’ বলে ফোন কেটে দিল চিঠি |

বুক ফাটিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল টুলু! সন্ধে ছটারও পর অব্দি আজ একসঙ্গে ছিল তারা! বিতান ঠিকই দেখেছে| ক্রমাগত দু আড়াই ঘন্টা হেঁটেছে, গল্প করেছে, খেয়েছে, কেনাকাটা করেছে চিঠি টার সঙ্গে! কলেজ থেকে পার্ক স্ট্রিট চলে এসেছিল ও, চাঁদনি চক থেকে পৌঁছে গেছিল টুলুও| অথচ তার মনে যে ভাবে লেপ্টে রয়েছে চিঠির সান্নিধ্যের স্মৃতি চিঠির গলায় তার রেশ মাত্রও নেই! এবং চিঠি প্রতিবার ঠিক এটাই করে, যেদিন চিঠির দু ঘন্টা আগে মনে হয় চিঠির জীবনে আজও একটা ভূমিকা ঠিকই রয়ে গেছে তার, সেদিনই দু ঘন্টার ব্যবধানে চিঠি এমনভাবে কথা বলে টুলুর সঙ্গে যেন মনে হবে কে টুলু তাই মনে করতে পারছে না ও! প্রতিবারই চিঠির সঙ্গে অমূল্য কিছুটা সময় কাটানোর ঘোর টুলুর এই ভাবেই ভেঙেছে! যখন টুলু ফোন করে বলতে চেয়েছে, ‘চিঠি বিকেলের আলোয় তোমাকে আজ ঠিক সেই আঠেরো উনিশ বছর আগের দু বেণী বাঁধা মেয়েটার মতোই দেখাচ্ছিল…,’ তখন ‘হ্যাঁ, কী ব্যাপার?’ চিঠির এই রুক্ষ কর্কশ জিজ্ঞাসা তার সব কিছু কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে তাকে| আর টুলু বুঝতে পারছে প্রতিদিন কোন না কোন আঘাত এসে ভেঙেচুরে দিয়ে যাচ্ছে তার আত্মাকে| আর যতই তাকে বত্রিশ দেখাক, সে বোঝে এই বয়েসে মনের ফাটলে শরীরও নষ্ট হয়ে যায়| চিঠির সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার পর তার খাওয়া নষ্ট হয়ে গেছে, ঘুম নষ্ট হয়ে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে কাজের মন! সবে ব্যবসাটা দাঁড় করিয়েছিল সে| এখন চিঠি ডাকলে যতটা, না ডাকলেও মন তাকে সরিয়ে রাখছে কাজকর্ম থেকে!

বিতান, বাপিরা এসব জানে, জানে চিঠির কাছে প্রথমবার পাওয়া আঘাতে পড়াশোনা নষ্ট হয়ে গেছিল তার| বাবার ইচ্ছে ছিল টুলু অঙ্কে এম এস সি করবে! কিন্তু কোনমতে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার থেকে এক পাও বেশি এগোতে পারেনি সে এ জীবনে আর! ফেকলুদের মতো এই পাড়াটার এ রকে ও রকে বসে বসে সময় কাটিয়ে দিয়েছে| ফুটবল খেলতে এত ভালোবাসত টুলু ছোট থেকে, এরপর তার ফুটবল খেলার নেশাটাও কেটে যায়!

বটুক জ্যাঠাদের রক থেকে উঠে পড়ে মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করল টুলু| মাঠেও কার্তিক পুজো হয়েছে| সেই মন্ডপেই নামিয়ে দিয়ে গেছে পূর্ণেন্দু দরজায় পড়া কার্তিক| এগারোটা বাজে| মাঠে আজ কেউ নেই| শুধু জ্বলছে কার্তিক এর জন্য বানানো ছোট্ট মন্ডপের টুনি বাল্বগুলো| সে মাঠের মাঝখানে হওয়া মন্ডপটাকে পার করে এক কোণের শিব মন্দিরের চাতালে গিয়ে বসলো| মন্দিরটা বেশি প্রাচীন না হলেও ষাট বছর অতিক্রান্ত| কিন্তু স্বজন সংঘ ক্লাবের রক্ষনাবেক্ষণের দৌলতে এখন ঝকঝক করছে, সারিয়ে রঙ করে, রেলিং দিয়ে ঘিরে দেওয়ায় দেখায় অত্যন্ত সুন্দর! যুগলদের মার্বেল পাথরের ব্যবসা আছে, রাজস্থান থেকে পাথর আনায় যুগলরা, এই জন্য ছটা ট্রাকও আছে ওদের| যুগল নিজের খরচে মন্দিরের ভেতরে, বাইরে, সিঁড়িতে, চাতালে, সব জায়গায় মার্বেল বসিয়ে দিয়েছে বছর কয়েক আগে| এখন স্বজন সংঘ ক্লাবটার দায়িত্ব তুলুদের ব্যাচটারই হাতে| আগে যারা ক্লাব চালাত দুর্গাপুজো আর হইহল্লায় ভরা একটা ফাংশান ছাড়া আর কোন কিছু করার রুচি ছিল না তাদের| উল্টে ক্লাবের টাকায় বেশ কিছুদিন মদের খরচটা উঠে যেত| হরিদাদের গ্রুপটা সন্ধে গভীর হলেই এই চাতালে জড়ো হতো একে একে| খোলা হতো বোতল| মাঝরাত অব্দি কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে বাজত মুকেশ রফির গান| তুলুরা এসব বন্ধ করেছে, এখন মন্দিরের মাথায় সারারাত একটা লাইট জ্বলে, সেই লাইটটা মাঠ পাহারা দেয়, অন্ধকারের সুযোগে বাজে কাজ হুয়া কিছুটা ঠেকানো গেছে এতে| ক্লাবের ফান্ড ভেঙে হরিদাদের মদ খাওয়াও হয় না আর| তবে রাত বাড়লে এখনও মাঠের দখল চলে যায় হরিদাদের হাতেই| আগে ফুটবল খেলার সময় বল মাঠ পার হয়ে হলধর বসু লেনে গিয়ে পড়ে নানা বিপত্তি বাঁধাত| পথচারী আহত হওয়া, এর ওর বাড়িতে বল ঢুকে যাওয়া ছাড়াও অন্য একটা ঝামেলাকেই সবচেয়ে ভয় পেত তারা| মাঠের বাইরেই ছিল কর্পোরেশন কল, কলটার মুখ ভাঙা ছিল, জল কখনো বন্ধ হতো না| যুগলদের বাড়ি ছাড়িয়ে ব্রিজের নিচে যে বস্তি, তার লোকজন ব্যবহার করত এই কলটাকে| স্নান, কাপড় কাচা, বাসনমাজা সব করত এখানে, বিহারী মেয়ে বউদের কলকলানিতে জমজমাট হয়ে থাকত জায়গাটা ভর থেকে সন্ধে অব্দি| এমনিতে ওরা ভদ্র লোকদের এড়িয়েই চলত সাধারনত, কিন্তু নিত্য ঝামেলা বাঁধত বল পড়া নিয়ে, কখনো ওদের বুকে পিঠে, কখনো জলভর্তি কলসিতে গিয়ে লাগত বল, আর গালাগালির ফোয়ারা ছুটত অমনি| নিভাননী ঠাকুমা লাঠি হাতে তেড়ে যেত ওদের দিকে, পাড়ায় ঢোকা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিত| ওরা একমাত্র মান্য করত ঠাকুমাকে| বলত, ‘তুমার কথা শুনে নিলম বলে ঠাকমা, তুমি পাড়ার মালিক লোক আছো, নইলে ঝা ঝোর লেগেছে না, আমরা আজ ছেড়ে দিতম না, হাঁ!’

টুলুরা ক্লাবের দায়িত্ব নেওয়ার পর হলধর বসুর দিকের মাঠের রেলিং জাল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল| কিন্তু তারপর তো কর্পোরেশন থেকে মাঠের কলটাই তুলে দিল বছর তিনেক আগে| রাস্তার চেহারাটা বদলে গেল তখন থেকে| দিনভরের থইথই জল উবে গেছে কোথায়, গুলাবি, পার্বতী, নথনিরা আর এখানে জমা হয় না, গালাগালি দেয় না| টুলুরা ফুটপাথ সারিয়ে গাছ বসিয়েছে| গাছগুলোর দেখাশোনা করে বাবলির মালি, মন্দিরও ধুয়েমুছে দিয়ে যায় বাবলির কাজের লোক, মোটাসোটা গিন্নীবান্নী বাবলিকেও মাঝে মধ্যে দেখা যায় মাঠে নেমে সব কিছুর তদারকি করতে| বাবলির ভূমিকা নিয়ে সংশয়ও দেখা দেয় কখনো কখনো| পরশুদিন সকালেই তো ঘোষ বাগানের কতা ছেলেকে বাবলি মাঠ থেকে বের করে দেওয়ায় একটা ছোটখাট বিবাদের সৃষ্টি হয়েছিল আর কী! টুলুই একমাত্র পাড়ায় ছিল সে সময়| সে ব্যাপারটাকে চেপে দিয়েছে| কিন্তু রাতে বটুক জ্যাঠাদের রকে বসে কথাটা বাসি ক্ষোভসহ ঠিক উত্থাপন করল পূর্ণেন্দু তার কাছে| বলল, ‘বাবলির এই অডাসিটিটা তো ঠিক নয়| যুগল যেচে মাঠে মার্বেল বসিয়ে দিয়েছে বা লোক দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে দিচ্ছে মানে মাঠটা ওদের সম্পত্তি হয়ে যায়নি নিশ্চই? বাবলি কাউকে মাঠ ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে বলার কে?’ সে তখন বলেছিল, ‘আরে না, না, বাবলি ওদের বড় দিদির মতো কথাটা বলেছে, মাঠে কী সব খেলবে ও বাচ্চাদের নিয়ে| তার জন্য দাগ ফাগ কাটার দরকার ছিল, এর মধ্যে সম্পত্তির কোনো ব্যাপার নেই, তুই ভুল বুঝেছিস! আজকালকার বাচ্চাগুলোও বহুত চুকলিখোর, এখন বাবলিদি বলতে তোদের এত লাগল, কালই তো দিয়া টিয়ার জন্মদিনে বিনা নেমতন্নে খেতে চলে যাবি!’

পূর্ণেন্দু চটে গেছিল জোর, ‘তুই সবসময় এত বাবলির ধামা ধরিস কেন? তোর নিজস্ব বলতে কিছু নেই?’

সে বলেছিল, ‘দ্যাখ বাবলি আর উর্মি, আমার কাছে এক, আমি বাবলির দোষ দেখতে পাই না, কী করব বল? কিন্তু সে বুঝেছিল পুর্নেন্দুর কোথায় লাগে! আসলে বাচ্চাদের খেলার জন্য পূর্নেন্দুর ঠাকুরদার বাবাই দান করেছিল এই জমিটা পাড়াকে| অর্থাৎ এই মাঠটা এক সময় ওদের সম্পত্তি ছিল| শুধু মাঠটা নয়, এই এলাকার অনেকটা জমিই ওদের মালিকানায় ছিল এককালে| এমনকী এই শিব মন্দিরটাও পূর্নেন্দুর ঠাকুরদার বাবা তৈরি করতে হাত দিয়ে মারা যাওয়ার পর নিভাননী ঠাকুমা কাজটা দাঁড়িয়ে থেকে সম্পূর্ণ করায়| শিবও নিভাননী ঠাকুমার প্রতিষ্ঠা করা| ঠাকুমা নাকি একা হাতে একদিন পূর্নেন্দুদের স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তির দেখাশোনা করেছে| হয়তো যা ছিল তাকে বাড়াতে পারেনি আর, কিন্তু যেভাবে গুছিয়ে রেখেছে এত বছর তাতে পূর্ণেন্দু কেন, ওর পরের দু পুরুষও বসে খেতে পারবে! এই বছর পুজোর সময়ই তো মা তাকে ডেকে দেখালো তিথির গলায় ঝুলে থাকা একটা গিনির হার| দুর্গা বরণ করতে তিথি সেদিন এত গয়না পরে এসেছিল যে বেচারি ঢাকায় পড়ে গেছিল সোনায়! মা বলল, ‘দ্যাখ টুলু, হারটা দ্যাখ, পঞ্চম জজের আমলের গিনি সব! এক পুরুষের ধনীদের বাড়িতে এসব দেখা যায় না, বুঝলি?’

মা আসলে বাবলির ওপর খুব চটে গেছিল তখন| মা নাকি টিয়াকে আদর করে একটু সুজি মুখে দিয়ে দিয়েছিল কবে, বাবলি দেখতে পেয়ে খাবারটা মুখ থেকে বের করে মার সামনেই ফেলে দেয়| তাতেই মনে ঠেস লেগেছিল মার!’ কাকিমা, কাকিমা করে কত পাত পেতেছিস একদিন বাবলি, পাঁচ বাড়ি খেয়েই তো মানুষ হলি| এখন তোর মেয়েরা হলো বড়লোকের মেয়ে আমাদের বাড়িতে খেলে তাদের মান যাবে!’ গজগজ করতে শুনেছে টুলু মাকে| কিন্তু টুলু এতে কিছুই মনে করেনি| বাবলি স্রেফ বাচ্চাটার শরীরের কথা ভেবেই এটা করেছে যে এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত|

চলবে…..

গত পর্বের লিং – https://banglalive.com/bengali-novel-by-sangeeta-bandyopadhyay-4/

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.