ডুগডুগি (শেষ পর্ব )

595

তা কি বলল ও? আমি জানতে চাই।

একটু চুপ করে থাকেন শ্বশুরমশাই। তারপর বলেন, সে সব অনেক কথা বলল, শুনে কাজ নেই তোমার …।

তবু বলুন না, শুনি।

তোমার নাকি অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আছে।

আমি চমকে উঠি একটু। বলি, তাই না কি, কুমকুম বলেছে …।

হ্যাঁ, তুমি নাকি ফোনে ফিসফিস করে কথা বল, মাঝে মাঝেই অনেক রাত করে বাড়ি ফের, জামা কাচতে গিয়ে তোমার পকেটে না কবে সিনেমার টিকিট পেয়েছে দুটো …।

আমি তাড়াতাড়ি বলি, বিশ্বাস করুন বাবা …।

শ্বশুরমশাই আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, বিশ্বাস তো একশোবার করি বাবা, বিশ্বাস না করলে কি আর …।

আমি খুব দোটানায় পড়ে যাই। আমাকে না কুমকুমকে – কাকে বিশ্বাস করার কথা বলছেন বুঝতে পারি না। বলি, অফিসে আমাদের খুব প্রবলেম চলছে এখন, সেইজন্যেই কলিগরা ফোনটোন করে মাঝে মাঝে, ফিরতেও দেরি হয় …।

শ্বশুরমশাই বলেন, সে কি আর জানি না বাবা অবনীশ; পুরুষ মানুষের বাইরে নানা ঝামেলা থাকে; মেয়েরা কি সব বোঝে …!

শ্বশুরমশায়ের কথা শুনে শাশুড়ির মুখ একটু গম্ভীর হয়ে গেল দেখলাম। তবে আমি নিশ্চিত হলাম এঁরা আমার দলে।

/////////

ওঁরা তখনই চলে যেতে চাইছিলেন। আমি বলে কয়ে আটকে দিলাম। বাজার করলাম বেশ ক’দিন পর। শাশুড়ি-মা রান্না করলেন। ওকে দেখলাম গুটি গুটি পায়ে রান্নাঘরে যাচ্ছে। শাশুড়ি বললেন, আমার বাপু বাতের ব্যথা, হাঁটু মুড়ে বসতে পারি না, দুটো কুটনো কেটে দাও তো …।

শ্বশুরমশাই খুব হতাশার গলায় বললেন, অবনীশ কী থেকে যে কী হয়ে গেল …।

আমি বলি, সবই ভাগ্য, বুঝলেন!

সে তো একশবার, না হলে কুমকুম তো এরকম ছিল না …।

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, সে তো বটেই …

শ্বশুরমশাই একটু গলা নামিয়ে বলেন, কিন্তু পরে কী দাঁড়াবে ব্যাপারটা, ভেবে দেখেছ?

আমি আর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, কী আর ভাবব …। ভাবার তো কিছু নেই …।

একটু মাথা চুলকে শ্বশুরমশাই বললেন, এসব প্রেম-পিরিতি তো বেশিদিনের জন্যে নয় …।

আমি বলি, কী জানি …।

তারপরেই তো শ্যামল লাথি মারবে ওকে ।

মারবে কী আর! আমি বলি, ছোটবেলার ভাব ভালবাসা … ।

একটু উত্তেজিত হয়ে শ্বশুরমশাই বলেন, আমি তোমাকে লিখে দিতে পারি, বয়েস তো কম হল না, কত দেখলাম …!

আমি বলি, কী আর করা যাবে; আমার আপনার হাতে তো কিছু নেই …।

শ্বশুরমশাই বলেন, তখন কুমকুমের কী দশা হবে ভাব দেখি …?

ভেবে কী আর করব …। ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি আমি।

তোমার কাছে কী আর ঠাঁই হবে ওর?

আমি চমকে উঠি। সোজা তাকাই শ্বশুরমশাইয়ের দিকে। শ্বশুরমশাই খপাত করে আমার বাঁ হাতটা চেপে ধরেন। একটু ধরা গলায় বলেন, তোমাকে বলার মুখ আমার নেই অবনীশ; তুমি বড় ভাল ছেলে … কিন্তু নিজের সন্তান তো, তাই বড় ভাবনা হয়, আমরা আর ক’দিন … মরেও শান্তি পাব না অবনীশ …।

////////

শ্বশুরমশাই আর আমি পাশাপাশি খেতে বসলাম। শাশুড়ি মা এটা-ওটা দিচ্ছিলেন পাতে। এই টানাপড়েনের মধ্যেও রান্নাটা করেছেন চমৎকার। বিশেষ করে বেগুনের ঝালটা। কুমকুম খুব ভালবাসে বেগুনের ঝাল। খেতে খেতে মনে পড়ছিল কুমকুমের কথা। শ্বশুরমশায়ের আবার বেগুন খাওয়া নিষেধ। একটু করুন দৃষ্টিতে আমার পাতের বেগুনের ঝাল দেখে নিন্দে করছিলেন নিজের মেয়ের।

আমি বললাম, ছেড়ে দিন ওর কথা, ভাগ্যে যা আছে হবে।

সে তো তুমি ভাল মানুষ বলে বলছ অবনীশ … ছিঃ ছিঃ … আমার মেয়ে হয়ে যে অমন করবে …।

প্রসঙ্গ ঘোরাবার জন্যে আমি বলি, ও কোথায়, ওকে তো দেখছি না …?

শাশুড়ি বললেন, শুয়ে আছে ঘরে।

শ্বশুরমশাই বললেন, এই অবেলায় শুয়ে …?

শাশুড়ি বললেন, অবনীশ, বাবা তুমি একটা ডাক্তার-টাক্তার দেখাও; এ মেয়ে যে পোয়াতি …।

প্রচণ্ড এক নিস্তব্ধতা ঝপ করে লাফিয়ে পড়ল ঘাড়ে। তিনজনেই চুপ। একেবারেই চুপ। আমি শাশুড়ির মুখের দিকে একভাবে তাকিয়ে।

দুরে কোথাও ডুগডুগির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ …। অবিকল সেই ডুগডুগি। এগিয়ে আসছে একটু একটু করে। ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ …।

কী করে বুঝলেন? জিজ্ঞেস করতে গিয়ে বুঝতে পারি আমার গলার স্বর বসে গেছে।

শাশুড়ি মা যেন সামান্য হাসলেন। বললেন, এ আর না বুঝব কেন!

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ …। এগিয়ে আসছে বাঁদর নাচ।

ঠিক বলছেন?

বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ঠিকই …।

ডুগ-ডুগিওলা কখন যেন উঠোন টপকে সিঁড়ি বেয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে। খুব জোরে জোরে বাজাচ্ছে – ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ… ভানুমতীর খেল … ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ ……

(সতেরো)

ডাক্তার ভিটামিন দিয়েছে। আয়রন ট্যাবলেটও। বলেছে, সবসময় যেন হাসিখুশি থাকে; আনন্দে থাকে। ভারি কাজ একদম নয়।

সেদিন বিকেলেই ফিরে গেলেন শ্বশুর শাশুড়ি। যাবার সময় শ্বশুরমশাই হাঁপাচ্ছিলেন খুব, কাশছিলেনও। শাশুড়ি কাঁদছিলেন। বললেন, তোমাকে তো কিছু বলার নেই অবনীশ … কিন্তু কুমকুমের কপালে দুঃখ আছে ঠিক, এসব ভাবভালবাসা তো দু’দিনের।

অফিসে যাওয়া বন্ধ। রোজ সকালে ওকে নিয়ে হাঁটতে বের হই। ডাক্তার বলেছে, পরিষ্কার বাতাসে, ধীরে ধীরে হাঁটাহাঁটি করবে। ওকে পাশে নিয়ে হাঁটি; রাস্তার খানাখন্দ হাত ধরে সাবধানে পার করাই।

কানাইদা ফোন করল একদিন। কী ব্যাপার রে, তুই হারিয়ে গেলি না কি …?

হেসে বলি, ঠিক বুঝতে পারছি না।

অফিসে আসছিস না কেন?

যাব, যাব।

সে মালটার কী খবর?

আছে।

আর তোর বউ?

আছে।

সর্বনাশ! কানাইদা আঁতকে ওঠে, একসঙ্গে দুটো মেয়েছেলে নিয়ে ঘর করছিস? তুই তো গুরুদেব লোক।

আমি বলি, দুটো হবে কেন, একটাই। আরে আমারই ভুল, বুঝলে, টেনশানে মাথার ঠিক ছিল না … তার ওপর ক’দিন খাওয়া-দাওয়া না করে কুমকুমও রোগা হয়ে গিয়েছিল, চিনতে পারিনি প্রথমে …।

একটু চুপ করে থাকে কানাইদা। তারপর বলে, কোথায় ছিল তোর বউ?

ওর এক মাসতুতো বোনের বাড়ি।

ও, দেখিস বাবা। কানাইদা বলে, অফিসে আসবি কবে?

যাব, যাব, দু-চার দিনের মধ্যেই যাব।

কানাইদা ওর দুঃখের কথা বলে। শিখা নাকি ইদানিং গণ্ডগোল করছে, সুযোগ পেলেই অন্য কাস্টমার বসাচ্ছে। শিখার মেয়েকে স্পাইয়িং-এর কাজে লাগিয়েছে কানাইদা। খেলনা, চকলেট দিয়ে হাত করেছে তাকে।

কানাইদা বলে, কত আর আগলে রাখব; আমারও তো অফিস-টফিস আছে; মেয়েছেলে জাতটাই এইরকম, বুঝলি …।

আমি সমর্থন করব কিনা বুঝতে পারি না। চুপ করে থাকি।

কানাইদা বলে, অন্য ধান্দা দেখতে হবে, বুঝলি … এভাবে হয় না …।

বেখেয়ালে মাথা নেড়ে সায় দিই। ভুলে যাই, কানাইদার সঙ্গে ফোনে কথা বলছি। ফোনে মাথা নাড়া দেখা যায় না। আমাকে চুপ দেখে কানাইদা লাইন কেটে দেয়।

////////

ডাক্তার বলে, বেবির গ্রোথ ভাল হচ্ছে। সব ঠিক আছে; ওষুধগুলো বন্ধ করবেন না।

একটু ফুলে উঠেছে ওর পেট। দেখে বড় তৃপ্তি লাগে। সকালে আরও সাবধানে হাঁটি ওকে নিয়ে। ঝন্টুও কুকুরটাকে নিয়ে বেরোয়, আড়চোখে দেখে ওর পেটের দিকে; ভুরু কুঁচকে ওঠে। চেনে টান দেয় কুকুরটা। কুকুরের এসব কৌতূহল নেই। সে নিজের জন্যে মদ্দা খোঁজে। ভরা পোয়াতির চেয়েও বড় পেট নিয়ে কুকুর সামলায় ঝন্টু।

বিশুবাবু বলে, হল কি মশাই আপনার, পাত্তা পাওয়া যায় না আজকাল …।

আমি লাজুক হাসি। বিশুবাবুকে বাড়ির একটা কাজের লোকের সন্ধান দিতে বলি।

বিশুবাবু মাথা নেড়ে বলে, লোক পাওয়া আজকাল বড় কঠিন; বিশেষ করে বিশ্বস্ত লোক …।

আমি বলি, টাকার জন্যে চিন্তা নেই …।

বিশুবাবু একটু অবাক হয়ে তাকায়। বলে, আপনার যেন কোন অফিস …?

//   ///

নন্দী ঠাকুমাকে দুধের কথা বলি।

ঠাকুমা বলে, কতটা?

চার পো ছ’পো, যত দেবে নেব; কিন্তু খাঁটি দুধ চাই …।

ঠাকুমা বলে, ক’মাস হল বউমার …?

বলি, চার পাঁচ মাস হবে বোধহয় …।

নন্দী ঠাকুমা রাগ করে। এ কী সোয়ামি, ঠিকমতো হিসেব রাখিস না …!

/////

ত্রিপর্ণা ফোন করে মাঝে মাঝে। গালমন্দ করে খুব। আমি কিছু মনে করি না। আমার এখন অনেক কাজ। একটা বাংলা অভিধান কিনেছি। সকাল সন্ধ্যে উলটে পালটে দেখি। ভাল ভাল শব্দ লিখে নিই খাতায়। ছেলে মেয়ে যাই হোক নাম দিতে হবে ভাল দেখে।

ও ঘুমলে আলতো হাত রাখি ওর পেটে। টের পাই ভেতরে নড়ছে। ডুগডুগি বেজে ওঠে – ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ …। এগিয়ে আসছে বাঁদর নাচ। ময়লা জামা, খোঁচা-খোঁচা গোঁফ-দাড়ি, রুক্ষ চুল লোকটার একহাতে দড়ি বাঁধা বাঁদর, অন্য হাতে ডুগডুগি। সজোরে হাত নেড়ে ডুগডুগি বাজাচ্ছে – ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ … ভানুমতীর খেল, বাচ্চারা জোরসে হাততালি … ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ …

 (আঠারো)

ছোটবাবু খুব তীব্র চোখে আমাকে দেখতে দেখতে বললেন, আপনাকে যতটা ন্যালাখ্যাপা ভেবেছিলাম, তা তো নয়; আপনি তো দেখছি একপিস মাস্টার ঘোড়েল।

আমি নিঃশব্দে মাথা নামিয়ে নিই। ছোটবাবুর টেবিলে এলোমেলো ছড়ানো কাগজ; তার মধ্যে একখানা বিয়ের নিমন্ত্রনপত্র। কোনে হলুদের ছোপ।

ছোটবাবু বলেন, আপনি তো ডেনজারাস ধরনের অ্যাক্টর, আমার একবারও সন্দেহ পর্যন্ত হয়নি …। এমনকি ওই মেয়েটা যখন কমপ্লেন করতে আসে, আমি পাত্তা দিইনি। আপনার শ্বশুর শাশুড়িকে জেরা করতে গিয়ে দেখি, ও বাবা, এ তো সাংঘাতিক কেস …।

আমি মাথাটা আরও নামিয়ে নিই। টেবিলের তলায় ছোটবাবুর বুটের ডগাগুলো চোখে পড়ে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বহুদিন পালিশ পড়েনি জুতোয়।

ছোটবাবু বলেন, নিন এবার ঘানি টানুন …।

আমার বিরুদ্ধে গুরুতর চার্জ এনেছে ত্রিপর্ণা। বুঝতে পেরেও আমি অন্য মেয়েকে নিজের বউ বলে নিয়ে চলে গেছি, আর বিয়ের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিনের পর দিন সহবাস করেছি ত্রিপর্ণার সঙ্গে।

আমি খুব মৃদু গলায় বলি, বিশ্বাস করুন স্যার, প্রথমে বুঝতে পারিনি, এত এক রকমের দেখতে; তারপর ভাবলাম, অসহায় মেয়ে, পেটে বাচ্চা, কোথায় যাবে; তার চেয়ে আমার কাছেই থাক …।

ছোটবাবু বলেন, আর ওই ত্রিপর্ণা বলে মেয়েটার কেসটা, ওটা তো আরও ডেনজারাস! বাড়িতে বউ, আর আপনি বাইরে রামলীলা করে বেড়াচ্ছেন …। আপনার বউ পালাবে না তো কার বউ পালাবে।

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি। বসে থাকি চুপচাপ, বিয়ের কার্ডে একটা কালো পোকা বসেছে, দেখতে পাই।

ছোটবাবু চিৎকার করে কাকে যেন ডাকে। খাকি উর্দি পরা এক সেপাই তাড়াতাড়ি এসে বলে, বলুন স্যার।

(উনিশ)

জেল এড়ানো গেল না আমার। কানাইদা একটা উকিল ঠিক করে দিয়েছিল। তীক্ষ্ণ নাক এবং কুতকুতে চোখের সেই উকিল বলল, সহজে ছাড়ব না, লড়ব। কতটা লড়াই করেছিল কে জানে, আমার কিন্তু জেল হল। লড়াই করেছিল নিশ্চয়ই, না হলে এসব কেসে নাকি আরও দীর্ঘমেয়াদী জেল হবার কথা। উকিল বলল, হাইকোর্টে আপিল করলে মেয়াদ আরও কমবে। আমার আর উৎসাহ ছিল না। সওয়াল জবাব বড় ক্লান্তিকর জিনিস। উকিল পাখিপড়া করে অনেক কথা শেখাবে, মনে রাখতে হবে, গড়গড় বলতে হবে আদালতে। বড় ক্লান্তিকর। বলতে গিয়ে বারবার খেই হারিয়ে ফেলি। মনে হল, তার চাইতে কিছুদিন জেলে থাকি। শান্তিতে থাকব। ওখানে বিশুবাবু নেই, ঝন্টু নেই, ত্রিপর্ণা নেই, শুধু কানাইদাকে মিস করব একটু। বড় ভাল লোক, জ্ঞানী লোক, আমার কথা সত্যিই ভাবে।

//////

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরলাম। কিছু জিনিস কানাইদা নিয়ে গেছে, কিছু চুরি গেছে। বাড়িময় ধুলো, নোংরা ঝুল, আবর্জনা। আমার একমুখ দাড়িগোঁফ। নিজের এই মূর্তি খুব চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছি। কোথায় যেন …?

ঝন্টুর সঙ্গে দেখা হল। সামনে চেন বাঁধা কুকুর, পেছনে বাবুলাল। আমাকে দেখে দুজনে হেসে হেসে কী যেন বলছিল। শুনতে পেলাম না ভাল, কুকুরটা চিৎকার করছিল বড়। ওর রাগের কারণটা বুঝি, ছোটবেলায় দেখতাম বাঁদরওলাকে দেখে পাড়ার ফেতিগুলো এভাবেই চিৎকার করছে।

গঙ্গারামের দোকানে চা খেতে গেলাম। বিশুবাবুর সঙ্গে দেখা। মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। প্রথমে ভুরু কুঁচকে দেখলেন আমাকে, তারপর চিনতে পেরে বললেন, আরে, কবে ছাড়া পেলেন? কেমন আছেন?

আমি হেসে বলি, ভাল।

বিশুবাবু বললেন, জেলের ব্যবস্থা কেমন দেখলেন।

বলি, ভাল।

জেলের খাবা্র নাকি খুব খারাপ?

না না, ভাল।

তাই নাকি? বিশুবাবু অবাক হন। বলেন, শুনেছি, জেলের পায়খানাগুলো না কি খোলা, দরজা নেই।

বলি, তাই হবে।

বিশুবাবু একটু সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে উঠে পড়লেন। ভাঁজকরা কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, পড়বেন না কি?

আমি হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিই। বিশুবাবু চলে যান। ভাঁজকরা ন্যাতানো কাগজ হাতেই ধরা থাকে আমার।

ঘুরতে ঘুরতে শ্বশুরবাড়ির দেশে চলে যাই। বাড়িতে ঢুকতে গিয়েও থমকে যাই। ঢোকা হয় না। শুনতে পাই, ভেতরে কেউ একজন কাশছে। কাশিটা চিনতে পারি। শ্বশুরমশাই। কতদিন হয়ে গেল, তবু কাশি সারেনি।

রাস্তায় এলোমেলো ঘুরি। কি যেন নাম সেই ছেলেটার? অমল? বিমল? নির্মল? না কি অর্ণব? না কি প্রশান্ত? না কি ঝন্টু? না কি বাবুলাল?

মনে পড়ে না কিছুতেই। সব ঘেঁটে তাল পাকিয়ে যায়।

একটা বাড়ির বারান্দায় একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। চুল আঁচড়াচ্ছে। খুব চেনা চেনা লাগে। একটু দাঁড়াই, এগিয়ে যাই ওর দিকে। ভাল করে দেখি। মেয়েটাও খুব অবাক হয়ে দেখছে আমায়। হাতের চিরুনি থেমে গেছে। খুব চেনা চেনা …। মনে পড়ে যায়। সেই মেয়েটার মতো দেখতে। অবিকল সেই মেয়েটার মতো। সেই রকম উঁচু পেট; দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পেটে বাচ্চা।

আমি আর একটু এগিয়ে যাই। মেয়েটার চোখে ভয়। ত্রস্ত পায়ে ঘরে ঢুকে যায়। হাঁটাচলাও একদম সেই মেয়েটার মতো। কিন্তু সে এখানে কী করে আসবে? তাকে তো কোন হোমে পাঠিয়ে দিয়েছে পুলিশ। এতদিনে নিশ্চয়ই বাচ্চা হয়ে গেছে তার। ডাক্তার বলেছিল, গ্রোথ ভাল, সব ঠিক আছে; শুধু আনন্দে রাখবেন। এটা তাহলে কে? একদম যেন সেই মেয়েটা। ভাবতে ভাবতে পথ চলি। কুকুরের দল চিৎকার করে আমায় দেখে; ছেলেপুলেরা পেছনে লাগে, ঢিল ছোড়ে …।

রাতে বাড়ি ফিরে আসি। ঘরের আলো-টালো সব চুরি হয়ে গেছে। খুঁজতে খুঁজতে একটা মোমবাতি পেয়ে যাই। জ্বালাই বাতিটা। মোমবাতির আলোয় আমার ছায়া পড়ে দেওয়ালে। গোঁফ-দাড়ি আর ঝুপ্পুস চুলের মাথাটা কী বড় দেখায়। বাংলা অভিধানটা দেখতে পাই। সেই খাতাটাও। কত ভাল ভাল নাম লেখা আছে ওটাতে।

খাতার পাতা ওলটাই। নামগুলো পড়ি। জ্বলে জ্বলে ছোট হয়ে আসে মোমবাতিটা। নিবে যায় শেষে। অন্ধকার ঘরে চুপ করে বসে থাকি। বিড়বিড় করে নামগুলো আওড়াই।

খুব ক্ষীণ একটা শব্দ আসে কানে। ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…। আস্তে আস্তে আরও ক্ষীণ হয়ে আসছে শব্দটা – ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ… বাঁদর নাচ দেখিয়ে ফিরে যাচ্ছে ভানুমতীর খেল … মিলিয়ে যাচ্ছে শব্দটা ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…

সমাপ্ত

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-17/

১৬ পর্বের লিঙ্ক –  https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-16/

১৫ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-15/

১৪ পর্বের লিংক –   https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-14/

১৩ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-13/

১২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-12/

১১ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-11/

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.