ডুগডুগি (পর্ব ১৩)

601

শুনতে পায়নি বোধহয়; এগিয়েই যাচ্ছে, প্রায় পৌঁছে গেছে দরজার কাছে।

আরও জোরে বললাম, এই যে … কুমকুম … ।

‘কুমকুম’ শব্দটা বলে নিজেই চমকে উঠলাম। অসাবধানে বেরিয়ে গেছে মুখ দিয়ে। কিন্তু তারপরই বিস্ময় চরমে। দেখলাম, আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ও। চোখমুখের ঘুম-ঘুম রেশ সরে গিয়ে সেখানে প্রবল বিস্ময়। অনেক দুরে, কোনও অজানা জায়গায় হঠাৎ কেউ নাম ধরে ডাকলে এমনই বিস্ময় জাগে মনে। তাহলে কি এর নামও কুমকুম ? দুজনের এত মিল, আবার নামটাও এক। এতো ভাঁজে ভাঁজে মিরাকেল। না কি ‘কুমকুম’ শব্দটা শুনে ও আমার দিকে তাকায়নি? আসলে অবাক হয়েছে; খুব জোরে ‘এই যে – কুমকুম’ বলেছি বলে। ফের মনে হল, হতেই পারে, এর নামও কুমকুম। কুমকুম একটা অতি কমন নাম, পঁচিশ কোটি বাঙালির মধ্যে নিদেন পক্ষে কয়েকশো কুমকুম পাওয়া যাবে।

হঠাৎ আমি খেয়াল করি, এর নাম কুমকুম হলে আমার আমার বড় সুবিধে হয়। ভীষণ কাজে লাগবে কুমকুম নামটা।

ও এখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ভেবেছিলাম, ওকে আমাদের পুরনো বাথরুমটা দেখিয়ে দেব। কিন্তু মত বদলে বললাম, ঠিক আছে, যাও।

/////////

বাথরুমে জল পড়ার শব্দ পাচ্ছি বাইরে থেকে। বিয়ের পর বেশ কিছুদিন কুমকুম বাথরুমে চান করতে ঢুকলে আমি দরজায় কান পেতে থাকতাম। ভাল লাগত জলের শব্দ শুনতে।

ও বের হল বাথরুম থেকে। ভিজে চোখে মুখে জলের ফোঁটা, থুতনি বেয়ে দু-চার ফোঁটা ঝরে পড়ল, দলছুট চুলগুলো এখন কপালে লেপ্টে।

আমি ইশারায় তারে ঝোলা গামছাটা দেখালাম। কুমকুমের গামছা এটা।

খুব আলতো করে চেপে চেপে মুখ মুছছিল ও। আমি পাশ দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠলাম। ছাদ থেকে ঝন্টুদের উঠোনটা স্পষ্ট দেখা যায়। ঝন্টু ওর বাইকটা বের করছে টেনে টেনে। আমি চিৎকার করে ডাকলাম, কুমকুম, একবার ছাদে এস তো।

আড়চোখে দেখলাম, ঝন্টু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। স্টার্ট দিতে ভুলে গেছে বাইকে।

আমি ফের চিৎকার করলাম, কুমকুম ছাদে এস একবার।

সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।

বাইকে স্টার্ট দেবার চেষ্টা করছে ঝন্টু। কিন্তু গণ্ডগোল করছে বাইক। আমি নিশ্চিত বাইকে কোনও সমস্যা নেই; ইচ্ছে করেই করছে ও। সময় নিচ্ছে। খুব ভাল, আমিও তাই চাই।

হঠাৎ দেখলাম, বাগানের গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকছে ত্রিপর্ণা। আমার ভেতরের উচ্ছ্বাসটা দপ করে লাফিয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেল।

(বারো)

ফোনে বিস্তারিত বলা হয়নি। এখন ত্রিপর্ণা পুঙ্খানুপুঙ্খ সব কিছু শুনল। ও একবার মাত্র দেখেছে কুমকুমকে; সেই স্মৃতি উসকে খুব খুঁটিয়ে দেখল ওকে। তারপর মাথা নেড়ে বলল, একবার মনে হচ্ছে এটাই বৌদি, আবার মনে হচ্ছে নয় … ।

আমি বলি, এটা ওরিজিনাল কুমকুম নয়, আমি নিশ্চিত।

ত্রিপর্ণা বলল, তাহলে তো আর কথাই নেই; তুমি পুলিশকে এক্ষুনি জানাও।

আমি আঁতকে উঠে বলি পাগল।

ত্রিপর্ণা বলে, পাগলামির কি দেখলে!

পুলিশ তাহলে নিয়ে চলে যাবে ওকে।

সে তো যাবেই।

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ত্রিপর্ণা। তখনই বেজে উঠল আমার মোবাইল। শ্বশুরমশাই।

ত্রিপর্ণাকে টেনে নিয়ে বাইরের ঘরে এলাম আমি। তারপর রিসিভ করলাম ফোনটা।

শ্বশুরমশাই খুব উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, বাবা, অবনীশ, কুমকুম উঠেছে ঘুম থেকে?

আমি বলি, উঠেছে।

দাও বাবা দাও, একটু কথা বলি।

আমি বেশ জোরে বলি, এই তো কুমকুম এখানেই আছে, আপনি কথা বলুন।

ত্রিপর্ণার দিকে বাড়িয়ে দিই ফোনটা। বলি, এই নাও কুমকুম, তোমার বাবার সঙ্গে কথা বল।

আবারও নিজের ধারালো বুদ্ধির পরিচয় দেয় ত্রিপর্ণা, ফোনটা নিয়ে বলে, হ্যালো … বাবা, কি বলছ …?

…………

ভাল আছি, তুমি চিন্তা কোরনা ।

……………

একটু ঠাণ্ডা লেগে বসে গেছে গলাটা, তাই অন্যরকম শোনাচ্ছে, ও কিছু নয়, তুমি চিন্তা কোর না।

……………………

না, না, তোমার আসার দরকার নেই।

…………………

ফোনে এতকিছু বলা যাবে না …… ।

…………………

বলছি তো, আসার দরকার নেই; আমি ঠিক আছি … ।

…………………………

আচ্ছা, আমিই, না হয় যাব’খন ওখানে …।

যাব, যাব, সপ্তাখানেক পরেই যাব … এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন বল তো … !

………………

শোন না, আমি এখন বাথরুমে ঢুকব, পরে কথা বলব মায়ের সঙ্গে, মার শরীর ভাল আছে তো … ?

…………………

হ্যাঁ, তখন তো গিয়েছিলাম, আবার এখন যেতে হবে … ।

সামান্য গণ্ডগোল, ও কিছু নয় … হ্যাঁ, হ্যাঁ ওষুধ খাব, ছাড়ছি এখন … ।

ফোন অফ করে দিল ত্রিপর্ণা। আমার চোখে যুগপৎ বিস্ময় আর শ্রদ্ধা। অসম্ভব প্রতিভাবান না হলে, এভাবে পরিস্থিতি ম্যানেজ করা যায় না।

ফোন অফ করেই আমায় মৃদু একটা ধমক দেয় ত্রিপর্ণা। বলে, আমাকে তো আগে বলবে যে ওনাকে বলেছ, আমি বাথরুমে গেছি … ।

প্রকৃতই ক্যাবলার মতো হেসে বলি, আমার কী আর মাথার ঠিক আছে … যাক, কিছু সন্দেহ করেছেন নাকি … ?

ত্রিপর্ণা বলে, মনে হয় করেননি, কিন্তু তোমার শাশুড়িকে দিতে চাইছিলেন ফোন …

আমি বলি, একটু কথা বলতে পারতে … ।

ত্রিপর্ণা বলে, শোন মায়েদের ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয়, ধরা পড়ে যেতে পারি …।

কিন্তু আমি নিশ্চিত যে, ও ধরা পড়বে না। ওকে ধরা সহজ নয়। ত্রিপর্ণা এমনকী আমার রোলেও অভিনয় করে দিতে পারে, সে প্রতিভা ওর আছে।

ত্রিপর্ণা বলে, তুমি ব্যাপারটা এত জটিল করে তুলছ কেন?

আমি বলি, জটিল কোথায়; তুমি তো সমাধান করে দিলে।

এত সহজ! ত্রিপর্ণা ধমকে ওঠে, তুমি কিন্তু আরও জালে জড়াবে, এরপর যদি সত্যিই বউদি ফিরে আসে … ।

আমি বলি, খুব ভাল, তখন থানায় গিয়ে বলব, ভুল হয়ে গেছে, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি … ।

থানা তোমায় ছেড়ে দেবে?

দেবে না কেন, আমি তো একা নই, এ ভুলে ওদেরও হাত আছে।

আমার এই যুক্তিটা সহজে উড়িয়ে দিতে পারে না ত্রিপর্ণা।

ঠোঁট কামড়ে চিন্তা করে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, বউদি যতদিন না ফেরে ততদিন এ কোথায় থাকবে?

কেন, এখানেই …। আমি অবাক হয়ে বলি।

এই বাড়িতে, একা, তোমার সঙ্গে?

হ্যাঁ, অসুবিধে কোথায়?

না অসুবিধে হবে কেন; তোমার তো সুবিধেই হয় …। মুফতে একটা মেয়ে পেয়ে যাবে … ।

আমি বলি ছিঃ ছিঃ, কি বলছ; তুমি কি আমায় চেন না!

চিনি বলেই তো বলছি। বেশ বাঁকা হেসে বলে ত্রিপর্ণা।

একথাটার তেমন জোরাল প্রতিবাদ করতে পারি না আমি। কাল রাতে মাঝে মাঝে যখন ঘুমন্ত মেয়েটিকে দেখছিলাম, বার বার আমার চোখ চলে যাচ্ছিল ওর ভরন্ত বুকের দিকে। ত্রিপর্ণার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে একটু নিচু গলায় বলি, কী করতে বল আমাকে এখন …?

থানায় যাও, গিয়ে বল এ আমার বউ নয়, ভুল করে …।

আমি আঁতকে উঠি, কিন্তু ঝন্টু, বিশুবাবু – সবাই জানে আমার বউ পেয়ে গেছি।

লোকজনকে এত ভয় পাও কেন …… ?

ভয় নয় ত্রিপর্ণা, লজ্জা, তুমি জান না, ঝন্টু কী খারাপ খারাপ কথা বলে আমাকে … বিশুবাবু বাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া করেছিল … ।

ত্রিপর্ণা বলে, আচ্ছা, বউদি যদি কারও সঙ্গে চলেও যায়, এতে লজ্জা পাবার কী আছে … ?

কী বল তুমি। আমি অবাক হয়ে বলি, আমার বউ অন্য লোকের সঙ্গে জড়িত, আমি লজ্জা পাব না … ।

একটু হেসে ত্রিপর্ণা বলে, তুমিও তো আমার সঙ্গে … তাহলে বউদিরটা মেনে নিতে অসুবিধে কোথায় বল ……?

এই প্রশ্ন তো আমার মনে আগেই কতবার উঁকি দিয়েছে, প্রতিবারই যুক্তিশীল মানুষের মতো নানা অভ্রান্ত যুক্তি দিয়ে নিজেকে বুঝিয়েছি, আমি নির্দোষ।

কিন্তু নিয়তির এমনই পরিহাস সেই সমস্থ অকাট্য যুক্তির একটাও মনে পড়ছে না এখন।

ত্রিপর্ণা ফের ফুঁসে উঠল, তোমরা পুরুষ মানুষ, সবাই সমান, সব ধান্দাবাজ …।

সব পুরুষ ধান্দাবাজ কিনা জানি না, কিন্তু আমার মধ্যে যে কিছু ধান্দাবাজি আছে, সেটা বিলক্ষণ স্বীকার করি। তবে সর্বসমক্ষে সেটা মেনে নেবার মতো মূর্খ আমি নই। ত্রিপর্ণাকে শান্ত করার জন্যে বলি, প্লিজ, উত্তেজিত হোয় না … ।

আমাকে থামিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল ত্রিপর্ণা। কিন্তু তখনই বেজে উঠল আমার ফোন। আমি আতঙ্কিত হয়ে দেখলাম, শ্বশুরমশাই।

জানি, ত্রিপর্ণা যে পরিমান উত্তেজিত এখন, ওকে ফোন দিলে বিপজ্জনক হতে পারে। রেগে মেগে সব হয়ত বলে দেবে। অগত্যা নিজেই ফোন ধরি।

কে বাবা, অবনীশ?

হ্যাঁ।

কুমকুম কোথায়, এই তোমার মা একটু কথা বলবে।

আমি বলি, ও তো এখন বাথরুমে।

এখনও বেরোয়নি?

না, খুবই পেট খারাপ … ।

ও তোমার মা বড় উতলা হয়েছে।

বলি, উতলা হতে বারণ করুন, ডাক্তারখানায় নিয়ে যাব, সেরে যাবে … ।

গলাটাও যেন কেমন কেমন শোনাল।

হ্যাঁ, ঠাণ্ডা লেগেছে … ।

তাহলে গলাটাও একবার দেখিয়ে নিও।

আমি বলি, সে তো বটেই, যাচ্ছি যখন সবই চেক-আপ করতে বলব …। আপনি চিন্তা করবেন না।

তাহলে বাথরুম থেকে বেরলে একবার ফোন করতে বোল।

নিশ্চয়ই বলব … ।

ত্রিপর্ণা একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। ফোন ছাড়তে বলল, এভাবে কতদিন চালাবে?

কী জানি! একটু হতাশ গলায় বলি আমি।

(তেরো)

দুপুরবেলা ফোন করল কানাইদা। একটু রেগেমেগে বলল, কী ব্যাপার তোর, বউয়ের খবর পেয়ে সেই যে পাঁই পাঁই করে ছুটলি, তারপর একেবারে হাপিস … । একটা খবর পর্যন্ত দিলি না।

বলি, খুব গোলমেলে ব্যাপার কানাইদা।

কেন রে, বউ মরে গেছে না কি?

না না, তাহলে তো অনেক সরল হয়ে যেত কেস।

কানাইদা বলে, সে তো বটেই। যাক, আমার কথাগুলো তাহলে মাথায় ঢুকেছে তোর … ।

কানাইদাকে এক নিঃশ্বাসে সব বলে দিই।

কানাইদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এই একবিংশ শতাব্দীতে একটা জোয়ান সমর্থ ছেলে বউয়ের শোকে পাগল হয়ে গেল, ভাবতেও লজ্জা লাগে …। পারিসও বটে তোরা।

আমি বলি, বিশ্বাস কর কানাইদা … মাইরি, মা কালীর দিব্যি, যা ছুঁয়ে বলতে বলবে, বলব … ।

কানাইদা ধমক লাগাল – ভ্যাট ।

বিশ্বাস কর কানাইদা, একটুও বাড়িয়ে বলছি না …। বলতে বলতে কান্নায় গলা বুজে আসে আমার।

এবার কানাইদা গম্ভীর গলায় বলে, ঠিক বলছিস?

একদম ঠিক। তুমি এসে দেখে যাও।

আমি দেখে কী করব। কানাইদা বলে, আমি তো তোর অরিজিনাল বউকেই দেখিনি কখনও …। মেয়েটা এখন কোথায়?

ঘরে; ঘুমচ্ছে।

হুঁ। কানাইদা আরও গম্ভীর হয়ে যায়।

আমি কাতর গলায় বলি, কী করি বলো তো?

কানাইদা একটু চুপ করে থেকে বলে, এক কাজ কর, আমার ব্যালেন্স খুব কম, তুই আমাকে একটা রিং কর।

কানাইদা লাইন কেটে দিতেই একটা কল ঢুকে পড়ে আমার ফোনে। আতঙ্কিত হয়ে দেখি শ্বশুরমশাই।

প্রথমে মনে হল ধরব না। তারপর ভাবলাম, এতে যদি সন্দেহ বেড়ে যায়, তার চেয়ে ধরাই ভাল, অন্যভাবে সামলাতে হবে ব্যাপারটা।

ফোন অন করতেই কাশির শব্দ শুনলাম। শ্বশুরমশাই কাশছেন। এত ভয়ঙ্কর কাশি যে মনে হচ্ছে আমার ফোনটাই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। ফোনটা আমি করিনি, শ্বশুরমশাই করেছেন, সুতরাং, কাশি শুনলে পয়সা নষ্ট হবার সম্ভাবনা নেই। তাই সেটটা কান থেকে একটু তফাতে রেখে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

কাশি থামার পর আমিই আগে বললাম, একটু জল খেয়ে নিন, আমি ধরে আছি।

শ্বশুরমশাই বললেন, সকাল থেকে এত জল খেয়েছি যে পেটে আর জায়গা নেই, জানই তো বাবা আমার হাই সুগার, এখন পাঁচ-সাত মিনিট ছাড়াই পেচ্ছাপে বসতে হচ্ছে।

চলবে…

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-12/

১১ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-11/

Advertisements

1 COMMENT

  1. khub valo lagche. apnar sathe ektu kotha bolte chhai. Shudhu lekhata valo legeche bolei na, kotha bola gele valo hoto. face book eo pelam na.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.