ডুগডুগি (পর্ব ১৪)

514

ভয়ানক অন্যরকম, অনেকটা ভিনগ্রহের প্রাণীদের মতো, শোনাচ্ছে শ্বশুরমশাইয়ের গলা।

আমি বলি, আপনার গলার অবস্থা তো খারাপ … ।

আর গলা – আমি বেঁচে আছি এই ঢের। সখেদে শ্বশুরমশাই বলেন, ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি বলি আমি।

কী বলল ডাক্তার?

ওষুধ দিয়েছে, আর কথা বলা একদম মানা … ।

আমাকেও ডাক্তার তাই বলেছে – কথা একদম চলবেনা।

আমি বলি, তাহলে বলছেন কেন ।

না বলে কী উপায় আছে। একটু বিরক্তির সঙ্গে শ্বশুরমশাই বলেন, হাট-বাজার আছে, ব্যাঙ্ক পোস্টঅফিস আছে, বাইরে বেরুলে লোকে তোমাকে কথা বলিয়ে তবে ছাড়বে … । এই দেখনা, তোমার শাশুড়ি সকাল থেকে কেবলই তাগাদা দিচ্ছে, ফোন কোর, ফোন কর …।

আমি তাড়াতাড়ি বলি,  কিন্তু কুমকুমকে তো ডাক্তার কথা বলতে একদম বারণ করে দিয়েছে … ।

দুটো কথাও বলতে পারবে না … ।

দুটো কেন, একটাও কথা বলা বারন … বলেছে কথা বললেই গলার ঘা বিষিয়ে গিয়ে খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে।

শ্বশুরমশাই আঁতকে ওঠেন, ও বাবা, তাহলে থাক … । পেট ছেড়েছিল যে, সেটা কি ধরেছে একটু?

বলি, ধরেছে, পেট নিয়ে চিন্তার কিছু নেই; কিন্তু গলাটাই মারাত্মক …।

শ্বশুরমশাইকে বোঝাতে পেরে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি আমি। একটা চিন্তা নামল মাথা থেকে। এবার ফোন করলাম কানাইদাকে।

কানাইদা বলল, এ তো সমস্যার কথা রে!

সমস্যা বলে সমস্যা …।

কানাইদা বলে, আমার কিন্তু অন্যরকম সন্দেহ হচ্ছে …।

কী? একটু ভয়ার্ত গলায় বলি আমি।

এটা একটা ট্র্যাপ।

কী রকম?

ধর ব্যাপারটা এরকম হল – কোন একদল বদ লোক তোর বউকে অপহরণ করল, তারপর অন্য একজনকে তোর বউ সাজিয়ে তোর বাড়িতে ঢুকিয়ে দিল, তারপর সুযোগ বুঝে টাকা-কড়ি গয়না-গাঁটি সব নিয়ে পালিয়ে গেল … ।

কানাইদার যুক্তি বেশ চিন্তায় ফেলে আমায়। বলি, এটা তো ভেবে দেখিনি …।

ভাবতে হবে, সব দিকই ভাবতে হবে।

বলি, কী করব তাহলে …?

আপাতত সব সময় ওকে চোখে চোখে রাখ, একদম কাছছাড়া করবি না…।

আমি বলি, আমি কাছছাড়া কী করব, ওই তো সব সময় আমার সঙ্গে ঘুরছে, আমি যেখানেই যাচ্ছি সঙ্গে যাচ্ছে …।

তাই! কানাইদার গলায় একটু বিস্ময়।

হ্যাঁ, একটু বাজার করব বলে বেরিয়েছিলাম, কী আকুল চোখে তাকিয়ে দেখছিল আমার দিকে … ফিরে এসে দেখলাম, জানালা দিয়ে একদৃষ্টে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে – চোখে ভয় … আমাকে দেখে যেন স্বস্তি পেল … ।

হুঁ।

আমি নিজেই দুটো ভাতে-ভাত ফুটিয়ে নিয়েছিলাম, ও রান্নাঘরে ঢুকতে প্রথম দিকে কেমন যেন ইতস্তত করছিল, তারপর দুপুরে খাবার সময় ও-ই থালা-টালা নিয়ে ভাত বাড়ল দুজনের … খাওয়া-দাওয়ার পর পাত কুড়িয়ে থালা বাটি মেজে ফেলল …

হু ।

তবে ভীষণ ক্লান্ত, দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় কাত হয়ে বসেই ঘুমিয়ে পড়ল … ।

শোন, এরা কিন্তু ভাল অভিনয় জানে, বাইরে বেরলে দরজায় তালা দিয়ে যাবি।

আচ্ছা ।

আর শোন, ওর হাতে খাবার-দাবার ছাড়িস না, কখন কী মিশিয়ে দেবে ঠিক নেই … ।

বলি, একে কিন্তু দেখে সেরকম মনে হচ্ছে না।

দেখে অনেক কিছুই মনে হয় না, কত লোক আদর করতে করতে বউকে গলা টিপে মারে, কত বউ স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে সোহাগের কথা বলতে বলতে অন্য লোকের সঙ্গে পালাবার ছক কষে, ভাইয়ের সম্পত্তি মেরে তীর্থ করতে যায় কত মানুষ, যা বলি, শোন … ।

আচ্ছা। আমি বলি, বলছ যখন … ।

আর শোন, রাতে শুবি কোথায়?

কেন ঘরে! আমি অবাক হয়ে বলি।

এক বিছানায় না কি?

ন-ন্‌-না। ওকে খাটে দিয়ে আমি মেঝেতে বিছানা করে শোব।

শোন্‌, একঘরে শোবার দরকার নেই।

কেন গো?

কারন আছে, মেয়েটার শরীর স্বাস্থ্য কেমন? 

একটু ভেবে বলি, ভালই।

চোখ মুখ?

পরিস্কার।

তাহলে একেবারেই রিস্ক নেওয়া যাবে না। আফটার অল তুই ব্যাটাছেলে, রাতে কখন যে কী খেয়াল মাথায় চাপবে। সঙ্গমের সময় পুরুষ মানুষকে মেরে ফেলা খুব সোজা।

আমি এবার হেসে ফেলি। বলি, ওহ, তুমি অনেকদুর ভেবে ফেলেছ দেখছি।

কানাইদা বলে, তুই অন্য ঘরে শুবি, আর ও যে ঘরে শোবে সেই ঘরে তালা দিয়ে দিবি; ভাল কথা বলছি শোন … ।

বলি, আরে, ওসব কোনও চান্স নেই।

কানাইদা বলে, কিন্তু তোর আসল বউয়ের কী হবে?

আমি একটু চিন্তিত গলায় বলি, সেটা তো ভাবছি আমিও …।

তাকে তো খুঁজে বের করা দরকার।

সে তো বটেই …।

কিন্তু খুঁজবে কে? কানাইদা বলে, যাদের খোঁজার কথা সেই পুলিশ, তারা তো জানে তোর হারানো বউ ফেরত পেয়ে গেছিস। তারা তো খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দেবে …।

আমি চুপ করে থাকি। আর চুপ করে থাকা ছাড়া আর উপায়ই বাকি? সমাধান তো আমার কাছে নেই। হঠাৎই মনে পড়ে যায় কুমকুমের কথা। কী করছে এখন? কোথায় আছে? আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, সেও কোথাও অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, প্রচণ্ড আঘাতে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, অন্য কোনও পুলিশ তাকে উদ্ধার করে আমারই মতো ভুল কারও ঠিকানায় পৌঁছে দিয়েছে; সে সেখানে তার বউ হয়ে গেছে …। হতেই পারে; হওয়া বিচিত্র কিছু নয় – ভাবতেই কুমকুমের জন্যে হু হু করে ওঠে মন আমার, বুকের মধ্যে থেকে পাক দিয়ে দিয়ে কান্না উঠে আসে ওপর দিকে; ভাবি দরকার নেই, সব জানিয়ে দিই পুলিশকে, পুলিশ এসে নিয়ে যাক একে … কী আর হবে, ঝন্টু হাততালি দেবে, বাবুলাল বগল বাজাবে, সহ্য করব, মেনে নেব, কী আর করা যাবে, পৃথিবীতে অনেক মানুষ থাকে যাদের দুটো হাতই বাঁ-হাত, ময়লা না ঘেঁটে থাকতে পারে না, গু পরিস্কার করার জন্যেই জন্ম তাদের। ঝন্টুরা সেই গোত্রের।

কানাইদাকে বলি, সেই ভাল কানাইদা; থানায় গিয়ে বলে দিই সত্যি কথাটা … ।

কানাইদা বলে, আমারও তাই মত।

(চোদ্দ)

অন্য ঘরে শোওয়া হল না আমার। ঘরে তালা-টালাও দেওয়া হল না। আগের দিনের মতোই ওকে বিছানা ছেড়ে, নিজে মেঝেতে শুলাম। এই ভিতু এবং জুবুথুবু মেয়েটা সবসময় কুঁকড়ে আছে; ও চোর-ছ্যাঁচোড় দলের সঙ্গে যুক্ত, ভাবাই কষ্টকর। তবুও শেষ মুহূর্তে কী মনে করে কাটারিটা বালিশের নিচে নিয়ে শুলাম। ভোঁতা কাটারি, এটা দিয়ে মানুষ ছার, কলাগাছও কাঁটা যাবে না, তবু একখানা অস্ত্র তো বটেই, আর কিছু না হোক কেউ আক্রমন করতে এলে আঘাত তো করা যাবে।

আজও সহজে ঘুম আসতে চায় না। আগের দিন মেঝেতে শোয়ার দরুন সারা গায়ে খাবলা খাবলা ব্যথা। শক্ত মেঝেতে বেশি এপাশ ওপাশ করলেই ব্যথাগুলো হুটোপাটি করে ধাক্কা মারছে। একবার ভাবলাম, ওর পাশে গিয়ে শুই, এই বিপুল টেনশনে আমার মধ্যেকার কু-মতলব কিছুতেই চাগিয়ে উঠবে না। কিন্তু তারপরেই মনে হল, কোন এক মহামানব বলে গেছেন গেছেন, মাটির দেওয়াল, পাগলা শেয়াল আর বদ খেয়াল, কখন যে কী কাণ্ড বাধাবে ঠিক নেই। এক ঘর পর্যন্ত ঠিক আছে; কিন্তু এক বিছানা কিছুতেই নয়। আইনেই আটকায়। এক বিছানা মানে বেড পার্টনার; ইংরিজি এই শব্দটার মধ্যেই ভয়ানক আন্তরিক কিন্তু আঁশটে গন্ধ আছে। অবশ্য একটা কাজ করে যেতেই পারে, ওকে মেঝেতে শুইয়ে আমি বিছানায় উঠে যেতে পারি; এতে টেনশানের মুক্তি আর শরীরের ব্যথার উপসম হয়। আইনও বাঁচে।

ওকে জাগাতে হল না। জেগেই ছিল। আমি বিছানায় উঠতেই হুড়মুড় করে উঠে বসল। শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নিল দ্রুত; নাইট ল্যাম্পের নীল আলোতেও দেখলাম, ওর চোখে মুখে কিছু আতঙ্ক।

চলবে…

গত পর্বের লিংক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-13/

১২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-12/

১১ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-11/

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.