ডুগডুগি (পর্ব ১৭)

1146

ছিটকে একটু সরে যায় ত্রিপর্ণা। বলে, ভালবাস না ছাই; তাহলে অজানা অচেনা একটা মেয়েকে বাড়িতে তুলতে না।

বলি, কী করব বল …।

কী করব মানে! ত্রিপর্ণা ফুঁসে ওঠে, এক্ষুনি পুলিশকে সব খুলে বল, ওকে জমা দিয়ে দাও থানায় …। আমি বাড়িতে ঝগড়া করে চলে এসেছি, এখন থেকে এখানেই থাকব।

আমি আঁতকে উঠি – কী পাগলের মতো বলছ।

পাগলামির কী দেখলে। ত্রিপর্ণা বলে, বউদির পরে তো আমার দাবিই বেশি … তা নয়, কোথাকার কে এসে জুটেছে … ।

আমি বলি, ঠিকই, এটা অস্বীকার করছি না, কিন্তু তোমাকে তো কুমকুমের মতো দেখতে নয়; কুমকুমের মতো দেখতে হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত, আমরা সুখে ঘর-সংসার করতাম দুজনে।

ত্রিপর্ণা বলে, কেন আমি কি খারাপ দেখতে।

না না, তা বলছি না …।

ত্রিপর্ণা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠে, অথচ তুমি কতবার বলেছ, আমাকে বৌদির চেয়ে ভাল দেখতে, বৌদির ফিগার আমার ধারেকাছে আসে না … বলনি, বল …? কী ধান্দায় বলেছিলে তখন …? মিথ্যেবাদী, লায়ার … ।

আমি বোঝাবার চেষ্টা করি, আসলে ভাল খারাপের প্রশ্ন নয় ত্রিপর্ণা … বউ পালানো বড় লজ্জার ব্যাপার … ।

ত্রিপর্ণা হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার ওপর। চুল ধরে বুকে কিল মারতে থাকে, পাগলের মতো কাঁদে, চুমু খায়, আমাকে বসায় সোফাতে, টেনে খুলে ফেলে নিজের জামা, ওর নরম বুকে মুখ গুঁজে বুঝতে পারি আমাকে জাগানোর চেষ্টা করছে।

কাঁদতে কাঁদতে বলে, দেখ, আমি দেখতে খারাপ … আমার ফিগার খারাপ … কত ছেলে আমাকে পাবার জন্যে … আমি শুধু তোমার কথা ভেবে … দেখ, ভাল করে দেখ … ।

টের পাই, আমার ভেতরের বজ্জাত ইচ্ছেগুলো ঘুম থেকে উঠে হাই তুলছে; চনমনে হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে … একবার দরজার দিকে তাকাই, দরজা বন্ধ, ও ঘরে একজন আছে … থাকুক গে, ও তো সত্যি সত্যি কুমকুম নয় … মনে করার চেষ্টা করি সদর দরজা বন্ধ করেছি কি না, … মনে পড়ছে না কিছুতেই … যাক গে, কুমকুম তো বাড়িতে নেই … আমার বাড়িতে বড় একটা কেউ আসে না … নিজের ভেতরে দাপাদাপি টের পাই … উথাল পাতাল শরীর সাড়া দিচ্ছে ত্রিপর্ণার ডাকে … আমি ওকে জড়িয়ে ধরি … চোখ বুজে আমার বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বিচিত্র সব শব্দ করছে ও, আচমকা ঘাড়ের কাছে একটু কামড়ে দেয় … আমিও কামড়াই ওর কানে … ঘড়ঘড়ে গলায় ত্রিপর্ণা বলে, বৌদির কাছে যা পাওনি, আমি তাই দেব … আমার ঔরসে তোমার গর্ভে ফুটফুটে বাচ্চা হবে একটা … আমাদের বাচ্চা …

খট করে কানে লাগে কথাটা। মারাত্মক ভুল বলেছে ত্রিপর্ণা; একদম অসম্ভব কথা, এ হতেই পারে না … সম্ভবত চূড়ান্ত পাগল অবস্থায় ভুলটা করে বসেছে … ওর ঔরসে আমার গর্ভে কি করে বাচ্চা হবে … আমার ঔরসে ওর গর্ভে সন্তান হতে পারে … মনে হল ওর ভুলটা ভেঙে দেওয়া উচিত, আমি বলি, ত্রিপর্ণা তুমি মারাত্মক ভুল বলেছ – তোমার ঔরসে আমার গর্ভে – কী করে সম্ভব, ওটা আমার ঔরসে তোমার গর্ভে হবে … ।

কথাগুলো বলতে চাই ত্রিপর্ণাকে; কিন্তু আমারই কেমন ওলট পালট হয়ে যায়; তোমার, আমার, ঔরস, গর্ভ সব তালগোল পাকিয়ে ঘুরতে থাকে চোখের সামনে, বারবার রিহার্সাল দিই, কিন্তু গুলিয়ে যায় তবুও … ।

এই প্রচণ্ড টানাপোড়ের মধ্যে কখন যেন ভেতরটা শান্ত হয়ে যায় আমার। অবাধ্য ইচ্ছেগুলো ফের কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে … ।

ত্রিপর্ণা চোখ খুলে বলে, কী হল তোমার! হঠাৎ অমন মিইয়ে গেল কেন …?

আমি অসহায়ভাবে মাথা নাড়ি। বলি, কী জানি বুঝতে পারছি না …।

ত্রিপর্ণা ফের ওর যাবতীয় কলাকৌশল প্রয়োগ করে আমার ওপর। কার্পেট বোম্বিং-এর মতো নাগাড়ে বোমাবর্ষণ করে … আমাকে ধ্বংস করতে চায় … কিন্তু ঔরস আর গর্ভ শব্দদুটো অ্যান্টি এয়ার-ক্রাফট কামানের মতো প্রতিহত করে ওর বিমান হানা …।

অনেকক্ষণ ব্যর্থ চেষ্টার পর সজোরে আমার তলপেটে লাথি কষায় ত্রিপর্ণা। প্রচণ্ড আক্রোশে বলে ঢ্যামনা।

বিনা বাক্যব্যয়ে আমি জামা-কাপড় পরে নিই ধীরে ধীরে।

(ষোলো)

আমি নিজে কোনওদিন ভুত দেখিনি। কিন্তু স্বচক্ষে ভুত দেখেছে এমন মানুষকে দেখেছি। আমাদের পাড়ার হরিজ্যাঠা। তখন কলেজে পড়ি; সন্ধ্যের পর মাচায় বসে গল্পগুজব করি। একদিন রাতে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরছি, আটটা – সাড়ে আটটা হবে, হঠাৎ হরিজ্যাঠার বাড়ির ভেতর তুমুল হইহল্লা। দৌড়ে গেলাম। হরিজ্যাঠা না কি ভুত দেখেছে। চোখগুলো গোলগোল, মনি স্থির, মুখ দিয়ে কেবল বু-বু-বু-বু-ভু … শব্দ বেরচ্ছে।

জল – বাতাস – আলো – লোকজন দেখে হরিজ্যাঠার ধাত ফিরল। কালো একটা ছায়ামূর্তিকে না কি জ্যাঠা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। জ্যাঠা কে-কে বলতেই অন্ধকারে বেমালুম মিলিয়ে গেছে। চোর-ছ্যাঁচড় হলে তো ছুটবে, শব্দ হবে, কিন্তু এ একেবারে যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল। জ্যাঠার এক দুর সম্পর্কের বোন অপঘাতে মরে ছিল; মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেল এটা তারই আত্মা। ওদের কুলপুরোহিত গয়ায় পিণ্ডদানের বিধান দিলেন। সত্যি বলতে কি, সেদিন বাড়ি ফেরার সময় একটু যেন গা ছমছম করছিল আমার, অন্ধকার ঝোপঝাড় দেখেও চমকে উঠছিলাম।

পরে অবশ্য জানতে পারি ওই ছায়ামূর্তি ভুত-পেত্নি কিছু নয়, আমাদের পাড়ার বিশ্বনাথ। বিশ্বনাথের সঙ্গে হরিজ্যাঠার ভাইঝি ঝিলিকের গোপন ভাব ভালবাসার সম্পর্ক ছিল।

বিশু সেদিন চাদর মুড়ি দিয়ে দেখা করতে এসেছিল ঝিলিকের সঙ্গে। 

আমার শ্বশুরমশাইয়ের অবিকল হরিজ্যাঠার দশা। চোখ গোল গোল, মনি স্থির, মাথা জোড়া টাক তাই, না হলে চুলগুলোও সজারুর মতো খাড়া হয়ে উঠত।

সকালবেলা চা খাচ্ছিলাম বারান্দায় বসে। তলপেটে ভীষণ ব্যথা। আগের দিন ওখানেই কষে লাথিটা মেরেছে ত্রিপর্ণা। কাল রাতেও ফোন করেছিল। বিস্তর গালিগালাজ করেছে। ওর সমস্যাটাও বুঝতে পারছি। মেয়েটা সত্যিই আমার ওপর খুব নির্ভর করে। কিন্তু এখন একে নিয়েই বা করব কী? থানায় ফেরত দিতে গেলে হাজার ঝামেলা। ত্রিপর্ণার যা অবস্থা দেখলাম, বাড়ি ফাঁকা পেলে এখান থেকে আর নড়বে না। ছোটবাবুর যা সন্দেহবাতিক, আমাকে প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করে মারবে। চা খেতে খেতে এইসব ভাবছিলাম। উঠোনের তারে ভিজে শাড়ি শুকোতে দিচ্ছিল ও। হঠাৎ বলা কওয়া নেই দেখি শ্বশুরমশাই একেবারে বাড়ির ভেতর। আর ওকে দেখেই অমন ভূত দেখার দশা।

চায়ের কাপ রেখে তাড়াতাড়ি নেমে এলাম উঠোনে। দেখি শাশুড়ি-মা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঢুকছেন। উনিও অবাক হয়ে দেখছেন দুজনকে।

আমি তাড়াতাড়ি ধরে ফেললাম শ্বশুরমশাইকে। থরথর করে কাঁপছেন। হাঁপাতে হাঁপাতে কোনওরকমে বললেন, অবনীশ, কী হচ্ছে বাবা কিছুই তো বুঝে উঠতে পারছি না।

আমি বলি, কেন?

কে এটি?

কেন, আপনার মেয়ে, চিনতে পারছেন না …?

তা কী করে হয় অবনীশ, আমি যে তাকে …?

আমার বুকের মধ্যে ধপাস করে ভারী কিছু একটা পড়ার শব্দ হয়। বলি, তাকে কি …?

এইমাত্র দেখে এলাম।

কোথায়? আমি বেশ জোরে বলে উঠি।

সে বড় লজ্জার কথা অবনীশ। শ্বশুরমশাইয়ের গলা বুজে এল, নিজের মেয়ে তো, ছিঃ ছিঃ … কিন্তু এ কে বাবা … আর যাকে দেখে এলাম সেই বা কে …?

শাশুড়ি-মা এগিয়ে এলেন ওর কাছে। চোখ কুঁচকে ভাল করে দেখলেন কিছুক্ষন। তারপর বললেন, না, এ তো আমার কুমকুম নয় …।

শ্বশুরমশাই ফ্যালফ্যাল করে একবার ওর দিকে, একবার আমার দিকে আর একবার শাশুড়ির দিকে তাকালেন। তারপর ধপ করে বসে পড়লেন উঠোনে। হাঁপাচ্ছেন খুব, শ্বাস নিচ্ছেন বড় বড়।

আমি তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাই শ্বশুরমশাইয়ের দিকে। হাত ধরে দাঁড় করাবার চেষ্টা করি। হাঁপাতে হাঁপাতে কোনওরকমে বলেন, এক গ্লাস জল দাও অবনীশ … ।

তাড়াতাড়ি জল এনে দেখি শাশুড়ি খুব গম্ভীর মুখে চোখ মুখ কুঁচকে দেখছেন ওকে। আর শ্বশুরমশাই সটান শুয়ে পড়েছে উঠোনে।

////////

শুনলাম কমল, বিমল, অমল নয়, ছেলেটার নাম শ্যামল। পাড়াতেই বাড়ি। কুমকুমের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ত। পাড়ার সমবয়সী ছেলেমেয়েরা যেমন করে, একসঙ্গে হাসিঠাট্টা গল্পগুজব করত।

শ্বশুরমশাই কান্নাধরা গলায় বললেন, বিশ্বাস কর অবনীশ ঘুনাক্ষরেও কিচ্ছুটি সন্দেহ হয়নি কোনওদিন। না হলে জেনে শুনে, তোমার মতো ভাল ছেলের এতবড় সর্বনাশ করি …?

শাশুড়ি বললেন, হায় হায়, অমন মেয়ের আঁতুড়েই মুখে নুন দিয়ে মেরে ফেলিনি কেন! কী লজ্জা বাবা, পাড়ায় টিকতে পারছি না …।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, আপনাদের আর কী দোষ … সবই কপাল …।

শ্বশুরমশাই বললেন, ছিঃ ছিঃ, মনে হচ্ছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ি, বুঝলে … বাঁচতে আর ইচ্ছে করছে না …।

আমি ব্যস্ত হয়ে বলি, আত্মহত্যা মহা পাপ বাবা … ওসব কথা মুখে আনবেন না …।

শাশুড়ি বলেন, কদিন যে কীভাবে কেটেছে …। শ্যামলের বাড়ির লোক দিন রাত কুকথা শোনাচ্ছে আমাদের, আমরা নাকি ষড় করে ওদের ছেলের সর্বনাশ করেছি … আমাদের না কি ছেলেধরা ডাইনির গুষ্ঠি …। তুমি তো আমাদের চেন বাবা … বল না …।

আমি বলি, সে তো একশবার।

শ্বশুরমশাই বললেন, আমি গিয়েছিলাম শ্যামলের বাড়ি, সোজা কুমকুমকে জিজ্ঞেস করলাম, একাজ কেন করলি, আমাদের মুখে চুনকালি মাখালি …?

চলবে…

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-16/

১৫ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-15/

১৪ পর্বের লিংক –   https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-14/

১৩ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-13/

১২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-12/

১১ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-11/

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.