ডুগডুগি (পর্ব ৭)

ওই কনস্টেবলই বাইকটা ভেতরে ঢুকিয়ে স্ট্যান্ড করল | পেছন পেছন ছোটবাবু আর আমি |

ছোটবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বউ আপনার হারাবে না তো কার হারাবে!

কী দেখে ছোটবাবুর এমন ধারণা হলো কে জানে! আমার মনে হলো, ছোটবাবু অতি-সরলীকরণ করে ফেলছেন | একটা বাইককে সাফল্যের সঙ্গে নাড়াচাড়া করতে না পারলে বউ পালাবে এটা ভেবে নেওয়া ঠিক নয় | দুনিয়ার বহু মানুষই এই কাজটা করতে গিয়ে ব্যর্থ হবে; তাদের সবারই কি বউ পালাচ্ছে? যাই হোক, ছোটবাবু তার নিজের বিশ্বাস নিয়ে থাক; পুলিশের ভ্রান্ত বিশ্বাস সংশোধন করা আমার কাজ নয় | আমার নিজেরই এখন বড় বিপদ; কী করে তা থেকে মুক্তি পাব সেই চেষ্টা বরং করাই উচিত |

ছোটবাবু ঘুরে ঘুরে বাড়িটা দেখলেন | রান্নাঘরে একটু বেশি সময় নিলেন | বেশ পরিপাটি গুছোনো রান্নাঘর | গ্যাস ওভেন, মিটকেস, তাকে ঝকঝকে বাসন, সারি সারি কৌটো | টেনে খুললেন ফ্রিজের দরজা; ফ্রিজে চাপা দেওয়া ভাত-ডাল-তরকারি | আগের দিন গলদা চিংড়ি এনেছিলাম | কুমকুম মালাইকারি করেছিল | চিংড়ি মালাইকারিটা দেখে একটু ভ্রু কোঁচকালেন | তারপর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথায় যেন চাকরি করেন?

আমি কোম্পানির নাম বললাম |
কী পোস্টে?
বললাম |

একটু বাঁকা হেসে ছোটবাবু বললেন, খাওয়া-দাওয়া তো বেশ গর্জাস করেন দেখছি, মাইনে কত?

এবার আমি মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম, না না, তেমন কিছু নয়…|

বলেন কী! ছোটবাবু বাঁকা হাসি মুখে ধরে রেখেই বললেন, চিংড়ির যা সাইজ দেখছি, মিনিমাম তিন-সাড়ে তিনশো করে কিলো হবে; এটাও যদি তেমন কিছু না হয়…! চিংড়ি কি রোজই খান?

না না, রোজ নয় | আমি তেমন পছন্দ করি না; কুমকুম ভালবাসে, তাই মাঝেমধ্যে পেলে নিয়ে নিই |
হুম| ছোটবাবু গম্ভীর হয়ে তাকালেন আমার দিকে |

আমি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিই ছোটবাবুর চোখ থেকে | আশংকা হয়, ছোটবাবু মিথ্যে কথাটা ধরে ফেললেন বোধহয় | চিংড়ি আমি খুবই পছন্দ করি; বরং কুমকুমের এলার্জির সমস্যা আছে বলে খেতে চায় না | তবু মিথ্যে কথাটা বললাম; ছোটবাবুকে বোঝাতে চাইছিলাম, বউকে আমি কতটা ভালবাসি |

ছোটবাবু বললেন, বিশ্বাসদা, চিংড়ি খাবেন নাকি; এমন সাইজ তো ঝট করে পাওয়া যায় না |

বুঝলাম কনস্টেবলের পদবী বিশ্বাস | আমি তাকালাম বিশ্বাসের দিকে | বিশ্বাসের মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, চিংড়ি খাবার প্রবল ইচ্ছে; কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছে না |

বুঝলাম পুলিশের চাকরি কী কঠিন, কী ভীষণ নিয়ম-শৃঙ্খলায় বাঁধা! এরা দুজন এখন যদি চিংড়ির মালাইকারিটা খেয়ে নেই, আমার কিছু বলার নেই | কিন্তু কর্তব্যের খাতিরে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয় |

মালাইকারি ভেতরে রেখেই ফ্রিজ বন্ধ করে দিলেন ছোটবাবু | টর্চ নিয়ে ছাদে উঠলেন | নেমে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার স্ত্রী ডায়রি-টায়রি কিছু লিখতেন না?

বললাম, হ্যাঁ, লিখতেন |

খুব উত্সাহের সঙ্গে ছোটবাবু বললেন, লিখতেন! কোথায় সেটা; একটু দেখব |

বললাম, সেটা তো পুড়ে গেছে |

পুড়ে গেছে, পুড়ল কী করে; নাকি আপনিই পুড়িয়ে দিয়েছেন, সত্যি করে বলুন | ছোটবাবু ধমকে উঠলেন |

বিশ্বাস করুন | আমি বলি, আমাদের রান্নাঘরে যেবার আগুন লাগে, তখন পুড়ে যায় |

ডায়রি উনি রান্নাঘরে রাখতেন নাকি?

রাখত না; তবে মাঝে মাঝে নিয়ে আসত | একবার একটা মেক্সিকান পদ রান্নার জন্য নিয়ে এসেছিল – সেবারই স্টোভের তেল উপচে রান্নাঘরে আগুন লাগে – ডায়রিটা পুড়ে যায় – ও তখন বাথরুমে ছিল, তাই বরাতজোরে বেঁচে গেছে – দেখুন না, দেওয়ালের একটা জায়গা এখনও কালো |

ছোটবাবু ভয়ংকর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন | অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে | কিন্তু ওই বিশ্বাসদা ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে | সেই বুঝিয়ে দিল ছোটবাবুকে – এ ডায়রি, সে ডায়রি নয় – এ রান্না লেখা ডায়রি |

ছোটবাবু ধমকে উঠলেন আমাকে, ধুর মশাই, রান্না লেখা ডায়রি কে চায়, আমি গুপ্তকথা লেখা ডায়রির কথা বলছি; তেমন কিছু নেই?

আমি বলি, না স্যার |

ঠিক বলছেন? ছোটবাবু গলা ফের গম্ভীর করলেন |

বলি, সত্যি বলছি স্যার – অমন ডায়রি কুমকুমের থাকবে কেন; সে তো যাদের মনে খুব দুঃখ-টু:খ থাকে তারা লেখে |

ছোটবাবু বলেন, আপনি শিওর, আপনার ওয়াইফের কোনও দুঃখ ছিল না?

ছোটবাবুর এই প্রশ্নটা থমকে দেয় আমায় | আমি ভাবতে বসি | তাই তো – তাই তো – কুমকুমের কি দুঃখ ছিল না কিছু? ছিল তো, অনেকগুলো দুঃখ ছিল কুমকুমের – হুড়হুড় করে মনে পড়তে থাকে আমার | ইদানীং কুমকুমের চুল উঠছিল খুব, একটা অটোক্লিন চিমনির শখ ছিল. পোষা টিয়াপাখিটা উড়ে গিয়েছিল কিছুদিন আগে, ওর বাবা-ময়ের শরীর দিন দিন খারাপ হচ্ছিল – এসব কিছু নিয়ে একাধিকবার ওকে দুঃখ প্রকাশ করতে দেখেছি |

দেখলাম, ছোটবাবু একদৃষ্টে তাকিয়ে আমার দিকে | সেই দৃষ্টির মধ্যে সম্ভ্রম উদ্রেককারী একটা ব্যাপার আছে | সত্যি পুলিশ অন্তর্যামী – ঠিক ধরে ফেলেছে কুমকুমের অনেক দুঃখ ছিল | আমি ওর দুঃখের লিস্টটা প্রায় পড়ে শোনাতে যাচ্ছিলাম; কিন্তু শেষ মুহূর্তে সংযত করে নিলাম নিজেকে | এমন দুঃখ তো কমবেশি সকলের আছে; এসব পাতি দুঃখের কথা কেউ দেরিতে লেখে না; ডায়রি হৃদয় তোলপাড় করা, নাড়ী ছেঁড়া দুঃখের জন্যে |

ছোটবাবু বললেন, কী হলো, আপনি শিওর ওর কোনও দুঃখ ছিল না?
বলি, ছিল; তবে সেগুলো গুরুতর কিছু নয় |
তবু শুনি |

আমি কুমকুমের দুঃখগুলো একে একে ছোটবাবুর কাছে কবুল করি |

ছোটবাবুর মুখে ব্যাঙ্গের একটা হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে যায় | বলেন, এই জন্যেই আপনাকে ক্যালানে বলি |
আমি খুব সরলভাবে বলি, কেন স্যার?

কোনও দুঃখকেই কখনও হালকাভাবে নেবেন না | আপনার কাছে যেটা সামান্য ব্যাপার, অন্যের কাছে সেটাই ভয়ঙ্কর | আপনি কি জানেন, বাবার কাছ থেকে সামান্য একটা মোবাইল পায়নি বলে এক স্কুল ছাত্রী সুইসাইড করেছিল, ওয়াশিং মেশিন কিনে দেয়নি বলে, এক স্ত্রী স্বামীর কাছে ডিভোর্স চেয়েছিল – তারপর ধরুন চুল, বহু মানুষ চুল হারিয়ে যত হাহাকার করে মাতৃ বা পিতৃশোকে তার এক শতাংশ নয় | সুতরাং, দুঃখ মাপার কোনও স্টান্ডার্ড স্কেল নেই জানবেন…|

ছোটবাবুর অমোঘ যুক্তিজালে জড়িয়ে আমি হাঁসফাঁস করি | খুব মৃদু গলায় বলি, তা অবশ্য ঠিক |

ছোটবাবু চিলতে অহংকারের হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন | ভাবখানা এমন – পুলিশ মানেই শুধু হুড়ুম-দুড়ুম গুলি-বন্দুক নয়, পুলিশও পারে গম্ভীর দার্শনিক হতে |

নীরবতা ভেঙে আমার মোবাইল বেজে উঠল | ছোটবাবুর দার্শনিক-সুলভ দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশমার্কা হয়ে ওঠে | পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে মৃদু ধাক্কা খাই | ত্রিপর্ণা | মেয়েটা আর ফোন করার সময় পেল না!

একটু তফাতে সরে গিয়ে বললাম, হ্যালো!

ত্রিপর্ণা বলল, তুমি কি বেরিয়ে পড়েছ অফিস থেকে?

বললাম, আমি আজ অফিস যাইনি |
কেন?
সে অনেক ব্যাপার |
কী হলো আবার – শরীর খারাপ?
না না, শরীর ঠিক আছে |
তাহলে; তুমি কোথায় এখন?
বাড়িতে |

আমার শরীরটা খারাপ | ত্রিপর্ণা বলে, কাল ফেরার সময় ঠান্ডা লেগে গেছে – বসে জানলার ধরে বসেছিলাম, হাওয়াটা সরাসরি লেগেছে |

ত্রিপর্ণার টনসিলের সমস্যা আছে | প্রতি বছর সিজন চেঞ্জের সময় ভোগে | কাল হলে ঢোকার সময় বলল, একটা ভুল হয়ে গেছে, গরম পোশাক কিছু আনা হয়নি | ঠিক ছিল, সিনেমা দেখে ধর্মতলার কোনও স্টল থেকে মাথায় বাঁধার স্কার্ফ-টার্ফ কিছু একটা কিনে নেব | কিন্তু হল থেকে বেরিয়ে খুব গম্ভীর ছিল ত্রিপর্ণা; কোথাও কম বলছিল; আমিও কৃতকর্মের জন্যে একটু অনুতপ্ত ছিলাম, ফলে ভুলে যাই স্কার্ফের ব্যাপারটা | রবীন্দ্রসদন মোড়-এ শাল গায়ে একটি মেয়েকে দেখে মনে পড়ে যায় আমার, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে |

আড়চোখে দেখলাম ছোটবাবু ছুঁচলো দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে | চাপা গলায় কথা বললে সন্দেহ করতে পারেন | তাই, একটু জোর গলায় বলি, ডাক্তার দেখিয়েছ?
না, দেখাইনি এখনও |
গায়ে জ্বর আছে নাকি?
না জ্বর নেই; কিন্তু ভীষণ গলা ব্যথা |

বলি, নুন জলে গার্গেল করো, ঠিক হয়ে যাবে; আমি ছাড়ছি এখন….|

পকেটে ফোনটা রেখে ছোটবাবুর দিকে সরাসরি তাকাই | সেই একই দৃষ্টি | এই ছুঁচ-দৃষ্টি যখন তখন বের করেন ছোটবাবুরা; সন্দেহজনক কোনও বেলুন দেখলেই ফুটো করে দেন |

ছোটবাবু বললেন, কে ফোন করেছিল?
ও আমার এক পরিচিত |
কালা?
না তো!
অত চিত্কার করে কথা বলছিলেন কেন?

বুঝতে পারি চিত্কারটা একটু বেশি রকমের হয়ে গেছে; ছোটবাবুর কানে লেগেছে | এই আমার চিরকালের সমস্যা – করতে যাই একরকম, হয়ে যায় আর এক | হঠাৎ বুদ্ধিটা খেলে যায় মাথায় | বলি, টাওয়ারের প্রবলেম; ভালো শোনা যাচ্ছিল না |
কোথায় বাড়ি?
কোন্নগরের নবগ্রামে |
হুম! ছোটবাবু গম্ভীর গলায় বলেন, কী নাম?

একটু চুপ করে থাকি আমি | বুঝতে পারছি, ছোটবাবুর যেরকম সন্দেহবাতিক, নামটা শুনলেই রহস্যের ভুরভুরে গন্ধ পেয়ে যাবে; তখন প্রশ্নের ফোয়ারা ছুটে আসবে আমার দিকে |

ছোটবাবু বলেন, কী হলো, নাম ভুলে গেছেন নাকি; কেমন পরিচিত আপনার?

বলি, বলাই সামন্ত |
এটা ত্রিপর্ণার বাবার নাম | কুমকুমের যাতে সন্দেহ না হয়, ত্রিপর্ণার বাবার নাম সেভ করে রেখেছিলাম ফোনে; তাই ওই নামটাই বলে দিলাম |

ছোটবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন | তখনই আমার পকেটের মোবাইল বেজে উঠল আবার | মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলাম, যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই | ত্রিপর্ণা |

ফোন ধরতেই ত্রিপর্ণা বলে উঠল, এই তুমি কি আমার রাগ করেছ আমার ওপর? কাল আসলে আমার মুডটা অফ ছিল, ছোড়দা কাল বাড়িতে প্রচন্ড অশান্তি করে তাই…|

আমি তাড়াতাড়ি বলি, রাগ-টাগ কিছু করিনি – আমি এখন খুব ব্যস্ত! পরে কথা বলব তোমার সঙ্গে |

 

চলবে

গত পর্বের লিংক – https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-6/

৫ম পর্বের লিংক –https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-5/

৪ র্থ পর্বের লিংক –https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-4/

৩য় পর্বের লিংক –https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-3/

২য় পর্বের লিংক –https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-2/

১ম পর্বের লিংক –https://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick/

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Illustration by Suvamoy Mitra for Editorial বিয়েবাড়ির ভোজ পংক্তিভোজ সম্পাদকীয়

একা কুম্ভ রক্ষা করে…

আগের কালে বিয়েবাড়ির ভাঁড়ার ঘরের এক জন জবরদস্ত ম্যানেজার থাকতেন। সাধারণত, মেসোমশাই, বয়সে অনেক বড় জামাইবাবু, সেজ কাকু, পাড়াতুতো দাদা