ডুগডুগি

1493

আমি, শ্রী অবনীশ হালদার, পিতা স্বর্গত চন্দ্রকান্ত হালদার, গ্রাম – ভত্তনগর, ডাক – শিমূলদহ, জেলা-হাওড়া, প্রকৃতপক্ষেই একজন শান্তিকামী, নির্বিরোধী, কিঞ্চিত ধান্দাবাজ এবং ঈষৎ চরিত্রহীন ভারতীয় নাগরিক | মাতৃভাষা বলাবাহুল্য বাংলা |

আমি শান্তিকামী, কারণ জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, পাড়ার মস্তানদের জুলুমবাজি, প্রশাসনের অব্যবস্থা, নেতাদের ভন্ডামি ইত্যাদি নিয়ে মানসিকভাবে গুমরে মরলেও প্রকাশ্য প্রতিবাদে যাই না |

আমি ধান্দাবাজ ও তৎ কারণেই ধাপ্পাবাজ | কর্মক্ষেত্রে লেট করলে বিস্তর মিথ্যে অজুহাত দিই, বেশ পাকাপোক্ত একটা এক্সট্রা-ম্যারিটাল থাকলেও বউ কুমকুমের কাছে বেমালুম চেপে যাই | এই আমিই আবার অফিসের ঊর্দ্ধতনকে সুযোগ বুঝে তোষামোদ করি, সহকর্মীদের নামে চুকলি কাটি, দু’একশো টাকা উপরি পেলে খুশিমনে গ্রহণও করি |

অবশ্য চরিত্রহীনতার ব্যাপারে আমার নিজের মধ্যেই কিছু দ্বিধা আছে | সত্যি বটে বাসে বা মেট্রোয় লেডিস সিটের সামনে দাঁড়াতে পছন্দ করি, খুব ভিড়ের সময় সুঠাম যৌবনবতী শরীর লেপ্টে দাঁড়ালে মন্দ লাগে না, আর সবচেয়ে বড় কথা, ত্রিপর্ণা নাম্নী এক শ্যামবর্ণা, চলেবল মুখচোখের অবিবাহিত অনূর্দ্ধ তিরিশের মহিলার ওপর আমার কিছু সফটনেস আছে | এবং ভাইসি ভার্সা |

তবে এই পরকীয়াটার ব্যাপারে আত্মপক্ষ সমর্থনে আমি কিছু বলব | প্রায় দশ বছরের বিবাহিত জীবন আমাদের | আর পাঁচটা দম্পতির মতো আমরাও একসঙ্গে খাই দাই ঘুমোই হাসিমুখে অতিথি আপ্যায়ন করি; আমি ওর মাথা ধরার বড়ি এনে দিই, ও আমার অন্তর্বাস কেচে দেয় | কিন্তু গভীর অন্তর্দৃষ্টিধারী কেউ যদি আমাদের এই গোলগাল নিটল দাম্পত্যের গায়ে অল্প টকা দেয়, তবে একটা ফাঁপা ঢ্যাপঢ্যাপে শব্দ ছাড়া কিছু পাবে না |

আমরা নিঃসন্তান |

আমাদের প্রেম কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো একটু একটু ক্ষয়ে গিয়ে এখন ভরা অমাবস্যা | রাতে যখন বিছানায় শুয়ে থাকি, ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেউ কাউকে দেখতে পাই না; নিঃশ্বাস ফেলি অতি সাবধানে, এমনকী সতর্ক থাকি দীর্ঘশ্বাসেও যেন শব্দ না হয় | আমার ধারণা সন্তান হচ্ছে খুব ঠাণ্ডা ঘরে ফায়ার-প্লেস, যেটাকে ঘিরে বসে দুজন মানুষ শরীরের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে |

ইদানীং এমন হয়েছে কোনও গ্যাদারিং-এ যেতে চায় না কুমকুম | বন্ধুরা যখন ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, গানবাজনা, দুষ্টুমি নিয়ে কথা বলে আমি উঠে যাই | অভাবী কেউ একাধিক সন্তান নিলে ব্যঙ্গ করে বলি, দেখেছ এদিক নেই ওদিক আছে | অন্য কোনও নিঃসন্তান দম্পতি দেখলে আনন্দ হয়, তাদের সঙ্গে ভাব জমাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি |

আর এসবের মধ্যেই বুঝতে পারি, দুজনের মধ্যে একটা মস্ত ফাঁকা জমি পড়ে আছে, যেটা নোংরা আবর্জনার স্তূপে ভরে উঠছে দিন দিন | একে অপরের কাছে যেতে গেলে এইসব আবর্জনা মাড়িয়ে যেতে হবে |

মনে হয়, শুধু একটা সন্তান থাকলে আমাদের দাম্পত্যে এত সমস্যা হয় না |

কিন্তু এই মুহূর্তে আমার সামনে অন্য এক সমস্যা – ভয়ঙ্কর এক বিপদ | কাল থেকে কুমকুম নিখোঁজ | কুমকুমকে লাস্ট দেখি অফিসে যাবার সময় | ও রোজকার মতোই আমায় ভাত বেড়ে দেয় সকাল ন’টায় | খেয়ে উঠে জামাপ্যান্ট পড়ে দশটা পাঁচে অফিস বের হই | কুমকুম তখন ফোনে কথা বলছে | আগে বেরোবার সময় গেটে দাঁড়াত; এখন দাঁড়ায় না | আমি অফিস যাবার সময় ‘আসছি’ বলতাম আগে; এখন বলি না | বাইরে থেকে দরজাটা টেনে দিয়ে গিয়েছিলাম, মনে আছে | কাল বাড়ি ফিরি অন্যদিনের চেয়ে দেরি করে | ত্রিপর্ণার সঙ্গে গ্লোবে সিনেমা দেখেছিলাম | ছবিটা হট-ছবি | তুমুল বেড-সিন ছিল কয়েকটা; রীতিমতো শিহরণ জাগানো দৃশ্য | ত্রিপর্ণাকে বেড় দিয়ে ধরেছিলাম; ওর শরীরের প্রখর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে উদ্দীপনা জোগাবার চেষ্টা করছিলাম | কোনও কারণে ঠিক মুডে ছিল না ত্রিপর্ণা | খুব সঙ্গত কারণেই ওর মেয়েমানুষিগুলোও কেমন যেন মুহ্যমান ছিল | আমার হাতটা ধরে ত্রিপর্ণা নিজে বেড়মুক্ত হলো প্রথমে, তারপর ভঙ্গুর জিনিসপত্র যেভাবে মানুষ সাবধানে নামিয়ে রাখে, সেভাবে ধীরে ধীরে আমার কোলেই রেখে দিল আমার হাত | এসব ব্যাপারে জোর খাটাতে আমি কোনোদিনই পারি না | শুধু ত্রিপর্ণা কেন, নিজের বিবাহিত স্ত্রী কুমকুমের সঙ্গে যখন নিয়মিত ঘনিষ্ঠতা হতো, তখনও, কোনোদিন কুমকুম কান-কটকট বা দাঁত-কনকনের মতো সামান্য সমস্যার কথা বললেও নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতাম সঙ্গে সঙ্গে | বেশ কয়েকবার কুমকুম প্রভূত বিস্মিত হয়েছে | ও বোধহয় এত সহজ নিষ্কৃতি আশা করেনি | শোবার পর অনেকক্ষণ দেখি উসখুস করছে | এমনিতে আমার ঘুম বড় প্রবল; এসব দিনে আবার প্রবলতর নিদ্রায় তলিয়ে যাই, কারণ জানি, আমি পুরুষমানুষ, একখানা বজ্জাতির ডিপো, কখন কোন শয়তানিটা যে আগলমুক্ত হয়ে অনাসৃষ্টি ঘটিয়ে বসে ঠিক নেই | এমনও হয়েছে, কিছুক্ষণ পরে কুমকুম ধাক্কা দিয়ে জাগিয়েছে আমায়; বলেছে, কী ব্যাপার, আচ্ছা লোক তো!

আমি ধড়ফড় করে উঠে বসি | বলি, কী ব্যাপার….!
তুমি ঘুমচ্ছ!
না, একটু তন্দ্রামতো এসে গিয়েছিল | আমি সাফাই গাইবার চেষ্টা করি |
বাজে কথা বোল না; নাক ডাকছিল তোমার |

জনশ্রুতি আছে, ঘুমলে আমার নাক ডাকে | যদিও আমি নিজে কখনও শুনিনি | শুধু আমি কেন, কোনও মানুষই নিজের নাসিকাগর্জ্জন শুনতে পায় না | পৃথিবীতে গুটিকতক অসম্ভব কাজের মধ্যে এটি একটি এবং স্বয়ং নেপোলিয়নও যে এ কাজে ব্যর্থ হতো তা একরকম নিশ্চিতভাবেই বলা যায় | বাড়ির লোক, আত্মীয়-স্বজন, এমনকী পাড়া প্রতিবেশীরা পর্যন্ত এ ব্যাপারে সতর্ক করেছে আমায় | একবার কার্জন পার্কে গাছতলায় বসা এক হস্তরেখাবিদ গভীর অভিনিবেশ সহকারে আতস কাচ-টাচ লাগিয়ে আমার হাত দেখে বলেছিল, তোমার নাক ডাকে; ঠিক কি না? সেদিন ওই হস্তরেখাবিদের অধিকাংশ কথা মিথ্যে প্রমাণিত হলেও, এই একটি ব্যাপারে সে ছিল অভ্রান্ত |

মোট কথা, আমার নাক ডাকার ব্যাপারটা প্রমাণিত এবং সত্য | তাই কিছু কুন্ঠিতভাবে কুমকুমকে বলি, সরি | আমি বরং ও ঘরে গিয়ে শুই |

ও ঘরে! কেন? কুমকুম বেশ বিস্ময় প্রকাশ করে |
আমি বলি, তোমার শরীর খারাপ; তার ওপর আমার নাক ডাকছে…|
কুমকুম বলে কোথাও যাবে না | আমার শরীর খারাপ –তোমার কি কোনও ডিউটি নেই!

‘ডিউটি’ শব্দটাকে কোনোদিনই আমার তেমন পছন্দ নয় | স্কুল-লাইফে কেবলই বানানটা ভুল করে বসতাম | সাংসারিক জীবনেও তাই –মনে হয় দুনিয়ার যত ডিউটি সব বস্তাবন্দি করে বঙ্গোপসাগরের জলে বিসর্জন দিই | কিন্তু, মনের কথা মনের মধ্যে চেপে রেখে একজন আপাদমস্তক ডিউটিফুল হাসব্যান্ডের মতো স্ত্রীর কথায় সায় দিয়ে বলি, সে তো বটেই! কী করতে হবে বল না!

একটু হাত বুলিয়ে দাও |

সেদিন কুমকুমের কান কটকট করছিল | কান কটকট করলে ঠিক কোন জায়গায় হাত বুলোতে হয় ভেবে পাচ্ছিলাম না | কুমকুম দেখলাম, আরও আমার শরীর ঘেঁষে শুলো; তারপর দেখিয়ে দিল, কানের ব্যথার উপশমে ঠিক কোথায় কী ভাবে হাত বোলাতে হয় | বলাবাহুল্য, খুব দ্রুত আমার হাত, কুমকুমের অবাধ প্রশ্রয়ে, কানের সীমানা ছাড়িয়ে অন্যত্র যাতায়াত শুরু করল এবং কুমকুম তীব্র আশ্লেষে আমায় জড়িয়ে ধরে কী ভীষণ একটা আদুরে গলায় বলল, ঢং! এখন আমি বুঝে গেছে, দন্তশূল বা কর্ণপ্রদাহ কোনও রোগ নয়; রোগের উপসর্গ মাত্র |

যাই হোক, যে কথা বলছিলাম –ত্রিপর্ণা, আলো-আঁধারির গ্লোব এবং নিজের অপ্রস্তুত হাত | বাকি সময় উজবুকের মতো নিজের হাত কোলে নিয়ে বসে রইলাম | তারপরেও কয়েকটা বেড-সিন ছিল; জিতেন্দ্রিয় পুরুষের মতো স্বচ্ছন্দে উতরে দিলাম সেগুলো | সিনেমার পর মেট্রো ধরে রবীন্দ্রসদন; সেখান থেকে বাসে চাপলে চল্লিশ-পয়তাল্লিশ মিনিটে আমার গ্রাম | খাতায়-কলমে গ্রাম; কিন্তু খুব চটজলদি শহুরে একটা চাপকান গায়ে তুলছে | এলাকায় বেশ কয়েকটা বিউটি পার্লার, একাধিক নার্সিং হোম, এ সি লাগানো রেস্টুরেন্ট, ছোটদের আমোদ-প্রমোদের জন্য পার্ক আর বড়দের মদ্যপানের জন্য বার | তবে এখনও কিছু গাছ গাছালি আছে, শীতকালে কিছুদিন ঠাণ্ডা পড়ে. আর কেচ্ছাকেলেঙ্কারি একটা ঘটলে বেশ গুজগুজ-ফুসফুস চলে কিছুদিন |

বাস থেকে নামলাম যখন, রাত ন’টা | স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে আমার বাড়ি পাঁচ-সাত মিনিট | কাটা-দশেক জায়গার ওপর একতলা বাড়ি | মা যতদিন বেঁচে ছিল সামনে ফুলের গাছ-টাছ লাগাত; এখন আগাছার বাড়বাড়ন্ত | মায়ের হাতে লাগানো একটা কামিনী আর একটা গন্ধরাজ গাছ কেবল এখনও সিজন এলে ঠিক ফুল ফোটানোর ডিউটিটা করে যায় |

গেটে একটা ষাট পাওয়ারের বাল্ব জ্বলে; কাল দেখলাম অন্ধকার | প্রথমে ভেবেছিলাম লোডশেডিং | কিন্তু আশেপাশের বাড়িগুলো থেকে ঠিকরে আসা আলোর ছটা দেখে বুঝলাম লোডশেডিং নয় | আরও বিস্ময়ের ব্যাপার, বাড়ির ভেতরও ঘুটঘুটে অন্ধকার | তারপর বিস্ময়ের ওপর বিস্ময় | কুমকুম নেই | বাড়ির ভেতর সবকিছু ঠিকঠাক; শুধু কুমকুম নেই | নেই তো নেই – একদম গায়েব |

…চলবে

Advertisements

3 COMMENTS

  1. শুরু তো মারাত্নক । টানছে । ১ ম পর্বেই ২য় টার লিঙ্ক , এইভাবে পর পর থাকলে আরও ভাল হয় । নির্মাল্য কুমার মুখোপাধ্যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.