সুপ্রিয় চৌধুরী
জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর কলকাতার পুরোনো পাড়ায়। বহু অকাজের কাজী কিন্তু কলম ধরতে পারেন এটা নিজেরই জানা ছিল না বহুদিন। ফলে লেখালেখি শুরু করার আগেই ছাপ্পান্নটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। ১৪২১ সালে জীবনে প্রথম লেখা উপন্যাস 'দ্রোহজ' প্রকাশিত হয় শারদীয় 'দেশ' পত্রিকায় এবং পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে আরও দুটি উপন্যাস 'জলভৈরব' (১৪২২) এবং 'বৃশ্চিককাল' (১৪২৩) প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে পুজোসংখ্যা আনন্দবাজার এবং পত্রিকায়। এছাড়া বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং দু চারটি ছোটগল্প লিখেছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আর লিটিল ম্যাগাজিনে। তার আংশিক একটি সংকলন বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে 'ব্যবসা যখন নারীপাচার' শিরোনামে। ২০১৭ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার।

নার্সিংহোমের বেডে শুয়েছিল ব্রিজেশ মিশ্র। প্লাস্টার মোড়া পা-টা একটা দড়ির ফাঁশে উঁচু করে ঝোলানো। বয়সে অভিরূপের চেয়ে কিছুটা ছোটই হবে। রুম ফ্রেশনার আর ওষুধ ওষুধ গন্ধ কেবিন জুড়ে। হাল্কা শব্দে এসি চলছে। একটা টুলে বসা অভিরূপ। পাশে তিনটে চেয়ারে এক বয়স্ক দম্পতি আর বছর বাইশ তেইশের একটা মেয়ে। আলাপ করিয়ে দিলো ব্রিজেশ। বাবা মা ও স্ত্রী। তারপরে নম্রস্বরে বলল – ‘পিতাজী আপলোগ মেহেরবানি করকে জরা বাহার যাইয়ে। ইনসে মেরা কুছ বাত করনা হায়।’

Banglalive

সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর অভিরূপের দিকে তাকালো ব্রিজেশ। ‘সরি দাদা, মেরা কারণ আপকো ইতনা তকলিফ ঝোলনা পড়হা। লেকিন ক্যা করে … নসিব। উসকা উপর কিসিকা নেহি চলতা। রাস্তায় পোড়া মবিল পড়েছিলো। টায়ার স্কিট করে গেল। সাম কা টাইম থা। সহি তরহা সে দেখ নেহি পায়া। আফশোষ …’

‘আরে তুমি কী করবে?’ কথার মাঝখানে ব্রিজেশকে থামালো অভিরূপ, ‘আ কেস অফ শিওর অ্যাকসিডেন্ট। নাথিং ডুয়িং অ্যাবাউট ইট। ও নিয়ে তুমি একদম চিন্তা কোর না। নাও, লেটস কাম টু দ্য পয়েন্ট। হোয়াটস অ্যাবাউট আওয়ার ফিউচার প্ল্যান?’

‘এভরিথিং ইজ সেট দাদা’, গলাটাকে একদম খাদে নামিয়ে আনলো ব্রিজেশ। ‘ওদের কনট্যাক্ট পারসনের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে আমার। পরশো রোজ সাত বাজে এক বাস ছোড়েগি রাঁচি বাসস্ট্যান্ড সে, লাতেহার যানে কা। নাম বায়ুদূত। গাড়ি নাম্বার থ্রি সিক্স থ্রি নাইন। সেই বাসে চড়ে বসবেন আপনি। কোথায় নামতে হবে রাস্তাতেই জানতে পেরে যাবেন। আমাকে শুধু এটুকু বলা হয়েছে, যেখানে নামবেন ঠিক সেখানেই অপেক্ষা করবেন। কোথাও যাবেন না। কেউ আসবে আপনাকে নিতে। কোড ল্যাঙ্গুয়েজে প্রশ্ন করবে – ‘পাঞ্জা?’ আপনার জবাব হবে ‘দুনি পাঞ্জা’। আব ওহ যাঁহা লে যায়গা ওহি যানা হোগা আপকো।’ বলতে বলতে চোখমুখ ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠছিল ব্রিজেশের। ‘তবে আমাকে একটা হিন্টস দিয়েছে ওরা। কম সে কম তিনদিন পয়দল চলনা হোগা আপকো। উনলোগোঁকা ঘাঁটি ইলাকা মতলব ‘গেরিলা জোন’-মে পঁহুছনেকে লিয়ে। উঁহা পার্টি কা টপ লিডারশিপসে কই বাত করেগা আপ কে সাথ। কাল সেভাবে আপনার কোন কাজ নেই। শুধু সকাল দশটায় ঝাড়খণ্ড পুলিশের অ্যান্টি-নক্সালাইট স্কোয়াড ‘কোবরা’-র হেডকোয়ার্টারে একবার দেখা করে নেবেন ওদের কমান্ড্যান্ট ইন চিফের সঙ্গে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্সড করা আছে। অ্যান্ড আই ডু রিপিট ইট এগেইন, ‘দুনি পাঞ্জা’ কোডটা কিছুতেই ভুলবেন না প্লিজ। গলত জবাবকে বদলে বুলেট চল সকতা হায় উল্টা তরফ সে।’

‘ডোন্ট ওয়রি। আই উইল কীপ ইট ইন মাই মাইন্ড। সো, টেক কেয়ার অ্যান্ড গেট ওয়েল সুন।’ দৃশ্যতই উদ্বিগ্ন ব্রিজেশের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বেরিয়ে এসেছিলো অভিরূপ।

আরও পড়ুন:  রিকশা ও শাশুড়ি

‘আই জাস্ট ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড ওয়ান থিং। হোয়াই ইউ মিডিয়া পিপল অ্যান্ড সাম সো কলড ইন্টেলেকচুয়াল সিভিলিয়ানস রোমান্টিসাইজ দেম আননেসেসারিলি। দে আর নাথিং বাট আ গ্যাং অফ নটোরিয়াস ব্যান্ডিটস।’ বলতে বলতে ঘর জুড়ে পায়চারি করছিলেন রণজিৎ সিং রাঠোর। কোবরা ব্যাটেলিয়ান কম্যান্ডান্ট ইন চীফ। সামনে বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিল। পিছনে দেয়ালে ঝোলানো বাঁধানো ফ্রেমে সাদার ওপর বড় বড় কালো অক্ষরে লেখা ক্যাপশন – ‘ফাইট দ্য গেরিলাস লাইক দ্য গেরিলাস’। রাঠোরের হাইট কম সে কম ছ ফুট দুই কি তিন। বলিষ্ঠ লোহাপেটা চেহারা। আজানুলম্বিত দুটো হাত। চওড়া চৌকোনা দৃঢ় চোয়াল। নাকের নীচে পাকানো মোটা মোচ। কিউপিড থুতনি। পরনে ডার্ক ডেনিম ব্লু জিনস। স্নিকার। হাতের পেশিগুলো যেন ফেটে বেরোচ্ছে লেমন ইয়েলো টি শার্টের হাতা ভেদ করে। পায়চারি করতে করতে বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করছিলেন অভিরূপকে। পাল্লা দিয়ে চড়ছিল গলার আওয়াজ। ‘ডু ইউ নো? সেই ফ্রম আর্লি এইট্টিস সারাদেশে সিকিওরিটির হাজারখানেকের ওপর জওয়ান শহীদ হয়েছে ওদের হাতে। এই ঝাড়খণ্ডেই, ওয়ান অফ আওয়ার ব্রেভমোস্ট অফিসার, ফ্রান্সিস ইন্দুয়ার … দোজ মাদারফাকার টেররিস্টস কিলড হিম ইন সো ক্রুয়েল ম্যানার … শর সে ধর আলগ কর দিয়া থা উনকা, ওহ শুয়ার কে বাচ্চো নে। কভি উসকা বিবি আওর বাচ্চা কা রোতা হুয়া চেহরা দেখা হায় আপলোগোনে? হামলোগোকা ফোর্স কা অওর এক জওয়ান … মুঠভেড় (এনকাউন্টার) মে উসে মারনে কা বাদ উসকা পেট কাটকে অন্দর বম্ব রাখ দিয়া থা … লাশ রেসকিউ করনেওয়ালে অওর তিন জওয়ান শহীদ হো গিয়া থা বিস্ফোট মে। ডিড ইউ এভার কাম টু মি দেন? … টু নো দ্য মেন্টাল স্ট্যাটাস অফ আস? আজ বড়ে চলে আয়ে হায় উন দেশদ্রোহিয়োঁ কি ইন্টারভিউ লেনে।’ পায়চারি থামিয়ে টেবিলে এসে বসলেন রণজিৎ সিং। সামান্য হাঁফাচ্ছেন উত্তেজনায়। গ্লাসের ঢাকনা সরিয়ে ঢকঢক করে জল খেলেন অনেকটা। চুপ করে রইলেন মিনিটখানেক। তারপর আবার শুরু করলেন। গলার আওয়াজ অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা এখন। ‘দেখুন মিঃ মিত্রা, আমার হাতে যদি এক্সট্রিম অথরিটি থাকতো তাহলে আমি আপনাকে কিছুতেই পারমিশন দিতাম না। বাট আনফরচুনেটলি আই হ্যাভনট গট দ্যাট। তাহলেই তো আবার আপনারা প্রেসওয়ালারা দেশ জুড়ে হই চই ফেলে দেবেন কী গভর্নমেন্ট সিকিওরিটি এজেন্সিগুলো ফ্রিডম অফ মিডিয়াকে রেসস্ট্রিক্ট করছে।তবে একটা কথা।’ অভিরূপের চোখে চোখ রাখলেন রাঠোর। ‘আপনি ওখানে যাবেন অ্যাবসলিউটলি অ্যাট ইওর ওন রিস্ক। আমাদের ফোর্সের সঙ্গে ওদের এনকাউন্টার, অ্যামবুশ লেগেই থাকে ওইসব এলাকায়। ইটস অলমোস্ট এভরিডেজ ফিচার ওভার দেয়ার। দোস প্লেসেস আর ফুল ফ্লেজেড ওয়ারফিল্ড। এনকাউন্টার অ্যামবুশের মাঝখানে পড়ে বা ‘কুমিং’ অপারেশনের সময় আপনার কিছু হয়ে গেলে তার রেসপনসিবলিটি আমরা নেবো না। একটা কথা জানিয়ে রাখি ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফর্মেশন, এরকম ঘটনা দুএকবার ঘটেছে অন্ধ্র, বস্তারে। নাউ ইটস অ্যাবসলিউটি ইয়োর ডিসিশন হোয়েদার ইউ উইল গো ওভার দেয়ার অর নট।’

আরও পড়ুন:  প্রেম, ভূত ও চুমু

একটানা রনজিতের কথা শোনার পড় এতক্ষণে মুখ খুলল অভিরূপ। ‘দেখুন মিঃ রাঠোর। এটা আমার জব। ডিউটি। অ্যান্ড আই অ্যাম ডিটারমাইন্ড টু ম্যাচিওর দ্যাট। আপনি বা আপনার ফোর্স আমাকে ফিজিক্যালি রেজিস্ট করলে আলাদা কথা। আর যদি সেটা না করেন তাহলে দয়া করে পেছনে স্পাই লাগিয়ে দেবেন না, প্লিজ।’

অভিরূপের কথায় হেসে ফেললেন রণজিৎ। ‘আপনার কি মনে হয় মিঃ মিত্র? ওরা কী দু’চারটে পেটি অর্ডিনারি ক্রিমিনাল যে পিছনে ফেউ লাগিয়ে দিলেই কাজ হবে? আরে দাদা, দো চার ব্যাটেলিয়ান ভি শালা কভি কভি কম পড় যাতা হায় উন হারামিয়োঁকে লিয়ে। সো ড্রপ অল দোজ ক্রাপস ফ্রম ইয়োর হেড। হাম সিরফ আপকো চেতাবনী দে দিয়া। বাকি আপকি মর্জি। আভি এক কাপ চায় তো পিজিয়ে। নেহি তো বাদ মে বোলিয়েগা শালে পোলিসওয়ালোনে এককাপ চায় ভি অফার নেহি কিয়া।’ ইন্টারকমের রিসিভারটা হাতে তুলে নিলেন রণজিৎ সিং রাঠোর।

মধ্যমগতিতে রাস্তা ধরে ছুটছিল রাঁচি-লাতেহার রুটের বাস। মাঝেমধ্যেই এবড়ো খেবড়ো, অসমান, গর্ত, ফোকড়। কমতে বাধ্য হচ্ছিল বাসের গতি। জঙ্গল, টিলাপাহাড়, ফসলকাটা ক্ষেত, ছোট ছোট গ্রাম, রোগা রোগা ছাগল চড়িয়ে ফেরা তার চেয়েও রোগা কালোকালো ছেলে, হাতে ব্যাঁকাত্যাড়া ডাল ভেঙ্গে বানানো লাঠি আর উদোম গায়ে চাদর জড়ানো, অজানা কারণে পরিত্যক্ত ভগ্নপ্রায় ধচাপচা ঝুপড়ি, ছোট চায়ের দোকানে উনুন ঘেঁষে ওম পোয়ানো রোয়াওঠা হাড় জিরজিরে নেড়িকুকুর, মাঝেমধ্যে একফালি রুখুশুখু চাষজমি। জানালার ধারে অভিরূপ। আনমনে এসবই দেখতে দেখতে চলেছিল। পাশে বসা এক পৌঢ়। রোগা, কালো, দড়িপাকানো চেহারা। বাসে ওঠার পর থেকেই ঝিমোচ্ছে। বাস মোটামুটি ভর্তি। মাথার ওপর টানা রডলাগানো র‍্যাকে ঠাসা পোঁটলাপুটলি, টিনের বাক্স, মালপত্তর। মাঝেমধ্যে ছোটখাটো গঞ্জ এলাকা, গ্রাম্য হাট, মানুষজনের ওঠানামা। মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছিল ঝুপড়ি চায়ের দোকানের ধারে বাঁশ কেটে বানানো অথবা কাঠের তক্তার বেঞ্চিতে নিজেদের মধ্যে আড্ডারত ছোপছোপ উর্দিধারি প্যারামিলিটারির জওয়ানদের। কোলেকাঁধে ইনস্যাস অটোম্যাটিক রাইফেল। রাস্তার ধারে দাঁড়ানো মাইন নিরোধক সাঁজোয়া গাড়ি। জলপাই রঙা সামরিক ট্রাক। রণভূমি তাহলে শুরু হয়ে গেল? এরই মধ্যে একটা স্টপেজে গাড়ি থামার পর বাসের দরজা খুলে উঠে এলো জনাতিনেক জওয়ান। মুহুর্তে বাসযাত্রীদের শরীর শক্ত। চোখে ভয়। জওয়ানরা ঘুরে বেড়াচ্ছে বাসের মধ্যে। রাইফেলের নল দিয়ে মালপত্র পোঁটলাপুটলির গায়ে খোঁচা মারছে। সন্দেহ হলে খুলিয়ে তল্লাশি করছে। ওদের মধ্যে একজন, ভারি বুটের শব্দ তুলে এসে দাঁড়ালো অভিরূপের সিটের সামনে। ‘কাঁহা যানা হায়?’ উচ্চারণে জাঠবলয়ের ছাপ স্পষ্ট। ‘লাতেহার’ শান্ত গলায় উত্তর দিলো অভিরূপ।

আরও পড়ুন:  কেতজেল পাখি (দ্রোহজ ২) পর্ব ৩

‘ক্যা কাম হায় উধার?’ কণ্ঠস্বর আরও রুক্ষ এবার।

‘পত্রকার হুঁ, কুছ সর্বেক্সন অওর ছানবিন কে কাম পে যা রহা হুঁ।’

দলের দ্বিতীয়জন, ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। ‘আপ উতার আইয়ে বাসসে।’ বরফঠাণ্ডা গলায় আদেশ উচ্চারিত হলো।

‘কাঁহা’, প্রশ্ন করলো অভিরূপ।

‘নীচে। হাবলদারজী অফিস মে বয়ঠে হুয়ে হায়। উনকে পাস … বাত করেঙ্গে আপসে।’

‘লেকিন মেরা সামান?’

‘ওহ ভি সাথ মে লেকে আইয়ে।’

‘লেকিন মেরা বাস ছুট যায়গি’, মরিয়া শেষ চেষ্টা করলো অভিরূপ।

‘হামলোগকা পার্মিশন বিনা গাড্ডি নহি ছোরেগি ইঁহাসে … আপ চলিয়ে আভি।’

তাড়া লাগালো তৃতীয় উর্দিধারী।

যুক্তিতর্কের চেষ্টা বৃথা। প্রতিবাদ করলে ফল উল্টো হতে পারে। অগত্যা কথা না বাড়িয়ে উর্দিধারীদের অনুসরণ করলো অভিরূপ।

বাস থেকে সামান্য দুরে একটা চারচালা মতো। ওপরে খড়ের ছাউনি। মাঝখানে কাঠের টেবিল। চেয়ারে বসা একজন। গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। মোটা মোচ সোজা গিয়ে জুড়ে গেছে জুলফির সঙ্গে। একই ধরনের জংলা ছোপ ছোপ উর্দি। উর্দির ওপর কালো ব্যাজে হলুদ অক্ষরে লেখা – ‘উমেশ কুমার’। হাবিলদার গোছের কেউ হবে। টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো অভিরূপ। একদৃষ্টিতে ওকে কয়েক সেকেন্ড জরিপ করলো লোকটা। তারপর সেই একই ধরনের প্রশ্ন। আরও বিস্তারিতভাবে। ব্যাগ তল্লাশির পালা তন্নতন্ন করে। বম্ব ডিটেক্টর দিয়ে। ‘পত্রকার?’ প্রেসকার্ডটা দেখার পর সামান্য নরম চোখের ভাষা। ‘ঠ্যাহেরিয়ে’, বলে ওয়াকিটকিতে কথা বলতে লাগলো অনেকক্ষণ ধরে। সাংকেতিক ভাষা। যার মধ্যে বেশিরভাগ না বুঝলেও ‘স্যর’ ‘পত্রকার’ আর ‘হেডকোয়ার্টার’ কথা কটা কানে এলো।

কান থেকে ওয়াকিটকি সরিয়ে অভিরূপের চোখে তাকালো হাবিলদার।

‘আপ পাকিস্তান যানা চাহতে হ্যায়?’

‘পাকিস্তান?’ অবাক অভিরূপ।

‘নক্সালবাদিয়োঁ কা ঘাঁটি ইলাকা … হাম উসে পাকিস্তান কে নাম পে বুলাতে হ্যায়। আতঙ্কিয়ো কা মুল্ক … ঠিক হ্যায়। আব আপ যা সকতে হো।’

‘ওয়, গাড্ডি ছোড় রে’। ড্রাইভারের দিকে হাত তুলে ইশারা করলো জওয়ানদের একজন। ব্যাগপত্তর সামলাতে সামলাতে দৌড়ে এসে বাসের হাতল ধরলো অভিরূপ।

আরও ঘণ্টাখানেক এভাবে চললো। সেই ছোট ছোট স্টপে বাস থামা। লোকজনের ওঠানামা। বাস অনেকটাই খালি ততক্ষণে। হঠাৎই কানের কাছে নিচুগলায় – ‘আপকা উতারনেকা টাইম আ গিয়া’। চমকে উঠে ঘাড় ঘোরালো।

 

চলবে

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/bengali-novel-ketjel-pakhi/

5 COMMENTS

  1. অনবদ্য এই উপন্যাসে পরতে পরতে চমক, আর সুপ্রিয় দা র কলমে ছোট ছোট চিত্রকল্পে ধরা পড়ছে বহু শ্রুত অথচ অচেনা এক জগতের কাহিনী. এই “আনপুটডাউনেবল” উপন্যাস বই হিসেবে পাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম. ভালো থাকবেন সুপ্রিয় দা.

  2. রনজিত সিং রাঠোর, উফ। সব দেখতে পাচ্ছি যেন। চোখের সামনে….

  3. ওপরের কমেনটে রনজিতের ডিটেল চেহারার বর্ননা অবান্তর বলে একজন রিডার একটি মন্তব্য করেছেন। সেই বিষয়ে আবার কিছু লিখতেই হল।

    মনে রাখতে হবে এটি একটি উপন্যাস। উপন্যাসে লেখক কলম দিয়ে চরিত্র গুলোকে সাদা কাগজের ওপর ফুটিয়ে তোলেন। শব্দ সেখানে একমাত্র হাতিয়ার। সাদা পাতায় একটা চরিত্রকে পাঠক যেন দেখতে পায়, এটা লেখকের দায়। শুধু চরিত্র নয়, সমগ্র পটভূমিটাই ফোটাতে হয় শব্দ দিয়ে। উপন্যাস আর খেয়াল গানের এখানে ভীষণ মিল। সুরে সুরে যেমন রাগটির চেহারা শ্রোতার কানের ভেতর দিয়ে গিয়ে মনশ্চক্ষু তে অনুভব করান হয়, তেমনি এখানে শব্দ সেই কাজটা করে।

    এ বিষয়ে কিছু বিখ্যাত উপন্যাস আমরা স্মরণ করব। গড ফাদার যখন পড়ছি তখন গোটা পরিবেশ আমার অচেনা। সিসিলি ঠিক কোথায়, জানিই না। জীবনে যেতে পারব না সেই বাজারে যেখানে ডন গুলিবিদ্ধ হলেন। ভরসা শুধু কলম। লেখক কিন্তু টম হেগেন, ক্লেমেনজা, টেসিও, সনি করলিওনি, এইসব না দেখা মানুষ কে সামনে এনে বসালেন কেবল চেহারার বর্নণা ও বৈশিষ্ট লিখেই।

    রেজারেকশনে নেখলিউদভ, কাতিউশা, জেলখানার ভেতরটা, রাস্তাঘাট দেখতে আমাকে রাশিয়া যেতে হল না। টলস্টয়রের কলম নিয়ে গেল অসামান্য ডিটেলে ভর করে।

    আমি নিজে একবার মেজর রন্জিত সিং, বাটালিয়ান কমানডার, ডোগরা রেজিমেনটকে পেয়েছিলাম ২১ দিন ধরে খুব কাছ থেকে, হাসিমারা এয়ার বেস ক্যাম্পে। সুপ্রিয়র রন্জিত সিং রাঠোর যেন কলমের টানে টানে মনে করিয়ে দিল সেই মেজরের স্মৃতিকে।

    অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই চরিত্র প্রতিষ্ঠার ডিটেল। শুধু কেবরা কমানডারই নয়, সব চরিত্রই যেন এই ভাবে পাঠকের কাল্পনিক জগত থেকে বাস্তবের সীমানায় চলে আসে এটাই মহত উপন্যাসের কাছে কাম্য।

এমন আরো নিবন্ধ