সুপ্রিয় চৌধুরী
জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর কলকাতার পুরোনো পাড়ায়। বহু অকাজের কাজী কিন্তু কলম ধরতে পারেন এটা নিজেরই জানা ছিল না বহুদিন। ফলে লেখালেখি শুরু করার আগেই ছাপ্পান্নটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। ১৪২১ সালে জীবনে প্রথম লেখা উপন্যাস 'দ্রোহজ' প্রকাশিত হয় শারদীয় 'দেশ' পত্রিকায় এবং পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে আরও দুটি উপন্যাস 'জলভৈরব' (১৪২২) এবং 'বৃশ্চিককাল' (১৪২৩) প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে পুজোসংখ্যা আনন্দবাজার এবং পত্রিকায়। এছাড়া বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং দু চারটি ছোটগল্প লিখেছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আর লিটিল ম্যাগাজিনে। তার আংশিক একটি সংকলন বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে 'ব্যবসা যখন নারীপাচার' শিরোনামে। ২০১৭ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার।

(২০১৪ সালে শারদীয় দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল লেখকের জীবনের প্রথম উপন্যাস দ্রোহজ। প্রকাশ হওয়ামাত্র পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে উপন্যাসটি। উপন্যাসের পটভূমি সত্তর দশক। আরও বিশদে বলতে গেলে এই শহর কলকাতা। সত্তরের কলকাতা। বাতাসে গুলি-বারুদের গন্ধ। অ্যাকশন এনকাউন্টার- অ্যামবুশ। অলিতেগলিতে রাতবিরেতে ভারী বুটের দাপাদাপি। রাস্তার মোড়ে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ লাশ। পাড়া আর স্কুল কলেজের দেয়ালে দেয়ালে লেখা হচ্ছে –‘নকশালবাড়ি লাল সেলাম।!’, ‘বুর্জোয়া শিক্ষা বয়কট করুন!’ … আরও কত কত শ্লোগান। এরকম একটা অস্থির সময়ে সুদীপ্ত, উত্তর কোলকাতার স্কুলে ক্লাস টেনের ছাত্র, নিজেকে বাঁচাতে পারেনি সময়ের আঁচ থেকে অথবা বলা ভাল চায়নি। কৈশোর-যৌবনের ধর্ম অবাধ্যতা, বিদ্রোহ। এই ধর্ম মেনেই ঝাঁপ দিয়েছিল দ্রোহাগ্নির দাবানলে। সঙ্গে বাবা অসিত, বড়দা মৃন্ময়, স্কুল আর পাড়ার বন্ধুরা আর সবার ওপরে পূর্ণেন্দু। স্কুলে প্রিয়তম বন্ধু। দুর্দান্ত, দুর্দমনীয়, স্কুল টিমের একনম্বর গোলকিপার। পাড়ায়-স্কুলে বিখ্যাত পুনে নামে। সুদীপ্ত আর পুনে হাতে হাত রেখে আগুনের ডানায় ভর দিয়ে উড়ে যাওয়া ঝোড়ো দু-তিনতে বছর অবশেষে উত্তর শহরতলীর এক শেল্টার থেকে গ্রেফতার সুদীপ্ত। এর আগেই ধরা পড়ে পুনে। কিন্তু রাষ্ট্রের কারাগার মাস কয়েকের বেশি তার পেটে গিলে রাখতে পারেনি চিরস্বাধীন এই কিশোরটিকে। কয়েকজন সঙ্গীর সঙ্গে জেল ভেঙ্গে পালায় পুনে। অতঃপর বহু প্রান আর ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে একদিন বিদায় সত্তর। বছর ছয়েক কারাবাসের পর মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফেরে সুদীপ্ত। কিন্তু কোথায় পুনে? কিছুদিন বাদে একটা চিঠি আসে সুদীপ্তর নামে। পালামৌর একটা আদিবাসী গ্রাম থেকে। জঙ্গলের রাস্তায় ফের নতুন করে পথ হাঁটছে পুনে। স্বপ্নভঙ্গের পর আবার স্বপ্ন দেখা শুরু নতুন করে।

Banglalive

উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার পর বহু মানুষ ফোন করে, চিঠিতে, অন্তর্জালের মাধ্যমে বহু কথা বলেছিলেন, উৎসাহ দিয়েছিলেন, প্রশ্ন করেছিলেন লেখককে। প্রশ্ন মূলতঃ একটাই। শেষ অবধি কী হলো পুনের? সেই আবেগমথিত প্রশ্নের উত্তর নিয়েই শুরু হলো  ‘কেতজেল পাখি’ (দ্রোহজ-২) উপন্যাস। যাঁরা দ্রোহজ পড়েননি তাঁরা লেখাটিতে একটু চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন শুরুর আগে। না পড়লেও সমস্যা নেই। বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হবে না।)

 

Whether true or false, what is said about men often has as much influence on their lives, and particularly on their destinies, as what they do.

                                                                     Victor Hugo.

 

রাস্তার ধারে শুকনো নালাটার ওপর ভাঙাচোরা আর ফাটলধরা সরু কালভার্টটার দু’ধারে চার থাকওয়ালা ইঁটের দুটো বেদীমতো। তারই একটার ওপর বসেছিল অভিরূপ। পাশে শুইয়ে রাখা রাকস্যাক। তারপাশে চামড়ার খাপবন্দি ডিএসএলআর ক্যামেরাটা। উত্তরদিক থেকে ছুটে আসা ঝাড়খণ্ডের বরফঠাণ্ডা হাওয়া হাড় ছ্যাঁদা করে দিচ্ছে। অভিরূপের গায়ে সফট্‌লেদার জ্যাকেট। তার তলায় শার্টের ওপর গোল-গলা পুলওভার। জিনসের প্যান্ট। মোটা উলেন মোজার ওপর মজবুত চামড়ার ট্র্যেকিং-শু। তবু ঠাণ্ডাটা পিন ফোটাচ্ছে শরীরে। জ্যাকেটের চেনটা গলা অবধি টেনে দিলো অভিরূপ। মাথার পিছনে শেষ বিকেলের মরা সূর্যটা দ্রুত হেলে পড়ছে দূরে ছোট-মাঝারি টিলাপাহাড়গুলোর পিছনে। কালভার্টের নীচে প্রায় শুকনো নালাটার একপাশে শুয়ে থাকা আদিগন্ত ধূ ধূ ফাঁকা মাঠ গিয়ে সোজা ধাক্কা খেয়েছে দূরে ছোট মাঝারি টিলা-পাহাড়গুলোর গায়ে। রাস্তার অন্যদিকে ঘন শাল-মহুয়ার জঙ্গল। একটা অচেনা পাখির ডাক। ‘কুব কুব’ শব্দে ডেকেই চলেছে পাখিটা। গাছের আড়াল থেকে। দেখা যাচ্ছে না পাখিটাকে। ঝুপ ঝুপ করে নেমে আসা কুয়াশার ভিড় বাড়ছে মাঠে। সামনের জঙ্গল ক্রমে আরও ঘন, আরও অস্পষ্ট। হাতের কব্জি উল্টে ঘড়িতে সময় দেখলো অভিরূপ। পাঁচটা বেজে পাঁচ। এমনিতে ঘড়ি পরে না। কদিন ধরে পরছে। কারণ জঙ্গলে মোবাইলের চার্জ ফুরিয়ে যাওয়া বা রিচার্জের সমস্যা হতে পারে। সময় দেখতে অসুবিধা হবে তখন …… এটাই স্বাভাবিক।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ২৫)

এইরকম মারাত্মক ঠাণ্ডা, সঙ্গে যদি একটু গা গরম করার মতো কিছু থাকতো। দু একটা সিপ … একটু চাঙ্গা হতো শরীরটা, কিন্তু দিব্যেন্দুদার স্ট্রিক্ট ইন্সট্রাকশন – ‘অ্যালকোহল ইজ স্ট্রিক্টলি প্রহিবিটেড অ্যাজ ফার অ্যাজ দিস প্রজেক্ট ইজ কনসার্নড’। যাদের মধ্যে কাজ করতে যাচ্ছে তাদের প্রচণ্ড রিজার্ভেশন রয়েছে ব্যাপারটা নিয়ে। সো, নাথিং ডুয়িং। চিন্তাটাকে হাটিয়ে দিতে জ্যাকেটের সাইড পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করলো। ধরিয়ে অনেকটা ধোঁয়া টেনে নিলো বুকে। ভাবনার রিলটাকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল বেশ খানিকটা সময়।

অফিসে ঢুকতেই লবিতে সেঁজুতি। ‘পেজ থ্রি’ ডেস্ক কভার করে। অভিরূপের পাশের কিউবিকলেই বসে। পরনে খাদি টাইপের থ্রি কোয়ার্টার কুর্তা। কুর্তার ওপর চড়ানো নকশাদার সম্বলপুরি হাফস্লিভ জ্যাকেট। বয়েজ কাট চুল। আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত কিংসাইজ সিগারেট। ‘অ্যাই, দিব্যেন্দুদা খুঁজছিলেন তোকে। একটু আগেই গেছিলাম ওনার চেম্বারে। আমাকে বললেন তোর সঙ্গে দেখা হলেই পাঠিয়ে দিতে।’ ‘যাচ্ছি’ বলে সেঁজুতির পাশ কাটিয়ে নিজের কিউবিকলের দিকে এগিয়ে গেলো অভিরূপ। ডেস্কের ওপর রাখা ডেস্কটপটা অন করে মেইলবক্সটা চেক করলো একবার। পাশে রাখা জলের গ্লাসের ঢাকনা সরিয়ে জল খেলো। নিজের আবছা মুখটা একবার দেখে নিলো স্ক্রিনে। তারপর পা চালালো দিব্যেন্দুদার চেম্বারের দিকে।

‘তারপর অভিচন্দ্র, কী খবর? কাজকম্মো ক্যামন চলছে?’ টেবিলের ওপারে গদিআঁটা চেয়ারে বসেছিল দিব্যেন্দুদা। আঙুলগুলো নাচছে টেবিলের ওপর। নামী অল ইন্ডিয়া কোয়ার্টারলি মান্থলি ম্যাগাজিন ‘নিউজ র‍্যাঞ্চ’-এর রিজিওনাল এডিটর ইন চিফ দিব্যেন্দু ব্যানার্জী। উল্টোদিকে বসা অভিরূপ। অভিরূপ মিত্র। পত্রিকার সিনিয়র ইনভেস্টিগেটিং রিপোর্টার। নেই নেই করে আট বছর হয়ে গেল এই অর্গানাইজেশনে। ভালো করে জানে দিব্যেন্দুদার এই টেবিলে তাল ঠোকা আর নামের পিছনে চন্দ্র জুড়ে দিয়ে এটাসেটা খেজুরে প্রশ্ন অথবা আলাপচারিতা মানেই কোন একটা টাফ কনসাইনমেন্টের কথা পাড়তে চলেছেন। তার আগে মুখরাটা সেরে নিচ্ছেন। হলোও তাই। টেবিলের ওপর নাচতে থাকা আঙুলগুলো থেমে গেলো। সামান্য খুক খুক করে কেশে গলাটা সাফ করে নিলেন দিব্যেন্দুদা। ‘… তারপর বুঝলি তো, দিল্লির হেড অফিস থেকে একটা কনসাইনমেন্ট এসেছে। আসলে এটার জন্য ওরা আমাদের রাঁচির করসপনড্যান্ট ব্রিজেশ মিশ্রর কথাই ভেবেছিল। ও প্রাইমারি কনট্যাক্টগুলো সেরেও ফেলেছিল অনেকটাই। কিন্তু প্রবলেম হয়েছে। তিনদিন আগে সাডেনলি স্কুটার অ্যাকসিডেন্টে পা ভেঙে নার্সিংহোমে পড়ে আছে বেচারা। কিন্তু হেড অফিস আর দেরি করতে চাইছে না। গত হপ্তায় ‘নেশন টুডে’ কাশ্মীরি মিলিট্যান্টদের ওপর কভার স্টোরিটা পাবলিশ করে হইচই ফেলে দিয়েছে চারদিকে। এর প্রপার কাউন্টার একটা কিছু দিতে না পারলে তো অর্গানাইজেশনের মান থাকে না। ওরা আমার কাছে সাজেশন চেয়েছিল, ইস্টার্ন রিজিয়নে ব্রিজেশের সাবস্টিটিউট কাউকে … আমি তোমার নামটা রেফার করে দিয়েছি। লাস্ট মান্থে লালগোলায় ড্রাগ র‍্যাকেটের ওপর তোমার ওই কভার স্টোরিটা খুব ইন্টারেস্টিং হয়েছিল … বেশ রিস্ক নিয়েই কাজটা করেছিলে বলতে হবে।’

‘তা এবারের কাজটা কী দিব্যেন্দুদা?’ সামান্য অধৈর্য্য স্বরে প্রশ্ন করলো অভিরূপ।

‘পেশেন্স অভিচন্দ্র। অত অধৈর্য্য হলে চলে? বলবো বলেই তো ডেকেছি।’ টেবিল থেকে রিমোটটা তুলে নিয়ে চলতে থাকা এসি-টা বন্ধই করে দিলেন দিব্যেন্দু। তারপর ঘুরে তাকালেন অভিরূপের দিকে। ‘রেড করিডরের নাম শুনেছো?’

ঘাড় নাড়লো দিব্যেন্দু। ইতিবাচক।

‘গুড’ সন্তুষ্টির ছোঁয়া সম্পাদকের গলায়। ‘নাও টেল মি সামথিং অ্যাবাউট দ্যাট।’

আরও পড়ুন:  ভাগাড় থেকে ফাইভস্টার

‘রেড করিডর’ অভিরূপের চোখ দিব্যেন্দুদার চোখে। ‘পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িষা, ছত্তিশগড়, অন্ধ্র, কর্ণাটকের বুক চিরে সেই মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুর, গড়চিড়উলি … লাল রাস্তা। দুর্গম জঙ্গল ঘেরা ট্রাইবাল বেল্ট। মাওবাদী, আই মীন নক্সালাইটদের মুক্তাঞ্চল … গেরিলা জোন। প্রধানমন্ত্রীর বয়ানে ‘দ্য সিঙ্গেল লার্জেস্ট ইনটারনাল থ্রেট’। খবরাখবর যতটুকু পাই তাতে তো মনে হয় একটা প্যারালাল গভর্নমেন্ট রান করে ওরা ওখানে … বাই দ্য নেম অফ জনানতনা সরকার ওর সামথিং লাইক দ্যাট …।’

‘গ্রেট!’ খুশি হলেন দিব্যেন্দু। ‘যাক, কনটেম্পোরারি এলিমেন্টস নিয়ে পড়াশুনোর অভ্যেসটা তাহলে আছে এখনও। এবার কাজের কথায় আসা যাক। এই রেড করিডরের মধ্যে ওয়ান অফ দ্য মোস্ট ইমপর্ট্যান্ট স্টেট ইজ ঝাড়খণ্ড। তারই একটা ব্লক লাতেহার। সেখানে নিজেদের অল ইন্ডিয়া কনফারেন্স করতে চলেছে মাওয়িস্টরা। পাহাড় জঙ্গল ঘেরা কোন এক দুর্গম অঞ্চলে। তার আয়োজন, ব্যবস্থাপনা কীরকম চলছে সেটা তদারকি করতে আসবেন ওদের পার্টির টপ লিডারশিপের কেউ একজন। তোমাকে তার একটা এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ নিতে হবে। এছাড়াও ওখানকার ওভারঅল সিচ্যুয়েশনের ওপর ইন্টারেস্টিং রিপোর্টাজ তৈরি করতে হবে একটা … আ ডেডলি কভার স্টোরি, অ্যাবসলিউটলি রিয়্যালস্টিক। হ্যাভ ইউ গট মাই পয়েন্ট?’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন দিব্যেন্দুদা। টেবিল থেকে রিসিভার তুলে নম্বর মেলালেন। ‘দুটো চা।’

মিনিট পাঁচেক বাদে কাঁচের দরজা ঠেলে ঢুকলো মদন। অফিসের পুরোন বেয়ারা। হাতের ট্রেতে সাজানো দুটো চায়ের কাপ। আলাদা প্লেটে বিস্কুট। টেবিলে নামিয়ে রেখে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ফের শুরু করলেন দিব্যেন্দু। ‘বাট ইউ হ্যাভ টু ডু ইট ভেরি কশাসলি। অন্ধ্র আর ওয়েস্ট বেঙ্গলে সেটব্যাকের পর মারাত্মক রিজার্ভড হয়ে গেছে ওরা। দুএকজন মোস্ট প্রমিনেন্ট সোশ্যাল ওয়ার্কার অথর ছাড়া আর কাউকে ওদের এরিয়ায় এন্টারটেইন করেনি সেভাবে। ওদের একটা অন্যতম অভিযোগ হলো সো কলড পপুলার মিডিয়াগুলোর অনেকেই ওদের এলাকা থেকে কাজ সেরে গিয়ে যে রিপোর্টগুলো করে সেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুল, ফ্যাব্রিকেটেড অ্যান্ড এক্সাজারেটেড। ভবিষ্যতে এরকম হলে আর কাউকেই এন্টারটেইন করবে না ওরা। অনেক কষ্টে পার্মিশনটা জোগাড় করা গ্যাছে। সুতরাং সতর্ক থাকতে হবে এব্যাপারেও। মোদ্দা কথা নিউট্রাল হতে হবে রিপোর্টটা। নইলে ইন ফিউচার এ ব্যাপারে ইনফরমেশন পাওয়া মানে ওদের ওয়ে অফ অ্যাকশন, ফিউচার প্লান … এ সবকিছু জানতে পারার সোর্সগুলোই ড্রাই ডাউন করে যাবে বরাবরের জন্য। সো, অলসো বি কেয়ারফুল অ্যাবাউট দ্যাট অ্যান্ড স্টার্ট প্যাকিং ইয়োর ব্যাগেজেস। আমাদের ট্রাভেল এজেন্টকে বলে দিয়েছি। পরশু সকালের ফ্লাইটে তোমার রাঁচির টিকিট কনফার্মড। বাকি সব ইনফরমেশন ওখানে গিয়ে ব্রিজেশের কাছ থেকে পেয়ে যাবে। নাও গো অ্যাহেড। বেষ্ট অফ লাক।’

দরজা দিয়ে বেরোনর মুখে ফের দিব্যেন্দুদার ডাকে থামতে হলো অভিরূপকে। ‘ওয়ান মোড় থিং অভি, ওরা একমাত্র ওদের এনিমি ছাড়া আর কারো সঙ্গে দেখা হলেই ‘লাল সেলাম’ আর ‘কমরেড’ বলে সম্বোধন করে। সে তোমার মনে লাল বা নীল যাই থাকনা কেন ওখানে কিন্তু ওই লাল সেলামেই জবাব দিতে হবে … হাঃ হাঃ।’ নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন দিব্যেন্দুদা।

 

‘এমন জায়গায় যাচ্ছো যে সাতদিন ফোন করতে পারবে না? অ্যাই শোনো! অনেক হয়েছে। এনাফ ইজ এনাফ। তোমার ওই জঘন্য চাকরিটা তুমি এই মুহূর্তে ছেড়ে দাও।’

সল্টলেকের শপিং মলটার তিনতলায় কফিশপের বিশাল কাঁচের দেয়ালের ওপারে ঝাঁ চকচকে সব দোতলা তিনতলা বাড়ি। মাঝে মাঝে কয়েকটা হাইরাইজ। নীচে রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া প্রাইভেট কার – বাস – মিনিবাস – ট্যাক্সি। রাস্তার ধারে গাছগাছালি। জানালা দিয়ে আলগোছে এসবই দেখছিল অভিরূপ। ঠোঁটের কোণে বিপদে পড়ে যাওয়া অস্বস্তির  হাসি। টেবিলের উল্টোদিকে বসা শ্রীতমা। শ্রীতমা মজুমদার। মধ্য কোলকাতার একটা গার্লস কলেজে ইংরিজী পড়ায়। পরনে হাল্কা ইঁটে রঙের তাঁতের শাড়ি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। আজকের তুলনায় একটু আউট ফ্যাশন্‌ড। আদ্যপান্ত একটা দিদিমনি দিদিমনি ভাব চেহারায়। আপাতত মুখের চেহারা ভয়ঙ্কর রকম সিরিয়াস। এসি-র ঠাণ্ডায় কফি জুড়িয়ে যাচ্ছে। হুঁশ নেই সেদিকে। অভিরূপ জানে এটা ঝড়ের পূর্বাভাস। টিপ অফ দ্য আইসবার্গ মাত্র। ঠাণ্ডা মাথায় ঝড়টার মোকাবিলা করতে হবে। এবং সেক্ষেত্রে নীরবতা অবলম্বন করাটাই একমাত্র ঢাল ওর সামনে। কিন্তু সেই ঢালে ফাটল ধরছে একটু একটু করে। কারণ উল্টোদিক থেকে ধেয়ে আসা বাক্যবান। ‘লিসন অভি … মুখ বুজে থাকলে চলবে না। ইউ হ্যাভ টু আনসার।’ অভিরূপকে তবুও চুপ করে থাকতে দেখে ফের সরব হলো শ্রীতমা। কণ্ঠস্বর আরও তীক্ষ্ণ। ‘তুমি নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবছো চাকরি ছাড়লে খাবে কী। সে চিন্তা তোমায় করতে হবে না। যে মুহূর্তে তুমি রেজিগনেশন লেটার সাবমিট করবে তার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দুজনে ম্যারেজ রেজিস্টারের কাছে গিয়ে নোটিশ দেবো। কারণ লেট হাজব্যান্ডের চেয়ে আনএমপ্লয়েড হাজব্যান্ড ইজ ফার বেটার অপশন। সে যদি তুমি রেস্ট অফ দ্য লাইফ বেকার থাকো, তবুও। কী আর হবে? কাঠফাটা গরমেও রাতে শোবার সময় ছাড়া এসি চালাবো না। উইকএন্ডের বদলে মাসে একদিন হোটেলে খাবো। পাঁচবছরে একবার বেড়াতে যাবো। তবু তুমি চাকরিটা ছেড়ে দাও।’

আরও পড়ুন:  মানুষের অস্তিত্ব আর ১০০ বছর

‘আর ছানাপোনা হলে …’ মৃদু রসিকতার লোভটা ছাড়তে পারলো না অভিরূপ।

‘অ্যাই, খবর্দার! চ্যাংড়ামো মারবেনা একদম। হয় আমি, নয় তোমার ওই চাকরি। দুটোর মধ্যে যে কোনও একটাকে বেছে নিতে হবে তোমায়। এই পরিষ্কার বলে দিলাম।’

অভিরূপ জানে এখন কিছুটা সময় দিতে হবে শ্রীতমাকে। বিস্ফোরণটা সামলানোর জন্য। কিছুক্ষণ বাদে ওর হাতে হাতটা ছোঁয়ালো অভিরূপ। ‘রাগ কমেছে?’ একটু আগে ভয়ঙ্কর রেগে যাওয়া চোখদুটোর কোনায় জল টলটল করছে এখন। ‘প্লীজ অভিরূপ … প্রতিমুহূর্তে এই ট্রিমেন্ডাস মাউন্টিং টেনশন। এই বোধহয় তোমাকে কোনও ডেঞ্জারাস কনসাইনমেন্টে যেতে হলো … আই জাস্ট কান্ট টেক ইট এনিমোর। বিলিভ মি’। চোখের কোনে জমে থাকা টলটলে ফোঁটা এবার ধারা হয়ে গড়িয়ে পড়লো দুগাল বেয়ে। সেদিকে তাকিয়ে হাসলো অভিরূপ। বড় মলিন সে হাসি, ‘দ্যাখো শ্রীতমা, এ দুনিয়ায় সবার জন্য কোনও না কোনও কাজ নির্দিষ্ট থাকে। যেমন আমার ক্ষেত্রে এটা … দ্য জব অর ডিউটি অফ আ ইনভেস্টিগেটিং রিপোর্টার। এন্ড অফ দ্য ডে এটাই হয়তো আমার ডেস্টিনি। বাট আই হ্যাভ টু অ্যাডমিট যে কাজটাকে আমি ভালোবাসি। এই যে নতুন নতুন কনসাইনমেন্ট … হান্টিং ফর এক্সক্লুসিভ নিউজ। সামটাইম মাইট বি র‍্যাদার ডেঞ্জারাস। তবু এই থ্রিলটা এনজয় করি আমি। আমার রক্তে ঢুকে গেছে এটা। এছাড়া আর কোনও কাজ করতে পারবো না … প্লিজ বিলিভ মি।’

শ্রীতমাকে চুপ করে থাকতে দেখে আলতো করে ওর কাঁধে হাতটা রাখলো অভিরূপ – ‘আরে বাবা, সাত দিন তো একটা টেন্টেটিভ টাইম। তার আগেই খবর পেয়ে যাবে আশা করি। এবার তো একটু হাসো।’ এতক্ষণ রাগী, বিষণ্ণ চোখদুটোর কোনে কী সামান্য হাসির ঝিলিক? কাঁধের ওপর হাতের চাপটা শক্ত করলো অভিরূপ – ‘এবার উঠতে হবে তো। কাল ভোরে ফ্লাইট। বাড়ি ফিরে আবার লাগেজ গোছাতে হবে। মা’র বয়স হচ্ছে। একা হাতে আর সবকিছু সামলাতে পারে না আগের মতো।’

চলবে…

7 COMMENTS

  1. যথারীতি মনোযোগের টুঁটি কামড়ে ধরা গদ্যে টানটান। পরেরটার জন্য রুদ্ধ শ্বাস

  2. Sei sabolil gati ja nischit niye choleche bartoman theke ateet. ..dainandin tike thaker middle class larai theke biplob er agun jhara din e .
    Porte thakbo r vabte thakbo haeto sab manus er antare ekta Ketsel Pakhi bas kare jake bondi kore rakha jae na Mrittu e tar sesh Pratibad.

  3. আর অপেক্ষা করে যাচ্ছে না ।দারুন গতি।

  4. অল্পেতে আশ মেটে না ….

  5. কবে বেরুবে বইটা ? ? ?

    প্রথমটা পড়েছি , এইটা পড়বার জন্য আর অপেক্ষা করা যাচ্ছে না ।

  6. fantastic starting….

    waiting very eagerly for the next part

এমন আরো নিবন্ধ